এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • তেল, তলোয়ার, ত্রাতা-কোন পক্ষে যাই!

    Sourav Mitra লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ মার্চ ২০২৬ | ৩৮ বার পঠিত
  • আয়ারল্যান্ডে একটা বহুল প্রচলিত­ রসিকতা হল, “যদি দেখো দুই প্রতিবেশী বা দুই ভাই একে-অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, তাহলে নিশ্চিত সেখানে কোনও ইংরেজ এসেছিল!” ভারত-পাকিস্তান, ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ— উদাহরণ মোটেই কম নেই। তবে আজ ইরানের কথা বলব। ইরান, অতীতের পারস্য। কিন্তু কারা এই পারসিক? পারস্যের ভুবনবিখ্যাত সম্রাট দারায়ুসের সমাধিতে লেখা আছে, ‘আমি একজন পারসিক, একজন পারসিকের পুত্র, একজন আর্য, আর্যবংশোদ্ভূত’। ঘটনাচক্রে এই ‘আর্য’ বা উচ্চারণভেদে ‘আরিয়ান’ থেকেই দেশটার বর্তমান নাম ‘ইরান’ হয়েছে। এই দারায়ুস তথা আদি পারসিককদের ধর্মের নাম ‘মাজদা য়াস্ন/ য়স্ন’। যেই ধর্মের প্রবর্তক জরাথুষ্ট্র। জরাথুষ্ট্রের গোত্রের নাম ‘স্পিতামা’। আবার অথর্ববেদের ভার্গব সংহিতা অনুসারে অসুরগণের গুরু শুক্রাচার্যের গোত্রও স্পিতামা! ঋগ্বেদের বিভিন্ন সূত্রে ‘প্রভুত্বকারী’ বা ‘ইন্দ্র’ নামক সত্তার সঙ্গে ‘পার্শব’ নামক এক জনগোষ্ঠীর মতবিরোধ, যুদ্ধ, ইত্যাদির উল্লেখ আছে। সম্ভবত, বৈদিক যুগের শেষদিকে পার্শবেরা একসময় নিজের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়। এই পার্শবেরাই আদি পারসিক। তাদের ধর্মগ্রন্থের নাম ‘আবেস্তা’ বা ‘আর্যদের স্থান’। আবেস্তা অনুযায়ী তাদের জন্মস্থানের নাম ‘হপ্তহিন্দু’ (সপ্তসিন্ধু বা উত্তর ভারত) । এর পাশাপাশি এই গ্রন্থে ‘হারখাওয়াতি’ নামের এক নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন পারস্য বা আধুনিক ইরানে এই নামের কোনও নদী পাওয়া যায়নি। ‘হারখাওয়াতি’ আসলে বৈদিক সরস্বতী নদীরই উচ্চারণভেদ। পার্শবেরা ইন্দ্রকে শয়তান বলে (১০.৯)। আবেস্তায় সমস্ত কর্মের দু’টি চালিকা শক্তির নির্দেশ পাওয়া যায়,‒ ‘আহুর মাজদা’  (শুভ শক্তি) ও ‘অঙ্গর মইন্যু’ (অশুভ শক্তি)। আবেস্তা ও বেদ, দু’টি পৃথক ভাষায় রচিত হলেও এই ভাষাদু’টির উৎস এক। যেই কারণে এই দু’টি ভাষার অজস্র শব্দে ধ্বনিগত বা phonetic সাদৃশ্য দেখা যায়। মহাভারতে ‘পার্শব’-এর বদলে ‘পারশব’ বানানটা পাওয়া যায় (বিদুরের পরিচয় হিসেবে)। এটা আসলে বৈদেহক, অম্বষ্ঠ, সূত, আরোগব, মাহিষ্যের মতো পার্শবও একটি বর্ণসংকর— ব্রাহ্মণ পিতা ও শূদ্র মাতার সন্তান (হ্যাঁ, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর আগে অবধি ভিন্ন বর্ণে বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল না)।

    এশিয়া মাইনরের (ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল) ‘বোঘাজ় ক্যোই লিপি’, যার সময়কাল মোটামুটি খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দী, সেখানে মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র, নাসত্য (অশ্বিনীকুমার), প্রভৃতি ‘বৈদিক দেবতা’র নাম পাওয়া গিয়েছে।  বৈদিক দেবতা ‘মিত্র’, আবেস্তায় উল্লেখিত হয়েছে ‘মিথ্র’ বা উচ্চারণভেদে ‘মিহ্‌র’। সম্রাট কণিষ্কের মুদ্রায় তার নাম আবার ‘মিইরো’। আবেস্তার ‘আহুর মাজদা’ ও ‘অঙ্গর মইন্যু’‒ ঋগ্বেদের ‘অসুর’ ও ‘অঙ্গিরা মুনি’। (‘মাজদা’ শব্দটির অর্থ মহৎধ্যায়ী বা মহান।) অঙ্গিরা মুনি ছিলেন দেবপূজারীদের গুরু, স্বভাবতই তাঁর/ তাঁদের আদর্শ পার্শবদের কাছে ছিল অগ্রহণীয়। সুতরাং, শুভ-অশুভের বিচারে আবেস্তা ও ঋগ্বেদের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। এই বৈপরীত্যের কারণ কী? কথিত আছে, ইন্দ্র ও তার অনুগামীরা ছিলেন ‘সমাজভূমির উর্বরতা বৃদ্ধির’ জন্য পশুবলি বা পশুমেধের পক্ষে, পার্শব বা পারশবেরা ছিলেন এই প্রথার বিপক্ষে!

    এই পার্শবদের একটা অংশ আবার ভারতবর্ষে ফিরেছিল। না, পারস্যে ইসলামিক আগ্রাসনের সময় টাটা, গোদরেজ বা মানিকশ্য-এর মতো পার্সিদের আসার কথা বলছি না। তার বহু আগেই, দাক্ষিণাত্যে সাতবাহন রাজারা পারস্য থেকে একদল সৈন্য নিয়ে এসেছিল— ‘পহ্লব’। ধ্বনি পরিবর্তনে যেভাবে ‘সপ্তাহ’ থেকে ‘হপ্তা’/ ‘হফ্‌তা’ হয় (অর্থাৎ ‘স’ ও ‘প’ ধ্বনিগুলিকে তার নিকটবর্তী/ পরবর্তী ধ্বনি ‘হ’ ও ‘ফ’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে), সেভাবেই ‘পার্শব’-এর ‘র’ ও ‘শ’ ধ্বনিদুটি প্রথমে ‘ল’ ও ‘হ’-এ পরিবর্তিত হয়ে ও তারপর পারস্পরিক স্থান পরিবর্তন করে (ব্যাকরণে যাকে ‘ধ্বনি/ বর্ণ বিপর্যয়’ বলা হয়, বাক্স-বাস্ক বা পিশাচ-পিচাশ-এর মতো) ‘পহ্লব’ শব্দটির সৃষ্টি। তারপর (ধর্ম বা কর্ম যেভাবে ধম্ম বা কম্ম হয়েছে, সেভাবে) তারা ‘পল্লব’ নামেও পরিচিত হয়েছে। শুরুতে সাতবাহন বংশেরই অধীনে সামন্তরাজা হিসেবে থাকার পর খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সাতবাহনদের পতন ঘটলে প্রথম পর্যায়ের স্বাধীন পল্লব রাজবংশের উত্থান পর্ব শুরু হয়। স্বাধীন রাজ্যস্থাপনের পর প্রায় তিনশো বছর রাজধানী কাঞ্চিপুরম থেকে মোটামুটি নির্বিবাদেই শাসনকাজ চালিয়ে গিয়েছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর একদম শেষের দিকে রাজা সিংহবিষ্ণুর হাতে তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের রাজত্বকাল শুরু হয়। মহাবলীপুরমের মন্দির পহ্লবদেরই কীর্তি।... ‘পার্শব’ থেকে ‘পহ্লব’— ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে? মাথায় রাখবেন, ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের আগে ‘পাহলভি’ রাজবংশেরই শাসন ছিল। শব্দগুলোর ধ্বনিগত মিল খেয়াল করে দেখুন।

    এদিকে যখন পহ্লব বা পল্লবদের রজত্বকাল, পারস্যে তখন ইসলামিক/ আরবিক আগ্রাসনের শুরু। দেখুন, তথাকথিত ‘সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানে’র ধারণাটি আদতে দার্শনিকের স্বপ্নদোষ। বাস্তবে (১) প্রাণের ভয়, (২) পেটের দায়, (৩) বিবাহ বা যৌন সম্পর্ক ও (৪) গভীর হীনমন্যতা ছাড়া কেউই অন্যের সংস্কৃতির গুণমুগ্ধ হলেও নিজেরটি ছেড়ে তাকে আপন করে নেয় না। তবে সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক জাতি হামেশাই কৌশলগত দিক থেকে নিজের সংস্কৃতি ও ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আক্রান্ত জাতি/ গোষ্ঠির নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা তখন হয়ে ওঠে তাদের জাতীয়তাবাদের প্রতীক। তবে এই লড়াইয়ের দৈর্ঘ্য ও ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে দুদিকের ভাষা/ সংস্কৃতির তুলনামূলক সমৃদ্ধির ওপর। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই আরবি ভাষার আধিপত্য সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই হিসেব অনেকটাই উলটে যায় পারস্যে এসে। আরবের হাতে সেলিক সাম্রাজ্য ধ্বংস হলেও, অধিকাংশ পারসিকেরা ইসলাম গ্রহণ করলেও নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ত্যাগ করেনি। বলাই বাহুল্য, বেদুইন জাতির ভাষা বা সংস্কৃতির তাদের পারসিক প্রতিরূপের মতো সুবিশাল ঐতিহ্য ছিল না। যুদ্ধজয়ী আরব পারসিক (ফারসি) ভাষার রূপ ও চরিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা করলে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়। ‘শাহনামা’র রচয়িতা মহান ফিরদৌসি, প্রমুখ কবিদের নেতৃত্বে পরসিকেরা রুখে দাঁড়িয়েছিল। এর ফল হয়েছিল চমকপ্রদ। ইসলাম ধর্ম মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরও পূর্বদিকে (ভারতীয় উপমহাদেশে) যাত্রা শুরু করলে আরবির পাশাপাশি ফারসি ভাষাও তার অন্যতম মূখ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, দিনে পাঁচবার প্রার্থনার প্রথাটিও ইসলাম জরাথ্রুস্ট্রীয় ধর্ম থেকে গ্রহণ করেছিল। (চমকে যাওয়ার কিছু নেই, খ্রিস্টানদের রবিবারের উপাসনা সূর্য-উপাশক পেগানদের অবদান। হিন্দুরাও নিরামিষভোজনের অভ্যাস জৈনদের কাছ থেকে পেয়েছে।)

    এবার চলে আসুন বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। ১৯০১ সালে ইরানের শাহ এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ীকে তেল অনুসন্ধানের বিশেষ অধিকার দিয়েছিলেন। সেই একচেটিয়া অধিকার থেকেই পরে গড়ে ওঠে অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (পরে যা ‘ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম’ নামে পরিচিত হয়)। এই বেনিয়া ইংরেজ যে দেশে ব্যবসা করতে ঢুকত, সে দেশের স্বার্থের/ উন্নতির প্রতি যে কতটা যত্নশীল হত— ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির দিব্যি, এই বিষয়ে ভারতীয়দের নতুন করে কিছু বোঝানোর নেই। শুরু থেকেই ইরানের বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। অ্যাংলো-ইরানিয়ান কোম্পানিটি বিপুল মুনাফা লাভ করলেও ইরান সরকার হাতে পেত লবডংকা! ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের আবাদান শহরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈল শোধনাগার গড়ে ওঠে। কিন্তু সেখানে কাজ করা ইরানি শ্রমিকদের মজুরি ছিল কম। জীবনযাত্রার অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। অন্যদিকে কোম্পানির ব্রিটিশ কর্মচারীরা অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করত। ইরানের শাহ তো রুষ্ট ছিলেনই, এসব বৈষম্যের কারণে ইরানি জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আরও শক্তিশালী হতে শুরু করে। অনেকেই মনে করত যে, দেশের তৈল সম্পদ বিদেশিদের হাতে থাকা স্বাধীনতার পক্ষে অপমানজনক। এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছিল মহম্মদ মোসাদ্দেকের। ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়েই খুব দ্রুত তিনি ইরানের তেল শিল্পকে রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা করেন। এর ফলে অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যায়। তার প্রক্রিয়ায় ইংরেজরা ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে, এমনকি ইরানের তেল বাণিজ্য বন্ধেরও চেষ্টা করে। কিন্তু কোনটাতেই তেমন সুবিধা করতে না পেরে, আমেরিকার কাছে নালিশ করতে ছোটে।

    শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। কিন্তু ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পশ্চিমা দেশগুলোর ভয় ছিল যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ইরানে কমিউনিস্ট শক্তি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। অগত্যা, ‘পৃথিবীর শান্তি রক্ষা’র স্বার্থে  CIA ও MI6-এর যৌথ পরিকল্পনায় ১৯৫৩ সালে ইরানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মোসাদ্দেকের নির্বাচিত, গণতান্ত্রিক সরকার ফেলে নিজেদের বশংবদ রেজা পাহলভিকে ইরানের সিংহাসনে বসিয়ে দেয়। তেল শিল্পের রাষ্ট্রায়ত্ত কাঠামো ভেঙে একটি নতুন আন্তর্জাতিক তেল কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়। ৪০% নিয়ন্ত্রণ নেয় ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ৪০% নেয় কিছু আমেরিকান কোম্পানি, বাকিটা পায় অন্যান্য কিছু ইউরোপীয় কোম্পানি। আগের তুলনায় ইরান কিছু বেশি ভাগ পেতে শুরু করলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ তখনও বিদেশি কোম্পানির কাছেই থেকে যায়।

    ওদিকে ইরানের প্রভুভক্ত শাহ জাতীয় স্বার্থকে পশ্চিমা উদারপন্থার চমক দিয়ে ঢাকার চেষ্টা শুরু করেন। তার নামও দিয়েছিলেন ‘হোয়াইট রেভোলিউশন’! ভূমি সংস্কার, শিল্পায়ন, নগরায়ন, শিক্ষার প্রসার, নারীদের ভোটাধিকার, ইত্যাদি সংস্কারগুলো ইরানকে দ্রুত আধুনিকতার দিকে নিয়ে যেতে শুরু করলেও সেসব সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। মূলত ধর্মীয় নেতৃত্বের অসন্তোষ, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি আর রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবের জায়গা থেকে খোমেইনির মতো কট্টরপন্থীদের উত্থান শুরু হয়। শাহের নির্দেশে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করার জন্য গোপন পুলিশ SAVAK প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফলে সমাজে যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তাতে জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী ও উদারপন্থীরাও কট্টরপন্থীদের সঙ্গে একজোট হতে শুরু করে। এই সময়ে খোমেইনি ধর্মীয় নেতা হিসেবে জনপ্রিয় হতে শুরু করেন। তিনি শাহের নীতির তীব্র সমালোচক ছিলেন; পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন। ১৯৬৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নির্বাসনে পাঠানো হয়। সাতের দশকে পৌঁছে পরিস্থিতি শাহের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি আমেরিকার সাহায্য চাইলে সদ্য ভিয়েতনামে নাক কাটিয়ে আসা আংকেল স্যাম নতুন কোনও বেইজ্জতি সইতে রাজি ছিল না। ১৯৭৮ সালে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিপ্লবের পর গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা হয়।

    যারা আফগানিস্থানে কমিউনিস্ট প্রভাব হঠাতে তালিবানের সৃষ্টি করতে পারে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে, কট্টরপন্থার হাত থাকে ইরানি ম্যাঙ্গোমানবদের বাঁচাতে সেই আমেরিকার আজকে প্রাণ কেঁদে উঠেছে! আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা গড়ে ওঠে (ও এখন চলছে), সেখানে আমেরিকান ডলারই ছিল কেন্দ্রবিন্দু। ক্রেতা-বিক্রেতা যে-ই হোক না কেন, প্রায় ষোলআনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যই ডলারের মাধ্যমে ঘটে থাকে। সেটা আমেরিকার অন্যতম অর্থনৈতিক আর কৌশলগত শক্তি। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২ নাগাদ আমেরিকা যেভাবে রাশিয়ার ওপর স্যাংশন চাপিয়ে দিয়েছিল (৯৮ শালে পোখরান কাণ্ডের পর ভারতের ওপরও চাপানো হয়েছিল), তাতে বহুদেশই নড়েচড়ে বসেছে। ইতিহাসে এই প্রথম বহু দেশেরই ফরেন রিজার্ভে ডলারের থেকে সোনার পরিমাণ বেশি হয়েছে (ফলে বাজারে সোনার দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে)। এই পরিস্থিতি আমেরিকার পক্ষে মোটেই সুখকর নয়। বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য খনিজ তেল। অতয়েব ‘ডলার-বাঁচাও আন্দোলনে’ নেমে অন্তত তেলের ব্যবসায় ডলারকে বাধ্যতামূলক রাখতে হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেদের আমদানি কমিয়ে রফতানি বাড়াতে হবে। তারা সেগুলোই করছে। মধ্যপ্রাচ্য, ভেনিজুয়েলা আর রাশিয়া— বিশ্বে এই তিনটে এলাকাই জ্বালানি তেলের মূল উৎস। প্রথমটার জন্য সরাসরি যুদ্ধ, দ্বিতীয়টার জন্য মাদকব্যবসার দোহাই তুলে সরকার ফেলে দেওয়া আর তৃতীয়টার ব্যবসা থামাতে ট্যারিফের হুমকি দেওয়া ছাড়া বেচারা আমেরিকার সামনে বিশেষ একটা পথ খোলা নেই।…

    এই যুদ্ধে আপনি পক্ষ নিতেই পারেন। শুধু জেনে-বুঝে, ভেবে-চিন্তে নিন। 

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল প্রতিক্রিয়া দিন