
এক
পৃথিবীতে কোনো সরকার এত তাড়াতাড়ি এত কাজ করে ফেলতে পারেনি। পুরো মন্ত্রীসভা তৈরি হয়ে গেছে, দায়িত্ববন্টন হয়ে গেছে। দিল্লির রিমোট কন্ট্রোলে আর কিচ্ছু চলছেনা। দোকানদার ভাইরা পেয়ে গেছেন 'দুয়ারে বুলডোজার' প্রকল্পে বিকল্প কর্মসংস্থান। হিন্দু গোপালক ভাইরা পেয়েছেন ঘরে গরু রাখার অধিকার। আর সেই গরু কেউ বেচে দিতে পারবেনা। শিক্ষকরা পেতে চলেছেন গাদা-গাদা ডিএ। তাতে কেউ নজর দেবেনা, কারণ ভাতা কোনো ভিক্ষা নয়, ভাতা হল অধিকার। মুসলমান ভাইরা ইদে আর কেউ গরু খাচ্ছেন না। এ বছর পাঁঠায় কাজ সারবেন। সামনের বছর তাঁরা সহি সনাতনী কায়দায় স্রেফ লাউ-কুমড়ো কুরবানি দেবেন। এছাড়াও আশ্বিনে হিন্দু ভাইরা পশুবলি বন্ধ রাখবেন, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ এবং ফাল্গুন-চৈত্রে তাঁদের জোর করে মাছ মাংস খাইয়ে দেওয়া হত, সেটাও আশা করা যাচ্ছে বন্ধ হবে। 'দু-টাকাকে এক-টাকা ভাবুন' প্রকল্প চালু হলেই ডলারের দাম কমে পঞ্চাশ টাকা হবে, তেলের দাম কমতে কমতে এমন জায়গায় পৌঁছবে, যে, দোকানে বোতল-বোতল তেল কোক-পেপসির মতো বিক্রি হবে। খালি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার আর আয়ুষ্মান ভারতটা এখনও বাকি আছে। দিল্লির সনাতনী নেতাদের নির্দেশে সেটাও ভালয় ভালয় মিটে গেলেই বাঁচোয়া।
দুই
গর্গ চট্টোপাধ্যায় এখনও জেল-হেফাজতে। নেহাৎই ভোট সংক্রান্ত অভিযোগ করেছিলেন বলে। আজকে কাগজে পড়লাম নদীয়ার সুকুমার বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে "আপত্তিকর ও কুরুচিকর ছবি" সমাজমাধ্যমে পোস্ট করার জন্য (আবাপ ১৭ই মে)। এর আগে পুলিশ মাজিনুর রহমান এবং আলী হোসেন নামে দুই ইউটিউবারকে গ্রেপ্তার করে, মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে কুরুচিকর মন্তব্য এবং হুমকি দেবার কারণে (বিগ নিউজ ২৪ -৭ বাংলা)। অর্থাৎ স্রেফ কথা বলার অপরাধে মোট ৪টি গ্রেপ্তার হয়েছে, নতুন সরকারের শপথ নেবার ৭ দিনের মধ্যে, অন্তত আমি যেটুকু পড়েছি।
বঙ্গীয় সুধীজনেরা নিশ্চয়ই সকলেই অম্বিকেশ মহাপাত্রের নাম জানেন। সেই গ্রেপ্তারটি হয়েছিল, পূর্বতন সরকার আসার ১ বছর পরে। এবং রোদ্দুর রায়ের গ্রেপ্তার হয়েছিল শেষ পর্বে। দুটো নিয়েই প্রতিবাদ-হইচই হয়েছিল প্রচণ্ড, সংবাদমাধ্যম তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ঠিকই করেছিল। তা বাদে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে ১৫ বছরে কুরুচিকর মিম-মন্তব্যের জন্য কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে শুনিনি। আর এই সরকারের প্রথম ৭ দিনেই অন্তত চারটি গ্রেপ্তার। তাতে সংবাদমাধ্যম এবং সুশীল সমাজের বিশেষ কিছু এসে যাচ্ছেনা। কারণ বিজেপি সরকারের আমলে বাক-স্বাধীনতা কখনও ক্ষুণ্ণ হয়না।
আরও চমৎকার ব্যাপার এই, যে, আজই আনন্দবাজারে এও পড়লাম, ফলতার বিরোধী প্রার্থী সম্পর্কে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, "ভোট শেষ হোক। ওর ব্যবস্থা করব। সেই দায়িত্ব আমার।’’ নিঃসন্দেহে এটা হুমকি না, কুরুচিকর তো নাই। দিলীপ ঘোষ দুদিন আগে "ক্যালানি" শব্দটা উচ্চারণ করে কাকে যেন ঠ্যাঙাবেন বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সদ্যনির্বাচিত বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি স্পষ্ট হিন্দিতে বেশ খোলসা করেই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি তাঁর বিধানসভা কেন্দ্রের কোন মুসলমানের জন্য কিছুমাত্র কাজ করবেন না। কারণ মুসলমানরা তাঁকে ভোট দেয়নি। ভোটের আগে শুভেন্দু আর অমিত শাহ কী বলেছিলেন সেসব আর যোগ করলাম না। কিন্তু মোদ্দা ব্যাপার হল, এগুলোর কোনোটাই হুমকি না, কুরুচির তো প্রশ্নই নেই। কারণ, প্রথমত, বিজেপির আমলে কোনো সন্ত্রাস হয়না, যেটুকু হয়, তার দায়িত্ব বিরোধীদের। দ্বিতীয়ত, শমীক ভট্টাচার্য শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন। আর তৃতীয়ত, গোদি মিডিয়র সঞ্চালকরা সবাই এখন গেরুয়া টাই পরার কম্পিটিশন করছেন। আর চতুর্থত, বাংলার তিন বৃহৎ পার্টি তৃণমূল-সিপিএম-কংগ্রেস এখনও গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারির নিন্দেটুকু করে উঠতে পারেননি, বাকিগুলোর খবর পেয়েছেন কিনা সন্দেহ। খুব সম্ভবত ওঁরা "তাবলে কুকুরে কামড়ানো কি মানুষের শোভা পায়?" নীতিতে বিশ্বাস করছেন। তা করুন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে এইভাবে রক্ষা করার লড়াই লড়লে তো গ্রেপ্তারি হবেই, তখন আবার "ওরা প্রথমে এসেছিল অমুককে নিতে, আমি তখন কিছু বলিনি" - ওই মুখস্থ কবিতাটা আওড়াবেন না।
তিন
যা বুঝছি, ভারতবর্ষে পোকার উপদ্রব খুব বেড়েছে। দিকে দিকে উইপোকারা ঢিপি বানিয়ে বসে আছে। এছাড়াও আরশোলাতেও ছেয়ে গেছে চারদিক। কেউ সাংবাদিক হচ্ছে, কেউ সোশাল মিডিয়া করছে, কেউ আরটিআই। চতুর্দিকে যুদ্ধপরিস্থিতি। এইসব সময়েই ধর্মস্থাপনায় স্বর্গ থেকে নেমে আসে বুলডোজার অবতার। ঘুঘু আর আরশোলার বাসা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উইয়ের ঢিপির তলা থেকে রত্নাকর বেরিয়ে আসেন বাল্মীকি হয়ে। রামরাজ্য তৈরি হয়। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় এসআইআর, এনআরসি ইত্যাদি হয়। নারীর নিরাপত্তাবিধান হয়, শূদ্রের অধিকারস্থাপন। আর বুদ্ধিজীবী ও নৈয়ায়িকরা সব্বাই সমস্বরে এই রামরাজ্যের জয়ধ্বনি দিতে থাকেন।
এই বিরাট রামরাজ্য শূন্য থেকে তৈরি হওয়া চোখের সামনে দেখলাম। আগে হলে বলতাম, ইতিহাস তৈরি হল। এখন তো তা আর বলা যাবেনা, বলতে হবে পুরাণ তৈরি হল। কোথায় নাকি বামরা মামলা করে বুলডোজারের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ এনেছে। কোথায় নাকি গর্গ চাটুজ্যের মামলার শুনানি এখনও হচ্ছে। তৃণমূলনেত্রী কোথায় নাকি আবার দল বানাবেন বলছেন। কিন্তু এই খুচরো দু-চাট্টে জিনিস করে খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ফিরে গিয়ে পুরাণ তৈরি হওয়াকে আটকানো যাবেনা। টিভিতে অনেককাল আগে যখন মহাভারত সিরিয়াল দেখাত, তার শুরুতেই দেখাত একটা চাকা। পিছনে বলত 'ম্যায় সময় হু'। এই চাকা পিছনে ঘুরে গেছে। যতই টানুন আর সামনে আসবে না।
r2h | 134.*.*.* | ২১ মে ২০২৬ ২০:২১740764