
এক
শমীক ভট্টাচার্যের সুললিত বক্তব্য নিয়ে চারদিকে উলুতপুলুত। তার একটাই কারণ, চারদিকে মার-কাট শুনতে শুনতে আমরা সাধারণ বক্তৃতা ভুলেই গেছি। আর তত্ত্ব, দর্শন, এইসব তো ছেড়েই দিন। ওসব নিয়ে কে মাথা ঘামায়। হঠাৎ করে কেউ ব্যারিটোন গলায় গম্ভীর কিছু বললেই, মনে হয়, উফ কী দিল। এমনকি তার মধ্যে আপত্তিকর কোন জায়গাটা সেটাও চিনতে পারিনা, এতই দুরবস্থা।
উনি কী বলেছেন? অতীত ভারতীয় ভূখণ্ডের গৌরবের কথা বলেছেন। কিচ্ছু ভুল বলেননি। পুরোনো ভারতের ইতিহাস যদি দেখেন, সুদূর অতীতের সব গৌরবগাথাই পূবদিকের। বাংলা বললেও অত্যুক্তি হয়না, কারণ, তখন তো বাংলা-বিহার আলাদা ছিলনা। এমনকি এই হাল আমলেও বিহারকে আলাদা করে হিন্দি চাপিয়ে দেবার আগে পর্যন্ত চালু ভাষা ছিল বাংলা বা তার পরমাত্মীয় মৈথিলী, মাগধী, এইসব। তা, মগধটা কোথায় ছিল? এই দিকে। গুপ্তদের রাজধানী কোথায় ছিল? পাটলিপুত্র। অশোক কোথাকার রাজা? পাটলিপুত্র। দ্বিঘাত সমীকরণ-খ্যাত শ্রীধরাচার্য হুগলীর ছেলে (কে জানে দীপাংশু আচার্যর আত্মীয় কিনা)। আর্যভট কোথাকার লোক? এই দিকেই কোথায় একটা যেন। তা, বাংলার ইতিহাস যদি শুরু হয়, মগধ-পাটলিপুত্র দিয়েই শুরু, ওটা বাংলারই গৌরবগাথা। এগুলো আমরা ভুলে মেরে দিয়েছি। গ্রিস নিয়ে খুবই লাফাই মগধ নিয়ে নয়, এটা উপনিবেশীয় মস্তিষ্ক প্রক্ষালন। এখানে উনি কিচ্ছু ভুল বলেননি। এবং এটা প্রথম বার বলছি তা নয়।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? উনি বলেছেন, উনি আগে ভারতীয়, তারপর বাঙালি। এই আগে আর পরেটাই হল গোলমেলে। অবিভক্ত ভারত ভৌগোলিকভাবে মধ্য-এশিয়া থেকে আলাদা হয়ে থাকা একটা ভূখণ্ড ছিল, তার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা সাধারণ সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিল, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরেও দেখবেন, কেন্দ্রীয় শাসন ছিলনা। উনি লিচ্ছবির কথা বলেছেন। লিচ্ছবি তো একা নয় ষোড়শ মহাজনপদের একটা। এর প্রতিটা আলাদা, সার্বভৌম রাজ্য ছিল। কোনোট প্রজাতন্ত্র, কোনোটা রাজতন্ত্র। সে তো এমনি এমনি হয়না। কারণ, আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন ছিল প্রাচীন ভারতের বৈশিষ্ট্য। এবং এই আঞ্চলিকতা থেকেই তৈরি হয়েছে আলাদা ভাষাগোষ্ঠী, আলাদা জাতি। যাদের মধ্যে সংযোগও ছিল বিভিন্নতাও ছিল। কোনোটা আগে নয়, কোনোটা পরে নয়। আগে ভারতীয় বলে দেওয়া মানে, এই বিভিন্নতাকে অস্বীকার করা। ভারতীয়ত্ব বাদে বাঙালিত্ব বা তামিলত্ব হয়না। আমরা সবাই নানা আকারের রামায়ণ-মহাভারত পড়ি, আমাদের সঙ্গীত ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আগে, আর কর্ণাটকী পরে, এই কথাটাই হল বিপজ্জনক।
এই আগে এবং পরে এই যে হায়ারার্কি তৈরি, এইটাই আরেসেসের বিপজ্জনক দিক। ওঁরা যখন বলেন, ভারতীয়ত্ব আগে, সেটা কোন ভারতীয়ত্ব? উত্তর-ভারতের গোবলয়ের আদর্শ। নইলে তো আর জয়শ্রীরামকে স্লোগান হিসেবে চালু করতেন না। হিন্দিকে ওঁরা মনে করেন সর্বভারতীয়। সেটাও গোবলয়ের ভাষা। ভারতীয়ত্ব এরকম উপর থেকে নিচে প্রবাহিত হয়না। বরং তামিল-বাঙালি-ওড়িয়া-পাঞ্জাবি সবের যোগফলই ভারতীয়ত্ব। সেটা নিচের দিক থেকে আসে। ভারতের সমস্ত জাতিসত্ত্বা, তাদের যোগফলই ভারতীয়ত্ব। সেই অর্থে জাতিসত্ত্বা গুলো আগে, তাদের যোগফল পরে। এই জায়গাটা শমীকবাবুরা ঠিক উল্টো করে বলেন। সেই জন্য, প্রচুর ভালো-ভালো এবং সমর্থনযোগ্য কথা বলার পরেও, তাঁদের দর্শন আধিপত্যবাদীই থেকে যায়।
দুই
যা বোঝা যাচ্ছে, মুঘল সাম্রাজ্যের আরও একবার পতন হল। হুমায়ুন এখন কোটি কোটি টাকায় বাবরি মসজিদ বানিয়ে সুখে আছেন। জাহাঙ্গীর বনবাসে। শাজাহান অনেকদিন আগেই সন্দেশখালির তাজমহলচ্যুত। এবার ক্ষমতায় আসছে ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা পলাশির যুদ্ধ ছলে বলে কৌশলে জিতে গেছে, এবার সামনে সিধে মন্বন্তর। ইতিমধ্যেই খুচরো কারবারিদের আঙুল-কাটা শুরু হয়েছে। চারদিকে উমিচাঁদদের রমরমা। মেকলের বাবুরা দ্রুতগতিতে নতুন লব্জ রপ্ত করছে। কে বা আগে প্রাণ করিবেক দান।
এ অবধি ঠিকই আছে। ফলতায় বিরোধীশূন্য করে ওয়েস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির জয় হবে, তাতে অনেকে দু-হাত-তুলে নাচবেন, যেন কী দুর্ধর্ষ গণতান্ত্রিক কাণ্ড ঘটছে, সেও ঠিকই আছে। কিন্তু বিপক্ষ দলের সেনাপতি কেন তাঁর শান্তিনিকেতন থেকে একবারও বেরোবেন না, সেটা বোঝা যাচ্ছেনা। আর এই মাহেন্দ্রক্ষণে সব ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন দলীয় কার্যালয়ে রঙ করছেন, সেটা বোঝাও শিবের অসাধ্য। হয়তো রঙ বাড়িতে বেশি হয়ে গেছে। বাহাদুর শা জাফরও নাকি এরকম করতেন, কিন্তু সে তো শখানেক বছর পরে। সাধে কি আর মার্কস বলেছিলেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় ঠিকই, তবে প্রথম বার হয় ট্রাজেডি, আর পরেরবার ফুক্কুড়ি।
তিন
কী নাকি একটা সরকারি সার্কুলার জারি হয়েছে শুনলাম, অনেকেই বলছেন, বাকস্বাধীনতা একেবারে চলে গেল। কিন্তু আমি তো তেমন কিছু দেখছিনা। কালকেই দেখলাম পাপিয়া অধিকারী দিব্বি কোন এক স্টুডিওতে চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, "আমি গঙ্গা জল দিয়ে পবিত্র করলাম, বহু চোখের জলের অভিশাপ, দুঃখ, স্টুডিও চত্বরে অতৃপ্ত আত্মা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এবার সবাই কাজ পাবে"। কেউ কোনো বাধা দিল না। দেখে আমার সেই "জয় বাবা তারকনাথ" সিনেমার সন্ধ্যা রায়ের কথা মনে পড়ল। কত যুগ আগের সেই গান, আজ তোমার পরীক্ষা ভগবাআআন। অন্যে কে কী কাজ পাবে জানিনা, এত বড় অভিনেত্রী যদি না পেয়ে থাকেন, অবিচার হয়েছে বলতেই হবে।
তারপর ঘাড় ঘোরাতেই দেখি, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়েরও গলা ধরে আসছে। ধরা গলায় সোচ্চারে যা বললেন, তার মানে হল, সদ্যোজাত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে কমপ্রোমাইজ করতে বাধ্য হয়েছি। সেটাতেও কেউ আটকালনা। এই কঠিন জীবনের কথা ভেবে আমারও একটু চোখে জল চলে এল। সরকারি কমিটি-টমিটিগুলোতে মিটিং চলছে, আর উনি দাঁতে-দাঁত চেপে বসে আছেন। এক বীর লেখকের লেখা নিয়ে তন্ত্রমন্ত্রের ওয়েব-সিরিজ চলছে, আর উনি দাঁতে-দাঁত চেপে অভিনয় করে চলেছেন। এরপরেও যে দাঁত আস্ত আছে, সেই রক্ষে। নইলে ফোকলা দাঁতে হেঁহেঁ করলে মোটেই ভালো দেখাতনা।
ভাববেন না, টলিউডে স্বরূপ বিশ্বাসের ডান্ডাবাজির কথা অবিশ্বাস করছি। টালিগঞ্জ নিয়ে জানিইবা কী, কথাটা হচ্ছে বাকস্বাধীনতা নিয়ে। সেই নিয়ে যা বুঝলাম, যে, স্বরূপ ডান্ডা চালাতেন, লীনা গঙ্গ্যোপাধ্যায় সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন, নেহাৎই চাপে এবং অনিচ্ছায় সবাই এঁদের পায়ে পড়ে কেরিয়ারের উন্নতি করতেন, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারতেন না। এখন সুযোগ এসেছে, পূর্বদিগন্তে লাল সূর্য উঠেছে, সেইদিকে সূর্যপ্রণাম করে সবাই নিজের আশা-আকাঙ্খা উজাড় করে দিচ্ছেন। এইটা বাকস্বাধীনতা না হলে বাকস্বাধীনতা কী? টিভিতেও দেখবেন তাইই চলছে। এই বাকস্বাধীনতা হল তৃণমূল বা বাম জমানার মুন্ডপাত করার স্বাধীনতা। নতুন সরকার তো খারাপ কিছু করেনা, ফলে তার বিরুদ্ধে আবার বলার কী আছে? ফালতু গোল পাকিয়ে নিজের বাকস্বাধীনতাকে বিপন্ন করবেন না। সার্কুলার জারি হোক বা না হোক।
ক | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ২১ মে ২০২৬ ১৮:২৬740758
Satyabadi | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ২১ মে ২০২৬ ২০:১৯740762