এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • সাঁঝ

    Indralekha Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৫ মার্চ ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত
  • আজ সন্ধ্যায় 'নিশিকিন্নরী' তে ঢোকার পর থেকে মোট যতক্ষণ আমি আর দ্রুহু লাউঞ্জে একসাথে সময় কাটিয়েছি, ভদ্রমহিলাকে একটানা পুরো সময়টাতেই আশেপাশে লক্ষ্য করেছি। প্রথমে ব্যাপারটা আমার ঠিক চোখে পড়েনি। কিন্তু এখন আর কোনো সন্দেহ নেই, ভদ্রমহিলা আমাদের উপর নজরদারি করছেন, বা আরও সঠিক ভাবে বলতে গেলে স্টক করছেন।

    ওনার চোখদুটো ভালো লাগেনি আমার। আচ্ছা, আমার মতো দ্রুহুও কি ওনাকে লক্ষ করেছে? ওতো তেমন কিছু আভাস দিচ্ছেনা। বুঝতে পারছিনা। কিন্তু আমি এও জানি, দ্রুহুর এখন আমি ছাড়া অন্য কোনো দিকে নজর নেই। আফটার অল, প্রায় পাঁচ মাস পর মিট করেছি আমরা। উফফ, ওর জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলাম আমি। আর আমার জন্য ও। আমাদের কেমিস্ট্রি এমনিতেই বন্ধু ও কলিগ মহলে যথেষ্ট ঈর্ষার কারণ। তার উপর আবার পাঁচ মাসের বিরহের পরে নিশিকিন্নরীর এই আলো-আঁধারির মায়া। জাস্ট কোনো কথা হবেনা।

    দ্রুহু ওর নতুন প্রজেক্টের সূত্রে বাঙ্গালোর থেকে বেশ কিছুদিনের জন্য কলকাতায় ফিরে এসেছে। আমার কাছে তো ওর এখানকার ঠিকানাও ছিলো না। অবশ্য তাতে কোনো অসুবিধা হয়নি। হিহি। আমার নাম সাঁঝবাতি রায়। ঠিক ওর গন্ধ পাই আমি।

    এতোদিনের ছাড়াছাড়ির পর আবার যে মিট করেছি আমরা এতে দ্রুহুও খুব খুশি, তবে আমি তো জানি, আমার চেয়ে বেশি নয়। হতেই পারেনা। কিন্তু এ তো আচ্ছা অস্বস্তির মধ্যে পড়া গেলো! এ আবার কোন স্পাই! 

    আমার জানার বাইরে, দ্রুহুর কোনো  নতুন বা পুরনো ফ্লিং টিং? 

    ধুস! যা তা! হতেই পারেনা। দ্রুহুর চেয়ে বয়সে অনেক বড়, প্রায় প্রৌঢ়া মহিলা। অদ্ভুত ভাবে একা। সঙ্গীহীন হয়েই বসে আছেন। অর্থাৎ একাই ক্লাবে এসেছেন।

    কোনো আত্মীয় টাত্মীয় বা অভিভাবক গোছের কেউ নয়তো! হয়তো নজর রাখছে, পরে বাড়িতে রিপোর্ট করবে। 

    কিন্তু তাহলে তো দ্রুহুর সাথে কথা বলতে বা কোনো সম্ভাষণ করতে দেখতাম। বা দ্রুহুই ওনাকে দেখে এগিয়ে যেতো। দূরে থেকে নজর রাখবে কেন!

    কিন্তু যাই হোক মহিলার চোখের দিকে তাকালেই গা টা কেমন শিরশির করে। দ্রুহুকে যতবারই বলব বলব ভাবছি, ওর কিছু না কিছু  উচ্ছ্বসিত কথায়, আবেগের তোড়ে প্রসঙ্গটা পালটে যাচ্ছে। কথাটা ভুলে যাচ্ছি বারবার। কিন্তু এবার আবার কোনাকুনি ভাবে উলটো দিকে বসা ভদ্রমহিলাকে দেখে আমার গা টা কেমন শিরশির করে উঠলো। কালো রঙের শাড়ি, আর লাল টুকটুকে একটা শল। ড্যাবডেবে চোখে স্মাজ করা কাজল যত না বীভৎস লাগছে, গলার ওই বিচ্ছিরি মালাটা আরও অস্বস্তিকর। কেমন যেন ছোটোবেলায় পড়া সেই গল্পের ডাইনিদের মতন।

    "কি ব্যাপার বল তো তোর !" দ্রুহু এতক্ষণে আমার উশখুশানি লক্ষ করে বললো কথাটা।  -"একে তো প্রায় পাঁচ মাস পরে আসার সময় হলো ম্যাডামের।  তার উপর আবার লাস্ট উইক থেকে ইনকম্যুনিকাডো। না ফোনে, না হোয়াটসঅ্যাপে টিকি পাওয়া যাচ্ছে আপনার। এখন আবার এসে থেকে ছটফট করছিস, আর এদিক ওদিক দেখছিস। বলছি, অন্য কোনো সেটিং করে কলকাতা এসেছিস নাকি রে! তাও আবার আজই, এখানেই, নিশিকিন্নরীতে? যাকে বলে এক ঢিলে দুই পাখি"-

    বলেই হাহা করে ওর স্বভাবসিদ্ধ প্রাণখোলা হাসিটা হেসে উঠল দ্রুহু। আহা, যেন কতদিন পরে শুনলাম ওর এই হাসি। অথচ ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপ কলে কথা, বা ভিডিও কলিং তো জাস্ট এক সপ্তাহ আগেই হয়েছে। না, ওসবে ঠিক মন ভরেনা। ভারচুয়াল আর রিয়ালে তফাত আছে না বস!

     দ্রুহু এবার আমাদের জন্য টেবিলে রাখা দুটো বিয়ার মাগ ভর্তি করে একটা আমার দিকে একটা ঠেলে দিতে দিতে ওর নামাঙ্কিত দুষ্টু হাসিটা হেসে আবার জিজ্ঞেস করল, "এই সাঁঝ, বলনা, তোর সিক্রেটটা কী? নতুন কেউ পছন্দ এসেছে? উউউ...রোম্যান্স ইন দ্য এয়ার!'- বলে চোখ টিপে মুখভঙ্গি করে আমার হাত ধরবে বলে ওর হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। 

     আমি কিন্তু কিছু কম যাইনা, তাই খিলখিল করে হেসে উঠে হাত সরিয়ে নিলাম। মুখে বললাম, " উঁহু, এখানে না, বাইরে, টেরেসে। চেয়ার ছেড়ে উঠে আয়।"- বলে নিজেই উঠে পড়লাম, বেরোতে লাগলাম নিশিকিন্নরী ক্লাবের মোহময়ী, কমনীয় আলো-আঁধারীর পর্দা ঠেলে, একঝাঁক রংবেরঙের প্রজাপতির মতো তরুণ-তরুণীদের ভিড়ের মাঝখান দিয়ে। 

    দ্রুহু, মানে আমার বন্ধু দ্রুহ্যু ব্যানার্জিকে দেখলাম আমার অমোঘ টানে উঠে পড়ে,লোকজনের মাঝখান দিয়ে আমার পিছন পিছন অন্ধের মতো টেরেসের দিকে ছুটে চলতে। আমরা দুজনেই বেরিয়ে এলাম। টেরেসের দরজায় সিকিওরিটির ছেলেটি দ্রুহুকে চট করে থামিয়ে ও কতটা ড্রাঙ্ক সেটা একবার চেক করে তারপরে মিষ্টি হেসে সাবধান করে, পারমিশন দিল। 

    এখানে এটাই নিয়ম। টেরেস সংলগ্ন এই ছোটো ও অল্পখ্যাত ক্লাব বা ক্লাব সংলগ্ন এই টুকটাক বাগান দিয়ে সাজানো ওপেন টেরেস বা ছাতের একটাই দুর্বলতা, তা হলো, এটা ঠিক সেফ নয়। এই ছয়তলা বিল্ডিং এর টপ ফ্লোরের এই ক্লাবের লাগোয়া ছাতের গাছপালা সমন্বিত পাঁচিল অত্যন্ত কারুকার্যময় এবং শৌখিন হলেও আসলে খুবই নীচু, এবং কেউ বেসামাল হলে অত্যন্ত বিপজ্জনক। একবার নাকি একটা দুর্ঘটনা ঘটতে ঘটতে বেঁচে গিয়েছিল। 

    আকাশে আজ গোল রূপোর থালার মতো ঝলমলে চাঁদ। অপূর্ব এক নরম আলোর চাদরে ঢেকে গেছে চরাচর। আমি ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম দ্রুহুর দিকে। দ্রুহু আমার হাত ধরতে এগিয়ে এলো। আমি তা না ধরে দুষ্টু মেয়ের মতো উঠে দাঁড়ালাম ছাতের পাঁচিলে। দ্রুহুও উঠতে গেলো আমাকে দেখে। কি মজা! আজ সাঁঝবাতি পাবে তার দ্রুহ্যুকে।

    "দাঁড়াও তুমি। উঠোনা ওখানে। নীচে নামো, নামো বলছি। চলো, চলো আমার সাথে।" - একি!  এ কে পিছন থেকে টেনে নামিয়ে নিল দ্রুহুকে! এ যে সেই ক্লাবের স্টকার মহিলা ! ও কে? ও এখানে কেন! আমি বুঝতে পারলাম এখন রাগে ধক ধক করে জ্বলে উঠেছে আমার দু চোখ। 

    একি! দ্রুহু আমাকে দেখে ওরকম ভয় পাচ্ছে কেন? ও ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমাকে কি দেখতে এখন খুব ভয়ঙ্কর লাগছে? অবশ্য ঠিক এক সপ্তাহ আগে আমি মারা গেছি। দেখতে খারাপ লাগারই কথা। তার উপর ওই শয়তান বুড়িটা আমার সারা গায়ে কি সব মন্ত্র পড়তে পড়তে একটা জল ছিটিয়ে দিলো। বোধহয় গঙ্গাজল বা অমন কিছু। 

    উফ, সারা গায়ে কি ভয়ঙ্কর জ্বালা! দ্রুহুটা কাপুরষের মতো লুকিয়ে পড়েছে ওই মহিলার পিছনে। জড়িয়ে ধরেছে বুড়ি ডাইনিটার হাত! টের পাচ্ছি আমার শরীর থেকে, গাল, মুখের এখান  খসে পড়ছে মাংসের টুকরো। স্বাভাবিক। সেই তালাবন্ধ গ্যারাজটায় থেকে তো পচে গেছিলাম আমি। চোখ বন্ধ করে একটানা মন্ত্র পড়ে চলেছে তান্ত্রিকের বেটি। ওর গলার বিশ্রী মালাটা আসলে রুদ্রাক্ষ, ঠিক খেয়াল করিনি তখন। ভয়ে, শকে কাঁদছে দ্রুহু। দ্রুহু, দ্রুহু। ভেবেছিলাম তোকে আমার সাথে বরাবরের জন্য নিয়ে যাব। তা আর হলনা। ওর চোখের সামনেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেন হাওয়ায় মিশে গেলাম আমি সাঁঝবাতি রায়।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ১৫ মার্চ ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে প্রতিক্রিয়া দিন