এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  সিনেমা

  • সময়, অনুবর্তন ও বেলা টারের অস্তিত্ববাদ

    শুভদীপ ঘোষ
    আলোচনা | সিনেমা | ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ২১০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৩ জন)


  • সঠিক সালটি এখন আর মনে নেই। সম্ভবত ২০০৯-১০ নাগাদ কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে বেলা টারের (২১শে জুলাই ১৯৫৫ – ৬ই জানুয়ারি ২০২৬) একাধিক ছবির একটি প্যাকেজ এসেছিল। তৎপূর্বে বেলা টারের নাম অল্পাদ্রু শুনে থাকলেও তাঁর কোনো ছবি দেখা হয়ে ওঠেনি। তবে স্পষ্ট মনে আছে, সেই উৎসবে প্রথম যে ছবিটি তাঁর দেখেছিলাম, নাম ছিল ‘ওয়ার্কমিস্টার হারমনিজ’ (২০০০)। বলতে দ্বিধা নেই, ছবিটির বৈশিষ্ট্য বলতে দীর্ঘ স্থায়ী একেকটি শট ছাড়া সেসময় আর সেভাবে মনে কিছু দাগ কাটেনি। এও মনে হয়েছিল ইতিপূর্বে আন্দ্রেই তারকভস্কি বা থিও অ্যাঞ্জেলোপউলাসের ছবিতে এরকম দীর্ঘ স্থায়ী শট তো আমরা দেখেছি। ঐ উৎসবেই এরপর একে একে দেখলাম ‘ড্যামনেশন’ (১৯৮৭), ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ (১৯৭৯), ‘আলমানাক অফ দা ফল’ (১৯৮৪), ‘দা ম্যান ফ্রম লন্ডন’ (২০০৭) এবং ‘সাতানতাঙ্গো’ (১৯৯৪)। শেষোক্ত ছবিটি সাড়ে সাত ঘণ্টার ছবি! মনে আছে এই ছবিটি টানা দেখানো হয়েছিল নন্দন-২ প্রেক্ষাগৃহে। ধীরে ধীরে আমরা অনুধাবন করতে পারি, ঐ দীর্ঘ স্থায়ী শটগুলির নান্দনিক সৌন্দর্য তারকভস্কি বা অ্যাঞ্জেলোপউলাসের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। পরে, আমার মতে তাঁর অন্তিম ও শ্রেষ্ঠ কাজ ‘দা টিউরিন হর্স’ (২০১১) দেখে সেই প্রত্যয় আরো দৃঢ় হয়। আজ বেলা টারের মৃত্যুর পর লিখতে বসা এই লেখায় কী লেখা যেতে পারে ভেবে মনে হল, ছবি গুলি দেখার ব্যক্তিগত স্মৃতি নিয়েই নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করা যেতে পারে তার এই ভিন্ন প্রকৃতি নিয়ে দুচার কথা বলার।



    কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বেলা টারকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দৃশ্যায়নের যে প্রচলিত পদ্ধতি অর্থাৎ একজন ঘরে ঢুকে “হ্যালো” বললে কাট করে প্রত্যুত্তরে আরেকজনের “হ্যালো” বলাকে ধরা, তারপর দুজনকে একসঙ্গে ধরা, এরকম দৃশ্য-সম্পাদনা তাঁর ছবিতে তেমন দেখা যায় না কেন? টার জানিয়েছিলেন ওরকমভাবে টেলিভিশনে ছবি তোলা হয়, এই পদ্ধতিটি বোরিং এবং এর মধ্যে তিনি কোনো চ্যালেঞ্জ খুঁজে পান না। তাছাড়া ওরকমটা মিথ্যে মিথ্যে দেখানো, কারণ আপনি সত্যি যখন একটা ঘরে বা কোনোখানে ঢুকে আরেকজনের সঙ্গে আলাপ করেন, তখন দুজনের দুজনকে উপলব্ধি করতে সময় লাগে। টার আরো জানান তিনি যৌবনে একটি জাহাজের ফ্যাক্টরিতে ওয়ার্কারের কাজ করতেন। সেই সময়ই তিনি বুঝতে পারেন মানুষ কিভাবে জীবন কাটায় এবং কাল বা সময় ব্যাপারটাই বা কিরকম! কম বয়েসে চলচ্চিত্রকার হওয়ার কথা তিনি ভাবেন নি। বাবা তাঁর পনের বছরের জন্মদিনে একটি আট মিলিমিটার ক্যামেরা কিনে দেন। ঐ কম বয়সেই তাঁর সুযোগ হয় গোদারের ‘ব্রেথলেস’ দেখার। ঐ বয়সেই ইয়াঞ্চো, জিভা ভের্টভের কিছু ছবি এবং তারকভস্কির ‘আন্দ্রেই রুব্লেভ’ দেখে তিনি যারপরনাই আলোড়িত হন। কম বয়স থেকেই তিনি বামপন্থার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। হ্যাঙ্গেরিতে সে সময় বামপন্থী সরকার থাকলেও তাঁর মতে সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারাতেই গোটা সমাজ পরিচালিত হত। ইতালির সিজার জাভাত্তিনি বা আমাদের দেশের মৃণাল সেনের মত টার ছিলেন লুপ্তপ্রায় প্রজাতির সম্ভবত শেষ পরিচালক যিনি চলচ্চিত্রকে মনে করতেন সমাজ পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার! এই প্রত্যয় থেকেই জিপসি ওয়ার্কার গ্রুপকে নিয়ে পঁচিশ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এই জিপসিদের গ্রুপটি হাঙ্গেরি ছেড়ে অস্ট্রিয়া চলে যেতে চাইলে হাঙ্গেরির বাম সরকার অনুমোদন দেয় না। সরকার অননুমোদিত এই তথ্যচিত্রটি টার নিজের উদ্যোগে নির্মাণ করেন ও নিজের উদ্যোগেই বিভিন্ন জায়গায় দেখানোর চেষ্টা করেন। তথ্যচিত্রটি পরে আর পাওয়া যায় না। মনে করা হয় হাঙ্গেরির তৎকালীন বাম-সরকার নাপসন্দ এই তথ্যচিত্রটি বাজেয়াপ্ত করে এবং এটি নির্মাণের পরিণাম হিসেবে টারকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে দেওয়া হয় না! হাঙ্গেরির কিছু তরুণ পরিচালকের সহায়তায় অতঃপর টার ১৯৭৯ সালে নির্মাণ করেন প্রথম পূর্ণ-দৈর্ঘ্যের ছবি ‘ফ্যামিলি নেস্ট’। সাদা-কালোয় নির্মিত এই ছবিটি তোলা হয় ষোল মিলিমিটার হ্যান্ড-হেল্ড ক্যামেরায়। অপেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে কোনো চিত্রনাট্য ব্যতিরেকেই তিনি নানান ধরনের ইম্প্রভাইজেশন করেন এই ছবিটিতে। তাঁর জাহাজের ফ্যাক্টরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও আছে এতে। মাত্র আঠেরো বছর বয়সে প্রতিদিন কুড়ি কেজির উপর মাল বহন করে তাঁর কোমরের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও মানুষের জীবনের কী অবস্থা, পারিবারিক জীবনের প্রকৃত চেহারাটা কী, জীবন ধারণের সত্যিকারের মান কী, এইসবের উপর ছবিটি গভীরভাবে আলোকপাত করে। এই ছবির শুরুতে যে ‘বেলা বালাজ ফিল্ম স্টুডিও ১৯৭৭ প্রেজেন্স’ দেখানো হয় এটি ছিল হাঙ্গেরির তরুণ পরিচালকদের একটি গ্রুপ। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ‘হাঙ্গেরিয়ান সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কারস পার্টি’-র সরকার এই তরুণ পরিচালকদের ছবি করার অনুমতি দেয় কিন্তু ছবি দেখানোর অনুমতি দেয় না। ফলে ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ নির্মিত হওয়ার পর দেশে মুক্তি পায় না, মুক্তি পেতে লেগে যায় প্রায় দু-বছর। কিন্তু ছবিটি ম্যানহাইম চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় ও টার রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। ফলত হাঙ্গেরির সরকার টারকে এরপর ছবি করা থেকে আটকে রাখতে পারে না। তিনি এরপর নিজের ইচ্ছে মত ছবি করতে থাকেন। তাঁর নিজের কথায়, “তুমি যখন প্রথম ছবি কর, তখন ব্যাপারটা সহজ হয়, কারণ তখন ডানে বাঁ-এ তাকাতে হয় না। কিন্তু প্রথম ছবির পর, তোমার নানান প্রশ্ন জাগে এবং ছবির পর ছবিতে তুমি উন্মোচন করতে থাকো তোমার নিজস্ব চিত্র-ভাষা। এটাই তোমার কাজ। এর সঙ্গে আমি দর্শকদেরও শ্রদ্ধা করি। দর্শকরা আমার কাছে প্রাপ্তবয়স্ক বুদ্ধিমান ও চালাক মানুষ। আমাকে আমার সেরাটা দিতেই হবে।”।



    নিজস্ব চিত্র-ভাষা নির্মাণের এই তাড়নাই টারের ছবিতে ক্রমে নিয়ে আসে সেইসব মৌলিক প্রকরণ যার জন্য ছবি শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায় এই ছবির পরিচালক বেলা টার ছাড়া অন্য কেউ হতেই পারেন না। ১৯৮৮ সালে নির্মিত পঞ্চম ছবি ‘ড্যামনেশন’ থেকে হাঙ্গেরির এই মায়াস্ত্রো আদ্যন্ত মৌলিক এক চলচ্চিত্রীয় ভুবন নির্মাণে সঠিক অর্থে সক্ষম হন। মদ্যপ, অপরাধী, উন্মাদ এই ধরনের তথাকথিত প্রান্তিক ও নিম্ন-বিত্ত মানুষের জীবন নিয়ে ছবি করতে গিয়ে টার দীর্ঘ ও শ্লথ সমস্ত শট নিতে থাকেন। সাদা-কালোয় নির্মিত অধিকাংশ এই ছবিগুলি দেখলে যেন মনে হয় গোটা মানব-সমাজ এক সামুহিক ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিখ্যাত চিত্রসমালোচক জনাথান রোসেনবম্ব টারকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘ডিস্পিরিচুয়ালাইজড তারকভস্কি’ হিসেবে। পূর্বে উল্লেখিত ‘ফ্যামিলি নেস্ট’-র জন্য ম্যানহাইম চলচ্চিত্র উৎসব থেকে প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হাঙ্গেরির সরকারকে বাধ্য করে তাঁকে ‘ইউনিভার্সিটি অফ থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্ম আর্টস ইন বুদাপেস্ট’-এ পড়ার অনুমতি দিতে। ছাত্রাবস্থায় ১৯৮১-৮২ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘দা আউটসাইডার’ (কামুর আউটসাইডার নয়) ও ‘দা প্রিফেব পিপল’ ছবি দুটি। আশির দশকের গোড়ার দিকে তিনি তাঁর চিত্র-দর্শনের ভাবনাগুলিকে প্রকাশ করার জন্য নতুন ধরনের এক পদ্ধতির সন্ধান শুরু করেন। ১৯৮২ সালে দূরদর্শনের জন্য মাত্র দুটি দীর্ঘ শটে অভিযোজন ঘটান শেস্কপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’-এর! ১৯৮৪ সালে নির্মিত চেম্বার ড্রামা ‘আলমানাক অফ দা ফল’-এ পাওয়া যায় রাইনার ওয়ার্নার ফাসবিন্দার ও ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ ধর্মী তির্যক অ্যাঙ্গেল ও ভীতিপ্রদ আলোর ব্যাবহার। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে দেখা বস্তুত এই ‘আলমানাক অফ দা ফল’ থেকেই আমাদের মনে হতে থাকে এ একদম নতুন এক চিত্র-অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা!


    'আলমানাক অফ দা ফল' ছবির দৃশ্য


    মূল পাঁচটি চরিত্র যেন একটি অ্যাকোরিয়ামের মধ্যে বন্দি। পাঁচটি একাকী মানুষের মধ্যেকার দীর্ঘ বাক্যালাপের পর্যায়গুলিকে টার মেলে ধরেছেন ভীতিপ্রদ আলোক-সম্পাতে। পরবর্তী ‘ড্যামনেশন’ থেকে অন্তিম ‘দা টিউরিন হর্স’-র সাদা-কালো যেন এই বিচিত্র রঙের আলোর জন্যই অপেক্ষমাণ ছিল। ‘দা আউটসাইডার’ থেকে টারের সম্পাদক ছিলেন আগনাস হেরিঞ্জকি। এই হেরিঞ্জকিকেই তিনি পরে বিবাহ করেন। টারের বন্ধু ও প্রখ্যাত উপন্যাসিক লাসজলো ক্রাস্‌নাহোরকাই-র উপন্যাস থেকেই ১৯৮৮ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘ড্যামনেশন’ ছবিটি। টারের অধিকাংশ ছবির চিত্রগ্রাহক ছিলেন ফ্রেড কেলেমেন ও গ্যাবর মেদভিজি এবং আবহ-সঙ্গীতকার ছিলেন মিহালি ভিগ। লাসজলো ক্রাস্‌নাহোরকাই ‘ড্যামনেশন’ ও তার পরের প্রায় সবগুলি ছবিরই কাহিনীকার ছিলেন। ক্ষুধাকে বাঙ্ময় করতে, তথাকথিত নিচু তলার মানুষের জীবনের উপর নিজের মত করে আলো ফেলতে এই ‘ড্যামনেশন’ ছবিটি থেকেই আমরা দেখতে পাই তাঁর বিখ্যাত লম্বা লম্বা শটের আধিক্য। এছাড়াও ক্রমে বুঝতে পারি টারের ভুবন ডিস্টোপিয়ান। সরকারের অনুমোদনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে টার ও ক্রাস্‌নাহোরকাই নিজেদের চেষ্টায় একটি অ্যাডভার্টাইজিং স্টুডিও ও আর্কাইভের ফান্ড থেকে এই ছবিটি নির্মাণ করেন। ‘ড্যামনেশন’-কে তাই অনেক সময় বলা হয়ে থাকে হাঙ্গেরির প্রথম ইন্ডিপেনডেন্ট সিনেমা। রোসেনবম্বের বলা ‘ডিস্পিরিচুয়ালাইজড তারকভস্কি’ তকমাটি কতটা সত্য তা আমরা প্রথম বুঝতে পারি এই ছবিটি দেখেই।



    'ড্যামনেশন' ছবির দৃশ্য


    তারকভস্কির সঙ্গে টারের মূলগত তফাৎ হল, এক, বাস্তবতার নির্মিতিতে টারের সাদা-কালো ছবির চরিত্রগুলির নিচুতলার নির্মম বাস্তবতার অনুসারী, তারকভস্কিতে তা প্রকারান্তরে চরিত্রগুলির অন্তর্লোকের পবিত্রতার স্মারক যেন। দুই, তাঁর সময়ের ভিতর দিয়ে ক্যামেরার যাত্রা তারকভস্কির মত আধ্যাত্মিক ও স্মৃতিময় ধারাবাহিকতা নয় বরং তা সময়কে অনুভব করায় ভারী ও নিষ্ক্রিয় বাস্তবতা হিসেবে। টারের দীর্ঘ স্থায়ী শট ও সময়কে বড় করে দেখানো তারকভস্কির মত এক ধরনের নৈতিক সিদ্ধান্ত বটে, কিন্তু টারের নৈতিকতা হল - তাঁর চরিত্রগুলির প্রকৃত অবস্থা বোঝানোর জন্য তিনি যেন দর্শকদের বাধ্য করেন চরিত্রগুলির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে। তারকভস্কির দীর্ঘ শটে যেখানে ঘটনার রূপান্তর ঘটে, টারে সেখানে প্রায় কোনো ঘটনাই নেই। দীর্ঘ শটের মধ্যে টারের চরিত্ররা হাঁটে, দাঁড়ায়, অপেক্ষা করে। তাঁদের কোনো পরিবর্তন নেই, তাঁদের আছে পুনরাবৃত্তি। ‘ড্যামনেশন’-র আন্তর্জাতিক সাফল্যে টার ও ক্রাস্‌নাহোরকাই ছবির অর্থের জন্য জার্মান ও সুইস প্রযোজকের সাহায্য পান। পরবর্তী ছবি ‘সাতানতাঙ্গো’-র তিনজন প্রযোজক ছিলেন। ইতিমধ্যে বার্লিন ওয়ালের পতন ঘটে গেছে। কমিউনিজমের স্বপ্নের মৃত্যুর পরে নির্মিত সাড়ে সাত ঘণ্টার ছবি ‘সাতানতাঙ্গো’-তে কমিউনিস্ট বেলা টারের কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া ছিল না। কিন্তু আমাদের বারবার মনে হয়েছে ছবিতে প্রদর্শিত খামারের ভাঙ্গন যৌথ জীবনের আদর্শের মৃত্যুকেই সূচিত করে। বার্লিন ওয়ালের পতনকে সে সময় বলা হয়েছিল ‘এন্ড অফ হিস্ট্রি’। ‘সাতানতাঙ্গো’ কী তারই চলচ্চিত্রীয় প্রতিভাস? দীর্ঘ দীর্ঘ শট, সময় যেন এগোয় না, শুধু পুনরাবৃত্ত হয়। ইতিহাস সততই থেমে গেছে যেন! শুরুতে উল্লেখিত ‘ওয়ার্কমিস্টার হারমনিজ’ পরে যখন আবার আমরা দেখি তখন ছবিটিকে আরো ভালো ভাবে বুঝতে পারি। ২০১১-য় নির্মিত ‘দা টিউরিন হর্স’ দেখে মনে হয়েছিল টারের চলচ্চিত্র-নির্মাণ থেকে অবসরের ঘোষণার সত্যিই যথার্থতা আছে। তাঁর ডিস্টোপিয়া, মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে মহান বিনষ্টির বোধ ও সর্বোপরি অ্যাপকালিপ্টিক দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় এই ‘দা টিউরিন হর্স’ ছবিটিতেই।



    ছবিটির শুরুতে কালো স্ক্রিনের উপর নেপথ্যে একজনের গলা শোনা যায়। তিনি বলছেন, “In Turin on January 3rd 1889, Friedrich Nietzsche steps out of the Door of number six Via Carlo Alberto, Perhaps to take a stroll, perhaps to go by the post office…to collect his mail. Not far from him, or indeed very far removed from him, a cabman is having trouble with his stubborn horse. Despite all his urging, the horse refuses to move, whereupon the cabman Giuseppe? Carlo? Ettore? - loses his patience and takes his whip to it. Nietzsche comes up to the throng and that puts an end to the brutal scene of the cabman, who is by this time is foaming with rage. The solidity built and full-mustached Nietzsche suddenly jumps up to the cab and throws his arms around the horse neck…sobbing. His neighbor takes him home, where he lies still and silent, for two days on a divan until he mutters…the obligatory last words: “Mother, I am fool.” and lives for another ten years, gentle and demented, in care of his mother & sisters. Of the horse…we know nothing.”। টারের এই ছবিটি সেই ঘোড়াটি, ঘোড়াটির মালিক ও তাঁর মেয়েকে নিয়ে। তিরিশটি দীর্ঘ-স্থায়ী শটে, পাঁচ দিনে বিভক্ত এই ছবিটি মানুষের পুনরাবৃত্তিমূলক একঘেয়ে জীবনের নির্মম দলিল। এই একঘেয়ে দৈনন্দিন জীবনে দুটি ঘটনা ঘটে। এক, প্রতিবেশী কোরমোশ মদ কিনতে এসে পৃথিবী কীভাবে অবিরাম অবক্ষয় ও অপ্রতিরোধ্য দখলদারির চক্রে পড়ছে তা নিয়ে এক দীর্ঘ বক্তব্য রাখে। দুই, একদল যাযাবর ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েটির হাতে একটি ধর্ম সম্পর্কিত বই দিয়ে যায়! মেয়েটি বইটি পড়েও। ঘোড়াটিকে আমরা ছবিতে খুব বেশি দেখতে পাই না। যতটুকু দেখতে পাই তাতে তার নির্বিকার উপস্থিতিকে যেন মনে হয় মানবজাতির প্রতি এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের অনমনীয় উদাসীনতার এক প্রতীক যেন সে! নাকি ব্রেসঁর বালথাজার নামের গাধাটির মতো এই ঘোড়াটিও মানুষের যাবতীয় যন্ত্রণা ধারণ করার এক আধার? ছবির শুরুতে, মূল ঘটনার সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন নীৎশের প্রস্তাবনাটি এই ধরনের ভাবনাকে আরো উসকে দেয় আমাদের মধ্যে। টারের ডিস্টোপিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি এই ছবিটিতে এসে পূর্ণতা পেয়েছে। ফলে তাঁর অবসরের ঘোষণা এক অন্য মহার্ঘতা লাভ করে। সম্প্রতি, প্রখ্যাত অভিনেতা স্টেলান স্কারসগার্ড ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ছবিটির জন্য সেরা সহ-অভিনেতার গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির ভাষণে তিনি বলেছেন, “In a cinema where the lights go down and eventually you share the pulse with some other people. That’s magic. Cinema should be seen in cinemas”। এই কথাটি বেলা টারের ছবির ক্ষেত্রেও কতখানি সত্য তাঁর ছবি যাঁরা প্রেক্ষাগৃহে দেখেছেন বা ভবিষ্যতে দেখবেন তাঁরা বুঝবেন।

    তথ্যসূত্র –
    Béla Tarr, The Time After - Jacques Ranciere
    Wiki থেকে প্রাপ্ত তথ্য


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ২১০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নৌকো - Anjan Banerjee
    আরও পড়ুন
    ঘ - শর্মিষ্ঠা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Amitava Mukherjee | ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৫৫737998
  • একে অবিচুয়ারি কোনো ভাবে বলা যাবে না। খুব ভালো লাগলো লেখাটি পাঠ করে।
  • Biswajit Roy | 139.5.***.*** | ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৮738005
  • টারের ছবি এখনো অবধি না দেখিনি যদিও, তবে বেশ একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেল তার সম্পর্কে লেখাটি পড়ার পর। দারুন। এরপর তো দেখতেই হবে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন