

অলংকরণ: রমিত
পঞ্চাশের দশক। প্রাইমারি ক্লাসে পড়ছি। নজরুলের নাম শুনেছি শুধু, কবিতা টবিতা পড়া হয় নি। গান? নাঃ। একটা চূণের ডাব্বামার্কা রেডিও। তাতে ভক্তিমূলক গান, পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত এই সব শোনা হয়। বেশিরভাগ সময় ওটা দাদু ঠাকুমার দখলে। আমরা শুনতাম শনি-রোববারে অনুরোধের আসর। ওই গানগুলো বিভিন্ন উৎসবের সময় চারদিকে ঝমঝমিয়ে বাজে। লাইনগুলো মুখস্থ হয়ে যায়। নজরুলগীতিকে ভীড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনার মত সুযোগ ও কান তৈরি হয় নি।
তবে কাকাদের ব্যাচেলর্স ডেনের দেয়ালে অনেক ফটো টাঙানো। প্রথমে চুলদাড়িওলা কজন—দেখলে কীরকম সাধুবাবা সাধুবাবা ফীলিং হয়। এঁদের মধ্যে শুধু রবি ঠাকুরকে চিনি। দেখলেই গড় হয়ে ‘ঠাকুর নম’ বলতে ইচ্ছে হয়। তারপরে লেনিন দাদু, স্তালিন দাদু, পাগড়ি মাথায় ঋষি বঙ্কিমের পর আলাদা করে দু’জন।
একজন গালে হাত দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে কিছু ভাবছেন। ঠিক করে গোঁফ ওঠেনি। দেখলে একডাকে কবি বলে চেনা যায়। উনি রানার বলে হেমন্তের গাওয়া হিট গানটার পদ্য লিখেছেন। পাশে আরেকজনের গোঁফদাড়ি নেই, কিন্তু মাথায় বাবরি চুল। বড় বড় টানা টানা চোখ, কেমন গল্পের রঘু ডাকাতের মত।
কাকাদের ধমক খাই। উনিও বড় কবি। ছোটকা একটা সুন্দরমত বই ধরিয়ে দেয়—গাঢ় সবুজ ডাঁটি ও পাতার উপর রক্তলাল পপি ফুল। বইটির নাম সঞ্চিতা। মায়ের বিয়েতে পাওয়া কালো রঙে বাঁধানো ‘সঞ্চয়িতা’ থেকে দাদু অনেক কবিতা পড়ে শোনায়। ওটা রবি ঠাকুরের বই। তা ইনি সঞ্চিতা নাম রাখলেন কেন? রবি ঠাকুরের নকল করে কবিতা লেখেন? ফের কানমলা।
--বোকার মত কথা না বলে পড়ে দেখ।
হুঁ, পাতা ওল্টালাম—“বাতায়ন পথে গুবাক তরুর সারি”! বাতায়ন মানে জানি, কিন্তু গুবাক? শব্দটা বিচ্ছিরি। বইটা রেখে দিলাম। দেখি ছোটকা কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। ফের তুলে নিলাম।
“সেদিন দেখিনু রেলে
কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে।
চোখ ফেটে এল জল।
এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”?
আরে, এ তো সত্যি কথা! আরো ছোট বয়সে কাকাদের কোলে উঠে হাওড়া স্টেশনে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন ঘটনা দেখেছি। লাল কুর্তা ও ময়লা ধুতি পরা, হাতে নম্বর লেখা পেতলের চাকতি বাঁধা হিন্দি বলা কুলিকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হোল। যা কানে এল—চার আনায় রফা হয়েছিল। কিন্তু মাল তোলার পর বাবুসাহেব একটা হলদেটে দু’আনি ছুঁড়ে দিলেন। কুলি নেবে না।
প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষটা গায়ের ধূলো ঝেড়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কু--ঝিক ঝিক করে এগোতে থাকা রেলগাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে জল ছিল না, আগুনও না। কেমন যেন গরুর মত বোবা দৃষ্টি।
নজরুল যেন আমার মনের কথা, ওর বোবা চোখের ভাষা নিয়ে লাইনটি লিখেছেন-- এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? কিন্তু তারপরে ঘ্যান ঘ্যান করেন নি।
গর্জে উঠেছেন—“বেতন দিয়াছ? চোপরও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোড় পেলি বল”!
আহা, বুকের মধ্যে দুর্গাপুজোর ঢাক বেজে উঠল। আকাশে গুর গুর করে মেঘ ডাকল।
খোলাখুলি বাবুসাহেবদের মিথ্যেবাদী বলা! চোপরও বলে ধমক দেয়া! এমন তো দেখিনি শুনিনি।
আর “এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”? এই লাইনটা উনি লিখেছেন আমার জন্যে। আমি একা নই, আমার মত দুর্বলদের জন্যে। মানে যারা গায়ে গতরে রোগা প্যাংলা, খ্যাংরাকাঠি আলুর দম গোছের। যারা হাতাহাতিতে কখনই পেরে ওঠে না। শুধু মার খায়।
মার খায় স্কুলে, মার খায় খেলার মাঠে। আমাদের দেখলেই অন্যেরা চিনতে পারে—সহজ শিকার। এদের পেটানো যায়। এরা মাস্টারমশাইয়ের কাছে নালিশ করবে না। বাড়ি গিয়ে কেঁদে কেটে বাবা কাকাদের ডেকে আনবে না। মুখ বুজে মার খাবে।
কোন কোন টিম যেমনি ওপেনিং জুড়ি আউট হলেই দান ছেড়ে দেয়। ব্যাট বগলে প্যাভিলিয়ন থেকে এক এক করে আসে আর ফিরে যায়। তেমনই এরা মারামারি শুরু হলেই অপেক্ষা করে কখন মার খেয়ে মাটিতে পড়ে যাবে।
কিন্তু ভগবান আছেন। উনি কি একদিন এইসব অন্যায়ের বিচার করবেন না? নজরুল কিছু বলেন নি? ‘সঞ্চিতা’ ‘সঞ্চয়িতা’র কবিতার বৈচিত্র্যের ঢেউয়ে কয়েক বছর চাপা পড়ে গেল।
কিন্তু কয়েক বছর পরে ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের সংকলনে পেলাম মনের মত উত্তর—“ফরিয়াদ”। শব্দটা আগে কখনও শুনিনি। উকিল দাদু বললেন—আসামী ও ফরিয়াদী। এখানে ফরিয়াদ মানে নালিশ। কার কাছে? ভগবানের কাছে।
বুকের পাটা আছে নজরুলের। সোজা ভগবানের কাছে নালিশ! কোন “ও অনাথের নাথ, ও অগতির গতি” বলে কান্নাকাটি, ভালভাবে বললে করুণ আর্তি, করা নয়। সোজা নালিশ।
“মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদিপিতা ভগবান”।
দারুণ লাগল। এই হোল কবিতা। হ্যাঁ, আগে রবি ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতা পড়েছি। সেটা অসাধারণ। কিন্তু উনি ভগবানকে প্রশ্ন করেছেন –তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো”?
কিন্তু নজরুল করেছেন নালিশ। সে নালিশের বিশাল ফিরিস্তি, পাতার পর পাতা জুড়ে। ভগবানের রাজ্যে কত অবিচার, কত অন্যায়। তো ভগবান করেন কি! নিজের ডিউটি ঠিকমত করেন না? পড়তে লাগলামঃ
“শ্বেত-পীত-কালো করিয়া সৃজিলে মানবে সে তব সাধ,
আমরা যে কালো তুমি ভালো জান নহে তাহা অপরাধ”।
আরে! এটাও আমার কথা। হরদম কালো বলে ব্যঙ্গবিদ্রূপ শুনি, --কালোভূত! কেলটে। জন্মেছি কালো হয়ে যদিও মা ফরসা—কিন্তু সেটা কি আমার দোষ! কিন্তু নজরুল কী করে টের পেলেন আমার কষ্ট? উনিও কি কালো?
কিন্তু শেষের দিকে এসে থমকে যাই। খানিক ভাবি, তারপর উল্লাসে ফেটে পড়ি।
“ওই দিকে দিকে বেজেছে ডংকা, শংকা নাহিক আর,
মরিয়ার মুখে মরণের বাণী উঠিতেছে মার! মার!”
নজরুল খোলাখুলি মারতে বলেছেন। উদোম ক্যালাতে বলছেন, কাদের? ওই যারা এতদিন ধরে তোমাদের মারছে তাদের। শুনতে বেশ ভাল লাগে। মারের পালটা মার! তারপর ঘাবড়ে যাই। না, আমি কাউকে মারতে পারব না। তাহলে কী করব? পালিয়ে যাব, টেনে দৌড়? ওসব কিছু নয়। দলবেঁধে মার মার করে পকেটমারকে ক্যালাও? না, ওর মধ্যে আমি নেই। ভগবান ফরিয়াদ শুনছেন। একদিন তাঁর ন্যায়ের দণ্ড নেমে আসবে। সব ধর্মই এই আশ্বাস দেয়। আপাত আশ্বস্ত হওয়া যাক।
আচ্ছা, নজরুল নিজে কখনও কাউকে মেরেছেন? মারামারি করেছেন?
মনে পড়ল দেশ পত্রিকায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ধারাবাহিক লিখতেন “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে”।
বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের ছেলেবেলার স্মৃতি, বিশেষ করে বাল্যবন্ধু কোন এক দুখু মিঞার কথা।
-- ছোটকা উনি কে?
-- উনি কল্লোল যুগের তিন মহারথী। কল্লোল পত্রিকার থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অন্যতম—শৈলজানন্দ, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অচিন্ত্যকুমার।
-- মানে ঘনাদা ও পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ?
-- দূর গাধা! তোর কথাটা ভুল নয়, আদ্দেক সত্যি।
-- আর দুখু মিঞা?
-- আরে উনিই তো বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম।
-- বিদ্রোহী কবি কেন?
-- উনি একটা কান্ড করেছিলেন। সারারাত জেগে লিখলেন একটা অন্যরকম কবিতা –বিদ্রোহী। তারপর সাত সকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে গিয়ে রাস্তা থেকে পাড়াজাগানো চিৎকার। রবি ঠাকুর অবাক হয়ে দোতলার বারান্দা থেকে জিজ্ঞেস করলেন—কী ব্যাপার কাজী? “গুরুদেব! আমি তোমায় হত্যা করব”!
-- সে কী! উনি পুলিশ ডাকেন নি?
-- আরে বোকারাম! এ হত্যা সে হত্যা নয়। উনি চেয়েছিলেন বাংলা কবিতার ধারা বদলে দিতে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সেই কাজটা করেছিল। ছন্দে, মাত্রা বদলে, শব্দ চয়নে ও পুরাণকথার রূপক মিলে সে এক কাণ্ড। বাংলা কবিতায় বাঁধা পথের বাইরে পা ফেলা। প্রথম লাইনেই চমকঃ
“বল বীর
চির উন্নত মম শির।
শির নেহারি আমারি নতশির ওই
শিখর হিমাদ্রীর”।
আরও শোনঃ
“আমি পিণাকপাণির ডমরুত্রিশূল ধর্মরাজের দণ্ড
আমি চক্র, মহাশংখ, প্রলয়নাদ প্রচণ্ড।
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুংকার”।
ছোটকার আবৃত্তি চলতে থাকে। আমি ভেসে যাই অনুপ্রাসের ঝংকার আর নতুন ধরণের শব্দের ছবির সারি দেখতে দেখতে। সাইক্লোন, ধ্বংস, পেরিয়ে সমস্ত নিয়মের শৃংখল ভেঙে টর্পেডো ভাসমান মাইন সব হয়ে বিদ্রোহী হঠাৎ মহর্ষি ভৃগু হয়ে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন। কিন্তু আচমকা একি?
“আমি চিত-চুম্বন-চোর কম্পন
আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর”!
এবার কেমন কেমন লাগছে। উনি কোন কুমারী মেয়েকে স্পর্শ করেছেন! মরেছে! আর গ্রামের মেয়ের কাঁচলি নিয়ে চিন্তা করা, কল্পনা করা! এই কবি নির্ঘাৎ--
ছোটকাকে কবিতার নেশায় পেয়েছে। আবৃত্তি চলছেঃ
--“একি উন্মাদ ! আমি উন্মাদ! আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ”।
বুঝেছি, এমন অকপট সত্যি বলতে উনিই পারেন। কিন্তু দুর্বলের পক্ষ নিয়ে কথা বলা সেই কবি কোথায় গেলেন? না, না। এই তো উনি পরশুরামের কুঠার হতে চাইছেন। কেন রে বাবা!
“যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-
অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না,
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত”।
ভাল লাগে। একটা অন্যরকম অনুভূতি। যেমন শরতের ভোরে মহালয়ার পাঠে মহিষাসুর বধের পর বুকের ভেতরে হয়। ‘আমি সেইদিন হব শান্ত’।
বাঃ, কিন্তু উনিই কি শৈলজানন্দের বাল্যবন্ধু দুখু মিঞা। অবাক লাগে। আরে ছোটবেলায় কিছু না কিছু টের পাওয়া যায়। যেমন সাভারকর ছোটবেলায় তাঁর জন্মভূমি ভাগুর গাঁয়ে বাচ্চাদের দলবল জুটিয়ে রাতের অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে একটা পুরনো মসজিদের কাঁচ ভেঙে ছিলেন।
কিন্তু দুখু মিঞার বিদ্রোহ কোথায়? বরং বেশ কোমল কবি কবি ভাব। একটা চড়াই পাখির ছানা ওড়ার চেষ্টা করে পড়ে যাওয়ায় মা-চড়াইয়ের কষ্ট নিয়ে কবিতা লিখলেন। ওদিকে রবি ঠাকুরকে ছোটবেলায় দেখুন।
“আমসত্ত্ব দুধে ফেলি তাহাতে কদলী দলি
সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে।
হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ
পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে”।
বেশ, বামুন বাড়ির ফলার খাওয়া পেটুক ছেলের ছবি।
ভুল ভেঙে গেল। দুখু মিঞা কোন ব্যতিক্রম নন। ছোটবেলা থেকেই রোমান্টিক। বন্ধু শৈলজানন্দের সংগে পাল্লা দিয়ে লিখে ফেললেন কোন রাণীমার গড় নিয়ে আবেগঘন কবিতাঃ
“ওই ঝাউয়ের পাহাড়ে নীরব চিতাটি রাণীমার,
ও যে দপদপ জ্বলে লোকে বলে আলো আঁধিয়ার।
এই নিভে যায়, ওই জ্বলে ওঠে
থমকি চমকি পছি দিকে ছোটে
মিশে যায় শেষে রাজগড়ে উঠে
আবার তেমনই আঁধিয়ার।”
বাচ্চা দুখু মিঞার শব্দচয়নে রবি ঠাকুরের প্রভাব স্পষ্ট। আহা, তাতে কী? বড় কবি অচিন্ত্য কুমারের রচনায় নেই? করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায়? কিন্তু আবেগ ও ছন্দের হাত? ওটা সবার হয় না, যার হয় তার হয়।
যেমন গলায় সুর ও কানে তালের বোধ--সবার থাকে না, যার আছে তার আছে।
দুখু মিঞা বড় হয়ে যখন নজরুল হলেন, তাঁর ছন্দ, অন্ত্যমিল এবং অনুপ্রাস অলংকার নিয়ে মারকাটারি নৈপুণ্যে ঘায়েল হয়ে কবিশেখর কালিদাস রায় লিখলেন –“নজরুল আমাদের কবিতা লিখতে দেবে না দেখছি। ও ‘অলস বৈশাখে’র সংগে ‘কলস কই কাঁখে’ মিলিয়েছে”।
বটেই তো। “জল আনতে চললি যে তুই অলস বৈশাখে,
-----কলস কই কাঁখে”।
কিন্তু দুখু মিঞা যে মহা আড্ডাবাজ, ইয়ার্কিদেনেওয়ালা। এক বন্ধুর পাঠশালা পেরোনো হয় নি, কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা সফল ব্যবসায়ী। কনেবৌ বাপের বাড়ি থেকে স্বামীকে চিঠি লিখেছে। ভাষাটা এইরকমঃ
“তুমি ভাল আছ। আমি কেমন আছি। ইতি-“।
সেই চিঠি পড়ে বন্ধুটি প্রেমে উলুত পুলুত। চিঠির জবাব লিখলেন শৈলজানন্দ। গোলাপি রঙের দামি কাগজের উপর বাঁদিকে ছোট করে ঠোঁটে চিঠি বয়ে নিয়ে যাওয়া পাখির মনোগ্রাম ছাপা।
দুখু মিঞা খুব হাসল। দেখল পাখির ছবির নীচে ছাপা রয়েছেঃ
“যাও পাখি, বোল তারে
সে যেন ভোলে না মোরে”।
বলল—“আর বোল এ চিঠিটি
লিখে দেছে শৈল।
বোল না বোল না যেন,
এ দিব্যি রইল”।
তো দুখু যে নজরুল হয়ে ঢাকায় আশু সোমের বাড়িতে কিশোরী রাণু সোমের (প্রতিভা বসু) পরিবেশন করা চা দেখে গেয়ে উঠবে “এত চা ওইটুকু কাপে, পাষাণী আনলে বল কে”—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুখু যে নজরুল হয়ে গেছে। তাই দু’লাইনের চটজলদি ছড়ার রূপান্তর ঘটল চমৎকার এক গানে—“ এত জল ওই কালো চোখে, পাষাণী আনলে বল কে”।
আর ফক্কুড়ি? হো হো করে হাসির সংগে “দে গরুর গা ধুইয়ে”!
কিন্তু দুখু বিদ্রোহী নজরুল হলেন কী করে? বা ঠিক করে বললে কবে? সেই যে পেটের দায়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ফৌজে যোগ দিয়ে আফগানিস্তান ঘুরে এলেন, তখন উনি হাবিলদার দুখু মিঞা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। অটোমানের সুলতানের বা খলিফার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শাসন তথা ধার্মিক নিদানের অধিকার টলটলায়মান। কারণ, ব্রিটিশ সরকারের হুকুম এবং তুরস্কে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আধুনিকতার জয়গান। উনি আইন করে খলিফাগিরি বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু সহজে কেউ ক্ষমতা ছাড়ে? তার আগে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হোল খিলাফত আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য অটোমান সুলতানের খলিফাগিরি বহাল রাখা।
গান্ধীজি ভাবলেন—ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দুদের সংগে মুসলিমদের একসাথে আনার সুবর্ণ সুযোগ। উনি খিলাফতের সমর্থন করলেন। কিন্তু ভারতীয় মুসলিম, কাজী পরিবারের নজরুল ইসলাম, উলটোপথে হাঁটলেন।
সংস্কারের সমর্থনে লিখে ফেললেন—“কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই”! তাহলে কি উনি মুসলিম নন? কে বলল নন? তাহলে “মোহম্মদী” পত্রিকায় কেন প্রবন্ধ লিখতেন? কী করে লিখলেন ঈদের গান, আর এই গানটাঃ
“সাহারাতে ফুটল যে ফুল,
সেই ফুলেরই জ্বালা।
কেউ বলে হজরত মোহম্মদ
কেউ বা কমলিওয়ালা”।
আর কী প্রমাণ চাই?
বেশ, কিন্তু এদিকে মালকোষে এইরকম গান লিখেছেন যে!
“গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু
নাচে শংকর নাচে স্বয়ম্ভু”।
আবার “মহাকালের কোলে এসে গৌরী হল মহাকালী”।
থামো, থামো; আরও আছে।
কতগুলো আগমনী গান আর দেবী দুর্গাকে নিয়ে বন্দনা গান বল দিকি?
গুনতে শুরু করঃ
“এলো রে শ্রীদুর্গা শ্রী আদ্যাশক্তি”, “জয় দুর্গা দুর্গতিনাশিনী”, “আয় মা উমা রাখো এবার”---
ব্যস্ ব্যস, এতেই হবে। তাহলে নজরুল কী? হিন্দু না মুসলমান? প্রতিমা পূজা বা ‘বুত-পরস্তি’ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়?
নজরুল নিজেই উত্তর দিয়ে গেছেনঃ
“হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার”।
তবু লোকের জিভ নড়ে, আজও নড়ে।
তাই লিখতে হয়ঃ
“সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন ‘আড়ি চাচা’!
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা”।
খেয়াল করি, নজরুলের কবিতা ও গানে দুর্গা আনন্দময়ী দেশমাতৃকা হয়ে যান। যুদ্ধ থেকে ফিরে ইংরেজ তাড়ানোর ইচ্ছে ওর মনে প্রবল। ওঁর আগুন ঝরানো সম্পাদকীয়ের চোটে একের পর এক পত্রিকা নিষিদ্ধ হচ্ছে। আর নামগুলো কী—লাঙল, ধূমকেতু, নবযুগ আরও অনেক।
মিনার্ভা থিয়েটারে মহাষষ্ঠীর দিন অভিনীত “দেবী দুর্গা” নাটকের জন্যে গান লিখলেন নজরুল। মন্মথ রায়ের “কারাগার” নাটকের জন্যেও। “আগমনী” কবিতায় উনি দুর্গার বন্দনা করলেন ‘রণরঙ্গিনী’ রূপে। “দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে
বাজে দশ প্রহরণ”।
দুর্গাকে ‘বেটি’ বলে আদর করে ডেকে আহ্বান করছেন লড়াইয়ের ময়দানে নামতে-- ‘ঢাল-তরবার’ নিয়ে ধ্বংস করতে ‘অত্যাচারী শক্ত চাঁড়াল’—স্পষ্টতই ইংরেজদের। এরপর কারাগারে যেতেই হয়। তাতে কি! গেয়ে উঠলেনঃ
“কারারই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”।
আর একটি লাইনে ধরা পড়ল শুধু বঙ্গ বা ভারত নয়, গোটা বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা—“আমরা ধরি মৃত্যুরাজার যজ্ঞ ঘোড়ার রাশ”। উনি কোন একটি দলের সমর্থনে বদ্ধ ছিলেন না। দেশ স্বাধীন করতে হবে—যিনিই করুন, নেতাজি বা গান্ধীজি—সবাই তাঁর শ্রদ্ধেয়।
“আনকোরা যত নন-ভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন খুশি,
‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন’ নাকি আমি বিপ্লবী -মন-তুষি।
‘এটা অহিংস’ বিপ্লবী ভাবে
নয় চরকার গান কেন গাবে?
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতিরাম ভাবে কন্ফুসি”।
কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি কখনই আমাদের বঙ্গে স্থায়ী হয় নি। আপাত শান্তির তলায় বিদ্বেষের তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে, আজও নেভেনি। তাতে ধুনো দেয়ার লোকের অভাব কোন কালেই ছিল না।
দাঙ্গার আগুনে মানবিক বোধ পুড়তে দেখে ব্যথিত নজরুল লেখেন—“খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি, অর্জুন ছোঁড়ে বাণ”। জাতের নামে বজ্জাতি সব তাঁর কাছে গোপন ছিল না। তবে মুজফফর আহমেদের সংগে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে থাকা ও বন্ধুত্ব তাঁকে আগ্রহী করে সাম্যবাদী আন্দোলনে। (এখন সেই বাড়ির সামনে একগাদা দোকানপাট, পেছনে সরকার পরিবারের পুরনো বাড়ি)।
‘গাহি সাম্যের গান” শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কবিতা নয়, শুধু কুলি-মজুরের কথা নয়—তিনি চেয়েছিলেন সার্বিক সাম্য। বিশেষ করে পুরুষ ও নারীর সাম্য। বলেছেন সৃষ্টির যা কিছু তার অর্ধেক নারীর সৃষ্টি। নজরুল বললে কী হবে? আমরা সংসদে নারীর জন্যে অর্ধেক আসন বরাদ্দ করার কথা এখনও ভাবতে পারিনি। এক-তৃতীয়াংশ দেব কিনা, কবে দেব—সেই নিয়ে কামড়াকামড়ি চলছে।
“মিথ্যে শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের থেকে বড় কোন মন্দির-কাবা নাই”।
তারপরেও নজরুল কতখানি হিন্দু বা কতখানি মুসলিম—আদৌ কোনটা কিনা, সে নিয়ে আজও তরজা চলে। আজ জীবিত থাকলে লাভ-জিহাদের অপবাদ শুনতে হত হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে।
এক ফাঁকে টুক করে বলে দিই—বিশ্বে সাম্যবাদী আন্দোলনের বিখ্যাত গান, পারি কমিউনের শ্রমিকের লেখা দ্য ইন্টারন্যাশনালের লিরিক রাশিয়া থেকে গোপনে ভারতে এনেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা অনুবাদ নজরুলের-‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’ নামে। একজন সত্যিকারের কবির কলমে ধরা পড়েছে গানটির আত্মা।
“যত অত্যাচারের শিরে বজ্র হানি, হাঁকে লাঞ্ছিত-জনমন-মথিত বাণীঃ
নব জনম লভি অভিনব ধরণী ওরে ওই আগত”।
কিন্তু এতসব বিদ্রোহ-বিপ্লবের ভীড়ে হারিয়ে যায় নি দুখু মিঞা নামের নটখট ছেলেটা। ছোটদের জন্যে লিখেছে একগাদা কবিতা!
দেখুন, বর্ণপরিচয়ে কোন রস নেই। খালি এটা করিও না। ওটা করিও না। খালি পড়তে বস, নো খেলাধূলো, নো হৈ -হুল্লোড়। রবি ঠাকুরের সহজ পাঠ? শিশু? শিশু ভোলানাথ? দারুণ সব কবিতা। আমাদের অন্য জগতে নিয়ে যায়। কিন্তু “ আমি আজ কানাই মাস্টার” বা “খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা” গোছের তিন চারটে ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবগুলো আসলে বড়দের জন্য। বাচ্চার বাবা-মায়ের জন্য। সবচেয়ে ভাল মদনমোহন তর্কালংকারের “রাত পোহালো ফর্সা হোলো, ফুটলো কত ফুল”। কিন্তু যাকে বলে মজা বা Fun, তার দেখা পাওয়া গেল নজরুলের লিচুচোর, খাঁদুদাদু, কাঠবেড়ালিতে।
“ওমা তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং” দুখু মিঞা ছাড়া কে লিখতে পারতেন? রবি ঠাকুরের প্রেমের গান ধূপের ধোঁয়ার মত, পূজা ও প্রেম মিশে যায়। নজরুল অনেক মাটির কাছাকাছি, অগুরু নয় দেহের গন্ধ পাই তাঁর প্রেমের গানে। পসন্দ আপনি আপনি!
তবে মিনমিনে গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি বা বান্ধবীকে শোনাতে পারেন, নজরুলের গান গাইতে একটু গলার চর্চা দরকার।
এটা আমার মত হরিদাস পালের ব্যক্তিগত মত; রে রে করে উঠবেন না প্লীজ!
রবি ঠাকুর লিখলেন—“আজি হতে শতবর্ষ পরে,
কে তুমি পড়িছ আজি আমার কবিতাখানি
কৌতুহল ভরে”?
নজরুল অন্য ধাতুর। কোন কালজয়ী কবি হবার অমর হবার লোভ নেই।
“পরোয়া করিনা বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা কর যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় মোর রক্তলেখায় তাদের সর্বনাশ”।।
উনি বললে কী হবে? একশ সাতাশ বছর হয়ে গেল। তবু নজরুলের গান কবিতা কিছুই আমরা ভুলি নি। কারণ, অনেক কিছু এখনও সেইরকম রয়ে গেছে। যেমনটি ছিল নজরুল বেঁচে থাকতে।
সত্যেন্দু সান্যাল | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ৩০ মে ২০২৬ ১৫:১৩740921
Skm | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ৩০ মে ২০২৬ ২০:৪৬740928
kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ৩০ মে ২০২৬ ২১:০৮740929