১ যে ঘরে ট্রেন ঢোকে নাঅয়ন মুখোপাধ্যায়
ঢাকুরিয়া বস্তির মেয়েটি জানে—
রেললাইনের গা ঘেঁষে থাকা টালির ঘরে
তার মায়ের হাত, আজও রান্না করছে।
আর সে,
চুল বেঁধে বসে আছে—
একা।
মাঝরাতে সে চোখ রাখে বইয়ের ভেতর।
চুপচাপ সিলেবাসের কবিতাগুলো পড়তে পড়তে
মাঝে মাঝে ফিসফিস করে নাম ধরে ডাকে বাবা বাবা
যিনি আকাশের ওপারে কোথাও আছেন।
দু’ লাইনের ওপর দিয়ে ছুটে যায় ক্যানিং লোকাল।
ছোট্ট পায়ের ছাপে স্বপ্নের গতি পায়।
কামরার জানলা ভেঙে
আলো ঠিকরে পড়ে
বস্তির ছাদে।
এক মুহূর্তে মেয়েটি ভাবে—
সে যেন পরী।
ঠিক তখনই
পরীর কানে ঢুকে পড়ে
ট্রেনের হর্ন।
যে শব্দে রাত্রি নামে,
সে বুঝে যায়—
আলো থাকলেও
সব ঘরে আলো জ্বলে না।
২লাইন টপকে বসন্ত
অয়ন মুখোপাধ্যায়
শীতের শেষে বসন্ত ঢুকে পড়ে
ভাঙা বস্তিতে।
বিনোদিনী গার্লসের নতুন শাড়ি-পড়া মেয়েগুলো
দল বেঁধে লাইন টপকায়—
তাদের পেছনে উড়ে যায়
আকাশের পাখির ঝাঁক।
বিস্মৃত শহর—
ঢাকুরিয়া—
আমার কাছে হঠাৎ মায়াবি লাগে।
মেয়েরা হেসে ওঠে,
আমাকে ডাকছে।
আমি হাঁটি।
হাঁটি যেন জন্মান্তরের দিকে—
রক্তের স্বাদ লেগে থাকা পথ ধরে।
ফেলে আসি
৮/২ ব্যানার্জি পাড়া লেন।
ওরা আমার দিকে তাকিয়ে হাসে।
আমি লজ্জা পাই,
তবু হাসি থামাই না।
এরা মেঘে ঢাকা তারা।
বাবারা দূরে।
মায়েদের কাজের চাপে
মেয়েরা স্বপ্ন দেখে।
স্বপ্নের শেষ আলোয়
পেয়ে যায় বাবার স্পর্শ—
প্রেমিকের আঙুলে।
৩ ঘাস হয়ে ওঠা নাম
অয়ন মুখোপাধ্যায়
মেয়েরা বড় হয়।
মায়েদের বয়সের পাশে দাঁড়ায়।
পঞ্চানন তলার বস্তিতে
আলো উপচে পড়ে।
কেউ কেউ কবরস্থানের আলোয় বসে থাকে।
আলোটা সেখানে কথা কম বলে।
হাতের ওপর এসে পড়ে,
হাঁটুর কাছে থামে।
কাঁকুলিয়া গেটে বিকেলের আলো ছড়িয়ে পড়লে
আমি দেখেছি—
গাছের পাতা নরম হয়ে আসে,
শীত কমে যায়।
এরা বিশ্বাস করে—
প্রজাপতি হাতের ওপর বসলে
শাড়ির আঁচলে মুছে যায়
প্রেমিকের কাটাদাগ।
কর্পোরেশনের জল এলে
কলকাতার বস্তিগুলো জেগে ওঠে।
জলের লাইনে দাঁড়িয়ে
মেয়েটি প্রেমিকের ভেতর খুঁজে পায়
বাবাকে।
সে বলতে চায়—
“বাবা…”
শব্দটা জল হয়ে
মাটিতে গড়িয়ে পড়ে।
সেখান থেকে
ঘাস জন্মায়।
বস্তির শহরে
আবার বসন্ত আসে।
আমি একা হাঁটি—
তাদের স্বপ্নের আলোয়।
ঢাকুরিয়ার বস্তি ধীরে ধীরে হালকা হয়।
রাত নামলে
ঘরের ভেতর
সে বাসা বাঁধে পাখির মতো—
যাকে ভোর এসে
ডেকে দিতে ভুলে গেছে
কবে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।