এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  ইতিহাস

  • বাংলার স্বায়ত্ব প্রবণতা ও স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্খা - সুলতানি উত্তর ও পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপটে (দ্বিতীয় পর্ব)

    Tuhinangshu Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | ইতিহাস | ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • তুঘলক যুগের অবসানের পর দিল্লি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়লে উত্তরভারতে সায়্যিদ ও লোদী বংশের অধীনে এক নতুন কিন্তু তুলনামূলকভাবে দুর্বল রাজনৈতিক বিন্যাস গড়ে ওঠে, এবং এই সময় বঙ্গের স্বায়ত্ত প্রবণতা আরও সুস্পষ্ট ও সুসংহত রূপ লাভ করে। ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর-এর দিল্লি আক্রমণের ফলে তুঘলক শাসনের অবকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে; এর পরবর্তী পর্যায়ে খিজির খান ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে সায়্যিদ বংশ প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর কর্তৃত্ব মূলত দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এই সময় বঙ্গ ইতিমধ্যেই ইলিয়াস শাহী শাসনের অধীনে একটি স্বাধীন সুলতানি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ-এর উত্তরসূরিরা—বিশেষত সিকান্দর শাহ ও পরবর্তীকালে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ—গৌড় ও পান্ডুয়া কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণ করেন। সায়্যিদ শাসকদের পক্ষে এই দূরবর্তী, নদীবাহিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ অঞ্চলে কোনও কার্যকর সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি; ফলে বঙ্গের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক কার্যত প্রতীকী স্তরে নেমে আসে এবং কোনও বাস্তব রাজনৈতিক অধীনতা সেখানে বজায় থাকে না।
    এই পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয় লোদী যুগে। ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে বাহলুল লোদী দিল্লিতে লোদী বংশ প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর প্রধান মনোযোগ ছিল পাঞ্জাব ও দোয়াব অঞ্চলে ক্ষমতা সুসংহত করা; বঙ্গের দিকে কোনও বড় সামরিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাঁর উত্তরসূরি সিকান্দার লোদী প্রশাসনিক সংস্কার ও উত্তরভারতে কেন্দ্রীভূত শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও বঙ্গের উপর বাস্তবিক কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। এই সময় বঙ্গে হাবশি অন্তর্বর্তী পর্বের পর পুনরায় ইলিয়াস শাহী বংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে এবং শেষে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এর শাসনকালে বঙ্গ একটি শক্তিশালী ও বিস্তৃত আঞ্চলিক সুলতানিতে পরিণত হয়, যার প্রভাব উত্তরবঙ্গে কামতা সীমান্ত, পূর্বে ত্রিপুরা ও আরাকান সীমান্ত এবং দক্ষিণে উপকূলীয় বন্দরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

    এই সমগ্র সায়্যিদ-লোদী পর্বে বঙ্গের স্বায়ত্ত প্রবণতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এটি আর কেবল প্রাদেশিক বিচ্ছিন্নতার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং একটি স্থায়ী ও স্বীকৃত আঞ্চলিক সুলতানি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দিল্লির শাসকরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট ও উত্তরভারতের ক্ষমতা পুনর্গঠনে ব্যস্ত থাকায় বঙ্গ কার্যত তাদের রাজনৈতিক দিগন্তের বাইরে চলে যায়। ফলে গৌড়–পান্ডুয়া কেন্দ্রিক বঙ্গীয় শাসন অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বায়ত্ততা অর্জন করে এবং নদীবাহিত ভূপ্রকৃতি, আঞ্চলিক বন্দরনির্ভর অর্থনীতি ও স্থানীয় অভিজাতদের সহযোগিতায় একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারাকে সুদৃঢ় করে তোলে। এই পর্যায়ে এসে বঙ্গের স্বায়ত্ত প্রবণতা আর বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ বা সাময়িক স্বাধীনতার প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি সুসংহত আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা দিল্লি-কেন্দ্রিক সাম্রাজ্যিক কাঠামো থেকে কার্যত পৃথক এক ঐতিহাসিক পথ নির্মাণ করে।
    সায়্যদ ও লোদী পর্বের পর বঙ্গের স্বায়ত্ত রাজনৈতিক সত্তা যে পরিণত ও সুসংহত রূপ ধারণ করে, তার পূর্ণ বিকাশ দেখা যায় হুসেন শাহী যুগ থেকে শুরু করে আফগান কররানী শাসন এবং প্রারম্ভিক মুঘল বিস্তারের সংঘর্ষময় অধ্যায়ে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। ক্ষমতায় এসে বঙ্গকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেই নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন। তাঁর শাসনকালে গৌড় রাজধানী হিসেবে বিকশিত হয় এবং প্রশাসনিক কাঠামো সুসংহত হয়। উত্তরবঙ্গে কামতা অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করে তিনি নীলাম্বরের শাসনের অবসান ঘটান, ফলে কোচ–কামতা অঞ্চলের উপর বঙ্গীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বদিকে সোনারগাঁও ও চট্টগ্রাম বন্দর বাণিজ্যের মাধ্যমে আরাকান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হয়, যা বঙ্গের অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী করে তোলে। এই সময়ে বঙ্গীয় শাসন কোনও সাম্রাজ্যের অধীন প্রদেশ নয়, বরং নিজস্ব সামরিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোসম্পন্ন একটি স্বাধীন সুলতানি শক্তি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
    হুসেন শাহের মৃত্যুর পর নাসিরউদ্দিন নাসরত শাহ শাসনভার গ্রহণ করেন এবং তাঁর সময়েই উত্তরভারতে নতুন শক্তি হিসেবে মুঘলদের উত্থান ঘটে। বাবর ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধে বিজয়লাভ করে দিল্লিতে মুঘল শাসনের সূচনা করলেও বঙ্গ সরাসরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে না। নাসরাত শাহ কূটনৈতিকভাবে বাবরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং সীমান্তে সংঘর্ষ এড়িয়ে বঙ্গের স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করেন। তাঁর সময়ে গৌড় ও পূর্ববঙ্গের প্রশাসনিক স্থিতি বজায় থাকে এবং কোনও বৃহৎ বহিরাগত আক্রমণ বঙ্গের উপর নেমে আসে না। এই সময়টি বঙ্গের স্বায়ত্ত অবস্থার এক স্থিতিশীল পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যেখানে বাহ্যিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করেও আভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।
    নাসরত শাহের পরবর্তী সময়ে বঙ্গের কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে আফগান শক্তির উত্থান ঘটে। শেরশাহ প্রথমে বিহার অঞ্চলে নিজের শক্তি সংগঠিত করেন এবং পরে ধীরে ধীরে বঙ্গের দিকে অগ্রসর হন। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি গৌড় দখল করেন এবং বঙ্গ সূর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। আফগান শাসনের উত্থানের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল নির্ধারক, এবং তাঁর বঙ্গ-অভিযানকে কেবল সামরিক সম্প্রসারণ হিসেবে নয়, বরং গঙ্গা অববাহিকার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবে বুঝতে হয়। শের শাহের প্রকৃত নাম ফারিদ খাঁ; তিনি সূর বংশীয় এক আফগান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যার পারিবারিক ঘাঁটি ছিল বিহারের সাসারাম অঞ্চল। প্রথম জীবনে তিনি বিহারের স্থানীয় আফগান অভিজাতদের অধীনে কাজ করেন এবং ধীরে ধীরে নিজস্ব সামরিক শক্তি গড়ে তোলেন। ১৫২০–৩০-এর দশকে লোহানী ও অন্যান্য আফগান গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে তিনি বিহারের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং গঙ্গা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলকে একটি শক্তিশালী সামরিক ভিত্তিতে রূপান্তরিত করেন। এই সময় তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল পূর্ব ভারতের বাণিজ্যপথ, কৃষিভিত্তিক সম্পদ এবং নদীপথ নিয়ন্ত্রণে আনা—যার জন্য বঙ্গ ছিল অপরিহার্য।
    বঙ্গ তখন হুসেন শাহী শাসনের অন্তিম পর্যায়ে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। নাসরাত শাহ-এর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সংকট ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়, এবং তাঁর উত্তরসূরি ঘিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ কার্যত দুর্বল অবস্থায় শাসন পরিচালনা করছিলেন। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে শের শাহ প্রথমে বিহার সম্পূর্ণভাবে দখল করেন এবং ধীরে ধীরে বঙ্গের পশ্চিম সীমান্তে অগ্রসর হন। ১৫৩৭–১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে গঙ্গার তীরবর্তী কৌশলগত অঞ্চলগুলি দখল করেন এবং অবশেষে গৌড় নগরের দিকে অগ্রসর হন। মাহমুদ শাহ মুঘল সম্রাট হুমায়ূন-এর সাহায্য প্রার্থনা করেন, ফলে বঙ্গ এক সময় মুঘল ও আফগান শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
    ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন গৌড়ে প্রবেশ করে সাময়িকভাবে শের শাহকে প্রতিহত করলেও তিনি সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে কৌশলগত ভুল করেন। এই সুযোগে শের শাহ দ্রুত গঙ্গা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলে নিজের শক্তি সংহত করেন এবং মুঘল বাহিনীর রসদ ও যোগাযোগপথ বিচ্ছিন্ন করেন। ফলত ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধে এবং ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে কানৌজের যুদ্ধে হুমায়ূনকে পরাজিত করে তিনি উত্তরভারতের উপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গ এই বৃহত্তর সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, কারণ গৌড় ও তার আশেপাশের অঞ্চল গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার বাণিজ্য ও রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। শের শাহের উদ্দেশ্য ছিল কেবল বঙ্গ দখল করা নয়; বরং সমগ্র উত্তরভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীভূত কাঠামোর মধ্যে আনা।
    শের শাহের শাসনকালে বঙ্গ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও তিনি এখানকার প্রশাসনে একটি বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করেন। গৌড়ের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মহামারীর কারণে প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থানান্তরের প্রবণতা দেখা যায় এবং স্থানীয় স্তরে অনেকাংশে পূর্বতন প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখা হয়। একই সঙ্গে তিনি সড়ক ও ডাকব্যবস্থা উন্নত করেন—বিশেষত উত্তরভারত থেকে বঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড—যা বাণিজ্য ও সামরিক চলাচলকে সহজ করে তোলে। তবে তাঁর কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গের নদীবহুল অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, এবং স্থানীয় ভূস্বামী শক্তি সেখানে তাদের প্রভাব বজায় রাখে।অতএব শের শাহ সূরের বঙ্গ-অভিযানকে একটি বৃহত্তর গঙ্গা-উপত্যকা-কেন্দ্রিক সাম্রাজ্য নির্মাণের অংশ হিসেবে দেখতে হয়, যেখানে বিহার ছিল তাঁর সামরিক ভিত্তি এবং বঙ্গ ছিল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য। তাঁর সাফল্য বঙ্গকে সাময়িকভাবে একটি বৃহত্তর উত্তরভারতীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করলেও এই অন্তর্ভুক্তি স্থায়ী হয়নি; বরং তাঁর মৃত্যুর পর পুনরায় আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটে, যা বঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী স্বায়ত্ত প্রবণতার ধারাবাহিকতাকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে।
    শের শাহ সূরের মৃত্যুর (১৫৪৫) পর যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা দ্রুতই বঙ্গে পুনরায় আঞ্চলিক স্বায়ত্ত প্রবণতার উত্থান ঘটায়। তাঁর উত্তরসূরি ইসলাম শাহ সূর সাম্রাজ্যকে কিছু সময়ের জন্য ধরে রাখতে সক্ষম হলেও তাঁর মৃত্যুর পর সূর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং উত্তরভারতে একাধিক আফগান গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বঙ্গে, যেখানে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় আফগান সেনানায়ক ও অভিজাতরা নিজেদের শক্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। এই সময় গৌড় ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল আবারও বহুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সূর প্রশাসনের কেন্দ্রীভূত কাঠামো ভেঙে যাওয়ায় বঙ্গে কার্যত একটি “পোস্ট-ইম্পেরিয়াল” পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে কোনও একক সর্বময় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।
    এই প্রেক্ষাপটে আবির্ভূত হন সুলেমান খাঁ কররানী, যিনি আফগান কররানী বংশ প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গে পুনরায় একটি শক্তিশালী শাসন কাঠামো গড়ে তোলেন। তিনি প্রথমে বিহার ও বঙ্গ উভয় অঞ্চলে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেন এবং পরে রাজধানী গৌড় থেকে তন্দায় স্থানান্তর করেন, যা প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। সুলেমান খাঁ মুঘল সম্রাট আকবর-এর নামমাত্র অধীনতা স্বীকার করেন—খুতবা ও মুদ্রায় তাঁর নাম ব্যবহার করা হয়—কিন্তু বাস্তবে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করেন। এই দ্বৈত কৌশল বঙ্গের স্বায়ত্ত প্রবণতার একটি পরিণত রূপ, যেখানে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে কূটনৈতিকভাবে স্বাধীনতা বজায় রাখা হয়। তাঁর শাসনকালে বঙ্গের প্রভাব ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং আঞ্চলিক সামরিক শক্তি যথেষ্ট সুসংহত হয়।
    কিন্তু তাঁর মৃত্যুর (১৫৭২) পর উত্তরাধিকার সংকট দেখা দিলে বঙ্গ আবারও অস্থির হয়ে ওঠে। তাঁর উত্তরসূরি দাউদ খাঁ কররানী মুঘলদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে অবতীর্ণ হন। এই সময় আকবর পূর্বভারতে নিজের কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সেনাপতি মুনিম খাঁ বঙ্গে অগ্রসর হয়ে তন্দা ও গৌড় দখল করেন। দাউদ খাঁ প্রথমে পশ্চাদপসরণ করে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সরে যান এবং পুনরায় সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে তুকারইয়ের যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন, যদিও সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হননি; অবশেষে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজমহল অঞ্চলে চূড়ান্ত সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। এর মাধ্যমে বঙ্গ আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এটি সুবা বাংলা হিসেবে প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে।
    তবে এই অন্তর্ভুক্তি ছিল কেবল নামমাত্র প্রশাসনিক সাফল্য; বাস্তবে বঙ্গের ভৌগোলিক ও সামাজিক কাঠামো মুঘল কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিশেষত পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চল—ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও তাদের শাখানদীর জটিল জলপথে গঠিত—মুঘল শাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। এখানে স্থানীয় জমিদার ও ভূঁইয়া প্রধানরা নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখে এবং ধীরে ধীরে একটি কনফেডারেসি গড়ে তোলে, যা ইতিহাসে “বারো ভূঁইয়া” নামে পরিচিত। এই শক্তির অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন ঈসা খাঁ, যিনি সোনারগাঁও, বিক্রমপুর ও ভাটি অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি নদীনির্ভর যুদ্ধকৌশল—দ্রুতগতির নৌবাহিনী, স্থানীয় জলপথের জ্ঞান—ব্যবহার করে মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
    আকবরের শাসনকালে একাধিক মুঘল সুবাদার—বিশেষত মানসিংহ—পূর্ববঙ্গে অভিযান পরিচালনা করলেও ভাটি অঞ্চলে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দীর্ঘ সময় লাগে। ঈসা খাঁ কখনও সরাসরি সংঘর্ষে, কখনও কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান বজায় রাখেন। ফলে ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বঙ্গের একটি বড় অংশ কার্যত আধা-স্বায়ত্ত অবস্থায় রয়ে যায়, যেখানে মুঘল প্রশাসন কেবল আংশিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
    আকবরের সময়ে বঙ্গ আনুষ্ঠানিকভাবে সুবা বাংলায় রূপান্তরিত হলেও প্রকৃত অর্থে মুঘল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত হয় পরবর্তী পর্যায়ে, বিশেষত জাহাঙ্গীর-এর শাসনকালে। এই সময়ে মুঘলরা বুঝতে পারে যে গৌড় বা তন্দার মতো পুরনো রাজধানী থেকে পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ফলে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতী প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং এর নামকরণ হয় জাহাঙ্গীরনগর। এই স্থানান্তর কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং কৌশলগত—ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা অববাহিকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করে মুঘলরা ভাটি অঞ্চলের উপর প্রত্যক্ষ নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ইসলাম খাঁ ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ঈসা খাঁ-পরবর্তী ভূঁইয়া শক্তিকে দমন করেন—বিশেষত মুসা খাঁ ও অন্যান্য স্থানীয় প্রধানদের পরাজিত করে পূর্ববঙ্গকে মুঘল প্রশাসনের অধীনে আনেন। এর ফলে প্রথমবারের মতো বঙ্গের বিস্তীর্ণ নদীবহুল অঞ্চল কার্যত কেন্দ্রীয় প্রশাসনের আওতায় আসে।
    তবে এই “নিয়ন্ত্রণ” ছিল আপাত ও স্তরভিত্তিক। মুঘল প্রশাসন জমিদারি কাঠামোর মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ শুরু করলেও স্থানীয় ভূস্বামী ও প্রভাবশালী পরিবারগুলির উপর নির্ভরশীলতা বজায় থাকে। পূর্ববঙ্গের বহু অঞ্চলে—বিশেষত সিলেট, ভাটি ও চট্টগ্রাম সংলগ্ন এলাকায়—স্থানীয় প্রধানরা নামমাত্র মুঘল কর্তৃত্ব স্বীকার করলেও বাস্তবে তারা নিজেদের আঞ্চলিক ক্ষমতা ধরে রাখে। জাহাঙ্গীরের সময়ে পর্তুগিজ ও আরাকানীয় জলদস্যুদের দমন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে অভিযান—এই সমস্ত ক্ষেত্রেও স্থানীয় সহযোগিতা ছাড়া মুঘলদের পক্ষে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। ফলে সুবা বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো এক ধরনের সমঝোতামূলক শাসনে পরিণত হয়, যেখানে কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।
    পরবর্তী পর্যায়ে শাহজাহান এর শাসনকালে বঙ্গ অর্থনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হুগলি, সোনারগাঁও ও ঢাকার বাণিজ্যকেন্দ্রগুলি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়—বিশেষত ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠীর আগমনের ফলে। এই সময়ে সুবাদাররা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে তুললেও বাস্তবে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় জমিদার ও মহাজন গোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে একদিকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় হয়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ স্থানীয় স্তরে সঞ্চিত হতে থাকে—যা স্বায়ত্ত প্রবণতার একটি অন্তর্নিহিত ভিত্তি তৈরি করে।
    ঔরঙ্গজেব-এর শাসনকালে এই দ্বৈত প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে তিনি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার জন্য সুবা বাংলায় শক্তিশালী সুবাদার নিয়োগ করেন—যাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শায়েস্তা খাঁ। তাঁর শাসনকালে (১৬৬৪–১৬৮৮) চট্টগ্রাম আরাকানীয়দের কাছ থেকে দখল করা হয় (১৬৬৬), যা বঙ্গের উপকূলীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঢাকাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংহত হয় এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই শক্তিশালী প্রশাসনিক উপস্থিতির মধ্যেও স্থানীয় স্বায়ত্ত প্রবণতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। নদীবহুল পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গের কিছু অঞ্চল এবং অভ্যন্তরীণ জমিদারি কাঠামো মুঘল প্রশাসনের বাইরে এক ধরনের আংশিক স্বাধীনতা বজায় রাখে।
    ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘ শাসনকালের শেষভাগে মুঘল সাম্রাজ্যের উপর চাপ বৃদ্ধি পায়—দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধ, রাজস্ব সংকট এবং প্রশাসনিক অতিরিক্ত বিস্তৃতি কেন্দ্রকে দুর্বল করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে সুবা বাংলায় সুবাদাররা ক্রমশ অধিক স্বায়ত্তশাসিত হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর উপর তাদের নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গ মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল, বাস্তবে এটি একটি উচ্চমাত্রায় স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশে পরিণত হয়, যেখানে কেন্দ্রের কর্তৃত্ব বজায় থাকলেও স্থানীয় শক্তির ভূমিকা নির্ণায়ক ছিল।
    ঔরঙ্গজেবের শাসনের শেষ দুই দশক (প্রায় ১৬৮০-এর দশক থেকে ১৭০৭) সুবা বাংলার ক্ষেত্রে এক জটিল ও বহুমাত্রিক রূপান্তরের সময়, যেখানে উপরিভাগে শক্তিশালী মুঘল প্রশাসন বজায় থাকলেও অন্তর্গত স্তরে ক্রমশ স্বায়ত্ত প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ঔরঙ্গজেব-এর সময়ে বাংলা ছিল সাম্রাজ্যের অন্যতম ধনী সুবা, এবং এই কারণে এখানকার সুবাদার পদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়। শায়েস্তা খাঁ এর দীর্ঘ শাসন (বিশেষত ১৬৬৪–১৬৮৮) বঙ্গে প্রশাসনিক দৃঢ়তার এক উচ্চস্তর নির্মাণ করে—চট্টগ্রাম দখল (১৬৬৬), আরাকানীয় ও পর্তুগিজ শক্তির দমন, ঢাকাকে সামরিক-প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে সুসংহত করা—এই সব পদক্ষেপ সুবা বাংলাকে কার্যত একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ইউনিটে পরিণত করে। কিন্তু এই শক্তির ভিত ছিল স্থানীয় জমিদার, বণিক ও আর্থিক গোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীল, যা পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার উপাদান সৃষ্টি করে।
    শায়েস্তা খাঁর পরবর্তী পর্যায়ে সুবাদারদের দ্রুত পরিবর্তন বাংলার প্রশাসনিক অস্থিরতার লক্ষণ হয়ে ওঠে। মহম্মদ আজম শাহ স্বল্প সময়ের জন্য সুবাদার হিসেবে নিযুক্ত হন, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি মূলত সাম্রাজ্যিক রাজনীতির অংশ ছিল; তিনি বাংলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেননি। এরপর ইব্রাহিম খাঁ (দ্বিতীয়) সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (প্রায় ১৬৮৯–১৬৯৭), যার সময়ে প্রশাসনিক শিথিলতা ও স্থানীয় অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এই সময়ই পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জমিদার বিদ্রোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেখা যায়—বিশেষত  শোভা সিংহ ও আফগান নেতা রহিম খাঁর বিদ্রোহ (১৬৯৬–১৬৯৭), যা বর্ধমান, নদীয়া ও মেদিনীপুর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। এই বিদ্রোহ দমন করতে মুঘল প্রশাসনকে ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে হয়, যা স্পষ্ট করে যে সুবা বাংলার গ্রামীণ-আঞ্চলিক স্তরে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
    এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে আজিম-উশ-শান সুবাদার হিসেবে বাংলায় আসেন। তিনি সম্রাটের নিকট আত্মীয় হওয়ায় (ঔরঙ্গজেবের নাতি) প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন এবং তিনি বাণিজ্য ও রাজস্ব থেকে অধিক আয় সংগ্রহের দিকে মনোনিবেশ করেন। তাঁর সময়েই ইউরোপীয় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলির—বিশেষত ইংরেজদের কলকাতা বসতি—বিস্তার ঘটে (১৬৯৮ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ), যা বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামোতে নতুন পরিবর্তন আনে। কিন্তু আজিম-উশ-শানের শাসনেও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ সম্পূর্ণ হয়নি; বরং তিনি রাজস্বসংগ্রহে ব্যক্তিগত স্বার্থে জোর দেন এবং এর ফলে দেওয়ানি প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
    এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন মুর্শিদকুলি খাঁ, যিনি প্রথমে বাংলার দেওয়ান হিসেবে নিযুক্ত হন (প্রায় ১৭০১)। তিনি মূলত দক্ষিণ ভারতের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে দাসত্বের মাধ্যমে মুঘল প্রশাসনে প্রবেশ করেন এবং পরে দক্ষ রাজস্বসংগ্রাহক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বাংলায় এসে তিনি রাজস্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করেন—জমিদারদের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, নগদ কর আদায়ের উপর জোর এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা পুনর্বিন্যাস করেন। তাঁর এই নীতি সুবা বাংলার আর্থিক ভিত্তিকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে, কিন্তু একই সঙ্গে স্থানীয় জমিদারদের সঙ্গে সংঘর্ষও সৃষ্টি করে।
    আজিম-উশ-শান ও মুর্শিদকুলি খাঁর মধ্যে এই প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব সুবা বাংলার ক্ষমতার কাঠামোকে দ্বিখণ্ডিত করে—একদিকে সুবাদার (সামরিক-প্রশাসনিক প্রধান), অন্যদিকে দেওয়ান (রাজস্বপ্রধান)। এই দ্বৈত কাঠামোর মধ্যে মুর্শিদকুলি খাঁ ধীরে ধীরে প্রকৃত ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। তিনি রাজস্বসংগ্রহের সুবিধার্থে প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকার পরিবর্তে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার আরও কেন্দ্রীয় স্থানে স্থানান্তর করেন, যা পরবর্তীকালে মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত হয়। এই স্থানান্তর কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং এটি বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রকে পুনর্নির্ধারণ করে।
    ১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দিল্লিতে উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়ে। আজিম-উশ-শান দিল্লির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং বাংলার প্রশাসন থেকে দূরে সরে যান। এই সুযোগে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলায় কার্যত স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সম্রাটের অধীনতা স্বীকার করতেন, বাস্তবে রাজস্ব, প্রশাসন ও সামরিক ক্ষমতা তাঁর হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়। অবশেষে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলার নবাব হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
    এই সমগ্র পর্বটি দেখায় যে ঔরঙ্গজেবের শেষভাগে বাংলায় যে প্রশাসনিক অস্থিরতা, জমিদার বিদ্রোহ, সুবাদার-দেওয়ান দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে একটি স্বায়ত্ত রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়। মুর্শিদকুলি খাঁর উত্থান সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিণতি, যেখানে সুবা বাংলা নামমাত্র মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ থাকলেও বাস্তবে একটি স্বাধীন নবাবি শাসনে রূপান্তরিত হয়—যা বঙ্গের ঐতিহাসিক স্বায়ত্ত প্রবণতার ধারাবাহিকতাকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে।
    অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গের রাজনৈতিক কাঠামো এক মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়—কিন্তু এই পরিবর্তন কোনও সরলরৈখিক বিচ্ছেদ নয়। নবাবি শাসনের পতন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা সত্ত্বেও যে স্বায়ত্ত প্রবণতার দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারা আমরা পূর্ববর্তী যুগগুলিতে প্রত্যক্ষ করেছি, তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় না; বরং এটি ক্রমশ এক অন্তর্লীন, গভীর সামাজিক-রাজনৈতিক সঞ্চয়ে রূপান্তরিত হয়। এই সঞ্চয় সরাসরি কোনও একক বৌদ্ধিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উৎস নয়—বরং এটি এক প্রাচীন অভ্যাস, যা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের এক বিকল্প রীতিকে বহন করে।
    ঔপনিবেশিক শাসনের প্রারম্ভিক পর্যায়েই এই প্রবণতার বিচ্ছিন্ন কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। কোম্পানির রাজস্বনীতি, জমিদারি পুনর্গঠন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উপর চাপ বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন স্থানে কৃষক ও আঞ্চলিক শক্তির প্রতিরোধ গড়ে ওঠে—যা কখনও ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের মতো ধর্মীয়-সামাজিক আকার ধারণ করে, কখনও চুয়াড় বিদ্রোহ বা সাঁওতাল আন্দোলনের মতো অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিবাদে রূপ নেয়। এই আন্দোলনগুলি পরস্পর বিচ্ছিন্ন হলেও তাদের অন্তর্গত সুর এক—কেন্দ্রীভূত ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তির বিরুদ্ধে স্থানীয় সমাজের প্রতিক্রিয়া। এখানে স্বায়ত্ত প্রবণতা আর মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ভাষায় প্রকাশ পায় না; বরং তা প্রকাশিত হয় জীবিকার প্রশ্নে, ভূমির অধিকারে, সামাজিক মর্যাদার লড়াইয়ে।
    এই প্রবাহ উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। একদিকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের মধ্যে থেকেই আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত ও অসংগঠিত প্রতিরোধ—উভয় ক্ষেত্রেই এই অন্তর্লীন প্রবণতার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। স্বাধীনতা সংগ্রামের বৃহত্তর পরিসরে যখন সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ একটি প্রধান কাঠামো হিসেবে আবির্ভূত হয়, তখনও বঙ্গের ভেতরে স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রশ্নগুলি সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায় না; বরং কখনও তা বিপ্লবী কার্যকলাপে, কখনও কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনে, কখনও সাংগঠনিক রাজনীতির ভেতরে বিকল্প কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রকাশিত হয়। এখানে স্বায়ত্ততার ধারণা সরাসরি “বিচ্ছিন্নতা” নয়; বরং এটি ক্ষমতার সঙ্গে এক ধরনের সমান্তরাল সম্পর্ক নির্মাণের চেষ্টা—যেখানে কেন্দ্রকে অস্বীকার না করেও তার একচ্ছত্র আধিপত্যকে প্রশ্ন করা হয়।
    স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করার পরও এই ঐতিহাসিক প্রবণতা নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বারবার কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে নিজস্ব অবস্থান নির্মাণের চেষ্টা করেছে—কখনও অর্থনৈতিক বণ্টনের প্রশ্নে, কখনও ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নে, কখনও রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতে। একই সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে চরমপন্থী আন্দোলন—বিশেষত গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে—এই প্রবণতার আরেকটি রূপকে সামনে নিয়ে আসে, যেখানে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত কাঠামোর বিরুদ্ধে বিকল্প সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়।
    এই দীর্ঘ ইতিহাসকে যদি একটি ধারাবাহিক স্রোত হিসেবে দেখা যায়, তবে স্পষ্ট হয় যে বঙ্গের স্বায়ত্ত প্রবণতা কখনও একরৈখিক নয়, কখনও একমাত্রিক নয়। এটি কখনও সামরিক প্রতিরোধ, কখনও প্রশাসনিক স্বশাসন, কখনও অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, কখনও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, আবার কখনও নিছক নীরব অস্বীকৃতির আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন এই প্রবণতাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও তা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি; স্বাধীনতার পরও নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে এটি আবার নতুন ভাষা খুঁজে নিয়েছে।
    অতএব বলা যায়, বঙ্গের এই স্বায়ত্ত প্রবণতা ইতিহাসের দৃশ্যমান ঘটনাবলির বাইরেও এক গভীর অন্তর্লীন স্তরে কাজ করে—এক ধরনের “হিডেন টেক্সচার” হিসেবে, যা সমাজের অভ্যাস, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক চেতনার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। এটি কোনও নির্দিষ্ট স্লোগান নয়, কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শ নয়; বরং এটি এক দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতার ফল, যা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের এক বিকল্প কল্পনাকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। আর সেই কারণেই প্রশ্নটি থেকে যায়—এই প্রবণতা কি কেবল অতীতের স্মৃতি? নাকি আজও, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার প্রবল উপস্থিতির মধ্যেও, তা নতুন রূপে, নতুন ভাষায়, আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতরে নীরবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে?

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    এলি - Emanul Haque
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন