

৩.৩ মনু কী বলেনঃ খাদ্যাখাদ্য, দন্ডনীতি, পাপ ও প্রায়শ্চিত্ত
আজকাল সবারই কথায় কথায় গায়ে ছ্যাঁকা লাগে। আপনার কোন কথায় বা কোন জোক যে কার ধর্মানুভূতিতে আঘাত করবে! ব্যাপারটা খানিকটা জ্বর আসার মত। জ্বর কখন আসবে তা আপনিও জানেন না , সেও জানেনা।
[‘জ্বরব্যাধি’- ইনিও বৈদিক দেবতা, এঁর স্তোত্র দেখুন অথর্ব বেদের ৫ম খন্ডে ২২ নম্বর স্তোত্র; “হে জ্বরব্যাধি, আমার প্রতি প্রসন্ন হও, আমাকে তপ্ত এবং রক্তবর্ণ করে তুলো না’।]
এসবের ঝামেলায় আমাদের খাদ্যভ্যাস নিয়ে সরকারের নাক গলানো শুরু হল। যাতে কারও ধর্মীয় আবেগে আঘাত না লাগে। আগে গোমাংস নিষিদ্ধ হল। সন্দেহের বশে দাদরি গাঁয়ে গণপিটুনিতে এয়ারফোর্সের কর্মচারী পুত্রের বাবা আখলাকের প্রাণ গেল। এরপর বিভিন্ন রাজ্যে আরও কয়েকজন, সন্দেহ হলেই হল। প্রমাণের দরকার নেই। আজ অব্দি কারও শাস্তি হয়নি।
ইদানীং শুনছি বঙ্গে পোস্টার পড়ছে—মৎস আমাদের অবতার। কাজেই মাছ খাওয়া ছাড়তে হবে, নইলে গণপিটুনি।
কী মুশকিল! কূর্ম এবং বরাহও তো অবতার, একই লাইনে; মানে জয়দেবের দশাবতার স্তোত্রে। তাহলে ওদুটো খাওয়াও ছাড়তে হবে নাকি? এসবই নাকি শাস্ত্রে মানা রয়েছে। কোন শাস্ত্রে? বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত কোথাও গরুকে মাতা বলতে দেখলাম না। তাই মনুস্মৃতিতেই খোঁজ করা যাক। কারণ, আগেই বলা হয়েছে—যা আছে তা মনুস্মৃতিতেই আছে, এবং যা এতে নেই তা কোথাও নেই।
দ্বিজের কী কী খেতে নেইঃ
বেশ লম্বা লিস্টি।
ধরুন পেঁয়াজ, রসুন, গাজর, ব্যাঙের ছাতা, চালতে, গাছ কাটা রস, বাছুরের জন্ম হলে প্রথম দশদিনের যে গাঢ় দুধ (পীযূষ), উটের এবং ভেড়ার দুধ, মোষ ছাড়া সব বুনো জন্তুর দুধ, মৃতবৎসা গাভীর দুধ, স্ত্রীলোকের দুধ বর্জনীয়(৫/৫,৬,৮,৯)।
সাপ, অজানা পশুপাখি বা বানরের মত পঞ্চনখওলা জন্তুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ(৫/১৭)।
পাখির মাংস খাব সে গুড়ে বালি! সমস্ত মাংসাশী পক্ষী, গ্রামবাসী পক্ষী, একখুর পশু ও তিতির পাখি, চড়ুই, হংস, চক্রবাক, গ্রাম্যকুক্কুট, সারস, ডাহুক, টিয়া ও শালিক বক, দাঁড়কাক, খঞ্জন, কুমীর এবং সবরকমের মাছ বর্জনীয়(৫/১১, ১২, ১৪)।
মরেছে! মাশরুম, চিকেন এবং সবরকম ফিশ নিষিদ্ধ! বাঙালি খাবেটা কী? সব মাছ নাকি মাংসভোজী, কাজেই বর্জনীয়।(৫/১৫)।
ঘাবড়াবেন না। মনু মহারাজ আমাদের কথা ভেবেই ব্যাকডোর এন্ট্রির ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
কী কী খাওয়া যায়ঃ
দেবকার্যে (পূজোয়) এবং পিতৃকার্যে (শ্রাদ্ধাদি)নিবেদিত বোয়াল, রুইমাছ, সিঙ্গী মাছ ও সমস্ত আঁশযুক্ত মাছ খাবে।
দেবতাকে ভোগ না দিয়ে তিল সহ সেদ্ধভাত, ঘি, অসংস্কৃত পশুমাংস খাওয়া যাবেনা।(৫/৭)। আসল কথা হল ওই ঠাকুরকে নিবেদন করে খাওয়া। যাই নিবেদন করুন, তারপর খেয়ে নিলে অসুখ করবে না।
সত্যজিৎ খামোখাই “গণশত্রু” ফিলিম বানিয়েছিলেন।
পঞ্চনখ জন্তুদের মধ্যে শজারু, গোসাপ, খরগোস, কচ্ছপ এবং গন্ডারের মাংস খাওয়া যাবে এবং উট ছাড়া অন্য একপাটি দাঁতওলা জন্তুর মাংস খেতে বাধা নেই(৫/১৮)।
প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়দের যজ্ঞে পশুপক্ষীর মাংস দিয়ে ‘পুরোডাশ’ (মাংসের পুর দেয়া পিঠেজাতীয় যা যজ্ঞে হবি হিসেবে প্রদান করা হয়) প্রস্তুত হয়েছিল এবং যজ্ঞের ও বৃদ্ধ মাতাপিতার জীবনধারণের প্রয়োজনে ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক পশুপাখি বধ করা যায়; অগস্ত্যমুনি তাই করেছিলেন (৫/২২,২৩)।
মাংস খাওয়ার বিধিসমূহঃ
মনে হয় মনু শেষ অবধি এনিয়ে দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অথবা নিয়মগুলো সময়ের সঙ্গে অনেকবার বদলে গেছে। পক্ষের যুক্তি দেখুনঃ
প্রতিদিন ভক্ষ্য প্রাণীদের ভক্ষণ করলে দোষ হয়না। বিধাতাই খাদ্য ও খাদক উভয়কেই সৃষ্টি করেছেন।(৫/৩০)
হরিণ নরম দাঁতে খায় নরম ঘাস, হিংস্র দাঁতওলা বাঘ খায় হরিণ, মানুষের আছে হাত, ওরা খায় যাদের হাত নেই মানে মাছ। সিংহের মত বীরের খাদ্য ভীতু হাতি।(৫/২৯)।
যজ্ঞে মন্ত্রপুত মাংস ব্রাহ্মণের অনুমতি নিয়ে খাওয়া যায়। শ্রাদ্ধে, মধুপর্কে অথবা খাদ্যাভাবে প্রাণসংশয়ে মাংস খাওয়া যায়।
যজ্ঞের জন্য মাংস খাওয়া দৈব বিধি; যজ্ঞ ছাড়া মাংস খাওয়া রাক্ষস বিধি।(৫/৩১)
মাংস কিনে বা পশুপালন করে বা অন্যের থেকে উপহার পাওয়া মাংস পিতৃগণকে অর্চনা করে খেলে দোষ হয়না(৫/৩২)।
শ্রাদ্ধে বা মধুপর্কে যথাবিধি নিযুক্ত হয়ে যে মাংস খায় না, সে মরে গিয়ে একুশ জন্ম পশুত্ব প্রাপ্ত হয় (৫/৩৫)।
এ তো একেবারে গলায় গামছা দিয়ে মাংস খাওয়ানো!
এবার শুনুন উলটো যুক্তিঃ
প্রাণিহিংসা না প্রণি করে কখনও মাংস উৎপন্ন হয়না।প্রাণিবধ স্বর্গলাভের সহায়ক নয়, সুতরাং মাংস বর্জন করবে(৫/৪৮)।
রক্ত শুক্রের থেকে মাংসের উৎপত্তিকে ঘৃণাজনক বিবেচনা করে এবং প্রাণীবধ নিষ্ঠুর কর্ম জেনে সকলপ্রকার মাংস ভক্ষণ বর্জন করবে (৫/৪৯)।
যে নিজের সুখের ইচ্ছায় অহিংসক প্রাণীকে হিংসা করে, সে জীবনে মরণে কোথাও সুখ পায় না(৫/৪৫)।
ইহলোকে যার মাংস খাচ্ছি, পরলোকে সে আমাকে খাবে—মনীষীগণ ‘মাংস’ শব্দের এই অর্থ করেছেন(৫/৫৫)।
যেন ঘড়ির পেন্ডূলাম-- এদিক থেকে ওদি্ক, বাম থেকে দক্ষিণ--হার্মনিক মোশনে দুলছে। কিং কর্তব্যম?
মাংসভক্ষণে, মদ্যপানে ও মৈথুনে দোষ নেই; এই হল জীবের প্রবৃত্তি। নিবৃত্তি মহাফলজনক(৫/৫৬)।
এই হল খাঁটি কথা। প্রথম জীবনে প্রবৃত্তির কথা শুনে চলব; বৃদ্ধ হলে মহাফল্ লাভের আশায় নিবৃত্তির হাত ধরব।
(চলবে)
অরিন | 119.224.***.*** | ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:১০736247
হীরেন সিংহরায় | ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:২৮736250