
চারদিকে ভাঙচুর চলছে, আর শাইনিং মধ্যবিত্ত হাত-তুলে নাচছে। মহিলাদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভকে সম্পূর্ণ এডিট করে টিভিতে দেখানো হচ্ছে স্রেফ আইন-শৃঙ্খলা-সমস্যা বলে, বীর ইনফ্লুয়েন্সাররা বলছেন আইন এখন সম্পূর্ণ লিঙ্গনিরপেক্ষ, যে যাকে খুশি ঠ্যাঙানো যেতে পারে, লিঙ্গ-টিঙ্গ দেখার দরকার নেই। পান-থেকে-চুন-খসলেই গর্জে ওঠা দুর্ধর্ষ নারীবাদী-প্রগতিশীলদের কণ্ঠস্বর আর শোনা যাচ্ছেনা, বরং শাইনিং জনতা আবারও লাফাচ্ছে, 'ওদের' কী দারুণ দিচ্ছে।
এ জিনিস হবারই ছিল। নব্বইয়ের দশকে যখন উদারীকরণ শুরু হল, সত্যি কথা বলতে কি একটা আস্ত প্রজন্মের মধ্যবিত্তকে কর্মসংস্থান জুগিয়েছিল কর্পোরেট, বিশেষ করে আইটি। তার আগের প্রজন্ম করত সরকারি চাকরি, সেসব উঠে যেতে বসে নব্বইয়েই। তার জায়গা নেয় আইটি। আমরা অনেকেই তাতে কুলিগিরি করে বেশ রসেবশে ছিলাম দীর্ঘদিন। ওই একই সঙ্গে ভারতবর্ষে বাড়তে শুরু করে অর্থনৈতিক অসাম্য। উপরের ১% আর নিচের ৫০% র মধ্যের কুৎসিত ব্যবধান গত পনেরো বছরে যা বেড়েছে, তা ছিলনা মনমোহন জমানায়, কিন্তু শুরুটা ওখানেই। অতটা বাড়েনি, কারণ কিছু চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস ছিল। যেমন ১০০ দিনের কাজ চালু হয় সেই সময়ই। কিন্তু ওই একই সময়ে এইসব ভরতুকি মার্কা বাজে জিনিসের বিরুদ্ধে শাইনিং মধ্যবিত্তের একটা আপত্তি শুরু হয়। তার আগে পর্যন্ত তারাও রেশন তুলত, কেরোসিন নিত, গ্যাসের দাম বাড়লে উৎকণ্ঠিত হত, কিন্তু উপরের ৫%এর হঠাৎ আয়বৃদ্ধি, ওসবকে অদরকারি মনে করতে শেখায়। এবং ওই একই সময়ে আস্তে আস্তে উপর তলার ৫% অ্যাসপিরেশনকে মোটামুটি সমাজের জনমত বলে চালানো শুরু হয়।
পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে বুদ্ধবাবুর জমানায়। তার আগে পর্যন্ত জ্যোতিবাবু একটা স্থিতাবস্থা বজায় রেখে চলতেন। বুদ্ধবাবুর সময় শাইনিং মধ্যবিত্তের অ্যাসপিরেশন গোটা বাংলার শাসনযন্ত্রটাই দখল করে ফেলে। সেইসময় থেকেই শোনা যেতে শুরু করে, বাংলার ভালো-ভালো ব্রেনগুলো কেন বেঙ্গালুরু চলে যাবে। সত্যিই চলে যাওয়াটা ভালো না, বাংলায় শিল্প থাকা উচিত ছিল। কিন্তু কেন নেই, তার তো কিছু ইতিহাস-ভূগোল আছে, ওগুলো ঠিক অর্থনীতির নিয়মে হয়নি। বাংলার ক্ষেত্রে বলতে গেলে সেই দেশভাগ থেকে শুরু করে বঞ্চনা ইত্যাদির বাদ্য বাজাতে হয়, যেগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। কিন্তু অত ধৈর্য কারো ছিলনা, কাজেই বাংলায় শিল্পায়নের বন্যার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই শাইনিংরা, তখন বুদ্ধবাবুর পিছনে ছিলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এঁদের কোনো রাজনীতি ছিলনা, এঁরা স্টার্ট-আপ, লিডারশিপ, মার্কেট ইকনমি এইসব নানা বুলিতে বিশ্বাস করতেন। ফলে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ডান একটা সরকার এসে যাওয়ায় এঁদের শিবির বদলে ফেলতে কিছুই অসুবিধে হয়নি। মজা হল, ফ্রি মার্কেট বলে যাকে দাবী করা হয়, সে কখনও ছিলই না, কিন্তু সেটা এখনকার বিষয় না।
এবার, এই উদারীকরণের অনিবার্য ফল ছিল নিচের তলার ৫০%কে আরও নিচে ঠেলা। পশ্চিমবঙ্গে, যেটা হয়, সেটা হল কার্যত এই উদারীকরণের রাজনীতির বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ। যে ঢেউয়ের মাথায় চড়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্যি কথা বলতে কি, সেই অবস্থান থেকে ওই সরকার ১৫ বছরে সরে আসেনি। এস-ই-জেড হয়নি, গায়ের-জোরে জমি-দখল হয়নি, পুলিশ গুলি চালায়নি, এবং জনকল্যাণমূলক অজস্র প্রকল্প এসেছে। দেউচা-পাচামি আর তাজপুর বন্দর খানিকটা সরে আসা, কিন্তু সেটা খুব বড় সমস্যা হয়নি। এই সরকারের সমস্যা ছিল, শাসক দল। সেই দলের বেশিরভাগ অংশটারই কোনো ধারণা ছিলনা, জনতার ১১ সালের রায়টা কী। প্রচুর লুম্পেন ছিল দলে, সে সব দলেই থাকে, কিন্তু ধরে রাখার মতো কোনো আদর্শ বা বন্ধন কিছুই ছিলনা। এবং ২০০৬ সালেও এদের কোনো ধারণা ছিলনা, যে, পাঁচ বছর পরে তারা ক্ষমতায় আদৌ আসতে পারে। ফলে পুরোটাই হয়ে যায় একটা অর্থকরী ধান্দা। দোকান-বসানো কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে নয়, ওটা স্রেফ হপ্তা আদায়ের ফিকির। একই ভাবে মাঝারি শিল্প প্রচুর এলেও আড়কাঠিরা লোক ধরে আনত সেই গোবলয় থেকেই। মধ্যবিত্তের চাকরি দিতেও আদায় হত পয়সা। এতে করে জনকল্যাণগুলো মিথ্যে হয়ে যায়না, কিন্তু এগুলোও মিথ্যে না। এর মধ্যে এসে যায় নতুন কেন্দ্রীয় সরকার। তারা ধীরে-সুস্থে পুরো মিডিয়াটাকেই কিনে ফেলে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হয় 'সংগ্রাম'। সেখানে ওই ওয়েস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি কোনো দুর্নীতি করেনা, হাজার-হাজার কোটি টাকা মেরে দেওয়া কোনো দুর্নীতি না। এটাকে বলে বাদ দেবার রাজনীতি। বরং পুরোটাই পেশ করা হয় কর্পোরেট স্টাইলে। শাইনিং মধ্যবিত্ত মার্কেট ইকনমির আনন্দে নাচতে শুরু করে। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান বলুন, গণতন্ত্র বলুন, ধর্মনিরপেক্ষতা, কোনোটারই কোনো কোনো মানে এদের কাছে নেই। আর তৃণমূল নামক বারো ভূতের ক্লাবের কাছে, এর কোনো উত্তর ছিলনা। এসআইআর থেকে গণনায় গোলমাল, লড়বে কি, তাদের ট্যাকটিকাল টিমটাই তো হাওয়া হয়ে গিয়েছিল ভয়ে বা ভক্তিতে।
এখন এর পুরোটাই চরমে পৌঁছেছে। মিডিয়া এই সরকার সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক খবর দেবেনা। মধ্যবিত্ত বেশ হয়েছে বলে লাফাবে কিছুদিন। যতদিন না নিজেরা বাঁশ খাচ্ছে। নিচের তলায় লোকে চেঁচাবে। সেই ক্ষোভ সংগঠিত করার লোক পাওয়া কঠিন। কারণ গণতান্ত্রিক পরিবেশটাই নেই। এখন যদি আরজিকর কাণ্ড হত, তো নিশ্চিন্ত থাকুন, শুরুতেই ঠেঙিয়ে সব বার করে দেওয়া হত। উন্নাও-হাথরাস প্যাটার্ন অনুযায়ী রত্না দেবনাথের জেলে থাকার কথা। আর টিভিতে এসব কিছু দেখাতই না। ফলে এখন চাপ-চাপ ক্ষোভ বিচ্ছিন্ন ভাবে বেরোবে এবং ধামাচাপা দেওয়া হবে। ১৯৬৬ তে বামপন্থীরা বা ২০০৭-৮ এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ফর্মা দেখিয়েছিলেন, কিংবা জরুরি অবস্থায় জয়প্রকাশ নারায়ণ, তার দুগুণ মতো কিছু কেউ করতে পারলে ক্ষোভ সংগঠিত হবে, এবং এই সরকারের গদি ওল্টাতেও পারে। আর সংগঠিত না করতে পারলে কী হবে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বহুদিন আগেই 'ওরা কেড়ে খেলনা কেন' এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন।
dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ১৯ মে ২০২৬ ০৯:৫৩740705
dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ১৯ মে ২০২৬ ১০:০০740706
জনৈক ভুক্তভোগী | 119.*.*.* | ১৯ মে ২০২৬ ১২:১২740707
. | ১৯ মে ২০২৬ ১৫:৪১740713
দীপ | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ১৯ মে ২০২৬ ১৬:১৮740714
Bratin Das | ১৯ মে ২০২৬ ১৬:২৭740715
. | ১৯ মে ২০২৬ ১৬:৩২740716
dc | 106.*.*.* | ১৯ মে ২০২৬ ১৭:০৩740717
ar | 96.*.*.* | ১৯ মে ২০২৬ ১৮:৩২740720