এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  সমোস্কিতি

  • আরও কিছু টুকরো

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    সমোস্কিতি | ১৯ মে ২০২৬ | ২৭৫ বার পঠিত


  • এক

    পৃথিবীতে কোনো সরকার এত তাড়াতাড়ি এত কাজ করে ফেলতে পারেনি। পুরো মন্ত্রীসভা তৈরি হয়ে গেছে, দায়িত্ববন্টন হয়ে গেছে। দিল্লির রিমোট কন্ট্রোলে আর কিচ্ছু চলছেনা। দোকানদার ভাইরা পেয়ে গেছেন 'দুয়ারে বুলডোজার' প্রকল্পে বিকল্প কর্মসংস্থান। হিন্দু গোপালক ভাইরা পেয়েছেন ঘরে গরু রাখার অধিকার। আর সেই গরু কেউ বেচে দিতে পারবেনা। শিক্ষকরা পেতে চলেছেন গাদা-গাদা ডিএ। তাতে কেউ নজর দেবেনা, কারণ ভাতা কোনো ভিক্ষা নয়, ভাতা হল অধিকার। মুসলমান ভাইরা ইদে আর কেউ গরু খাচ্ছেন না। এ বছর পাঁঠায় কাজ সারবেন। সামনের বছর তাঁরা সহি সনাতনী কায়দায় স্রেফ লাউ-কুমড়ো কুরবানি দেবেন। এছাড়াও আশ্বিনে হিন্দু ভাইরা পশুবলি বন্ধ রাখবেন, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ এবং ফাল্গুন-চৈত্রে তাঁদের জোর করে মাছ মাংস খাইয়ে দেওয়া হত, সেটাও আশা করা যাচ্ছে বন্ধ হবে। 'দু-টাকাকে এক-টাকা ভাবুন' প্রকল্প চালু হলেই ডলারের দাম কমে পঞ্চাশ টাকা হবে, তেলের দাম কমতে কমতে এমন জায়গায় পৌঁছবে, যে, দোকানে বোতল-বোতল তেল কোক-পেপসির মতো বিক্রি হবে। খালি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার আর আয়ুষ্মান ভারতটা এখনও বাকি আছে। দিল্লির সনাতনী নেতাদের নির্দেশে সেটাও ভালয় ভালয় মিটে গেলেই বাঁচোয়া।

    দুই

    গর্গ চট্টোপাধ্যায় এখনও জেল-হেফাজতে। নেহাৎই ভোট সংক্রান্ত অভিযোগ করেছিলেন বলে। আজকে কাগজে পড়লাম নদীয়ার সুকুমার বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে "আপত্তিকর ও কুরুচিকর ছবি" সমাজমাধ্যমে পোস্ট করার জন্য (আবাপ ১৭ই মে)। এর আগে পুলিশ মাজিনুর রহমান এবং আলী হোসেন নামে দুই ইউটিউবারকে গ্রেপ্তার করে, মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে কুরুচিকর মন্তব্য এবং হুমকি দেবার কারণে (বিগ নিউজ ২৪ -৭ বাংলা)। অর্থাৎ স্রেফ কথা বলার অপরাধে মোট ৪টি গ্রেপ্তার হয়েছে, নতুন সরকারের শপথ নেবার ৭ দিনের মধ্যে, অন্তত আমি যেটুকু পড়েছি।

    বঙ্গীয় সুধীজনেরা নিশ্চয়ই সকলেই অম্বিকেশ মহাপাত্রের নাম জানেন। সেই গ্রেপ্তারটি হয়েছিল, পূর্বতন সরকার আসার ১ বছর পরে। এবং রোদ্দুর রায়ের গ্রেপ্তার হয়েছিল শেষ পর্বে। দুটো নিয়েই প্রতিবাদ-হইচই হয়েছিল প্রচণ্ড, সংবাদমাধ্যম তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ঠিকই করেছিল। তা বাদে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে ১৫ বছরে কুরুচিকর মিম-মন্তব্যের জন্য কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে শুনিনি। আর এই সরকারের প্রথম ৭ দিনেই অন্তত চারটি গ্রেপ্তার। তাতে সংবাদমাধ্যম এবং সুশীল সমাজের বিশেষ কিছু এসে যাচ্ছেনা। কারণ বিজেপি সরকারের আমলে বাক-স্বাধীনতা কখনও ক্ষুণ্ণ হয়না।

    আরও চমৎকার ব্যাপার এই, যে, আজই আনন্দবাজারে এও পড়লাম, ফলতার বিরোধী প্রার্থী সম্পর্কে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, "ভোট শেষ হোক। ওর ব্যবস্থা করব। সেই দায়িত্ব আমার।’’ নিঃসন্দেহে এটা হুমকি না, কুরুচিকর তো নাই। দিলীপ ঘোষ দুদিন আগে "ক্যালানি" শব্দটা উচ্চারণ করে কাকে যেন ঠ্যাঙাবেন বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সদ্যনির্বাচিত বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি স্পষ্ট হিন্দিতে বেশ খোলসা করেই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি তাঁর বিধানসভা কেন্দ্রের কোন মুসলমানের জন্য কিছুমাত্র কাজ করবেন না। কারণ মুসলমানরা তাঁকে ভোট দেয়নি। ভোটের আগে শুভেন্দু আর অমিত শাহ কী বলেছিলেন সেসব আর যোগ করলাম না। কিন্তু মোদ্দা ব্যাপার হল, এগুলোর কোনোটাই হুমকি না, কুরুচির তো প্রশ্নই নেই। কারণ, প্রথমত, বিজেপির আমলে কোনো সন্ত্রাস হয়না, যেটুকু হয়, তার দায়িত্ব বিরোধীদের। দ্বিতীয়ত, শমীক ভট্টাচার্য শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন। আর তৃতীয়ত, গোদি মিডিয়র সঞ্চালকরা সবাই এখন গেরুয়া টাই পরার কম্পিটিশন করছেন। আর চতুর্থত, বাংলার তিন বৃহৎ পার্টি তৃণমূল-সিপিএম-কংগ্রেস এখনও গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারির নিন্দেটুকু করে উঠতে পারেননি, বাকিগুলোর খবর পেয়েছেন কিনা সন্দেহ। খুব সম্ভবত ওঁরা "তাবলে কুকুরে কামড়ানো কি মানুষের শোভা পায়?" নীতিতে বিশ্বাস করছেন। তা করুন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে এইভাবে রক্ষা করার লড়াই লড়লে তো গ্রেপ্তারি হবেই, তখন আবার "ওরা প্রথমে এসেছিল অমুককে নিতে, আমি তখন কিছু বলিনি" - ওই মুখস্থ কবিতাটা আওড়াবেন না।

    তিন

    যা বুঝছি, ভারতবর্ষে পোকার উপদ্রব খুব বেড়েছে। দিকে দিকে উইপোকারা ঢিপি বানিয়ে বসে আছে। এছাড়াও আরশোলাতেও ছেয়ে গেছে চারদিক। কেউ সাংবাদিক হচ্ছে, কেউ সোশাল মিডিয়া করছে, কেউ আরটিআই। চতুর্দিকে যুদ্ধপরিস্থিতি। এইসব সময়েই ধর্মস্থাপনায় স্বর্গ থেকে নেমে আসে বুলডোজার অবতার। ঘুঘু আর আরশোলার বাসা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উইয়ের ঢিপির তলা থেকে রত্নাকর বেরিয়ে আসেন বাল্মীকি হয়ে। রামরাজ্য তৈরি হয়। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় এসআইআর, এনআরসি ইত্যাদি হয়। নারীর নিরাপত্তাবিধান হয়, শূদ্রের অধিকারস্থাপন। আর বুদ্ধিজীবী ও ​​​​​​​নৈয়ায়িকরা ​​​​​​​সব্বাই ​​​​​​​সমস্বরে এই ​​​​​​​রামরাজ্যের ​​​​​​​জয়ধ্বনি ​​​​​​​দিতে ​​​​​​​থাকেন।

    এই ​​​​​​​বিরাট ​​​​​​​রামরাজ্য ​​​​​​​শূন্য ​​​​​​​থেকে ​​​​​​​তৈরি ​​​​​​​হওয়া ​​​​​​​চোখের ​​​​​​​সামনে ​​​​​​​দেখলাম। আগে হলে বলতাম, ইতিহাস তৈরি হল। এখন তো তা আর বলা যাবেনা, বলতে হবে পুরাণ তৈরি হল। কোথায় নাকি বামরা মামলা করে বুলডোজারের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ এনেছে। কোথায় নাকি গর্গ চাটুজ্যের মামলার শুনানি এখনও হচ্ছে। তৃণমূলনেত্রী কোথায় নাকি আবার দল বানাবেন বলছেন। কিন্তু এই খুচরো দু-চাট্টে জিনিস করে খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ফিরে গিয়ে পুরাণ তৈরি হওয়াকে আটকানো যাবেনা। টিভিতে অনেককাল আগে যখন মহাভারত সিরিয়াল দেখাত, তার শুরুতেই দেখাত একটা চাকা। পিছনে বলত 'ম্যায় সময় হু'। এই চাকা পিছনে ঘুরে গেছে। যতই টানুন আর সামনে আসবে না।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • সমোস্কিতি | ১৯ মে ২০২৬ | ২৭৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • r2h | 134.*.*.* | ২১ মে ২০২৬ ২০:২১740764
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন