পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের রাজনৈতিক আঙিনায় বেশ কিছু পুরোনো লব্জ ঘোরাফেরা করছে, যেমন কেন্দ্র রাজ্য বঞ্চনা, ভাতা বনাম চাকরি, উন্নয়ন বনাম ধার, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ইত্যাদি প্রভৃতি। এই সব গুলিই তাদের নিজস্ব পরিসরে যথেষ্ট গুরুত্ত্ব রাখছে বা রাখবে নিশ্চিত। কিন্তু বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বাঙলার সামাজিক মানচিত্রের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও শ্রেণিগত ফাটল দানা বাঁধছে, যা হয়তো এই নির্বাচনের জনমতের অভিমুখ নির্ধারণে অনুঘটকের কাজ করতে পারে, সর্বোপরি এই প্রবণতা আমাদের বর্তমান সময়ের নিরিখে খুব জরুরি একটি পর্যবেক্ষণ। কাজেই সেই বিষয়টি দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক। মূলত গ্রাম শহর যে বিভাজনটি বঙ্গ রাজনীতিতে বরাবরই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে এবং বলতে পারা যায় যে একটি নিয়ামক হয়ে এসেছে, সেখানে একটি রূপান্তরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে পরিষ্কারভাবে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক বিশাল 'অ্যাসপিরেশনাল ক্লাস' বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমাজ, যারা এখন আর কেবল মহানগর-কেন্দ্রিক বা গ্রাম কেন্দ্রিক নয়, বরং বিস্তৃত হয়েছে জেলা-সদর বা মহকুমা স্তরের বর্ধিষ্ণু গ্রামগুলোতেও ... ...
তুঘলক যুগের অবসানের পর দিল্লি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়লে উত্তরভারতে সায়্যিদ ও লোদী বংশের অধীনে এক নতুন কিন্তু তুলনামূলকভাবে দুর্বল রাজনৈতিক বিন্যাস গড়ে ওঠে, এবং এই সময় বঙ্গের স্বায়ত্ত প্রবণতা আরও সুস্পষ্ট ও সুসংহত রূপ লাভ করে। ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর-এর দিল্লি আক্রমণের ফলে তুঘলক শাসনের অবকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে; এর পরবর্তী পর্যায়ে খিজির খান ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে সায়্যিদ বংশ প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর কর্তৃত্ব মূলত দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এই সময় বঙ্গ ইতিমধ্যেই ইলিয়াস শাহী শাসনের অধীনে একটি স্বাধীন সুলতানি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ-এর উত্তরসূরিরা—বিশেষত সিকান্দর শাহ ও পরবর্তীকালে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ—গৌড় ও পান্ডুয়া কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণ করেন। ... ...
ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনায় বঙ্গ অঞ্চল সেনবংশীয় কর্তৃত্বের অধীন থাকলেও তা কোনও সমন্বিত কেন্দ্রীভূত শাসন-যন্ত্র ছিল না। লক্ষ্মণসেনের সময় (শাসনকাল আনু. ১১৭৮–১২০৬) প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মূলত পশ্চিম ও মধ্য বঙ্গের নগর-নিবিড় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল; পূর্ববঙ্গ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় ভূস্বামী, সামন্ত ও আঞ্চলিক প্রধানদের শক্তি প্রবল ছিল। অর্থাৎ, বাহ্যিকভাবে একটি রাজবংশীয় ধারাবাহিকতা থাকলেও অন্তর্গত কাঠামো ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট—বরেন্দ্র, রাঢ়, বঙ্গ, সমতট প্রভৃতি আঞ্চলিক এককগুলির ঐতিহাসিক স্মৃতি তখনও সক্রিয়। ... ...
১৯৫০-এর দশকে ফ্রান্স আলজেরিয়ায় তাদের ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখতে মরিয়া ছিল। অন্যদিকে, মিশরের গামাল আবদেল নাসের তাঁর ‘প্যান-অ্যারাবিজম’ মতবাদের মাধ্যমে আলজেরীয় বিপ্লবীদের (FLN) অস্ত্র ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন। ফ্রান্সের কাছে নাসের ছিলেন এক ‘সাধারণ শত্রু’, যিনি উত্তর আফ্রিকায় ফরাসি সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছিলেন। ফ্রান্সের নীতিনির্ধারকরা তখন মনে করেছিলেন যে, নাসেরের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে একটি শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করা জরুরি। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের প্রাক্কালে সম্পাদিত গোপন ‘সেভয়ে প্রোটোকল’ (Protocol of Sèvres) ছিল এই পারস্পরিক স্বার্থের চূড়ান্ত প্রতিফলন। ... ...
কার্বি আংলং এবং বোড়োল্যান্ড—উভয় ক্ষেত্রেই দাবি ছিল স্বায়ত্তশাসন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের। কিন্তু এই দাবিগুলি কখনোই বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বৃহত্তর উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নাগা, মিজো, কুকি প্রভৃতি জাতিসত্তার দীর্ঘ আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছায়া যেমন এই দাবিগুলিকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি অসমের অভ্যন্তরীণ ভাষা ও ভূমি-রাজনীতিও এগুলির রূপ নির্ধারণ করেছে। ... ...
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফেডারেল কোর্টে জমা থাকা নথির কিছু অংশ প্রকাশের পরপরই সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন স্টুডিও, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একযোগে যে আলোড়ন দেখা গেছে, তা শুধু অপরাধের ভয়াবহতার জন্য নয়; বরং সংবাদ-ফ্রেমিংয়ের কৌশলগত নির্বাচনের কারণেও আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে। শিরোনামগুলি প্রায় সর্বত্র মূলতঃ কিছু বাঁধা লব্জ ভিত্তিক —“Epstein Files”, “Pedophilia Network”, “Elite Abuse Ring”—যেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে একক ব্যক্তিত্ব হিসেবে এপস্টাইন-কে স্থাপন করা হচ্ছে।এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকীকরণ এমনভাবে নির্মিত যে, বৃহত্তর ক্ষমতাবলয়, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, আন্তর্জাতিক চলাচলের অবকাঠামো, এবং রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক সম্পর্কের জটিল নেটওয়ার্কটি আড়ালে পড়ে যায়। ... ...
বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এস আই আর প্রক্রিয়া ঘিরে সাম্প্রতিক যে বিতর্ক, তা আপাতদৃষ্টিতে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নাগরিকত্বের নথি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে। দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায় এই বিতর্ক প্রতিদিন নতুন ভাষা পাচ্ছে—কখনও আশঙ্কা, কখনও আশ্বাস, কখনও আইনি যুক্তি, কখনও রাজনৈতিক পাল্টা অভিযোগ। কিন্তু এই কোলাহলের মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায় অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থাকে আমরা কি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছি, নাকি তাকে একটি গভীর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মতো বোঝার চেষ্টা করছি? ... ...
অপরাজিত মুক্তিপ্রাপ্তির সময় চলে নি। পরবর্তীতে ভেনিসে গোল্ডেন লিও জেতার পর আবার একবার মুক্তি পায় যতদূর শোনা যায়, তাও চলে নি। ... ...