
আমাদের সেন্সাস অর্থাৎ জনগণনা হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালে। তখন হয়নি, কোভিড চলছিল। কিন্তু কোভিড কেটে গেছেও বহুদিন হলো। সেন্সাস তবুও হয়নি। সেই সময় অনেকেই, যেমন জঁ দ্রেজ়, অভিযোগ করেছিলেন যে, বিজেপি ইচ্ছে করে সেন্সাস পিছিয়ে দিচ্ছে কারণ, সংবিধানের ৮৪তম সংশোধনী অনুযায়ী ডিলিমিটেশন হতে পারবে শুধুমাত্র ২০২৬-এর পরের প্রথম সেন্সাসের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যদি ২০২৭ সালে সেন্সাস হয়, তাহলে ২০২৯-এর লোকসভা ভোটের আগেই ডিলিমিটেশন সম্ভব।
সেই আশঙ্কা এখন বাস্তব। সরকার ঘোষণা করেছে, সেন্সাস হবে ২০২৭ সালে। আর সেই সেন্সাসের ভিত্তিতে ডিলিমিটেশন করে ২০২৯-এর ভোটের আগেই নতুন মানচিত্র তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সেটুকুই শেষ কথা নয়। গত কয়েকদিনে পরিস্থিতি আরও অনেকটা এগিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে (এপ্রিল ২০২৬) সংসদের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল, তিনটি বিল পাস করানোর জন্য, যা একসাথে ভারতের নির্বাচনী কাঠামো আমূল বদলে দিতে পারে। এই লেখায় সেই পুরো ছবিটা বোঝার চেষ্টা করা যাক।
প্রশ্নঃ ডিলিমিটেশন জিনিসটা কী?
ভারতের লোকসভায় প্রত্যেক রাজ্যের জন্য বরাদ্দ আসন সেই রাজ্যের জনসংখ্যার সমানুপাতিক। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা যদি কেরালার দ্বিগুণ হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের আসনসংখ্যাও দ্বিগুণ হওয়া উচিত। এবার, সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বাড়ে, বাড়বেই, কিন্তু সেই বৃদ্ধির হার সব রাজ্যে সমান নয়। তাই কিছুদিন অন্তর এই হিসেব নতুন করে কষার দরকার, সহজ কথায় এটাই ডিলিমিটেশন।
সংবিধানের ৮১ নম্বর ধারা অনুযায়ী ডিলিমিটেশন একটি পর্যাবৃত্ত প্রক্রিয়া, যার দুটি মূল উদ্দেশ্য। এক, বিভিন্ন রাজ্যের আসনের ভাগ তাদের জনসংখ্যার অনুপাতের যতটা সম্ভব কাছাকাছি রাখা। দুই, সব নির্বাচনী এলাকায় জনসংখ্যা যতটা সম্ভব সমান রাখা।
ডিলিমিটেশনের ফলে লোকসভার আসন পুনর্বণ্টন শেষবার হয়েছিল ১৯৭৩ সালে, ১৯৭১-এর সেন্সাসের ভিত্তিতে। তারপর থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে। ১৯৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ৪২তম সংশোধনীতে ডিলিমিটেশন ২০০১ সাল অব্দি স্থগিত রাখেন, যাতে রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উৎসাহ পায়। অর্থাৎ, ১৯৮১ ও ১৯৯১ সালের সেন্সাসের পরেও কোনো ডিলিমিটেশন হয়নি, এই সংশোধনীর জেরেই সেই প্রক্রিয়া স্থগিতই ছিল। ২০০২ সালের আইনের অধীনে একটি ডিলিমিটেশন কমিশন গঠিত হয়, যার কাজ সম্পন্ন হয় ২০০৮ সালে। তবে তাতে কোনো রাজ্যের সিট বাড়েনি, শুধু কয়েক জায়গায় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে আঁকা হয়েছিল, জনসংখ্যার সমতা বজায় রাখতে। আর ২০০২ সালে ৮৪তম সংশোধনীতে এই স্থগিতাদেশ আরও বাড়িয়ে বলা হয় যে, ২০২৬-এর পরের সেন্সাসের আগে আর ডিলিমিটেশন হবে না – অর্থাৎ, সিটও বাড়বে না, কোনো বাউণ্ডারি-ও নতুন করে টানা হবে না। সেই সময়সীমা এখন শেষ হতে চলেছে। তবে, সে ইতিহাস-ও এখন অনেকটাই অতীত।
উত্তর বনাম দক্ষিণ
এইবার আরেকটু গভীরে ঢোকা যাক। ডিলিমিটেশন নিয়ে বিতর্কের মূল কারণটি এই যে ১৯৭১ থেকে ২০২৪ - এই পঞ্চাশ বছরে উত্তর ভারতের জনসংখ্যা দক্ষিণের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। একদিকে কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা - এই রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখিয়েছে আর ঠিক এর উল্টোদিকে, উত্তরপ্রদেশ, বিহারে বৃদ্ধির হার অনেক বেশি।
এর অর্থ, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করলে হিন্দিবলয়ের আসন বাড়বে, দক্ষিণের কমবে। যদি মোট আসন-সংখ্যা এক-ই থাকতো তাহলে ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে হিসেব করলে: উত্তরপ্রদেশে বাড়বে সাতটি আসন, তামিলনাড়ুতে কমবে ঠিক সাতটি। বিহারে বাড়বে পাঁচটি, কেরালায় কমবে পাঁচটি। সরল কথায়, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার শাস্তি হবে রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো।
তিনটি বিল, তিনদিনে। ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
এতদিন যা ভবিষ্যতের আশঙ্কা ছিল, তা এখন বর্তমানের সংকট। ১৬ এপ্রিল ২০২৬ থেকে সংসদের একটি বিশেষ অধিবেশন শুরু হচ্ছে, যেখানে একসাথে তিনটি বিল পেশ করা হবে। কী আছে এই তিন বিলে?
১) ১৩১তম সংশোধনী বিল: লোকসভার আসন ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব।
২) নতুন ডিলিমিটেশন বিল: নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য একটি কমিশন গঠন।
৩) মহিলা সংরক্ষণ বিল সংশোধন: মহিলাদের জন্য এক,তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ, কিন্তু ডিলিমিটেশনের সাথে যুক্ত করে।
এই তিনটি বিলকে আলাদা আলাদাভাবে দেখলে প্রত্যেকটিকে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। কিন্তু একসাথে দেখলে বোঝা যায়, এগুলি একটি সুনিপুণ পরিকল্পনা বা “মেটিকিউলাস ডিজ়াইনে”র অংশ। কীরকম একটু দেখে নেওয়া যাক।
প্রথম অঙ্ক - ৮৫০ আসন
সহজ করে বলতে গেলে, ১৯৭১-এর পরে যে রাজ্যগুলির, বা যে অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি হয়েছে, তাদের সিটের ভাগ অর্থাৎ রিপ্রেজেন্টেশন বাড়বে, আবার ঠিক উল্টোদিকে যে রাজ্যগুলি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের সিটের ভাগ, অর্থাৎ ক্ষমতা কমবে। আরও ভোঁতাভাবে বলতে গেলে, উত্তরের রাজ্যগুলির, বিশেষতঃ গোবলয়ের আসন-সংখ্যা বাড়বে, যে বাড়ার মাশুল দেবে ভারতের বাদবাকি রাজ্যগুলি। ভেবে দেখুন, ভারতের জনসংখ্যা এখন সবার থেকে উপরে, সাধারণ মানুষের সামান্য সামাজিক সুরক্ষা নেই, ন্যূনতম মানবাধিকারও তাদের কাছে স্বপ্ন – অথচ, এই পরিস্থিতিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শাস্তিই বিধেয়, পুরস্কার নয়। কতোটা বাড়বে সেটাও সহজেই কষে ফেলা যায় জনবৃদ্ধির হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট) ও সাম্প্রতিক জনঘনত্বের তথ্য-উপাত্ত থেকে।
সরকার বলছে, সব রাজ্যেরই আসন বাড়বে। কেউ হারবে না। কিন্তু অঙ্কটা একটু ভালো করে দেখা দরকার। ২০১১ সালের সেন্সাসের ভিত্তিতে ৮৫০ আসন বণ্টন করলে:
•হিন্দিবলয়ের আসন ৩৩% থেকে বেড়ে হবে ৩৮%, গোটা হিন্দিবলয় ধরলে মোট ১৩৩টি নতুন আসন।
•সমস্ত পাঁচটি দক্ষিণী রাজ্য মিলিয়ে পাবে মাত্র ৪৪টি নতুন আসন।
•উত্তরপ্রদেশ একাই পাবে ৫৮টি নতুন আসন, গুণতিতে পুরো দক্ষিণের চেয়েও বেশি।
•দক্ষিণের মোট আসন শেয়ার ২৪% থেকে কমে হবে ২১%।
•এমনকি গোয়া ২টি আসন থেকে কমে ১টি হয়ে যাবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, কেরালার ৩.৩৪ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ২৩টি আসন, কিন্তু দিল্লির মাত্র ১.৬৭ কোটি জনসংখ্যার জন্য ১৭টি আসন। এই অসামঞ্জস্যটা কোথা থেকে এলো, সেটা পরের অংশে বলছি।


দ্বিতীয় অঙ্ক - ইউনিয়ন টেরিটরির কারসাজি
৮৫০ আসনের মধ্যে ৮১৫টি রাজ্যগুলির জন্য, বাকি ৩৫টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা ইউনিয়ন টেরিটরির জন্য বরাদ্দ। এই সংখ্যাটা কীভাবে এলো?
সমস্ত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা মোট ভারতীয় জনসংখ্যার মাত্র ২.৭%। সেই হিসেবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট আসন হওয়া উচিত ২৩টি। এমনকি বর্তমান অনুপাত (৫৪৩,এর মধ্যে ১৯টি = ৩.৫%) বজায় রাখলেও হওয়া উচিত ২৯টি। কিন্তু প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৫টি। কারণটা বুঝতে দিল্লির দিকে তাকানো দরকার। নয়টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে সাতটি ছোট, প্রত্যেকে পাবে মাত্র ১টি করে আসন। বাকি ২৮টি যাবে শুধু দিল্লি আর জম্মু-কাশ্মীরে। এর মধ্যে দিল্লি পাবে ১৭টি আসন, বর্তমান ৭টির জায়গায়। জম্মু,কাশ্মীর পাবে ১১টি - বর্তমান ৫টির জায়গায়।
কেন? বিজেপি দিল্লির সব আসনে জেতে। অর্থাৎ এই এক চালে বিজেপি নিশ্চিত করে নিচ্ছে বাড়তি ১০টি নিশ্চিত আসন, জনসংখ্যার কোনো যুক্তি ছাড়াই। কেরালার জনসংখ্যা দিল্লির প্রায় দ্বিগুণ। তবু দিল্লি পাচ্ছে ১৭টি আসন আর কেরালা পাচ্ছে ২৩টি। অতএব, এটা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নয়, এটা নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি।

তৃতীয় অঙ্ক - মহিলা সংরক্ষণ, যো-যা’র ট্রোজান হর্স
রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব এই বিলটিকে বলেছেন "ট্রোজান হর্স"। কেন?
মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের দাবি দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। ২০২৩ সালে নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়াম পাস হয়েছিল, কিন্তু তখন বলা হয়েছিল, এটা কার্যকর হবে সেন্সাস ও ডিলিমিটেশনের পরে। অর্থাৎ ২০২৯র পরে। এখন হঠাৎ সরকার বলছে, ডিলিমিটেশনের সাথে সাথেই মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর হবে। এটা কি মহিলাদের প্রতি হঠাৎ বিজেপি-র সদিচ্ছা?
আসলে এর কারণ আলাদা। বর্তমান ৫৪৩ আসনে ৩৩% সংরক্ষণ মানে ১৮১টি আসন মহিলাদের জন্য, যা পুরুষ সাংসদদের সরাতে বাধ্য করবে। বিজেপির সবচেয়ে বেশি পুরুষ সাংসদ। তাই ৫৪৩ আসনে সংরক্ষণ কার্যকর করলে বিজেপির সবচেয়ে বেশি পুরুষ সাংসদকে সরে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু আসন যদি ৮৫০ হয়ে যায়, তাহলে বিজেপি নতুন ৩০৭টি আসনে নতুন মহিলা প্রার্থী দিতে পারবে, কোনো পুরুষ সাংসদকে না সরিয়ে।
আরও বড় কথা, মহিলা সংরক্ষণকে ডিলিমিটেশনের সাথে জুড়ে দিয়ে বিরোধীদের জন্য একটি ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে: বিলের বিরোধিতা করলে বলা হবে "মহিলাবিরোধী"। সমর্থন করলে পুরো ডিলিমিটেশন কাঠামোকে বৈধতা দেওয়া হয়। এই দুটির মাঝখানে বিরোধীদের আটকানোর কৌশলই হলো ট্রোজান হর্স।
অথচ সমাধান সহজ: নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম ইতিমধ্যে আইন। বর্তমান ৫৪৩ আসনেই এখনই কার্যকর করা যায়। সেটা না করে ডিলিমিটেশনের সাথে বাঁধার একটাই কারণ থাকতে পারে। ডিলিমিটেশন এগিয়ে নেওয়া, এবং ঐ যোগেন্দ্রবাবুর উপমার মত, একটি উভয়সংকট তৈরি করা।
বিলে আসলে কী লেখা আছে?
সরকার মুখে বলছে, দক্ষিণী রাজ্যগুলির আসন কমবে না। কিন্তু বিলের ভেতরে তার কোনো আইনি গ্যারান্টি নেই। বিলটিতে যা আছে তা আরও উদ্বেগজনক। সবথেকে অদ্ভুত যে বিলে "জনসংখ্যা"র সংজ্ঞা এমনভাবে লেখা হয়েছে যে সংসদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ঠিক করতে পারবে ডিলিমিটেশনের ভিত্তি হবে কোন সেন্সাস। আগে এটা বদলাতে সংবিধান সংশোধন লাগত। এখন লাগবে না। অর্থাৎ সরকার চাইলেই ২০২৭-র বদলে ২০১১ সালের সেন্সাস ব্যবহার করতে পারবে। এন-ডি-এ সরকারের কাছে ততগুলো আসন আছে।
৮২ নম্বর অনুচ্ছেদের নাম পরিবর্তনঃ সংবিধানের ৮২ নম্বর ধারার নাম ছিল "প্রতিটি সেন্সাসের পরে পুনর্বিন্যাস"। বিলে এটা বদলে শুধু "নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাস" করা হয়েছে। এই তিনটি শব্দ বাদ দেওয়ার অর্থ, সেন্সাস ছাড়াও ডিলিমিটেশন করা যাবে। এ ছাড়াও, কীভাবে রাজ্যগুলির মধ্যে আসন বণ্টন হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট ফর্মুলা বিলে নেই। এবং, ডিলিমিটেশন কমিশনের সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। আর, কমিশন শুধু সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। কমিশনের সদস্য নিয়োগ করবে সরকার নিজেই।
অর্থাৎ, কোনো সূত্র ছাড়াই, কোনো জুডিশিয়াল নজরদারি ছাড়াই, কমিশন সরকারের হাতের ক্রীড়নক হয়ে যাবে। এই কাঠামোতে ডিলিমিটেশন হলে ফলাফল কী হবে, তা বোঝার জন্য আসাম আর জম্মু,কাশ্মীরের দিকে তাকানো দরকার।
আসাম ও জম্মু,কাশ্মীরঃ আসামে ইতিমধ্যে রাজ্য স্তরে ডিলিমিটেশন হয়েছে। ফলাফল কী? ডিলিমিটেশন কমিশন কাজ শুরু করার আগেই আসাম সরকার জেলার সংখ্যা ৩৫ থেকে কমিয়ে ৩১ করেছিল। তারপর মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচনী এলাকাগুলো তিনটি পদ্ধতিতে ভেঙে দেওয়া হয়েছে – (ক) ক্র্যাকিং (একটি জনগোষ্ঠীকে একাধিক আসনে ছড়িয়ে দেওয়া), (খ) প্যাকিং (এক আসনে অতিরিক্ত সংখ্যালঘু ভোটার ঢুকিয়ে সেই ভোট নষ্ট করা), এবং (গ) স্ট্যাকিং (বিরুদ্ধ জনগোষ্ঠী মিলিয়ে এমন আসন তৈরি করা যেখানে সংখ্যালঘু কখনও জিততে পারবে না)।
ফলে ১২৬টির মধ্যে মুসলিমপ্রধান আসনের এফেক্টিভ সাইজ় ৩৫ থেকে নেমে এসেছে প্রায় ২০তে। আরও লক্ষণীয়, যে তিনটি আসনে ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম প্রার্থীরা জিতত, সেগুলোকে তফশিলী জাতি/উপজাতির জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে, ফলে সেখানে মুসলিম প্রার্থী দাঁড়াতেই পারবেন না। কাগজে-কলমে দলিত ও আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক সুরক্ষাকে অন্য একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এই ডিলিমিটেশন "দুই দশক ধরে আসামের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবে।" কার ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে তিনি উদগ্রীব সে তো আমরা হাড়ে-হাড়ে জানি।
জম্মু-কাশ্মীরের ছবিটা আরও স্পষ্ট। ছয়টি নতুন আসন জম্মু প্রদেশে গেছে, উপত্যকায় গেছে মাত্র একটি, যদিও উপত্যকার জনসংখ্যা বেশি। নতুন ছয়টি আসন সবই হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ। পুঞ্চ-রাজৌরি, একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা, জুড়ে দেওয়া হয়েছে পিরপঞ্জাল পর্বতমালা পেরিয়ে অনন্তনাগের সাথে। এর কোনো ভৌগোলিক অর্থ বা কারণ নেই, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক।
এই দুটো উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে কোনো নিয়মকানুন, কোনো আদালত, কোনো বিরোধিতা, কিছুই এই প্রক্রিয়া থামাতে পারেনি। জাতীয় স্তরে একই কাঠামো ব্যবহার করা হলে ফলাফল কী হতে পারে, তা কল্পনা করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
এস-আই-আর
ডিলিমিটেশন যদি হয় নির্বাচনী মানচিত্র বদলানোর অস্ত্র, তাহলে SIR বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন হলো ভোটার তালিকা ছাঁটাইয়ের অস্ত্র। দুটো একসাথে দেখলে পুরো ছবিটা সম্পূর্ণ হয়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও পুদুচেরিতে ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের আগে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন হবে। কমিশনের যুক্তি, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা ভোটার কার্ড পেয়ে গেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে ফলাফল: প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে। যার মধ্যে ২৭.১৬ লক্ষ "অযোগ্য" হিসেবে চিহ্নিত, বাকি ৬৩ লক্ষ আগেই বাদ দেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি বাদ গেছেন মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা ও মালদার বাসিন্দারা, যেগুলো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা। এবং বাদ গেছেন প্রচুর প্রান্তিক মানুষ। লোকনীতির সমীক্ষা থেকে অবশ্য এর আন্দাজ বা আশঙ্কা আগেই করা যাচ্ছিল। সে কথা লেখা হয়েছে অন্য প্রবন্ধে ()।
তৃণমূল সরকার একে "কেলেঙ্কারি" বলেছে, অভিযোগ করেছে এটি বিজেপির স্বার্থে ভোটার তালিকা কারসাজি। বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টে গেছেন। রিপোর্ট বলছে, বৈধ আধার, প্যান কার্ড, পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও অনেকের নাম বাদ গেছে।
মনে রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গে সর্বশেষ এস-আই-আর হয়েছিল ২০০২ সালে। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি সময় আগে। হঠাৎ ভোটের আগে এই তড়িঘড়ি কেন? এইবার পুরোটা একসাথে ভাবতে হবে। এস-আই-আর, ডিলিমিটেশন, এবং নতুন বিলের কাঠামো। এই তিনটেই মেটিকুলাস ডিজাইনের তিনটি অঙ্ক। একসাথে দেখলে বোঝা যায়, নির্বাচনী মানচিত্র ও ভোটার তালিকা, একসাথে এই দুটোকেই একসাথে ডিসএনফ্র্যাঞ্চাইজ়মেন্ট অর্থাৎ অধিকার কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র হিসেবে শাণিত করে তুলেছেন ওঁরা।
হাতে পেন্সিল?হাতে পেন্সিল?
হতাশ জীবনে আশার আলোর মত একটা তথ্য এই শেষ পাতে দেওয়া যাক। বিজেপি একা এই সংবিধান সংশোধনী পাস করাতে পারবে না। সংবিধান সংশোধনের জন্য দরকার উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। লোকসভায় এন-ডি-এ-র কাছে আছে প্রায় ২৯৩টি আসন, আর দরকার ৩৬২। অর্থাৎ তারা প্রায় ৭০ ভোট পিছিয়ে। রাজ্যসভায় এন-ডি-এ’র আছে ১৩৪-১৪০টি আসন, দরকার ১৫৬-১৬০। অর্থাৎ ১৫ থেকে ২৫ ভোট কম।
অর্থাৎ, বিরোধীরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে এই বিলগুলো সংবিধান সংশোধন হিসেবে পাস হতে পারবে না। কিন্তু এখানে একটি ফাঁদ আছে। বিরোধীদের মধ্যে কেউ কেউ এই যুক্তিতে ভয় পাচ্ছেন: যদি সংশোধনী বিল হেরে যায়, তাহলে ২০০২ সালের ডিলিমিটেশন আইনের অধীনে শুধু সীমানা পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাজ্যভিত্তিক আসন বণ্টন বদলাবে না। সেই পরিস্থিতিতে কিছু না পাওয়ার চেয়ে ৮৫০ হয়ে যাক।
এই যুক্তিতে ফাঁক আছে। ২০০২ সালের আইন সংসদীয় ভোটেই পরিবর্তন করতে হবে, এবং সেখানেও বিরোধীদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু ১৩১তম সংশোধনী পাস করা মানে এমন একটি কমিশনের হাতে ক্ষমতা দেওয়া যার কোনো সূত্র নেই, কোনো বিচারব্যবস্থার নজরদারি নেই। অর্থাৎ, আসাম ও জম্মু-কাশ্মীরে ইতিমধ্যে যে হ্যালো-টেস্টিং করে ফেলেছেন, সেই এক-ই জিনিষ করার অধিকার পেয়ে যাবেন সারা দেশে।
বিরোধীদের কী দাবি হওয়া উচিত? মহিলা সংরক্ষণ এখনই চাই, ৫৪৩ আসনে, ডিলিমিটেশন ছাড়া। নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়াম আইন হিসেবে ইতিমধ্যে বিদ্যমান। সেটা কার্যকর করতে নতুন বিলের দরকার নেই।
অধিবেশনের সময়
ও হ্যাঁ। আরেকটা কথা! এই অধিবেশনের সময়টা নি-ছক কাকতালীয় নয়। ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল। এই তিনদিনে তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের প্রচারাভিযান তুঙ্গে। দক্ষিণে ডি-এম-কে আর আমাদের বাংলায় তৃণমূলের সাংসদরা যদি সংসদে থাকেন, তাহলে নিজেদের রাজ্যে প্রচার করতে পারবেন না। যদি রাজ্যে থাকেন, তাহলে সংসদে ভোট দিতে পারবেন না। যদিচ, ওঁদের উপর আশা-ভরসা করতে হবে এটাও একটা ব্যথার জায়গা, তাও, খেলাটা কী ধরতে পারলেন?
এদিকে, বিলগুলো শেয়ার করা হয়েছে অধিবেশনের মাত্র দুইদিন আগে, ১৪ এপ্রিলে। কোনো সর্বদলীয় বৈঠক হয়নি। সরকারের নিজস্ব ২০১৪ সালের নীতি অনুযায়ী ৩০ দিনের পাবলিক কমেন্ট পিরিয়ড বাধ্যতামূলক। সেটাও মানা হয়নি। যে সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চায়, সে এভাবে কাজ করে না। অবশ্য সে অভিযোগ কেউ বিজেপির বিরুদ্ধে করেছে বলে জানা নাই। এছাড়া আরও একটা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে আমাদের অগোচরে, কারণ সেই নিয়ে প্রায় কেউ বলছেন না। এই বিল পাস হলে লোকসভা ও রাজ্যসভার আসনের অনুপাত ২.২:১ থেকে বদলে ৩.৩:১ হবে, ফলে ভবিষ্যতে যৌথ অধিবেশনে রাজ্যসভার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও লোকসভার সামনে অকার্যকর হয়ে যাবে। অর্থাৎ, রাজ্যসভায় বিরোধীদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও, যৌথ অধিবেশনে সরকারের কাছে লোকসভার ৫৬% আসন থাকলে তারা সেটা উল্টে দিতে পারবে।
মোদ্দা কথা, জঁ দ্রেজ এবং আরও অনেকে যা বলেছিলেন, বিজেপি সেন্সাস পিছিয়ে দিয়ে ডিলিমিটেশন এগিয়ে আনার ফন্দি করছে, সে আর আশঙ্কা নেই, এখন বাস্তব। আর, যোগেন্দ্র যাদবের উপমাটিই এক্কেবারে ঠিক। এ এক ট্রোজান হর্স বৈ তো নয়। বিরোধীদের একটাই কাজ এই মুহূর্তে, যাকে বাংলায় বলে “লাইনে থাকা”। লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই বাজারে বিরোধীদের একমাত্র এবং শেষ অস্ত্র। শুধু যদি ওঁরা একটু নিজেদের খেয়োখেয়ি বন্ধ করে একজোট থাকেন। সে গুড়ে অবশ্য মগরার ফাইন স্যাণ্ড!
ও, আর আমাদের কাজ: নিজেদের মতন করে ব্যাপারটা বোঝা, আর যা হচ্ছে সেইসব লিখে যাওয়া।
আপডেট
আজ (১৬ এপ্রিল) সংসদের বিশেষ অধিবেশনে ১৩১তম সংশোধনী বিল সহ তিনটি বিল পেশ করা হয়েছে। পেশ করার ভোটে ২৫১ জন পক্ষে, ১৮৫ জন বিপক্ষে। চূড়ান্ত ভোট হবে আগামীকাল শুক্রবার বিকেল ৪টায়।
b | 117.238.***.*** | ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:১৪739969