এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • সা - রে - গা - মা - পা- ধা - নি

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ২২৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • সা – রে – গা – মা – পা – ধা – নি। (প্রথম সুর)
     
     
    ১. সা….
     
    সাবর্ণ সকাল সকাল বিছানা ছেড়ে তৈরি হয়ে নেয়। আজ কৃষ্ণনগর যেতে হবে। অফিসের কাজে। সেলসের চাকরির এই হলো সমস্যা, আবার মজাও বটে। সারাজীবন অফিসে একজায়গায় চেয়ারে বসে ঝিমিয়ে, ঘুমিয়ে থিতু হয়ে বুড়িয়ে যাওয়া নয়, সব সময় বেশ গতিমান হয়ে থাকা। চাকরির বাজারের যা হাল তাতে করে আর ভালো কিছু সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে ভরসা করেনি সাবর্ণ। গ্র্যাজুয়েশনের পর্ব মেটার পর পড়াশোনা নিয়ে আর এগোতে চায়নি সে। এমন একটা সিদ্ধান্ত বাড়ির কেউই সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি, তবে তা নিয়ে বিবাদ বিসম্বাদের পথেও হাঁটেনি কেউ। খালি মা সেবন্তী বলেছিলেন – এই কাজটাতে খাটাখাটনি তো কম নয়। তোর্ যা আতুসে শরীর তাতে করে সবদিক সামলাতে পারবি? 
    সাবর্ণ এ কথার কোনো আলোচনায় যায়নি, খালি মনে মনে নিজেকে বলেছিল – এখন দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের সময়। অতশত বাছা বাছির সুযোগ নেই। না গড়িয়ে ফেলে রাখলে সব কিছুই আপনাআপনিই নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং….
     
    সপ্তাহের ব্যস্ত কাজের দিন। সেই তুলনায় ট্রেন যথেষ্ট ফাঁকা। উঠেই বসবার জায়গা পেয়ে যায় সাবর্ণ। অনেকটা পথ যেতে হবে। তাই বসতে পেরে বেশ স্বস্তি বোধ করে।কামরার ভেতরে বেশ নীরবতা। আগে ট্রেনের কামরায় থাকা লোকজন নিজেদের মধ্যে নানান বিষয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থাকতো। ইদানিং বোধহয় সেই সবাক থাকার সংস্কৃতিতে খানিকটা ভাটা পড়েছে। খানিকক্ষণ সিটে বসার পর‌ই সবাই মগ্ন হয়ে যায় ফোনের স্ক্রিনে। কেউ কেউ কানে হেডফোনের প্লাগ গুঁজে চোখ বন্ধ করে গান শোনে। খবরের কাগজের পাতায় ইতস্তত চোখ বোলাতে থাকে কেউ কেউ। ট্রেন ছুটতে থাকে আপন নিয়মে।জোয়ার ভাটার টানের মতো কামরায় যাত্রীদের ভিড়ের বাড়া কমা চলতেই থাকে নিয়মিত ব্যবধানে। এদিকের ট্রেনে হকাররা হলো রীতিমতো সম্পদ। কতরকমের বিচিত্র পসরার ডালি নিয়ে আসে এই চলমান বিপণিবিতানে। গরম পড়েছে, তাই কচি শসার চাহিদা তুঙ্গে। হাক দিয়ে উপস্থিতি জানান দিতে না দিতেই যাত্রীদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। দর কষাকষি চলতে থাকে। কামরা এখন সরগরম। নিজের অবস্থাকে অজান্তেই এই হকারদের সঙ্গে তুলনা করে সাবর্ণ।
    বিশ্বজোড়া বিপণির সেও যেন এক অংশীদার।
     
    গাড়ি হালিশহর স্টেশন ছাড়তেই কামরার ভিড় অনেকটাই হালকা হয়ে যায়। এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে। মা সেবন্তী মাঝে ফোন করেছিল ছেলের অবস্থান জানতে। মায়ের মন সবসময় উতলা হয়ে থাকে সন্তানের জন্য, সেকথা বেশ বুঝতে পারে। সাবর্ণ মাকে আশ্বস্ত করেছে, নিয়মমাফিক বারন‌ও করেছে চিন্তা না করার জন্য। ফোন দেখায় যেহেতু অনীহা, সাবর্ণ ব্যাগের ভেতর থেকে রোববার পত্রিকাটা বের করে। গতকাল একদম নজর বোলাবার সময় পায়নি। এই নেশাটা বাবার কাছ থেকে পাওয়া।বাড়ি থেকে একটু দূরে কোথাও যেতে হলে সাবর্ণ গুটিকয়েক ম্যাগাজিন নিজের ব্যাগের ভেতর গুছিয়ে নেয়। সময় সুযোগ মতো নেড়েচেড়ে পড়ে দেখে। পাতা উল্টিয়ে নিজের পছন্দের এক লেখকের লেখা চোখের সামনে মেলে ধরতেই মোলায়েম এক আশ্চর্য কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসে।
     
    – কিছু যদি মনে না করেন তাহলে আপনার হাতের পত্রিকাটি একবার পেতে পারি? আসলে আজ আমার সঙ্গে পড়ার মতো কিছু নেই খালি কোম্পানির লেটেস্ট সেলস্ রিপোর্টটি ছাড়া। তাইই..
    ঘাড় তুলে সামনের সিটের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে 
    যায়। মেয়েটির কথা শেষ হয় না। সাবর্ণ তাঁর হাতের পত্রিকাটি উল্টো দিকের সিটে বসা মানুষীর দিকে এগিয়ে দেয়।
     
    – ধন্যবাদ। আমার নাম সুবর্ণা, সুবর্ণা সেন। আপনি..?
    – আমি সাবর্ণ, সাবর্ণ সান্যাল।  
    দুজন অপরিচিত মানুষের নামের এমন মিল দেখে দুজনেই হেসে ওঠে। আলাপচারিতার শুরুতেই এমন ঘটনা সাবর্ণকে অবাক করে। সহজভাবেই সে জিজ্ঞেস করে।.. 
    -- আপনি কি সেলসের কাজ করেন? আজকাল তো মেয়েরাও এই কাজে এগিয়ে আসছে।
    – হ্যাঁ আমি সেলসের কাজ‌ই করি তবে তা সরাসরি বাজার ঘুরে পণ্য বিক্রির কাজ নয়। আমি সেলস্ অ্যানালিস্টের কাজ করি। বাজার ঘুরে যাচাই করতে হয় বিশেষ বিশেষ প্রোডাক্ট কতটা পছন্দ করেন সাধারণ ক্রেতারা ? এই রিপোর্ট অনুযায়ী বাজারে 
    সেই পণ্যের জোগান, আপগ্রেডেশন সব ঠিক করে কোম্পানিগুলো। আপনি নিশ্চয়ই সেলসে আছেন? না হলে এমন আগ্রহী হয়তো হতেন না।
    – না ঠিক তা নয়। আসলে আমরা যখন কমবেশি এক‌ই নৌকার সহযাত্রী তখন আলাপ করতে আপত্তি কোথায়? 
    -- Exactly so ! I always appreciate this স্পিরিট। 
    সাবর্ণ এই কথার কোনো উত্তর দেয়না, খালি একটু মুচকি হাসি হাসে।
    এরপরের বেশ কিছুটা সময় নানান বিষয় নিয়ে কথা চলতে থাকে দুজনের মধ্যে। দুজনের নামের মধ্যে অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়ায় অবাক হয়েছিল তাঁরা, এবার ভাবনার মিল দেখে তাঁরা আরও অবাক হয়। আলোচনায় একে একে উঠে আসে চলতি বাজারদর থেকে শুরু করে উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তপ্ত পরিস্থিতি, হালফিলের সিনেমা, থিয়েটার, আই পি এল সব। কামরায় থাকা যাত্রীরা দুজনের এই আলাপচারিতা বেশ উপভোগ করে। মনে মনে নানান ধরনের অনুমানের পর্ব‌ও চলতে থাকে নিশ্চয়ই। ওঁরা এসবের তোয়াক্কা করেনা। দেখতে দেখতে ট্রেন এসে দাঁড়ায় রানাঘাট স্টেশনে।
     
    – আমি এখানেই নামবো। আপনি তো কৃষ্ণনগরের প্যাসেঞ্জার 
    আপনাকে পেয়ে সময়টা ভালোই কেটে গেল। ভালো থাকবেন। আবার দেখা হবে।
     
     ভিড় কাটিয়ে ট্রেন থেকে নামে সুবর্ণা। জানালার সামনে মুখ বাড়িয়ে থাকা সুবর্ণের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে। তারপর প্লাটফর্মের জটলা ঠেলে এগিয়ে যায় সুবর্ণা। এই অল্পক্ষণ সময়ের মধ্যেই এক অন্যরকম অনুভুতি তৈরি হয়েছে সাবর্ণের মনে। অপলক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে সাবর্ণ। একসময় মনে হয় অজস্র উপলখণ্ডের ভিড় ঠেলে নিজের পথ কেটে এগিয়ে যাচ্ছে এক তটিনী - নদী, সুবর্ণরেখা নদী। নতুন এক আশ্চর্য অনুভুতি যেন ভিজিয়ে দিয়ে যায় সাবর্ণকে। ভো বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দেয়। পরবর্তী স্টেশন……
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ২২৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • শর্মিষ্ঠা লাহিড়ী। | 2405:*:*:*:*:*:*:* | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৩২739770
  • বেশ অন্যধরনের একটি কাহিনী লেখকের কাছ থেকে হয়ে বেশ উপভোগ করলাম।।
  • Somnath mukhopadhyay | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩২739772
  • শর্মিষ্ঠা আপনাকে ধন্যবাদ জানাই প্রথম মতামত জানানোর জন্য। আমার প্রতিবেশী বালকের সকালবেলা সরগম সাধা শুনেই ইচ্ছে হলো এরকম একটা কিছু লেখার। খুব পাকাপোক্ত হয়তো হয়নি, তবে এই লেখার সূত্রে, নিজের বুড়িয়ে যাওয়া শরীরে, ফেলে আসা দিনের চনমনে মেজাজটাকে হয়তো খানিক জুড়ে নেওয়া গেল। ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
  • DrSouravM | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ২০:০১739787
  • Eta exactly "Sesh hoyeo hoilo na sesh"
  • Somnath mukhopadhyay | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ২২:১৫739789
  • একেবারেই সাধারণ কথা বলতে চেয়েছি। এখানে সরগমের প্রথম সুরের একটা কোমল আভাস হয়তো আছে তবে তা কখনোই জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইনি।
    পাঠকের যদি মনে হয় আরও একটু হলেও ক্ষতি কি! তাহলে মনে করবো ব্যাপারটা উৎরে গেছে। পরবর্তী গল্পের দিকে তাকিয়ে থাকুন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে প্রতিক্রিয়া দিন