এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  দর্শন

  • রটন্তী কুমার এবং ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শনে প্রমাণঃ পর্ব ৪ 

    রানা সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | দর্শন | ০২ মে ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • | | |
    গত পর্বে আমি লিখেছিলাম, যদি এর মধ্যে ইনফর্মেশন অনুযায়ী কিছু ঘটে যায়। অর্থাৎ ব্যাপারটা যদি ইমার্জেন্সি হয়, তাহলে?

    তখন হয় সেটাকে যাচাই করবার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন বা কোনও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন।
    না নিলে কী হবে?

    একটা গল্প বলি। গল্পটা আমাদের সকলের জানা। এই ক’দিন আগে ফেবুতেও অনেক লাইক পেয়েছিল।

    প্লেটো এক বিশেষ ধরণের গণতন্ত্র পছন্দ করতেন কারণ তিনি সাধারণ জনতার মনস্তত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছিলেন – The Ship of State.

    ধরুন, মাঝ সমুদ্রে একটি জাহাজ বিপদে পড়েছে। সামনে ঝড় আর চারদিকে ডুবো পাহাড়। এদিকে জাহাজের নাবিকেরা তর্কে মত্ত। প্রত্যেকেই হাল ধরতে চায়, কিন্তু জাহাজ চালানো সম্পর্কে কারও বিশেষ কোনও ধারণাই নেই।

    তারা তখন ভোটের আয়োজন করল। আর সেই ভোটে কে জিতল? যে গলাবাজি করতে পারে আর বাকিদের তার মিষ্টি কথায় তুষ্ট করতে পারে। আর অন্যদিকে যিনি নক্ষত্র দেখে দিক চিনতে পারেন, নৌবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী, সে বেচারা তখন অবহেলিত; বিদ্রুপের শিকার। তাকে ‘এলিটিস্ট’ তকমা দিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখা হল। আর ফলাফল যা হওয়ার তাই হল – জাহাজ ডুবে গেল।

    কারণ সেখানে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া হল না।
    সেইজন্যই আমি দেশ চালনার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার যোগ্যতার কথা বলেছিলেম। প্লেটোর মতে এটাই সাধারণ মানুষ দ্বারা নির্বাচিত গণতন্ত্রের আসল চেহারা। এখানে প্রজ্ঞার থেকে জনপ্রিয়তা বেশি গুরুত্ব পায়। জ্ঞানের থেকে গুরুত্ব পায় ধর্ম আর রাজনীতি। মনে রাখা দরকার, এথেন্সের মানুষ কিন্তু গণভোটের মাধ্যমেই সক্রেতিসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। ঠিক কী রকম প্রজ্ঞার একজন মানুষ ছিলেন সক্রেতিস তা নিশ্চয়ই আপনারা জানেন।

    সত্য, যা মানুষ তথা মানবের মঙ্গল চেয়েছিল, তা হেরে গেল কেবল সংখ্যার কাছে!

    প্লেটো স্বৈরতন্ত্রের থেকেও বেশি ভয় পেতেন ক্ষমতার হাতে থাকা অজ্ঞতাকে। কারণ যখন ভোটের মাধ্যমে কোনও সত্য নির্ধারিত হয়, জনপ্রিয়তার মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাই হয়, তখন রাষ্ট্র যোগ্যতা খোঁজা বাদ দিয়ে জনপ্রিয়তা আর লেজুর বৃত্তির লোকজনই খোঁজে।

    ভোটের নিশ্চয়ই দরকার আছে, তবে তার ফর্মেশন বা নিয়মকানুন যদি বিজ্ঞাসন্মতভাবে ঠিক করা হয়, সময়োপযোগী আর আরও আরও মানবতাবাদী ও গণতান্ত্রিক করা হয়, তাহলে তা যে কোনও দেশের পক্ষেই আরও আরও কার্যকরী হয়ে উঠতে পারে।

    প্লেটো সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, শুরুতে আসে নীতিহীন স্বাধীনতা। এরপর দক্ষতার, সৃষ্টিশীলতার জায়গা দখল করে নেয় মানুষের সাধারণ মতামত। এরপর আসে চাটুকার রাজনীতিবাজদের দাপট। যারা অবান্তর ও অবাস্তব সব স্বপ্ন দেখায়। আর ঠিক তখনই জনমতের মুখোশ পরে হাজির হয় চরম স্বৈরতন্ত্র।

    পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন। যে যে দেশগুলো আজকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে গেছে, তারা সেটি অর্জন করতে পেরেছে কেবলমাত্র চেতনাশীল শিক্ষিত মানুষদের প্রচেষ্টায়।

    প্লেটোর প্রায় আড়াই হাজার বছর পরেও সমুদ্র সেই আগের মতোই উত্তাল; কেবল আমাদের রাষ্ট্র নামক জাহাজটি আরও বিপন্ন হয়ে পড়ছে সময়ের সাথে।

    কবেই সন্ত কবীর বলে গেছিলেন, “জাতি না পুছ সাধু কা / পুছ লিজিয়ে জ্ঞান / মোল করো তলোয়ার কা / পড়া রহনে দো ম্যায়ান”।

    ভারত এবং বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই।

    হিসেব করে বলুন তো বাঙালি হিসেবে আপনাদের অর্জন বেশি নাকি হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে আপনাদের অর্জন বেশি? ঘাঁটুন। ইতিহাস ঘাঁটুন।

    এখন প্রশ্ন হল, আমরা বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করতে উন্মুখ হই কেন?

    বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।
    এটি একটি বহুল প্রচারিত বাংলা প্রবাদ। যার অর্থ – গভীর বিশ্বাস বা আস্থায় কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ করা সম্ভব, কিন্তু যুক্তি তর্কের মাধ্যমে তা নাকি অনেক দূরে সরে যায়। এটি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস, ভক্তির ক্ষেত্রে নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের ওপর জোর দেয়।

    আমি বলি, বিজ্ঞানে মিলায় বস্তু, তর্কে অচিনপুর!

    অর্থাৎ বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলেই আমরা নতুন নতুন বস্তু লাভ করতে পারি আর তর্ক করে করে পৌঁচ্ছে যেতে পারি নতুন কোনও অজানা রহস্যময় দূরর্বর্তী ও অচেনা কোনও জায়গায় বা জ্ঞানে। হ্যাঁ, প্রথমে, মানসিকভাবে, তারপর ইচ্ছে করলে শারীরিকভাবে। অবশ্য শারীরিকভাবে চাইলেই আমরা যে কোনও জায়গায় যেতে পারি না। তার জন্য আরও অনেক প্যারামিটার লাগে।

    যাই হোক, আমাদের মন মূলত আরাম, নিশ্চয়তা আর ধারাবাহিকতা খোঁজার প্রবণতা থেকে বিশ্বাস করতে উন্মুখ হয়, যা এই পোড়া অনিশ্চিত দুনিয়ায় মানসিক স্বস্তি ও স্বায়িত্ব প্রদান করে। আমাদের মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতামূলক তথ্য এবং আবেগ দ্বারা চালিত হয়ে বিশ্বাস তৈরি করে, যা অজানা বিষয়ে ভরসা দেয় আর সামাজিক সম্পর্ক ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

    ১) মানসিক আরাম ও নিশ্চয়তাঃ- মানুষ সাধারণত যা আরামদায়ক বা সান্ত্বনাদায়ক তার ওপর ভিত্তি করেই কী বিশ্বাস করবে তা ঠিক করে। এটি অস্থির সময়ে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

    ২) অনিশ্চয়তা হ্রাসঃ সাধারণ মানুষের মন অজানা বা অনিশ্চিত বিষয়কে এড়িয়ে চলতে চায় (শুধুমাত্র অ-সাধারণরাই সব কিছুকে জানতে বুঝতে চায়। কিন্তু দুনিয়ায় সাধারণ মানুষের সংখ্যা বেশি। ফলে অ-সাধারণরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন; প্রান্তিক হয়ে পড়েন)। কিন্তু এড়িয়ে চললেও সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে একটা মন গড়া ধারণা সাধারণ মানুষেরা পোষণ করে। আর বিশ্বাস সেই অজানা বিষয়ের ওপর একটা কাল্পনিক নিশ্চিত ছক তৈরি করে, যা মনের ভয় কমায়।

    ৩) সামাজিক ও মানসিক প্রয়োজনঃ বিশ্বাস মানুষের মধ্যে একধরণের পারস্পারিক বন্ধন তৈরি করে, এমনকি অপরিচিতদের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করে। এটি মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যবোধ এবং সংহতিবোধ টিকিয়ে রাখে।

    ৪) অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসঃ শৈশব থেকে পাওয়া শিক্ষা, পরিবেশ ও অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে।

    ৫) আবেগ দ্বারা চালিতঃ অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগ সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।

    ৬) বিবর্তনীয় কারণঃ অনেকে মনে করেন যে মানুষের মন বিশ্বাস করবার জন্য বিবর্তনীয়ভাবেই প্রস্তুত, অনেকটা ভাষা শেখার ক্ষমতার মতো।

    আসলে মন বিশ্বাস করতে চায় কারণ এটি বাস্তবতাকে সরল করে তোলে আর অনিশ্চিত বিশ্বে একটি স্থিতিশীল মানসিক অবস্থা তৈরি করতে সাহায্য করে।

    তবে খুব বিশ্বাসী হলে, আবেগী হলে কিন্তু সমস্যা আছে। বিশ্বাস যুক্তি মানে না আর তার ফলে বিশ্বাসের মধ্যেকার সেই সন্মোহনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নানান কুচক্রী কিন্তু আপনাকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নিতে পারে। এখন সেই কাজ ভালো হলে ভালো; কিন্তু মন্দ হলে?

    আর সেখানেই আসে যাচাই করার কথা। যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করার কথা। সুতরাং, সেসব যদি না করতে পারেন স্ট্রেট বিশ্বাস করবেন না, আবার অবিশ্বাসও করবেন না আর করবো না বলে দেবেন।

    এখন আমরা দেখবো, পাশ্চাত্য দর্শনে যুক্তির স্বরূপ।

    মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী। সে নিজের সম্বন্ধে চিন্তা করে। তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে চিন্তা করে, এমনকি তার সামনে যে বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আছে, তার সম্পর্কেও চিন্তা করে। উদ্দেশ্য – জানতে চাওয়া, জ্ঞান লাভ করা আর নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করা। হ্যাঁ, অস্তিত্ব।

    ফলে মানুষ এমন একটি শাস্ত্রের জন্ম দিয়েছে যার নাম যুক্তিবিজ্ঞান বা লজিক। ভাষায় প্রকাশিত চিন্তা সম্পর্কীয় বিজ্ঞানই হল যুক্তি বিজ্ঞান। Logic is the science of thoughts as expressed in language. তবে যুক্তিবিজ্ঞান কিন্তু স্মৃতি, কল্পনা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে না; করে অনুমান নিয়ে।

    এখন, আমরা কীভাবে ঐ যুক্তি বা লজিকের সাহায্যে অনুমান করবো?

    Copi তাঁর Introduction to lOgic বইতে লিখছেন – Inference is a process by which one proposition in arrived at and affirmed on the basis of one or more other propositions accepted as starting point of the process. অর্থাৎ অনুমান হল সেই প্রক্রিয়া যার দ্বারা একটি বচনে উপনীত হওয়া যায় এবং সেই প্রক্রিয়ায়র শুরু হিসেবে যে এক বা একাধিক বচন গ্রহণ করা হয়, তার ভিত্তিতেই উপনীত বচন্টিকে স্বীকার করা হয়।

    উদাহরণ – যেখানে ধোঁয়া থাকে সেখানেই আগুণ থাকে।
    ঐ বাড়িটিতে ধোঁয়া আছে।
    অতএব, ঐ বাড়িটিতে আগুণ আছে বা লেগেছে।

    এই যুক্তির প্রকৃতি কী?

    যুক্তি হচ্ছে মন কয়েকটি বচনের সমষ্টি, যেগুলোর মধ্যে কোনও একটি বচনের সত্যতা অন্য কয়েকটি বচনের সত্যতার ওপর নির্ভির করে বলে দাবী করা হয়।

    An argument is any group of propositions of which one is claimed to follow from the others, which are regarded as providing evidence for the truth of that one – Introduction to Logic, Copi.

    এখন এই যুক্তি বা হেতুবাক্যের কিন্তু নিয়ম। যা খুশি তাই বসিয়ে দেওয়া যায় না।

    যেমন –

    কোনও কোনও বিদ্বান ব্যাক্তি হয় বাস্তবুদ্ধিহীন।
    কেষ্টা নয় একজন বিদ্বান ব্যাক্তি।
    অতএব, কেষ্টা নয় বাস্তবুদ্ধিহীন।

    বচন আর বাক্য কিন্তু এক নয়। বচন হল ঘোষক বাক্য।

    অ্যারিস্টটলীয়ান যুক্তিবিদ্যায় সম্বন্ধ, গুণ ও পরিমাণের ভিত্তিতে বচন বা proposition এর বিভিন্ন ভাগ করেছে।

    ১) সম্বন্ধের ভিত্তিতে – নিরপেক্ষ বা শর্তহীন বচন আর সাপেক্ষ বা শর্তাধীন বচন।
    উদাঃ- সকল মানুষ হয় মরণশীল। কোনও কোনও ভারতীয় হয় সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তিসম্পন্ন।

    ২) গুণের ভিত্তিতে – সদর্থক ও নঞর্থক। Positive and Negative proposition.

    আর ৩) পরিমাণ অনুসারে – সামান্য বা সার্বিক বচন আর বিশেষ বচন। Universal and particular proposition.

    আবার, সাপেক্ষ বচন দুই ধরণের হয়। প্রাকল্পিক ও বৈকল্পিক। Hypothetical and Disjunctive.

    ১) প্রাকল্পিকঃ যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।

    ২) বৈকল্পিকঃ মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।

    আবার নব্য যুক্তিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বচন ১) সরল ও ২) যৌগিক। বাট্রার্ন্ড রাসেল ছিলেন নব্য যুক্তিবিজ্ঞানের জনক।

    সরল – সত্যেন বসু বড় বৈজ্ঞানিক ছিলেন।
    যৌগিক – যদি ঠিক সময়ে বর্ষা না আসে তবে ফলন ভালো হবে না।

    যুক্তির আকার থেকে যেমন যুক্তি পাওয়া যায়, তেমনি উল্টোটিও ঘটে।

    সকল ক হয় খ
    সকল খ হয় গ
    অতএব, সকল ক হয় গ।

    আবার, যদি ক তবে খ

    অতএব, খ।

    যুক্তির বৈধতা –

    বৈধ যুক্তি বলতে বোঝায় – ১) যুক্তিটির হেতুবাক্য থেকে সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে নিঃসৃত হবে।
    ২) যুক্তির বৈধতার এই ভিত্তি হল প্রসক্তি সম্বন্ধ।
    ৩) এই বৈধতা আকারগত।
    ৪) বৈধতা অবরোহ যুক্তিরই হয়, আরোহ যুক্তির বৈধতা থাকে না।

    সকল মানুষ হয় মরণশীল।
    নেপোলিয়ান হয় মানুষ।
    অতএব, নেপোলিয়ান হয় মরণশীল।

    এখন হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্তের সত্যতা আর মিথ্যাত্ব নিয়ে ৪ রকমের বিকল্প বা সম্ভাবনা হতে পারে।

    ১) হেতুবাক্য সত্য, সিদ্ধান্ত সত্য
    ২) হেতুবাক্য মিথ্যা, সিদ্ধান্ত মিথ্যা
    ৩) হেতুবাক্য মিথ্যা, সিদ্ধান্ত সত্য
    ৪) হেতুবাক্য সত্য, সিদ্ধান্ত মিথ্যা

    দেখা যাবে যে চতুর্থ বিকল্পের ক্ষেত্রেই যুক্তি অবৈধ হবে।
    উদা- সকল মানুষ হয় মরণশীল।
    সকল দার্শনিক হন মানুষ।
    অতএব, কোনও দার্শনিক নন মরণশীল।

    এখন স্বতঃসিদ্ধ বচন হল বচনটি হবে এমন বচন যে তা সর্বদা সত্য হবে, কোনও অবস্থাতেই মিথ্যা হবে না।

    স্বতঃসিদ্ধ নিরপেক্ষ বচনঃ সকল মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন
    স্বতঃসিদ্ধ বৈকল্পিক বচনঃ এখন হয় বৃষ্টি পড়ছে, না হয় পড়ছে না।
    স্বতঃসিদ্ধ প্রাকল্পিক বচনঃ যদি বৃষ্টি পড়ে, তাহলে মাটি ভিজে থাকে। বৃষ্টি পড়ছে। অতএব, মাটি ভিজে।

    এখন যুক্তির বৈধতা আকারগত। অর্থাৎ যুক্তির বৈধতা যুক্তির আকারের ওপর নির্ভির করে, যুক্তির অন্তর্গত বচনের বিষয় বা উপাদানের ওপর নির্ভর করে না।

    যেমন – সব ক হয় খ। সব গ হয় খ। অতএব, সব ক হয় গ।
    উদাঃ- সব মিশরবাসী হয় আফ্রিকাবাসী। সব কায়রোবাসী হয় মিশরবাসী। অতএব, সব কায়রোবাসী হয় আফ্রিকাবাসী।

    আবার, সব ক হয় খ। সব গ হয় খ। সকল ক হয় গ।
    উদাঃ- সকল কুকুর হয় প্রাণী। সকল বিড়াল হয় প্রাণী। অতএব, সকল কুকুর হয় বেড়াল।

    এখানে হেতুবাক্য দুটি সত্য, কিন্তু সিদ্ধান্ত মিথ্যা। অতএব, যুক্তির আকারটি অবৈধ।

    আবার, এই আকারে এমন অনেক যুক্তি পাব যেগুলোর হেতুবাক্য ও সিদ্ধান্ত দুটোই সত্য।

    উদাঃ- সব ইওরোপীয় হয় মানুষ। সব ফরাসি হয় মানুষ। অতএব, সব ফরাসি হয় ইওরোপীয়।

    বৈধতা ও সত্যতাঃ -

    যুক্তিবিজ্ঞানে বৈধতা ও সত্যতা এক জিনিস নয় আর এই শব্দ দুটোকে আমরা একই বিষয়ের ওপর আরোপ করতে পারি না।। একটা বস্তুর যেমন আকার ও উপাদান থাকে; তেমনি যুক্তির থাকে আকার ও বিষয়বস্তু। আর কতকগুলো বচনের মাধ্যমেই যুক্তির বিষয় বস্তু প্রকাশিত হয়ে থাকে। ফলে এই বিষয়বস্তু সম্বন্ধেই আমরা সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন তুলি; কিন্তু যুক্তির আকার সম্বন্ধে বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্ন তুলি।

    অন্যভাবে বলা যায়, যুক্তির ধর্ম বৈধতা, কিন্তু সত্যতা আর মিথ্যাত্ব হল বচনের ধর্ম।

    উদাঃ সকল মানুষ হয় মরণশীল।
    সকল শিক্ষক হন মানুষ।
    অতএব, সকল শিক্ষক হন মরণশীল।

    আবার,

    সকল স্তন্যপায়ী প্রাণী হয় মানুষ।
    সকল স্তন্যপায়ী প্রাণী হয় চতুষ্পদী।
    সকল মানুষ হয় চতুষ্পদী।

    বলাই বাহুল্য যে নীচের বচনটি মিথ্যা; কিন্তু যুক্তির আকার বৈধ।

    এখন অবৈধ যুক্তিতেঃ-

    হেতুবাক্য সিদ্ধান্ত

    সত্য সত্য
    সত্য মিথ্যা
    মিথ্যা সত্য
    মিথ্যা মিথ্যা – হতে পারে।


    আবার, বৈধ যুক্তিতে,

    হেতুবাক্য সিদ্ধান্ত

    সত্য সত্য
    মিথ্যা মিথ্যা
    মিথ্যা সত্য- হতেও পারে।


    কিন্তু কোনও বৈধ যুক্তিতে
    হেতুবাক্য – সত্য কিন্তু সিদ্ধান্ত – মিথ্যা হতে পারে না।

    (ক্রমশ)
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | |
  • আলোচনা | ০২ মে ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ধুমা  - albert banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • রানা সরকার | ০২ মে ২০২৬ ১৬:০৩740444
  • গুরুচন্ডা৯-এর এডিটর এ টেবিল এর অপশন কি রাখা সম্ভব? হলে খুব ভালো হয়। নয়তো সেঈ টেবিলকে ছবি করো রে, সেই ছবি আপলোড করো রে তারপর সেই লিংক পেস্ট করলে তবে গিয়ে সম্ভব।
     
    যদি টেবিল অপশন রাখা যায়, খুব ভালো হয়।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন