এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  সমাজ

  • আজকের ব্রাহ্মণ্যধর্মের চৌপদী - পর্ব পনেরো

    রঞ্জন রায়
    আলোচনা | সমাজ | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৭ বার পঠিত
  • মনুস্মৃতি, মায়াবাদ, ভগবদ্গীতায় যুদ্ধের নৈতিকতা ও হিন্দুত্বের তত্ত্ব



    সাভারকরের হিন্দুত্ব

    সাভারকরের ‘হিন্দুত্ব’ লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে, ‘ এ মারাঠা’ ছদ্মনামে। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে, ‘ভারত ছোড়ো’ আন্দোলনের সময়ে। তাতে প্রকাশকের বিস্তারিত ভূমিকা পড়লে বোঝা যায় যে সম্ভবতঃ এর প্রকাশক সাভারকর নিজে। প্রকাশন সংস্থা—‘বীর সাভারকর প্রকাশন’ এবং ঠিকানা ‘সাভারকর সদন’, বোম্বে।

    এর সঙ্গে যে এক পাতার ধন্যবাদ পত্র বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন লেখাটি রয়েছে তাতে নাম রয়েছে জনৈক S S Savarkar, Publisher of first edition

    এই এস এস সাভারকরের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। আজকের গবেষকরা মনে করেন যে ওটাও বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ছদ্মনাম। ইংরেজ সরকার সাভারকরের প্রথম সিপাহী বিদ্রোহের উপর লেখা প্রথম বইটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ‘হিন্দুত্ব’ বা ‘হিন্দুপদ পাদশাহী’ বইদুটো নিষিদ্ধ হয় নি।

    তবে এই বইটি হাতে নিলে কিছু জিনিস প্রথমেই চোখে পড়ে।

    এক, বইটির ১৯৪২ সালের সংস্করণের ভূমিকার প্রথম প্যারাতেই প্রকাশক বলছেন যে বীর সাভারকরের লেখা ‘রোমান্টিক হিস্ট্রি’ গোছের অধিকাংশ বই তার বিষয়ের মৌলিকত্ব, উৎকর্ষ এবং স্টাইলের জন্যে ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্স’ এর মধ্যে গণ্য হওয়ার যোগ্য।

    দুই, সাভারকর নাকি ১৯০৬ থেকে ১৯১০ সাল, অর্থাৎ আইনের ছাত্র এবং অভিনব ভারত সংস্থার সংগঠক হিসেবে লণ্ডন বাসের সময়েই ‘হিন্দু’ ঠিক কাকে বলা যায়—এটা ভাবছিলেন। (কিন্তু লণ্ডনবাসের সময়ে ওনার কোন লেখা বা প্যাম্ফলেটে ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটি নেই বা হিন্দুর সংজ্ঞা নিয়ে কোন চিন্তার প্রকাশ নেই)।

    তিন, ‘হিন্দুত্ব’ বইটির রূপরেখা, অধ্যায়গুলো এবং বক্তব্যের মুখ্য বিন্দুগুলো এবং হিন্দুত্বের সংজ্ঞার কাব্যরূপ – সব নাকি আন্দামানের নির্জন কারাবাসের সময়ে জেল- কূঠরির চুণকাম করা দেয়ালে লেখা হয়ে গেছল। অথচ সাভারকরের প্রথম জীবনীলেখক ধনঞ্জয় কীর এবং ইদানীং কালের বিক্রম সম্পতের মতে বইটি রত্নাগিরি জেলে বসে লেখা হয়েছিল। সাভারকরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে যে হ্যাঁ, বইটি রত্নাগিরি জেলে থাকার সময়ে ১৯২৩ সালে লেখা হয়েছিল। আবার ওয়েবসাইটের অন্য একটি অংশে লেখা রয়েছে যে বইটি আন্দামানে ১৯২১-২২ সালে লেখা হয়েছিল।

    চার, বইটির লেখকের ছদ্মনাম ‘এ মারাঠা’, ‘অ্যান ইন্ডিয়ান’ নয়। কারণ, সাভারকর মনে করতেন হিন্দুদের হৃতগৌরব ফিরে এসেছিল মারাঠা রাজত্বে, শিবাজীর পর পেশোয়াদের সময়। তারা দিল্লির মসনদে বসা মোগলদের ক্ষমতা খর্ব করেছিল।

    এর প্রমাণ?

    সেলুলার জেলে বারীন ঘোষ এবং উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোর স্মৃতিকথা। যাতে ওঁরা উল্লেখ করেছেন যে সাভারকর স্বাধীন ভারতের মডেল হিসেবে পেশোয়ারাজকে আদর্শ মনে করতেন। সাভারকরের হিন্দুত্ব বইটির পর দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য রচনা –“হিন্দুপদ পাদশাহী”, বইটি দু’বছর পরে ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয়। এর বিষয়বস্তু মারাঠা হিন্দুসাম্রাজ্যের গৌরবগাথা। সাভারকরের মূল রচনা ‘হিন্দুত্ব’ বইয়ের প্রায় এক পঞ্চমাংশ জুড়ে রয়েছে মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মারাঠা পেশোয়াদের উত্থানের এবং বিজয়ের বর্ণনা।

    আমরা আপাততঃ “হিন্দুত্ব” বইটির বিষয় এবং সাভারকরের মতে ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘হিন্দুইজম’ এর ফারাক নিয়ে আলোচনা করব।

    সেসময় আর্যদের ভারত আগমনের তত্ত্ব এবং তার খন্ডন- এই দুটো বিরোধীমত নিয়েই বিতর্ক চলছিল। সাভারকর আর্যদের মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত আগমনের তত্ত্বকে আশ্রয় করে তাঁর হিন্দুত্বের তত্ত্বকে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর হিন্দু ভারতে বহিরাগত ঔপনিবেশিক হিন্দু, যারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এদেশের মূল নিবাসী পণি এবং দাসদের দমন করে হিন্দুসাম্রাজ্যের স্থাপন করেছিল। সাভারকরের মতে সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং বলপ্রয়োগ অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এবং কাম্য।

    সাভারকর সেই ঐতিহ্যে ফিরে গিয়ে সমগ্র বিশ্বে হিন্দু সাম্রাজ্যের বিস্তার দেখতে চান। তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ বইটি শেষ হয় এই আশায় যে’একদিন ঐক্যবদ্ধ হিন্দুরা ‘can dictate their terms to the whole world. A day will come when mankind will have to face the force’।

    এ নিয়ে গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন ডঃ বিনায়ক চতুর্বেদী এবং ডঃ জানকী বাখলে।

    আজকাল আমরা কথায় কথায় ভারতের বিশ্বগুরু হবার সম্ভাবনা এবং আহ্বান শুনতে পাই।

    আমরা ওই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সাভারকরের মূল অবধারণাকে বোঝার চেষ্টা করব—অবশ্যি তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ বইটিকে নিয়ে।

    কথা ওঠে যে সাভারকরের অনেক আগে চন্দ্রনাথ বসু (১৮৪৪-১৯১০) এবং লোকমান্য তিলক ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটি নিয়ে কথা বলেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সুহৃদ চন্দ্রনাথ বসু যখন তাঁর “হিন্দুত্ব—হিন্দুর প্রকৃত ইতিহাস” (১৮৯২) বইয়ে হিন্দুত্বের ধারণা এবং তার মাহাত্ম্য নিয়ে চর্চা করছেন, তখন সাভারকর নয় বছরের বালক।

    চন্দ্রনাথের চিন্তা অনুযায়ী হিন্দু বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি, হিন্দুধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং হিন্দু সংস্কৃতি পাশ্চাত্ত্যের থেকে উন্নত। তাঁর মতে ভারতভূমিতে ক্রিশ্চান এবং ইসলামকে স্থান দেয়া উচিত নয়। আমরা দেখতে পাব যে চন্দ্রনাথের হিন্দুত্ব ধারণার সঙ্গে সাভারকরের কত মিল!

    হিন্দু কে এবং ‘হিন্দুত্ব’ কাকে বলে?

    সাভারকর প্রথমে প্রশ্ন তুললেন –নামে কিবা আসে যায়! উত্তরে বললেন—অনেক কিছু আসে যায়; জুলিয়েটকে যদি রোজালিন্ড বলে ডাকা হয় বা ম্যাডোনাকে ফতিমা, অথবা অযোধ্যাকে হনলুলু—তাহলে কি একই অনুভূতি প্রকাশ পাবে? অবশ্যই নয়। মহম্মদকে ইহুদী বললে কি তিনি খুশি হতেন? তাই হিন্দুত্ব, হিন্দু এবং হিন্দুস্তান শব্দ নিয়ে তাঁর বিচার শুরু হল।
    বললেন ‘হিন্দুত্ব’ একটি শব্দ মাত্র নয়, এটি আমাদের ইতিহাস। খালি আধ্যাত্মিক ইতিহাস নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতি, যুগ যুগ ধরে জীবনযাপনের যে ঐতিহ্য যে মূল্যবোধ—তার পূর্ণরূপ। হিন্দুধর্ম এর একটি সাবসেট, বা ক্ষুদ্র অংশ। আবার সনাতন ধর্ম বলে যা চালানো হয় তা বিশাল বৈচিত্র্যময় হিন্দুধর্মের একটি অংশ মাত্র, পুরোপুরি হিন্দুধর্ম বা তার একমাত্র রূপ নয়।
    আগে হিন্দু এবং হিন্দুস্তানের উৎস বোঝা দরকার।

    প্রচলিত মত হল মধ্য এশিয়া থেকে আগন্তুক তুর্কীদের আক্রমণের সময় থেকে ওদের মুখে সিন্ধু হয়েছে হিন্দু, যেমন কিনা সাভারকর নিজেই দেখেছেন জেন্দ -আবেস্তা ধর্মগ্রন্থে ‘স’ কে ‘হ’ বলতে।

    কিন্তু সাভারকর খাপ্পা! আমাদের নামকরণ করবে আক্রমণকারী বিধর্মীরা?

    যে হিন্দুধর্ম মানে সেই কি হিন্দু?

    সাভারকর একেবারেই এই সংজ্ঞা মানতে রাজি নন। তাঁর মতে আর্যগোষ্ঠীর একটি অংশ সিন্ধুনদীর এবং সপ্তসিন্ধুর তীরে তাদের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্বতন্ত্র নদীমাতৃক কৃষিসভ্যতা স্থাপন করে এবং তাদের মধ্যে ক্রমশঃ এক জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে। ওরা নদীর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজেদের এলাকার নাম দিল ‘সপ্তসিন্ধু’। ঋগবেদে এর উল্লেখ আছে। এবং সাভারকরের মতে এটি আমাদের বিশিষ্ট জাতীয়তা এবং সংস্কৃতির দ্যোতক।

    মুশকিল হল দুটো; এক, ওই জাতীয়তা ব্যাপারটি বেদে কোথাও নেই, পুরাণেও নেই। রয়েছে ‘জাতি’। এবং সেই জাতি বা বর্ণ নানান ভাগে বিভক্ত। সপ্তসিন্ধু এলাকা জুড়ে একটি মাত্র জাতি বা একটি রাষ্ট্র –এমন কোথাও বৈদিক বা বৌদ্ধ বা পুরাণ কথায় নেই। না ‘হিন্দু’ বলে কোন জাতি বা রাষ্ট্রের কথা রয়েছে।

    দুই, তার বদলে ঋগবেদে, মহাভারত রামায়ণ আদি সমস্ত পুরাণকথায় এবং বৌদ্ধ সাহিত্যে যত জনপদ এবং রাজত্বের বর্ণনা রয়েছে তাতে দেখি বিভিন্ন রাজার আলাদা আলাদা রাজ্য/রাষ্ট্র এবং শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তার এলাকা বাড়ানো কমানো। অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়ার কথা মনে করুন। পরাভূত রাজারা বশ্যতা স্বীকার করে এবং কর দিয়ে বা যুদ্ধের সময় সৈন্য সাহায্য দিয়ে রেহাই পেত।

    খুঁজতে খুঁজতে সাভারকর বিষ্ণু পুরাণে পৌঁছলেন। বললেন—এই ছোট্ট দ্বিপদীতে আমাদের পরিচয় চমৎকার ভাবে ধরা হয়েছে।

    ‘উত্তরং যতসমুদ্রস্য হিমাদ্রৈশ্চৈব দক্ষিণম্‌।
    বর্ষ তদ্ভারতং নাম ভারতী যত্র সন্ততী।। (বিষ্ণু পুরাণ)

    যে ভূখণ্ড সমুদ্রের উত্তরে এবং হিমালয়ের দক্ষিণে স্থিত তাকে ভরতবংশীয়দের বাসস্থান হিসেবে ভারত বলে অভিহিত করা হয়। এখানেও মুশকিল, ভারত আছে, হিন্দু বা হিন্দুস্থান নেই।
    প্রাচীন যুগে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রশক্তি, একটি মাত্র জাতি –কোথাও নেই। এবং ভারত রয়েছে কিন্তু হিন্দুস্থান বা হিন্দু নেই, সাভারকর অস্বস্তিতে পড়লেন।

    ওনার উপপাদ্য হল ভারত নয়, হিন্দু এবং হিন্দুস্থান শব্দ দুটো; এবং এর ব্যবহার বিদেশী যবন-ম্লেচ্ছদের মুখে নয়, প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের সময় থেকে প্রচলিত বলে প্রমাণ করতে হবে।
    দেখা যাক সেটা উনি কী ভাবে করেন।

    সাভারকর বললেন- সপ্তসিন্ধু বা সিন্ধুস্থান হল আমাদের হিন্দুদের আদি জাতি এবং রাষ্ট্রের রূপ। এটি প্রাচীন সাহিত্যে পাওয়া যাচ্ছে। সেটাই পরে প্রাকৃতে হিন্দুস্থান হয়েছে।
    কিন্তু বৈদিক এবং বৌদ্ধ সাহিত্যে যে ‘হিন্দু’ শব্দ নেই! উনি বললেন –সংস্কৃতের ‘স’ প্রাকৃত জিভে ‘হ’ হয়ে যায়। সপ্তাহ হয়ে যায় হপ্তা। পারসিক ভাষায় ‘আসুর’ হয় ‘আহুর’। এসব বলতে বলতে উনি আশ্রয় নিলেন সেই ভবিষ্যপুরাণের, তার প্রতিসর্গ পর্বের।

    আগের পর্বেই দেখিয়েছি মূল শ্লোকটি হল-
    জানুস্থানে জৈনু শব্দঃ সপ্তসিন্ধুস্তথৈবচ।
    সপ্তহিন্দুর্যাবনী চ পুনর্জ্ঞেয়া গুরুন্ডিকা।। (৩৬)

    যবনী ভাষায় জানুকে বলে জৈনু, আর সপ্তসিন্ধুকে বলে ‘সপ্তহিন্দু’!

    এবার ফিরে যান সাভারকরের ছ’লাইনের শ্লোকটিতে। প্রায় প্রতিটি শব্দ মূল পুরাণের ২১-২২ এবং ৩৫-৩৬ থেকে তোলা। কিন্তু একটা তফাৎ রয়েছে।

    শেষ লাইনে সাভারকর লিখছেনঃ হপ্তহিন্দুর্যাবনী চ পুনর্জ্ঞেয়া গুরুণ্ডিকা।। অর্থাৎ ভবিষ্যপুরাণেও সপ্তকে হপ্ত বলা হয় নি, ওটা সাভারকর একরকম জোর করে বলছেন।

    এছাড়াও আর একটা প্রশ্ন না করেই পারা যাচ্ছে না। সাভারকরের উদাহরণ কি তাঁর থিওরির বিরুদ্ধেই যাচ্ছে না? ভবিষ্যপুরাণের শ্লোকটি বলছে – স কে হ বলা হয় যবনদের ভাষায়।
    তাহলে কী দাঁড়াল? সিন্ধু থেকে হিন্দু বলা যবনদেরই বৈশিষ্ট্য, আমাদের নয়।

    কিন্তু সাভারকর নিজের পিঠ নিজেই চাপড়িয়ে বলছেন—এতক্ষণ আমরা পা ফেলেছি ‘on solid ground of recorded facts’।

    কিন্তু ভবিষ্যপুরাণের ভাষা ও উচ্চারণ বিধি নিয়ে ঐ শ্লোকটি কি অমন শক্তপোক্ত প্রমাণ? দু’পাতা এগিয়ে সাভারকর যেন দ্বিধাগ্রস্ত। বলছেন—এমনও হতে পারে যে সিন্ধু এলাকার আদিম অধিবাসীরা সিন্ধুকে ‘হিন্দু’ বলত। আগন্তুক আর্যরা ওই একই নিয়মে সংস্কৃতে হ কে স করে হিন্দুকে সিন্ধু করে নিয়েছে? মানে, সিন্ধু থেকে হিন্দু হয় নি, উলটো পথে প্রাকৃত হিন্দু থেকে সিন্ধু হয়েছে!

    এর থেকে কী বুঝব? আর্যদের স প্রাকৃত জিভে হ হল, নাকি আদিবাসীদের হ আর্যদের জিভে স হল? আমি হাল ছেড়ে দিলাম।

    কিন্তু সাভারকর এবার বলছেন আমাদের দেশের আদি বৈদিক নাম হল ‘সিন্ধুস্তান’, ‘ Sindustan—the best nation of Aryans’।

    প্রমাণ? কেন, সেই ভবিষ্যপুরাণের প্রতিসর্গ পর্ব! এবারেও কোন শ্লোক সংখ্যা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করেন নি।

    চারটে শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন যার সার হলঃ
    বিক্রমাদিত্যের নাতি শালিবাহন তাঁর পূর্বজদের সিংহাসনে বসে শক, চৈনিক, তাতার, বালহিক, কামরূপ, খোরাজান এবং শঠদের পরাস্ত করে আর্য এবং ম্লেচ্ছদের মধ্যে সীমান্ত চিহ্নিত করে দিলেন। তখন থেকে আর্যদের শ্রেষ্ঠ দেশের নাম হল সিন্ধুস্থান এবং ম্লেচ্ছদের দেশ হল সিন্ধুনদের ওপারে।

    কিন্তু বিক্রমাদিত্যের শক-হুণদল-পাঠান-মোগল বিজয়ের আখ্যান কি আদৌ বৈদিক যুগের?

    বার বার বৈদিক ইতিহাস বা সাহিত্যের উদাহরণের নামে কেবল ভবিষ্যপুরাণের উল্লেখের দুর্বলতা বোধহয় সাভারকরকেও চিন্তায় ফেলেছিল। তাই তিনি ভবিষ্যপুরাণের সাফাই দিয়ে দু’পাতার ফুটনোট দিলেন।

    *The verses from Bhavishyapuran quoted above seem to be quite trustworthy so far as their general purport is concerned।

    ওনার তর্ক হল মানছি, ‘it contains some inaccuracies and even absurdities—and is Plutarch free from them? বিদেশি পণ্ডিতদের সার্টিফিকেট না পেলে আমাদের ঐতিহ্যকে খারিজ করতে হবে? আরও বলছেন যে এইযে শ্লোকটি ভবিষ্যপুরাণে রয়েছে—
    “চন্দ্রগুপ্তস্য সুতঃ পৌরস্যাধিপতি সুতাম্‌
    সুলভস্য তথোদাহ্য যাবর্নী বৌদ্ধতৎপরঃ”,-- একে কি খারিজ করতে হবে?

    শ্লোকটির অর্থ (সাভারকরের ইংরেজি, আমার বাংলা)’ তখন বৌদ্ধমতের দিকে আকর্ষিত চন্দ্রগুপ্তের পুত্রটি পুরু রাজ্যের অধিপতির কন্যা সুলভাকে বিয়ে করল’।

    না, কেন খারিজ করব? কিন্তু এই শ্লোকটি কি প্রমাণিত করছে না যে ভবিষ্যপুরাণ আদৌ বৈদিক সাহিত্যের যুগে রচিত নয়, বরং অনেক পরবর্তী রচনা?

    প্রশ্ন হল- ভবিষ্যপুরাণের প্রতিসর্গ পর্বের উলটো পালটা রাজবংশের বর্ণনা এবং ফেব্রুয়ারি সান্ডে এসব শব্দ থাকার পরেও তাদের ইংরেজ আগমনের পরবর্তী না ভেবে প্রাচীন ৫০০০ বর্ষ আগের ইতিকথা কী করে বলা যায়?

    দুই, আর্যগোষ্ঠী আসার আগে যারা এই সপ্তসিন্ধু এলাকায় বৈদিক যুগে বাস করছিল তাদের কী দশা হবে? দাস বা পণিরা? তাদের কি হিন্দু বলা যায়?

    বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ থেকে আজ অব্দি যত পুনর্মূদ্রণ হয়েছে তাতে মলাটের ভেতর দিকে ঋগবেদ থেকে একটি শ্লোক মুদ্রিত রয়েছেঃ
    “য ঋক্ষাদংহসো মুচদ্যো বার্যাত সপ্তসিন্ধুপু।
    বধর্দাসস্য তুবিংলৃমণ লীলমঃ”।। ঋগবেদ, ৮/২৪/২৭।

    এর অর্থ, “আমাদের সপ্তসিন্ধুকে সম্পদ শালী কে করেছে? তুমিই হে প্রভু। এখন আমাদের শত্রু দাসেদের ধ্বংস করতে তোমার বজ্র হানো”! অর্থাৎ, সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে আগত আর্যেরা মূল অধিবাসী দাসদের শত্রু ভাবছেন!

    সাভারকর শ্লোকটির ইংরেজি অনুবাদে জুড়ে দিয়েছেন ‘Nation of Sapta Sindhus’, কিন্তু ঋগবেদের এই শ্লোকটিতে কোথাও জাতি বা জাতীয়তা গোছের নিকটতম সংস্কৃত শব্দ দেখা যাচ্ছে না।

    শেষে সাভারকর হিন্দুর সংজ্ঞা নির্ধারিত করলেন এই শ্লোকটি রচনা করেঃ
    “ আসিন্ধু সিন্ধু-পর্যন্তা যস্য ভারত-ভূমিকা,
    পিতৃভূঃ পূণ্যভূশ্চৈব স বৈ হিন্দুরিতি স্মৃতঃ”।

    সাভারকর এর ইংরেজি ব্যাখ্যা করেছেন সিন্ধুনদ থেকে সমুদ্র পর্য্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রকে যাঁরা ‘পিতৃভূ’ (পিতৃভূমি) এবং ‘পূণ্যভূ’(পূণ্যভূমি) মনে করেন তাঁরাই হিন্দু।

    (চলবে)


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৭ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    মাংস - অরিন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন