এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  রাজনীতি

  • ভোটের মরসুমে বাংলার নতুন 'আমরা-ওরা' ও সাম্প্রতিক নির্বাচনী সমীকরণ 

    Tuhinangshu Mukherjee লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | রাজনীতি | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ৫৫ বার পঠিত
  • পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের রাজনৈতিক আঙিনায় বেশ কিছু পুরোনো লব্জ ঘোরাফেরা করছে , যেমন কেন্দ্র রাজ্য বঞ্চনা, ভাতা বনাম চাকরি, উন্নয়ন বনাম ধার, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ইত্যাদি প্রভৃতি। এই সব গুলিই তাদের নিজস্ব পরিসরে যথেষ্ট গুরুত্ত্ব রাখছে বা রাখবে নিশ্চিত। কিন্তু বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বাঙলার সামাজিক মানচিত্রের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও শ্রেণিগত ফাটল দানা বাঁধছে, যা হয়তো এই নির্বাচনের জনমতের অভিমুখ নির্ধারণে অনুঘটকের কাজ করতে পারে, সর্বোপরি এই প্রবণতা আমাদের বর্তমান সময়ের নিরিখে খুব জরুরি একটি পর্যবেক্ষণ। কাজেই সেই বিষয়টি দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক। মূলত গ্রাম শহর যে বিভাজনটি বঙ্গ রাজনীতিতে বরাবরই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে এবং বলতে পারা যায় যে একটি নিয়ামক হয়ে এসেছে, সেখানে একটি রূপান্তরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে পরিষ্কারভাবে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক বিশাল 'অ্যাসপিরেশনাল ক্লাস' বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমাজ, যারা এখন আর কেবল মহানগর-কেন্দ্রিক বা গ্রাম কেন্দ্রিক নয়, বরং বিস্তৃত হয়েছে জেলা-সদর বা মহকুমা স্তরের বর্ধিষ্ণু গ্রামগুলোতেও। এই 'সদর-গ্রামের' এবং মফস্বলীয় শহরাঞ্চলের এক বড় অংশ এখন চিরাচরিত কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বা পারিবারিক জমি ভিত্তিক যৌথ জীবন যাপন থেকে অনেকদিন ই সরে এসেছে, আর একটি অংশ শহরের কারখানা নির্ভর যে নিশ্চিন্ত জীবনযাপন ছিল তার থেকে বেশ কিছুকাল বিচ্যুত , অন্য বড় অংশগুলো বর্তমানে নানান কারণে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এদের মধ্যে রয়েছেন যেমন স্বল্প বেতনের বেসরকারি চাকুরিজীবী বা 'স্যালারিড ক্লাস', তেমনই রয়েছেন এক বিশাল অংশ যারা গিগ-ইকোনমি বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের অস্থায়ী পেশায় যুক্ত। এদের পাশাপাশি স্থানীয় স্তরে ছোটখাটো ব্যবসা বা উদ্যোগ চালানো একদল মানুষও রয়েছেন, যারা নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও একধাপ উপরে নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া, রয়েছেন কিছু সংস্কৃতি, মিডিয়া বা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত পেশাদার যারা তাদের পেশায় উঁচু জায়গায় পৌঁছতে চান। এরা প্রত্যেকেই সংঘটিত বা অসংঘটিত যে ক্ষেত্রেই কাজ করুন না কেন, একটি নির্দিষ্ট জীবনযাপনের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং তুলনামূলকভাবে অনেক এগিয়ে থাকা একটি গোষ্ঠীর থেকে নিজেদের দুরত্বকে অনুভব করে চলেছেন। পাশাপাশি আছেন কিছু প্রথাগতভাবে শিক্ষিত এবং চাকুরী প্রার্থী যারা এই মুহূর্তে নিজের পছন্দমতো কোন কাজই পাচ্ছেন না এই শহরে যাতে তারা অন্যান্য বড় শহরের কর্মরত দের মতন সমমূল্য পান। এই নতুন মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজের কাছে রাজনীতি বা নির্বাচন এসব এখন আর কেবল কোন পছন্দ কিংবা বাছাই নয়, বরং এক উন্নততর জীবনযাত্রা বা 'হাই লাইফ'-এ পৌঁছানোর সিঁড়ি হিসাবে আবিভূর্ত হতে চাইছে। কাঙ্ক্ষিত মানের কর্মসংস্থান বা স্থায়িত্বের অভাব যখন তাদের এই 'কর্পোরেট' ঘরানার জীবনযাত্রার স্বপ্নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখনই সেই মানসিক শূন্যস্থান দখল করছে এক বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক পরিচয় সত্তা যা হিন্দুত্বের মধ্যে গরিমা খুঁজে পাচ্ছে। এই নতুন মধ্যবিত্ত বা অসন্তুষ্ট সমাজের অন্তরে এক গভীর প্রত্যয় দানা বেঁধেছে যে, গুজরাট বা নয়ডার ধাঁচে এক ‘ক্যাপিটাল সেন্ট্রিক ডেভেলপমেন্ট’ বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রিত আধুনিক উন্নয়নের জোয়ার যদি রাজ্যে আসে, তবেই তাদের যাবতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাধাগুলো অপসারিত হবে। তারা মনে করে, এই ধরণের পরিকাঠামোগত রূপান্তর ঘটলে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত যে প্রতিবন্ধকতাগুলো তাদের ‘হাই-লাইফ’ বা সামাজিক উচ্চতায় প্রবেশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিমেষেই ঘুচে যাবে এবং তারা সেই নতুন নাগরিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেদের স্থান করে নিতে পারবে। এরই সাথে সাথে শহরের যে অংশটির প্রতি তাদের মনোযোগ, তাদের মুখোমুখিও হতে পারবে।

    এই জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ যেমন বর্তমান শাসনকাঠামোর ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা নব্য-সুবিধাবাদী শ্রেণির দৃশ্যমান প্রাচুর্য দেখে ক্ষুব্ধ, তেমনই তারা নিজেরাও সেই সচ্ছলতার ভাগীদার হতে উন্মুখ। শহরের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত এবং জেলা-সদরের এই নব্য-নাগরিকদের মধ্যে এক অদ্ভুত সমান্তরাল রসায়ন তৈরি হয়েছে। তারা আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, উন্নত পরিকাঠামো এবং অর্থনৈতিক মুক্তির বাসনায় এক বিকল্প রাজনৈতিক বয়ান বা ‘বাইনারি’ নির্মাণে সচেষ্ট। এই শ্রেণির অনেকের কাছেই হিন্দুত্বের ‘ক্যাপসুল’ বা ধর্মীয় মেরুকরণ কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং এক ধরণের আধুনিক ও শক্তিশালী পরিচয়ের মাধ্যমে নিজেদের ব্রাত্য থাকার গ্লানি মোচনের হাতিয়ার। ফলে, একদিকে কর্মহীনতা বা পেশাগত অনিশ্চয়তার দহন, আর অন্যদিকে আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার আকাঙ্ক্ষা—এই দুইয়ের টানাপড়েনেই তৈরি হয়েছে এক গভীর ‘অ্যানটাগনিজম’ বা বৈরিতা। শাসকদলের জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের তুলনায় এই শ্রেণির কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিশা এবং সামাজিক প্রতিপত্তি। এই আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে ও তা ক্রমশই বাড়ছে, যা এবারের নির্বাচনে এক নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে, যা বাংলার চিরাচরিত ভোটের সমীকরণকে বেশ কিছুটা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

    অন্যদিকে, বাংলার এই বিবর্তিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমান্তরাল প্রেক্ষাপটে অবস্থান করছে এক সুবিশাল প্রান্তিক জনপদ এবং শহরতলীর কলোনি এলাকাগুলো, যাদের চিন্তা ভাবনা আর যাপনের রসায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই শ্রেণির মানুষের কাছে রাজনীতি কোনো বিমূর্ত মতাদর্শ নয়, বরং তা প্রাত্যহিক অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য ‘সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি’। এখানে স্থানীয় স্তরে এক নতুন ধরণের ক্ষমতাকাঠামো গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রান্তিক নিম্নবিত্তের এক বড় অংশ শাসনব্যবস্থার ছত্রছায়ায় একধরণের পরিচিতি ও প্রভাব অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এই নবলব্ধ ক্ষমতা অনেক সময় হয়তো তথাকথিত নাগরিক রুচি বা সাংস্কৃতিক নিরিখে ‘বিপথগামী’ বা অসংলগ্ন মনে হতে পারে, কিন্তু ব্রাত্য এই শ্রেণির কাছে তা এক পরম আশ্রয় এবং আত্মমর্যাদার হাতিয়ার। এই নির্দিষ্ট জনবিন্যাসের মধ্যে শাসকদলের প্রতি যে আনুগত্য পরিলক্ষিত হয়, তার মূলে রয়েছে এক গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন সরকারি নির্ভরতা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের যে সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়েছে, তা এই জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থার এক প্রধান স্তম্ভ। মজার বিষয় হলো, এই শ্রেণির মধ্যে হিন্দুত্বের যে সুপ্ত উন্মাদনা বা ‘জিল’ তৈরির চেষ্টা বিরোধী পক্ষ করছে, তাকে কৌশলে মোকাবিলা করছে তৃণমূল কংগ্রেসের এক সুচিন্তিত রণকৌশল। শাসকদল সরাসরি হিন্দুত্বকে আক্রমণ না করে বরং তাকে একধরণের ‘সফ্ট’ বা নমনীয় মোড়কে আপন করে নিয়েছে। এই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যে হিন্দুত্বের আকাঙ্খা নেই তা একেবারেই নয় বরং তারা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ উৎসাহী এবং দেশাত্মবোধের যে আন্তরিক আবেদন বিজেপির রাজনৈতিক মূলধন তার দ্বারা যথেষ্টই উদ্দীপিত, কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় ক্লাবের পুজোয় বিপুল অনুদান, পুরোহিত ভাতা প্রদান, এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে দলীয় নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আবেগকেও একধরণের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে, ধর্মীয় পরিচিতির যে উগ্র বহিঃপ্রকাশ ঘটার সম্ভাবনা ছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হচ্ছে এই সামাজিক ও ধর্মীয় সংশ্লেষের মাধ্যমে।

    শহরতলীর কলোনি এলাকা বা গভীর গ্রামাঞ্চলের এই ভোটারদের একাংশ যদিও একটি অন্য রাজনৈতিক বিকল্পের হাতছানি পাচ্ছে, তবুও তারা এই বর্তমান ‘কমফোর্ট জোন’ বা স্থিতাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে এক ধরণের জড়তা বা অনিচ্ছা প্রদর্শন করছে। তাদের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত এই রাজনৈতিক ও সামাজিক মৈত্রীর বলয়টি ভাঙার ঝুঁকি অনেক বেশি। এই শ্রেণির মানুষের কাছে স্থানীয় রাজনৈতিক সংযোগ কেবল ক্ষমতার উৎস নয়, বরং আপদে-বিপদে আইনি বা প্রশাসনিক এমনকি দৈনন্দিন সুরক্ষা পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। ফলে, স্থানীয় স্তরে শক্তির আস্ফালন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্তি—এই দুইয়ের এক অদ্ভুত মিশেল তৈরি হয়েছে। এই নির্ভরশীলতার রাজনীতি একদিকে যেমন জনমানসে এক ধরণের নিশ্চিন্ততা দেয়, অন্যদিকে তেমনই তৈরি করে এক গভীর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। বিরোধী শিবিরের উগ্র প্রচারের মুখেও এই গ্রামীণ ও শহরতলীর কলোনি এলাকার এক বড় অংশ শেষ পর্যন্ত তাদের চেনা রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত দেখছে। পাশাপাশি তথাকথিত শিক্ষিত বড়লোক শ্রেণীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারার একটি পরিতৃপ্তিও পাচ্ছে। এই জনগোষ্ঠীর ‘পাওয়ার পজিশন’ বা ক্ষমতার অবস্থানটি হয়তো অনেক সময় উগ্র বা অসংলগ্ন মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলার ভোটযুদ্ধে এই প্রান্তিক শক্তির সংহতিই এবারের নির্বাচনের আর একটি চেনা এবং মুখ্য অন্তস্রোত হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করাই যায়।

    এর বাইরে কলকাতার তথাকথিত ‘এলিট’ বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং সাংস্কৃতিক মনস্ক সমাজটির রাজনৈতিক অবস্থান যোগ করা প্রয়োজন, যারা মূলত মহানগরীর বৌদ্ধিক চর্চার ধারক ও বাহক। এই শ্রেণির যাপনচিত্র বা প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতির সংযোগ সরাসরি না থাকলেও, তাদের ‘ভোকাল’ বা সরব উপস্থিতি জনমত গঠনে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে, যদিও ক্রমশই এই প্রভাব কমছে, এবং এরাও ওই প্রথম বর্ণিত বাইনারটির মধ্যেই একটি অংশ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে পড়ছে ক্ষুদ্ধ মধ্যবিত্তের চিন্তায়। তবুও একটি ক্ষুদ্র অংশে এদের প্রভাব রয়ে গেছে এখনো, দেখা যাচ্ছে, এই নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির ভূমিকা বা তাদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের আগ্রাসনকে খুব একটা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। তাদের কাছে বিজেপির জয়যাত্রা বা বাঙালির চিরাচরিত উদারপন্থী সংস্কৃতির ওপর এই উগ্র রাজনৈতিক প্রভাব এক ধরণের অস্বস্তির উদ্রেক করেছে। এই এলিট শ্রেণির অনেকেই শাসকদল তৃণমূলের সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত না থাকলেও বা তাদের দুর্নীতির অভিযোগে অসন্তুষ্ট থাকলেও, বিজেপির বিকল্প হিসেবে তৃণমূলকে পূর্ণ সমর্থন জানাতে কুণ্ঠিত হলেও, হয়ত কিছুক্ষেত্রে ভোটের পক্ষে সমর্থন দিয়ে আসছে। আবার এই ধরণের দোলাচলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কলকাতার এই শিক্ষিত অভিজাত মহলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুনরায় বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাদের কাছে বামেদের ভোট দেওয়াটা কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়, বরং একধরণের ‘ভোকেশনাল চয়েস’ বা রুচিবোধের বহিঃপ্রকাশ। তারা মনে করছেন, বামপন্থার পুনরুত্থান হয়তো বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে, আবার রুটি রুজির প্রশ্ন গুলিও রাজনীতির অংশ হয়ে উঠবে যদিও এই শ্রেণির ভোটের সংখ্যা শতাংশের হিসেবে হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু তাদের এই ‘অ্যান্টি-বিজেপি’ এবং ‘প্রো-লেফট’ অবস্থানটি রাজ্যের মননশীল সমাজে এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, যা বিশেষ করে শহুরে বুথগুলোতে শাসক ও প্রধান বিরোধী—উভয় শিবিরের জন্যই সংখ্যাগত বিচারে এক নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজেপি শিবিরের পক্ষ থেকে এই শ্রেণীর কিছু মানুষকে নিজেদের দিকে নিয়ে আসবার চেষ্টাও সেই কারণেই উল্লেখযোগ্য।

    তবে নির্বাচনী পাটিগণিতের এই জটিল আবহে সবথেকে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়টি হলো ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা 'স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রেকটিফিকেশন' (SIR) প্রক্রিয়া। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত তিন চার মাসের প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া বা সংশোধিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা স্বভাবতই তুঙ্গে। বিশেষ করে নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলোতে এই হার অন্যান্য জায়গার তুলনায় লক্ষ্যণীয়ভাবে বেশি। মালদহ এবং মুর্শিদাবাদে তো রীতিমত সংখ্যাগত হিসাব নিকাশ করে মুসলিম তথা সংখ্যালঘু ভোটার ছেটে ফেলা হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যের থেকে বেশ কিছুটা পৃথকভাবে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি নামক একটি প্রক্রিয়াকে যোগ করা হয়েছে যা নিয়ে বিরাট অংশের মানুষের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে দুই মাস এবং এখনো বেশ অনেককেই এই সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে, সম্ভবত বেশ কিছু বৈধ ভোটার কে বাদ রেখেই নির্বাচন হতে চলেছে।তৃণমূল কংগ্রেস অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই সম্পূর্ণ নির্বাচনী মরসুমকে ‘SIR’ বা ভোটার ছাঁটাইয়ের এক বিশাল ষড়যন্ত্র হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছে। শাসকদলের কৌশলী প্রচারের মূল লক্ষ্য হলো—ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াকে কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখিয়ে, তাকে ‘বাঙালির নাগরিকত্ব’ বা ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে একটি আবেগঘন ‘ক্যারিকেচার’ বা রাজনৈতিক বয়ানে রূপান্তর করা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘বাঙালি সেন্টিমেন্ট’ কার্ড চালার নেপথ্যে রয়েছে সেই ভোটারদের সহানুভূতি আদায় করা, যারা কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই সক্রিয়তায় নিজেদের অসুরক্ষিত মনে করছেন, আবার একই সাথে সার্বিক বাঙালির মননে এই প্রক্রিয়াটি কেন্দ্র করে এক ধরণের ক্ষোভের জন্ম দেওয়া যাতে তারা এই বিষয়টির অন্তর্নিহিত অসততা টিকে ধরতে পারে। যদিও এই নাম কাটার প্রকৃত কারণ বা এতে কার কতটুকু ভূমিকা রয়েছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে, কিন্তু প্রোপাগাণ্ডার লড়াইয়ে ‘প্রো-এসআইআর’ বা ‘অ্যান্টি-এসআইআর’ বিতর্কটিই এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    অন্যদিকে, বিজেপি-র নির্বাচনী রণকৌশল দাঁড়িয়ে আছে বুথ স্তরের সুক্ষ্ম গাণিতিক পরিবর্তনের ওপর। গেরুয়া শিবিরের আশা, ভোটার তালিকার এই চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং সন্দেহজনক ভোটারদের চিহ্নিতকরণের ফলে প্রতিটি বুথে যদি গড়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভোটের ব্যবধান কমানো যায়, তবে রাজ্যের সামগ্রিক ফলাফল নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর অভূতপূর্ব মোতায়েন বা 'স্যাচুরেশন ডিপ্লয়মেন্ট'। এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনী কতটা স্বায়ত্তশাসন (autonomy) ভোগ করবে এবং বুথ দখল বা ছাপ্পা ভোট রুখতে দিল্লির তরফ থেকে কতখানি চাপ বজায় থাকবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বুথ স্তরের এই মার্জিন পরিবর্তনের সফলতা। ইতিমধ্যেই কমিশনের আওতায় প্রায় অভূতপূর্ব ভাবে প্রশাসনিক স্তরে বিরাট মাপের রদবদল আনা হয়েছে যা সম্ভবত স্বাধীন ভারতে কখনোই এই মাত্রায় ঘটেনি। যদি কেন্দ্রীয় বাহিনী পূর্ণ শক্তিতে বুথের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবে ইভিএমে তার প্রতিফলন তৃণমূলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে, বাহিনীর এই ‘অতি-সক্রিয়তা’কে তৃণমূল কংগ্রেস যদি সাধারণ মানুষের ওপর ‘দিল্লির খবরদারি’ হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তা হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

    এই প্রেক্ষাপটে বিজেপির পক্ষ থেকে বারংবার উত্থাপিত 'ঘুষপেটিয়া' বা অনুপ্রবেশকারী তত্ত্ব এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা যোগ করেছে, যা তথ্যগত প্রমাণের চেয়েও অনেক বেশি 'পারসেপশন' বা জনমতের ওপর দাঁড়িয়ে যা মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার দ্বারা নির্মিত ও সচেতনভাবে প্রচারিত। SIR প্রক্রিয়া শুরুর আগেই গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে এই দাবিটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, লক্ষ লক্ষ অবৈধ ভোটার রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে এবং নির্বাচনী ফলাফলকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তথ্যের কোনো নিখুঁত গাণিতিক বা পরিসংখ্যানগত অকাট্য প্রমাণ জনসমক্ষে না থাকলেও, এক বিশাল সংখ্যক ভোটারের মনে এটি ধ্রুবসত্য হিসেবে গেঁথে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে এই ‘অনুপ্রবেশ’ তত্ত্বকে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে যে, শহর থেকে সুদূর গ্রাম পর্যন্ত একধরণের প্রচ্ছন্ন ভীতি ও সংশয় দানা বেঁধেছে। এই প্রচার এতটাই সংক্রামক যে, উপরি উক্ত বাইনারি গুলি এই ক্ষেত্রে ভেঙে যাচ্ছে এবং প্রায় সর্ব স্তরের ভোটারদের মধ্যেই একটি অংশ উঠে আসছে যারা এই বিষয়টিতে বিশ্বাস করছে। কোনো প্রামাণ্য সংখ্যা বা জন গণনার চেয়েও এই 'অ্যাজাম্পশন' বা অনুমানই এখন ভোটারদের একাংশের কাছে বড় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর তৈরি ভাষ্যের বিপরীতে অবস্থান করছে এবং আর একটি বাইনারি তৈরি করছে। যদিও SIR এর পরিসংখ্যান এক্ষেত্রে অনেকটাই শাসক পক্ষ কে সুবিধা করে দিয়েছে যা এই বাইনারি টিতে তাদের কে সুবিধায় রাখছে বেশ কিছুটা কারণ, এই ধরনের কোন পরিসংখ্যান SIR এর তথ্যে উঠে আসেনি, বরং মুখ্যমন্ত্রীর নিজে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করা, এক্ষেত্রে তাকে বেশ কিছুটা এগিয়ে দিয়েছে বলাই বাহুল্য।

    নির্বাচনী প্রচারের প্রথাগত ব্যাকরণকে ছাপিয়ে এবারের যুদ্ধের ময়দান হয়ে উঠেছে স্মার্টফোনের ছোট পর্দা। রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়েও এখন ‘পারসেপশন’ বা জনমানসে ভাবমূর্তি তৈরির লড়াই মুখ্য। তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি—উভয় পক্ষই কয়েকশো কোটি টাকা ব্যয় করে এক বিপুল ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে ফেসবুক বা এক্স-এর চেয়েও ‘ইনস্টাগ্রাম রিলস’ বা ‘শর্ট ভিডিও’ হয়ে উঠেছে প্রধান অস্ত্র। এই প্রচারের মূল লক্ষ্য হলো রাজ্যের নবীন বা ‘ফার্স্ট টাইম’ ভোটাররা। এই তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব এখন আর আবেগতাড়িত নয়, বরং তা অত্যন্ত ‘ক্যালকুলেটিভ’ বা হিসেবি। রিলস বা ইনফোগ্রাফিক্সের মাধ্যমে তাদের মগজে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি যেখানে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও আধুনিকতার এক মিশেল তুলে ধরছে, তৃণমূল সেখানে ‘বাংলার নিজের মেয়ে’ ও জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের সাফল্যের গপ্পোকে বিনোদনের মোড়কে পরিবেশন করছে। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা বেসরকারি কোম্পানি বিরাট অংকের অর্থের বিনিময়ে এই পুরো ব্যাপারটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, পাশাপাশি বিভিন্ন ইউটিউবার কিংবা সোশ্যাল ইনফ্লুযেনসার দের এই কাজে লাগানো হচ্ছে যার একটা বেশ বড় রকমের প্রভাব হতে পারে নেটিজেন মহলে। এই চটকদার প্রচারের জাঁতাকলে পড়ে রাজনৈতিক জটিলতাগুলো একপ্রকার লঘু হয়ে যাচ্ছে, বিভিন্ন সামাজিক জরুরি সমস্যা আর ততটা কাউকে ভাবাচ্ছে বলে মনে হয়না আর ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হয়ে পড়ছে অ্যালগরিদম-নির্ভর। অন্যদিকে, বামপন্থী ও অন্যান্য ছোট দলগুলোও এই ডিজিটাল মাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয়, কিন্তু তাদের প্রভাব মূলত একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বামেদের সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন বেশ কিছুটা যুক্তিনির্ভর এবং সৃজনশীল হলেও, তা মূলত শহরের তথাকথিত শিক্ষিত ও সচেতন মধ্যবিত্তের একটি ‘ইকো-চেম্বার’-এ আটকে পড়ছে। যারা আগে থেকেই বামপন্থা বা বিকল্প রাজনীতির সমর্থক, তাদের মধ্যে এই প্রচার ব্যাপক সাড়া ফেললেও, সাধারণ গ্রামীণ বা প্রান্তিক ভোটারদের ‘রিল-নির্ভর’ মনস্তত্ত্বকে তা স্পর্শ করতে পারছে না। বামেদের এই ডিজিটাল লড়াই তাই অনেকাংশেই ‘কনভার্টেড’ বা নিশ্চিত ভোটারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিপরীতে, বড় দুই দলের বিপুল অর্থবল ও ‘মাইক্রো-টার্গেটিং’ টেকনিক সাধারণ তরুণ ভোটারের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও লুব্ধকর হয়ে উঠছে। এই ডিজিটাল জৌলুস আর গাণিতিক প্রচারের গোলকধাঁধায় পড়ে শেষ পর্যন্ত নেটিজেন ভোটারদের সেই ‘ক্যালকুলেটিভ’ মন কোন দিকে হেলে, তার ওপরও বেশ কিছুটা নির্ভর করবে ২০২৬-এ বাংলার ভাগ্য।

    নির্বাচনী এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের সমান্তরালে বাম-কংগ্রেস এবং আইএসএফ (ISF) এই সমস্ত দলগুলোর ভূমিকা এক অত্যন্ত জটিল গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তৃতীয় শক্তিগুলোর সংগৃহীত ভোটের পরিমাণের ওপরও নির্ভর করছে রাজ্যের অনেকগুলো আসনের চূড়ান্ত ফলাফল। সহজ পাটিগণিতে দেখা যায়, বাম,কংগ্রেস বা আইএসএফ যদি তাদের ভোটব্যাঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে সংহত করতে পারে, তবে তা মূলত বিজেপি-র জয়ের পথকে কঠিন করে তোলে। কারণ, ধর্মনিরপেক্ষ বা বিরোধী ভোট বিভাজিত হয়ে যদি এই সব দলের বাক্সে জমা পড়ে, তবে তার সরাসরি সুবিধা শাসকদলের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে—যাকে রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘ভোট ক্রসিং’ বলা হয়। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটে ‘SIR’ বা ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম কাটার যে অভিযোগ উঠছে, তা এই চেনা সমীকরণকে উল্টে দিতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু প্রধান বা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে যদি ভোটার ছাঁটাইয়ের প্রভাব তীব্র হয়, তবে শাসকদলের নিশ্চিত ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় বদল ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাম কংগ্রেস জোট যেহেতু এবারে নেই, কাজেই কিছু আসনে তাদের নিজস্ব ভোট ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশি প্রবল, এর মধ্যে মালদহ মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস এর কিছু আসন জিতবার মতন সুযোগও তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি তৃণমূলের দিক থেকে ভোটারদের একাংশ মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং কংগ্রেস বাম বা আইএসএফ-এর দিকে সেই ভোট সরে যায়, তবে ভোট কাটাকাটির সেই সুবর্ণ সুযোগে বিজেপি অত্যন্ত নগণ্য ব্যবধানে বা ‘মার্জিনাল’ টক্করে অনেকগুলো আসনে জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। অর্থাৎ, তৃতীয় পক্ষের ভোট বাড়লে একদিকে যেমন বিজেপি-র ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসানোর ভয় থাকে, অন্যদিকে ‘SIR’ এর ডিলিশন কাউন্ট এর প্রভাবে সেই একই শক্তি শাসকদলের ভোট কেটে গেরুয়া শিবিরের জয়ের পথ প্রশস্ত করে দিতে পারে। এই প্রবণতা শহরের কিছু কিছু আসনেও উঠে আসতে পারে, এর সাথে মতুয়া ভোটের একটি বড় অংশ শাসকদলের পক্ষে গিয়ে কিছুটা সুবিধা করে দেবার সম্ভাবনাও থেকে যায় এবারের পরিস্থিতিতে, যা এর আগে বেশ অনেকটাই ছিল বিজেপির সাথে।

    পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-এর এই ভোটের যুদ্ধ কেবল সভার ভিড় বা সোশ্যাল মিডিয়ার গ্ল্যামারের লড়াই নয়; এটি আসলে বুথ স্তরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গাণিতিক হিসাব-নিকাশের লড়াই। যদিও মূলত একদিকে নব্য-সুবিধাবাদী শ্রেণির উপস্থিতি আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্তের ক্ষোভ, অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার লড়াই ও সরকারি নির্ভরতা—এই দুইয়ের টানাপড়েনেই লুকিয়ে আছে বাংলার আগামীর চাবিকাঠি, এরকম ধারণা করা অমূলক মনে হয়না। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারি আর ভোটার তালিকার কাঁটছাঁট যদি সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করে, তবে তার ফলাফল ইভিএমে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের জন্ম দিতে পারে। এমনকি দীর্ঘ সময় বাদে এক ধরণের হ্যাং এসেম্বলির সম্মুখীন হতে পারে রাজ্য,যদিও এখনো খুব জোরের সাথে তেমন বলার জায়গা আছে বলে মনে হচ্ছেনা। যাইহোক, বাংলার চিরাচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই ক্রমিক বিবর্তন শেষ পর্যন্ত কার পালে হাওয়া দেবে, তা হয়তো সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, এবারের জনরায় কেবল পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠন করবে না, বরং তা বাংলার দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারনের ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ৫৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Debanjan Banerjee | 103.4.***.*** | ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ২২:২৩739791
  • লেখক খুব প্রাসঙ্গিক লেখা একটা উপহার দিয়েছেন | অনেক ধন্যবাদ আপনাকে | আচ্ছা বিজেপি শাসিত অন্যান্য রাজ্যে এই এস্পিরেশনাল বনাম বেনেফিসিয়ারি ক্লাসের সংঘর্ষের পরিণতি কি ? বিজেপি তো অন্য রাজ্যেও বেনেফিসিয়ারি ক্লাসের সৃষ্টি করেছে যেমন মধ্যপ্রদেশ মহারাষ্ট্র বিহার অসম ইত্যাদি তাহলে সেখানেও কি এই এস্পিরেশনাল বনাম বেনেফিসিয়ারি ক্লাসের সংঘর্ষের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ? এই এস্পিরেশনাল বনাম বেনেফিসিয়ারি ক্লাসের সংঘর্ষকে বিজেপি তার নিজের শাসিত রাজ্যে কিভাবে মোকাবিলা করছে ? পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যার দিক থেকে এই এস্পিরেশনাল বনাম বেনেফিসিয়ারি ক্লাসের ডেমোগ্রাফিক ব্যাপারটা কেমন একটু সংখ্যা দিয়ে বলবেন প্লিজ |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন