এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বাঙালির রঙিন জগাখিচুড়ি

    অখিল রঞ্জন দে লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ মার্চ ২০২৬ | ৪৩ বার পঠিত
  • তত্ত্ব বনাম তপ্ত জিলিপি...
    বাঙালির রঙিন জগাখিচুড়ি...
    পন্ডিতদের জন্য এক চিলতে আবির... 
     
    আজকের এই দোল-পূর্ণিমা-গ্রহণ-মহাপ্রভু-গোপাল পূজা-রবীন্দ্রনাথের মহাজাগতিক বসন্ত উৎসবের ককটেলটি আসলে আমাদের তথাকথিত নাস্তিক আর শুষ্ক তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের জন্য এক চরম দুঃস্বপ্ন। যখন কোনো মার্ক্সবাদী সমাজতত্ত্ববিদ চশমা ঠিক করতে করতে ল্যাপটপে টাইপ করেন—"ধর্ম হলো জনসাধারণের আফিম এবং দোল উৎসব হলো আসলে সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্যের অবশেষ", ঠিক তখনই তাঁর জানলার বাইরে 'ওরে গৃহবাসী'-র রবীন্দ্র-সুর আর 'হরিবোল' ধ্বনি মিলেমিশে বাংলায় একাকার হয়ে তাঁর থিওরিকে সপাটে চড় মারে। আমাদের এই পণ্ডিতকুল যখন সেমিনারের এসি রুমে বসে ''সাবঅল্টার্ন কালচার" নিয়ে খাতা ভর্তি করেন, তখন রাঢ় বাংলার পিন্ডারের পলাশ বনে আগুন লেগে গেছে, আর সেই পলাশের রঙে রাঙা হয়ে রিকশাওয়ালা আর কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে যাবতীয় 'সোশ্যাল স্ট্রাকচার'-এর দফারফা করে দিচ্ছেন।
     
    বাঙালির এই 'আধ্যাত্মিক মাল্টিটাস্কিং' বোঝা ওই অতি-যুক্তিবাদী মগজের কর্ম নয়। একদিকে রাধাকৃষ্ণের প্রেমতত্ত্ব, অন্যদিকে মহাপ্রভুর ভক্তি-আন্দোলন, আর তার ওপর শান্তিনিকেতনি নান্দনিকতা বসন্ত উৎসব —এ এক এমন জগাখিচুড়ি যা কোনো লজিক দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। পণ্ডিতরা যখন পূর্ণিমার চাঁদে গ্রহণের 'রাহু-দোষ' বা 'অন্ধবিশ্বাস' খুঁজতে ব্যস্ত, বাঙালি তখন সেই ছায়াঘেরা চাঁদকেই 'রোমান্টিক মেলাঙ্কোলি'র মোড়কে রবিঠাকুরের গানে গেঁথে ফেলছে। তাঁদের শুষ্ক তাত্ত্বিক কচকচালির চেয়ে ধামসা-মাদলের সেই আদিম গম্ভীর ধ্বনি আর ঝুমুর গানের সুরের মাদকতা অনেক বেশি জীবনমুখী।
     
    আর এই ভোজের আসল ঘি-টুকু তো ঢেলে দিয়েছেন স্বয়ং বালগোপাল! আমাদের আধুনিক নাস্তিকরা যখন 'পিতৃতন্ত্র' নিয়ে নাকে খত দিচ্ছেন, তখন বাঙালির ঘরে ঘরে ওই ননীচোরা গোপাল কিন্তু সব থিওরিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিংহাসনে আয়েশ করে বসে মাখন মারছেন। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের কোনো চা-বাগানের মেঠো সুরে যখন দোলের গান ওড়ে, কিংবা কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে যখন আবিরের ধুম লেগে যায়, তখন অক্সফোর্ডের প্রফেসরের 'কালচারাল হেজিমনি' থিওরি স্রেফ জলে ধুয়ে যায়। তাত্ত্বিকদের মোটা চশমার কাঁচ যেখানে কেবল 'অন্ধবিশ্বাস' খোঁজে, সেখানে বাঙালির গোপাল-পূজা বা মদনমোহন উৎসব প্রমাণ করে দেয় যে ঈশ্বরকে ভয় নয়, বরং আদর করে গালে রঙ মাখিয়ে দিলেই জগতের সব টেনশন ভ্যানিশ।
     
    দিনশেষে পাণ্ডিত্যের সব গাম্ভীর্য ওই গোপালের হাসির কাছে হার মেনেছে। পিন্ডারের পলাশ বনের আগুন আর উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির সেই নিজস্ব সুর মিলেমিশে আজ একটাই কথা বলছে—লাইব্রেরির তত্ত্ব দিয়ে পেট ভরে না, পেট ভরে গোপালের প্রসাদী খিচুড়ি , আলুর দম,পায়েস আর লাড্ডু, মালপোয়া! তাই হে জ্ঞানপাপীগণ, আজ অন্তত ওই লজিকের চশমাটা খুলে একটু আবির মাখুন। আপনাদের 'ডিসকোর্স' কালকেও থাকবে, কিন্তু আজকের এই রঙিন পাগলপন্তি আর তপ্ত জিলিপি—দুটোই মিস করলে জীবনটাই বৃথা!
     
    সবাইকে দোল পূর্ণিমা ও বসন্ত উৎসবের রঙিন শুভেচ্ছা! ❤️
                              অখিল রঞ্জন দে 
                                  ‌ ০৩/০৩/২০২৬

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2402:3a80:441:1872:252d:f305:808a:***:*** | ১১ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৫739104
  • "আর সেই পলাশের রঙে রাঙা হয়ে রিকশাওয়ালা আর কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে যাবতীয় 'সোশ্যাল স্ট্রাকচার'-এর দফারফা করে দিচ্ছেন।"
     
    এটা আবার কবে কোথায় হলো? 
  • কৌতূহলী | 115.187.***.*** | ১১ মার্চ ২০২৬ ১৫:৪৮739105
  • আপনার প্রতিটা লেখাই বেশ চিত্তাকর্ষক লাগে। লেখাগুলো পড়ে আমার কেমন যেন মনে হয় , লোককে ইচ্ছাকৃত ক্ষেপিয়ে দেওয়ার জন্য লেখেন। আগেরদিন আপনার তৃণমূল নিয়ে লেখাটা পড়ে তেমনই লাগল। 
     

    "আর সেই পলাশের রঙে রাঙা হয়ে রিকশাওয়ালা আর কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে যাবতীয় 'সোশ্যাল স্ট্রাকচার'-এর দফারফা করে দিচ্ছেন।"
     
    তাত্ত্বিকদের মোটা চশমার কাঁচ যেখানে কেবল 'অন্ধবিশ্বাস' খোঁজে, সেখানে বাঙালির গোপাল-পূজা বা মদনমোহন উৎসব প্রমাণ করে দেয় যে ঈশ্বরকে ভয় নয়, বরং আদর করে গালে রঙ মাখিয়ে দিলেই জগতের সব টেনশন ভ্যানিশ।
     
    এইদুটো জাস্ট ফাটাফাটি। কোনও কথা হবে না। 
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন