

সঠিক সালটি এখন আর মনে নেই। সম্ভবত ২০০৯-১০ নাগাদ কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে বেলা টারের (২১শে জুলাই ১৯৫৫ – ৬ই জানুয়ারি ২০২৬) একাধিক ছবির একটি প্যাকেজ এসেছিল। তৎপূর্বে বেলা টারের নাম অল্পাদ্রু শুনে থাকলেও তাঁর কোনো ছবি দেখা হয়ে ওঠেনি। তবে স্পষ্ট মনে আছে, সেই উৎসবে প্রথম যে ছবিটি তাঁর দেখেছিলাম, নাম ছিল ‘ওয়ার্কমিস্টার হারমনিজ’ (২০০০)। বলতে দ্বিধা নেই, ছবিটির বৈশিষ্ট্য বলতে দীর্ঘ স্থায়ী একেকটি শট ছাড়া সেসময় আর সেভাবে মনে কিছু দাগ কাটেনি। এও মনে হয়েছিল ইতিপূর্বে আন্দ্রেই তারকভস্কি বা থিও অ্যাঞ্জেলোপউলাসের ছবিতে এরকম দীর্ঘ স্থায়ী শট তো আমরা দেখেছি। ঐ উৎসবেই এরপর একে একে দেখলাম ‘ড্যামনেশন’ (১৯৮৭), ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ (১৯৭৯), ‘আলমানাক অফ দা ফল’ (১৯৮৪), ‘দা ম্যান ফ্রম লন্ডন’ (২০০৭) এবং ‘সাতানতাঙ্গো’ (১৯৯৪)। শেষোক্ত ছবিটি সাড়ে সাত ঘণ্টার ছবি! মনে আছে এই ছবিটি টানা দেখানো হয়েছিল নন্দন-২ প্রেক্ষাগৃহে। ধীরে ধীরে আমরা অনুধাবন করতে পারি, ঐ দীর্ঘ স্থায়ী শটগুলির নান্দনিক সৌন্দর্য তারকভস্কি বা অ্যাঞ্জেলোপউলাসের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। পরে, আমার মতে তাঁর অন্তিম ও শ্রেষ্ঠ কাজ ‘দা টিউরিন হর্স’ (২০১১) দেখে সেই প্রত্যয় আরো দৃঢ় হয়। আজ বেলা টারের মৃত্যুর পর লিখতে বসা এই লেখায় কী লেখা যেতে পারে ভেবে মনে হল, ছবি গুলি দেখার ব্যক্তিগত স্মৃতি নিয়েই নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করা যেতে পারে তার এই ভিন্ন প্রকৃতি নিয়ে দুচার কথা বলার। 
কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বেলা টারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দৃশ্যায়নের যে প্রচলিত পদ্ধতি অর্থাৎ একজন ঘরে ঢুকে “হ্যালো” বললে কাট করে প্রত্যুত্তরে আরেকজনের “হ্যালো” বলাকে ধরা, তারপর দুজনকে একসঙ্গে ধরা, এরকম দৃশ্য-সম্পাদনা তাঁর ছবিতে তেমন দেখা যায় না কেন? টার জানিয়েছিলেন ওরকমভাবে টেলিভিশনে ছবি তোলা হয়, এই পদ্ধতিটি বোরিং এবং এর মধ্যে তিনি কোনো চ্যালেঞ্জ খুঁজে পান না। তাছাড়া ওরকমটা মিথ্যে মিথ্যে দেখানো, কারণ আপনি সত্যি যখন একটা ঘরে বা কোনোখানে ঢুকে আরেকজনের সঙ্গে আলাপ করেন, তখন দুজনের দুজনকে উপলব্ধি করতে সময় লাগে। টার আরো জানান তিনি যৌবনে একটি জাহাজের ফ্যাক্টরিতে ওয়ার্কারের কাজ করতেন। সেই সময়ই তিনি বুঝতে পারেন মানুষ কিভাবে জীবন কাটায় এবং কাল বা সময় ব্যাপারটাই বা কিরকম! কম বয়েসে চলচ্চিত্রকার হওয়ার কথা তিনি ভাবেন নি। বাবা তাঁর পনের বছরের জন্মদিনে একটি আট মিলিমিটার ক্যামেরা কিনে দেন। ঐ কম বয়সেই তাঁর সুযোগ হয় গোদারের ‘ব্রেথলেস’ দেখার। ঐ বয়সেই ইয়াঞ্চো, জিভা ভের্টভের কিছু ছবি এবং তারকভস্কির ‘আন্দ্রেই রুব্লেভ’ দেখে তিনি যারপরনাই আলোড়িত হন। কম বয়স থেকেই তিনি বামপন্থার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। হ্যাঙ্গেরিতে সে সময় বামপন্থী সরকার থাকলেও তাঁর মতে সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারাতেই গোটা সমাজ পরিচালিত হত। ইতালির সিজার জাভাত্তিনি বা আমাদের দেশের মৃণাল সেনের মত টার ছিলেন লুপ্তপ্রায় প্রজাতির সম্ভবত শেষ পরিচালক যিনি চলচ্চিত্রকে মনে করতেন সমাজ পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার! এই প্রত্যয় থেকেই জিপসি ওয়ার্কার গ্রুপকে নিয়ে পঁচিশ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এই জিপসিদের গ্রুপটি হাঙ্গেরি ছেড়ে অস্ট্রিয়া চলে যেতে চাইলে হাঙ্গেরির বাম সরকার অনুমোদন দেয় না। সরকার অননুমোদিত এই তথ্যচিত্রটি টার নিজের উদ্যোগে নির্মাণ করেন ও নিজের উদ্যোগেই বিভিন্ন জায়গায় দেখানোর চেষ্টা করেন। তথ্যচিত্রটি পরে আর পাওয়া যায় না। মনে করা হয় হাঙ্গেরির তৎকালীন বাম-সরকার নাপসন্দ এই তথ্যচিত্রটি বাজেয়াপ্ত করে এবং এটি নির্মাণের পরিণাম হিসেবে টারকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে দেওয়া হয় না! হাঙ্গেরির কিছু তরুণ পরিচালকের সহায়তায় অতঃপর টার ১৯৭৯ সালে নির্মাণ করেন প্রথম পূর্ণ-দৈর্ঘ্যের ছবি ‘ফ্যামিলি নেস্ট’। সাদা-কালোয় নির্মিত এই ছবিটি তোলা হয় ষোল মিলিমিটার হ্যান্ড-হেল্ড ক্যামেরায়। অপেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে কোনো চিত্রনাট্য ব্যতিরেকেই তিনি নানান ধরনের ইম্প্রভাইজেশন করেন এই ছবিটিতে। তাঁর জাহাজের ফ্যাক্টরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও আছে এতে। মাত্র আঠেরো বছর বয়সে প্রতিদিন কুড়ি কেজির উপর মাল বহন করে তাঁর কোমরের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও মানুষের জীবনের কী অবস্থা, পারিবারিক জীবনের প্রকৃত চেহারাটা কী, জীবন ধারণের সত্যিকারের মান কী, এইসবের উপর ছবিটি গভীরভাবে আলোকপাত করে। এই ছবির শুরুতে যে ‘বেলা বালাজ ফিল্ম স্টুডিও ১৯৭৭ প্রেজেন্স’ দেখানো হয় এটি ছিল হাঙ্গেরির তরুণ পরিচালকদের একটি গ্রুপ। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ‘হাঙ্গেরিয়ান সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কারস পার্টি’-র সরকার এই তরুণ পরিচালকদের ছবি করার অনুমতি দেয় কিন্তু ছবি দেখানোর অনুমতি দেয় না। ফলে ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ নির্মিত হওয়ার পর দেশে মুক্তি পায় না, মুক্তি পেতে লেগে যায় প্রায় দু-বছর। কিন্তু ছবিটি ম্যানহাইম চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় ও টার রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। ফলত হাঙ্গেরির সরকার টারকে এরপর ছবি করা থেকে আটকে রাখতে পারে না। তিনি এরপর নিজের ইচ্ছে মত ছবি করতে থাকেন। তাঁর নিজের কথায়, “তুমি যখন প্রথম ছবি কর, তখন ব্যাপারটা সহজ হয়, কারণ তখন ডানে বাঁ-এ তাকাতে হয় না। কিন্তু প্রথম ছবির পর, তোমার নানান প্রশ্ন জাগে এবং ছবির পর ছবিতে তুমি উন্মোচন করতে থাকো তোমার নিজস্ব চিত্র-ভাষা। এটাই তোমার কাজ। এর সঙ্গে আমি দর্শকদেরও শ্রদ্ধা করি। দর্শকরা আমার কাছে প্রাপ্তবয়স্ক বুদ্ধিমান ও চালাক মানুষ। আমাকে আমার সেরাটা দিতেই হবে।”। 
নিজস্ব চিত্র-ভাষা নির্মাণের এই তাড়নাই টারের ছবিতে ক্রমে নিয়ে আসে সেইসব মৌলিক প্রকরণ যার জন্য ছবি শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায় এই ছবির পরিচালক বেলা টার ছাড়া অন্য কেউ হতেই পারেন না। ১৯৮৮ সালে নির্মিত পঞ্চম ছবি ‘ড্যামনেশন’ থেকে হাঙ্গেরির এই মায়াস্ত্রো আদ্যন্ত মৌলিক এক চলচ্চিত্রীয় ভুবন নির্মাণে সঠিক অর্থে সক্ষম হন। মদ্যপ, অপরাধী, উন্মাদ এই ধরনের তথাকথিত প্রান্তিক ও নিম্ন-বিত্ত মানুষের জীবন নিয়ে ছবি করতে গিয়ে টার দীর্ঘ ও শ্লথ সমস্ত শট নিতে থাকেন। সাদা-কালোয় নির্মিত অধিকাংশ এই ছবিগুলি দেখলে যেন মনে হয় গোটা মানব-সমাজ এক সামুহিক ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিখ্যাত চিত্রসমালোচক জনাথান রোসেনবম্ব টারকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘ডিস্পিরিচুয়ালাইজড তারকভস্কি’ হিসেবে। পূর্বে উল্লেখিত ‘ফ্যামিলি নেস্ট’-র জন্য ম্যানহাইম চলচ্চিত্র উৎসব থেকে প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হাঙ্গেরির সরকারকে বাধ্য করে তাঁকে ‘ইউনিভার্সিটি অফ থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্ম আর্টস ইন বুদাপেস্ট’-এ পড়ার অনুমতি দিতে। ছাত্রাবস্থায় ১৯৮১-৮২ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘দা আউটসাইডার’ (কামুর আউটসাইডার নয়) ও ‘দা প্রিফেব পিপল’ ছবি দুটি। আশির দশকের গোড়ার দিকে তিনি তাঁর চিত্র-দর্শনের ভাবনাগুলিকে প্রকাশ করার জন্য নতুন ধরনের এক পদ্ধতির সন্ধান শুরু করেন। ১৯৮২ সালে দূরদর্শনের জন্য মাত্র দুটি দীর্ঘ শটে অভিযোজন ঘটান শেস্কপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’-এর! ১৯৮৪ সালে নির্মিত চেম্বার ড্রামা ‘আলমানাক অফ দা ফল’-এ পাওয়া যায় রাইনার ওয়ার্নার ফাসবিন্দার ও ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ ধর্মী তির্যক অ্যাঙ্গেল ও ভীতিপ্রদ আলোর ব্যাবহার। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে দেখা বস্তুত এই ‘আলমানাক অফ দা ফল’ থেকেই আমাদের মনে হতে থাকে এ একদম নতুন এক চিত্র-অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা!

Biswajit Roy | 139.5.***.*** | ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৮738005