

অতি সম্প্রতি আমাদের নিকটতম ভিনদেশী প্রতিবেশী বাংলাদেশের বহুচর্চিত সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হল। ২০২৪ সালের তথাকথিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, তদারকি সরকার গঠন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নির্মাণের রূপকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধকরণ এবং পরিশেষে দেশের জনগণতান্ত্রিক সরকার গঠনের জন্য সাধারণ নির্বাচন ও দেশের সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে গণভোট। এই নির্বাচনকে ঘিরে একদিকে যেমন বহু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, আবার অন্যদিকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তরও পরিস্ফুট হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে একদিকে যেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ও আপাত উদারপন্থী বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির (বিএনপি) জয়জয়াকার, তেমনি অন্যদিকে পাকিস্তান পন্থী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী জামাত শিবিরের পরাজয়, অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে এযাবৎকাল পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে চমকপ্রদ ফলাফল। কেউ কেউ বলছেন, এই জয় আসলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের বিরুদ্ধে জয়, রাজাকারদের পুনরুজ্জীবনের বিপক্ষে জয়। কেউ বা আবার বলছেন এই জয় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জয়। কারও উচ্ছ্বাসে আবার এটা নাকি পাকিস্তান পন্থী উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের বিপক্ষে জয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ম কিংবা ধর্মীয় অস্তিত্ব অথবা ধর্মীয় একচ্ছত্রবাদকে অস্বীকার করে কেবলমাত্র সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করে বাংলাদেশে নির্বাচন এবং জনগণতান্ত্রিক সরকার গঠন ও পরিচালনা কি আদৌ সম্ভব? কারণ, ভাষাগত জাতিস্বত্বাকে আধার করে নির্মিত দেশটা যে ক্রমশই মৌলবাদী ধর্মীয় স্বত্বার খোলসে আশ্রয় নিয়ে ফেলছে, তা উপলব্ধি করতে আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের প্রয়োজন হয় না। যার অবশ্যম্ভাবী ফল হল, ধর্মীয় একচ্ছত্রবাদের ভিত প্রবলভাবে সুদৃঢ় করার অত্যুৎসাহে অন্য মতাবলম্বী ও ধর্মালম্বীদের প্রতি উদ্ধত অসহিষ্ণু আক্রমণের বিরামহীন উদাহরণ। অথচ তথাকথিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল ভিত্তিই ছিল ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার শিকড় সমূলে উৎপাটিত করে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনর্গঠন, যে রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী অধ্যায়ে বাংলাদেশ জুড়ে যখন ধর্মীয় ও মতাদর্শের সংখ্যালঘুদের প্রতি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিশেষত আওয়ামী লীগের, নেতা-কর্মীদের প্রতি লাগাতার অকথ্য অত্যাচার ও বর্বরোচিত উৎপীড়নের ঘটনা ঘটানো হচ্ছিল, তখনও কিন্তু অদ্ভুত নীরবতায় আচ্ছন্ন থেকেছে সমানাধিকারের ভিত্তিতে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের সূচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারকি সরকার! দেশব্যাপী নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রতি অনমনীয়তার প্রশ্নে রাষ্ট্রযন্ত্র যত উদাসীন থেকেছে, বাংলাদেশ জুড়ে সহিষ্ণু ধর্ম পালনের পরিবর্তে ধর্মীয় মৌলবাদ নির্ভর অসহিষ্ণু আস্ফালনের ধিকিধিকি আগুনটা হিংস্র দাবানল হয়ে আছড়ে পড়ার চিত্রনাট্যটা তত নিখুঁতভাবে সম্পাদিত হয়েছে। যার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে ভাষাগত জাতিস্বত্বার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি দেশ, তদারকি সরকারের আমলে তার সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র সহ ধর্মকে ব্যবহার করে মৌলবাদী উন্মত্ততার আঁধারে ক্রমশই ডুবে যাচ্ছে বলে সারা বিশ্ব শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।
অথচ ভাষা আন্দোলনের ফসল হিসেবে নির্মিত বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতির হাল এমনটি কিন্তু হওয়ার হওয়ারই কথা ছিল না। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী আছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯৭৮ সালে, জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকালে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি ছেঁটে ফেলা হয়। এরপর ১৯৯০ সালে, জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনকালে বঙ্গবন্ধু প্রণীত ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে সংশোধন করে দেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্মকে গ্রহণ করা হয়। সেই থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামই হয়ে রয়েছে। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশ ‘ইসলামিক এমিরেটস’ নয়। অর্থাৎ, শরিয়া আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালিত হয় না। কিন্তু দেশের সংবিধান স্বীকৃত রাজধর্ম হিসেবে শুধুমাত্র ইসলামকেই মান্যতা দেওয়া হয়েছে। যে দেশে সংবিধান স্বীকৃত একটি নির্দিষ্ট রাজধর্ম রয়েছে, সেই দেশে অন্যান্য ধর্মালম্বী মানুষেরা, কিংবা কোন ধর্মেই বিশ্বাস নেই এমন মানুষেরা, তাঁদের মতপ্রকাশ, ধর্মচারণ ও মুক্তচিন্তা প্রসারের ক্ষেত্রে সবসময়ই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়ে থাকেন। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ কোন দেশে রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন নির্দিষ্ট ধর্ম না থাকার কারণে সকল ধর্মবিশ্বাসী মানুষেরাই তাঁদের নিজ নিজ ধর্মপালনের ক্ষেত্রে সমানাধিকার পেয়ে থাকেন। এমনকি যাঁদের কোন ধর্মেই বিশ্বাস নেই, এমন মানুষেরাও কোন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অনায়াসে তাঁদের স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে পারেন।
বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া পরধর্ম অসহিষ্ণুতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের উপর্যুপরি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনকালের প্রায় শেষের দিকে, তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী মাননীয় মাসুদ হাসান দেশের রাষ্ট্রধর্ম থেকে ইসলামকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি লাগাতার বর্বরোচিত অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে পুনরায় ‘রাজধর্ম-বিহীন’ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। শাহবাগ স্কোয়ারের সমবেত সুধী নাগরিকেরা এমন এক রাষ্ট্রের দাবীতে সোচ্চার হয়েছিলেন, যে রাষ্ট্র কোন নির্দিষ্ট ধর্মীয় আভরণে নিজেকে মুড়ে রাখবে না। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র হোক সবার। ধর্ম থাক আত্মায়, সোনার বাংলায় রাষ্ট্র বিরাজ করবে তার ধর্মনিরপেক্ষ সত্ত্বা বহন করে। শোনা গিয়েছিল, তৎকালীন হাসিনা সরকার বঙ্গবন্ধু প্রণীত ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র’ হিসেবে বাংলাদেশকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনী বিলও আনতে চেয়েছিল। খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ভারতবর্ষের একপ্রান্তে আফগানিস্তানে যখন শরিয়া আইনে রাষ্ট্র চেতনা মুড়ে ফেলা হচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশের অন্য প্রান্তে বাংলাদেশে ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজন চলছিল। ভারতবর্ষের সংবিধানের মূল কাঠামো ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার ভিত্তিতে নির্মিত হলেও, সংবিধান প্রণয়নকালে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি যে নির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত ছিল না, এ কথা ধ্রুব সত্য। কিন্তু পরবর্তী অধ্যায়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি ভারতীয় সংবিধানে নির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করে ভারত যে যুগান্তকারী দিশা দেখাতে পেরেছিল, বাংলাদেশের ভূতপূর্ব মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী সামনেও অপেক্ষা করছিল হুবহু একই অগ্নিপরীক্ষার অনুকৃতি। আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা তা পারেননি। তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের ফলে তিনি গদিচ্যুত হয়ে পরদেশে নির্বাসিত দিন কাটাচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্নও চিরতরে নির্বাসনে চলে গেছে। তদারকি সরকারের শাসনকাল জুড়ে লাগামহীন নৈরাজ্য ও অসহিষ্ণুতার পরিপ্রেক্ষিতে যেন মনে হয়েছিল, ধর্মীয় মৌলবাদের একচ্ছত্রবাদী আগ্রাসনের গ্রাসে ‘সোনার বাংলা’ তলিয়ে গেল বুঝি।
বাস্তবে তা কিন্তু হল না। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষজন তা হতে দিলেন না। অতীত দিনের মতোই ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী দলকে বাংলাদেশী জনতা ক্ষমতার মসনদে বসার ছাড়পত্র দিলো না। যারা কেবলমাত্র ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলতো, যারা শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবাবেগ ও জিগির উসকে দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ামক হওয়ার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে ছিল, প্রগাঢ় ধর্মীয় ভাবাবেগে নিমজ্জিত থাকা আমবাংলাদেশী মানুষজন কিন্তু সেই উগ্র মৌলবাদী জামাতকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৃত্তের বাইরেই রেখে দিলো। বিজয়ী জোটের প্রধান দল বিএনপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রশ্নে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য না হলেও, তারা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী তথা আগমার্কা ধর্মীয় মৌলবাদী নয়। এক্ষেত্রে হয়তো বিগত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় রাজনৈতিক আঙিনায় পাক খাওয়া ‘গ্রেটার ইভিল’-‘লেসার ইভিল’ তত্ত্বটি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হল। বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় কট্টর মৌলবাদী শক্তির উত্থান হলে বাংলাদেশ জুড়ে এবং পড়শি দেশ হিসেবে ভারতের পক্ষে যে কি হতে পারতো, তা নিশ্চিতভাবে অনুমেয়। কিন্তু বাংলাদেশ তা হতে দেয়নি। এতএব, এ কথা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক আঙিনায় কট্টর মৌলবাদী শক্তিকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষ এই নির্বাচনেও প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বাংলাদেশ যা পারলো, তা কিন্তু আমরা পারিনি। আমাদের মতো বহুত্ববাদী, মুক্তমনা, ধর্মনিরপেক্ষ একটি গণতান্ত্রিক দেশে যখন ধর্মের আধারে ভোট বিভাজনের মাধ্যমে কোন কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতার মসনদে আসীন হওয়ার ফন্দি আঁটে, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও, আমরা কিন্তু সেই ধর্মীয় জিগির বিছানো ফাঁদে বারংবার পা গলিয়ে দিই। আর এই ঘৃণ্য চক্রান্তের ধূর্ত উদ্দীপনায় আমরা মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে মন্দির-মসজিদ নিয়ে তরজা করে বেড়াই। স্বাধীনতার এত বছর পরেও যে দেশের মূল সমস্যা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে ক্ষুধার কষ্টে, বেকারত্বের যন্ত্রণায়, অশিক্ষার অর্বাচীনতায়, বাক্-স্বাধীনতার অস্থিরতায়, সেই দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য কি শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবাবেগের উন্মাদনায় নির্ধারিত হওয়া সাজে? অথচ মৌলবাদী ধর্মান্ধতা নির্ভর রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার হিংস্র অজগর ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে তিল তিল করে গড়ে ওঠা ‘বহুজন সুখায় চ, বহুজন হিতায় চ”-র এই মহান দেশের বহুত্ববাদের কাঠামো। শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার তাগিদে। ভারতীয় ভূ-রাজনীতির নির্বাচনী প্রচারে যখন মানুষকে মানুষের মতো বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনগুলোর নিরবিচ্ছিন্ন সংস্থান, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলোকে সচেতনভাবে এড়িয়ে কেবলমাত্র ধর্মীয় ভাবাবেগের জিগির ছড়িয়ে ভোট প্রার্থনা করা হয়, বিগত প্রায় এক যুগ ধরে আমরা কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেইগুলোকেই প্রশ্রয় ও আশ্রয় দিয়ে এসেছি। ফলে আমরা গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী, উদারমনস্ক আবহে প্রতিপালিত হয়েও ধর্মীয় ভাবাবেগের জিগির নির্ভর রাজনীতিকেই যেন ক্রমশ আঁকড়ে ধরতে চাইছি। অথচ, প্রবল ধর্মীয় রক্ষণশীলতায় পরিপূর্ণ একটা সমাজব্যবস্থায় প্রতিপালিত হয়েও, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদ ভিত্তিক উগ্র রাজনীতির কুশীলবদের রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করলো। ঠিক এই জায়গাতেই, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার চাদরে আবৃত বাংলাদেশ যা পারলো, তথাকথিত মুক্তমনা অসাম্প্রদায়িক আমরা কিন্তু তা এখনও পারলাম না। আর ঠিক এখানেই বুঝি বাংলাদেশ আমাদের টেক্কা দিয়ে ফেলেছে!
ধর্ম থাক না মন্দিরে, মসজিদে, গির্জায়, গুরুদ্বারে। ধর্ম থাক না আমাদের পরমআত্মায় মিশে। হোক না আমাদের ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, রাজনৈতিক মতবাদ একে অন্যের থেকে আলাদা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হোক দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকারত্ব মোচন, সর্বজন শিক্ষার অঙ্গীকার, স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশ, শান্তি ও সহিষ্ণুতার আশ্বাস, নিজস্ব মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা। শুধুমাত্র রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার হীন উদ্দেশে আমরা নাই বা টানলাম মানুষে মানুষে বিভাজন, ধর্মীয় ভিত্তিতে মানুষের মেরুকরণ। এত দারিদ্র্য, এত অশিক্ষা, এত ধর্মীয় গোঁড়ামির ভিড়েও বাংলাদেশ কিন্তু পারলো। আমাদেরও পারতেই হবে। দেশের অখণ্ডতা রক্ষার তাগিদে। দেশের সংবিধান রক্ষার তাগিদে। দেশের আপামর জনসাধারণের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার তাগিদে। আমাদের অদম্য প্রেরণা মিশে আছে মিলকরণের সেই নিবিড় মন্ত্রোচ্চারণে। যার শক্তিতে আমরা বাঁধা পড়ে আছি। একই সুতোয়। আবহমান কাল ধরে। সেই সর্বশক্তিমান মানবতাবাদের বলিষ্ঠ মন্ত্রোচ্চারণের ব্রত থেকে আমরা যেন কখনো উল্কার মতো ছিটকে না পড়ি নিযুত রাজনৈতিক প্রলোভন এবং উস্কানির মাঝেও।