তত্ত্ব বনাম তপ্ত জিলিপি...বাঙালির রঙিন জগাখিচুড়ি...
পন্ডিতদের জন্য এক চিলতে আবির...
আজকের এই দোল-পূর্ণিমা-গ্রহণ-মহাপ্রভু-গোপাল পূজা-রবীন্দ্রনাথের মহাজাগতিক বসন্ত উৎসবের ককটেলটি আসলে আমাদের তথাকথিত নাস্তিক আর শুষ্ক তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের জন্য এক চরম দুঃস্বপ্ন। যখন কোনো মার্ক্সবাদী সমাজতত্ত্ববিদ চশমা ঠিক করতে করতে ল্যাপটপে টাইপ করেন—"ধর্ম হলো জনসাধারণের আফিম এবং দোল উৎসব হলো আসলে সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্যের অবশেষ", ঠিক তখনই তাঁর জানলার বাইরে 'ওরে গৃহবাসী'-র রবীন্দ্র-সুর আর 'হরিবোল' ধ্বনি মিলেমিশে বাংলায় একাকার হয়ে তাঁর থিওরিকে সপাটে চড় মারে। আমাদের এই পণ্ডিতকুল যখন সেমিনারের এসি রুমে বসে ''সাবঅল্টার্ন কালচার" নিয়ে খাতা ভর্তি করেন, তখন রাঢ় বাংলার পিন্ডারের পলাশ বনে আগুন লেগে গেছে, আর সেই পলাশের রঙে রাঙা হয়ে রিকশাওয়ালা আর কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে যাবতীয় 'সোশ্যাল স্ট্রাকচার'-এর দফারফা করে দিচ্ছেন।
বাঙালির এই 'আধ্যাত্মিক মাল্টিটাস্কিং' বোঝা ওই অতি-যুক্তিবাদী মগজের কর্ম নয়। একদিকে রাধাকৃষ্ণের প্রেমতত্ত্ব, অন্যদিকে মহাপ্রভুর ভক্তি-আন্দোলন, আর তার ওপর শান্তিনিকেতনি নান্দনিকতা বসন্ত উৎসব —এ এক এমন জগাখিচুড়ি যা কোনো লজিক দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। পণ্ডিতরা যখন পূর্ণিমার চাঁদে গ্রহণের 'রাহু-দোষ' বা 'অন্ধবিশ্বাস' খুঁজতে ব্যস্ত, বাঙালি তখন সেই ছায়াঘেরা চাঁদকেই 'রোমান্টিক মেলাঙ্কোলি'র মোড়কে রবিঠাকুরের গানে গেঁথে ফেলছে। তাঁদের শুষ্ক তাত্ত্বিক কচকচালির চেয়ে ধামসা-মাদলের সেই আদিম গম্ভীর ধ্বনি আর ঝুমুর গানের সুরের মাদকতা অনেক বেশি জীবনমুখী।
আর এই ভোজের আসল ঘি-টুকু তো ঢেলে দিয়েছেন স্বয়ং বালগোপাল! আমাদের আধুনিক নাস্তিকরা যখন 'পিতৃতন্ত্র' নিয়ে নাকে খত দিচ্ছেন, তখন বাঙালির ঘরে ঘরে ওই ননীচোরা গোপাল কিন্তু সব থিওরিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিংহাসনে আয়েশ করে বসে মাখন মারছেন। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের কোনো চা-বাগানের মেঠো সুরে যখন দোলের গান ওড়ে, কিংবা কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে যখন আবিরের ধুম লেগে যায়, তখন অক্সফোর্ডের প্রফেসরের 'কালচারাল হেজিমনি' থিওরি স্রেফ জলে ধুয়ে যায়। তাত্ত্বিকদের মোটা চশমার কাঁচ যেখানে কেবল 'অন্ধবিশ্বাস' খোঁজে, সেখানে বাঙালির গোপাল-পূজা বা মদনমোহন উৎসব প্রমাণ করে দেয় যে ঈশ্বরকে ভয় নয়, বরং আদর করে গালে রঙ মাখিয়ে দিলেই জগতের সব টেনশন ভ্যানিশ।
দিনশেষে পাণ্ডিত্যের সব গাম্ভীর্য ওই গোপালের হাসির কাছে হার মেনেছে। পিন্ডারের পলাশ বনের আগুন আর উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির সেই নিজস্ব সুর মিলেমিশে আজ একটাই কথা বলছে—লাইব্রেরির তত্ত্ব দিয়ে পেট ভরে না, পেট ভরে গোপালের প্রসাদী খিচুড়ি , আলুর দম,পায়েস আর লাড্ডু, মালপোয়া! তাই হে জ্ঞানপাপীগণ, আজ অন্তত ওই লজিকের চশমাটা খুলে একটু আবির মাখুন। আপনাদের 'ডিসকোর্স' কালকেও থাকবে, কিন্তু আজকের এই রঙিন পাগলপন্তি আর তপ্ত জিলিপি—দুটোই মিস করলে জীবনটাই বৃথা!
সবাইকে দোল পূর্ণিমা ও বসন্ত উৎসবের রঙিন শুভেচ্ছা! ❤️
অখিল রঞ্জন দে
০৩/০৩/২০২৬
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।