আগের পর্বগুলো জানতে এখানে পড়ুন। পর্ব ১ , পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ , পর্ব ৯
, পর্ব ১০ , পর্ব ১১ |
৭৬ BCE, জেরুসালেম, সালোমে আলেকজান্দ্রিয়ার কথা
আজ অনেকদিন পরে লিখতে বসে খুব বেশি করে পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে | কোথা দিয়ে যে শুরু আর কোথায় যে চলে এলাম আজকে | এই হাসমোনিয়ান ম্যাকাবিদের পরিবারের বধূ হয়ে আসবার পর থেকেই ভেবেছি আমি সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো কিন্তু পারলাম আর কোথায় ! মানুষ যা ভাবে আর যিহোবা যা ভাবেন সবসময়ে তা মেলেনা বোধয় | শুরুটা হয়েছিলো আরিস্টোবুলুসের সঙ্গে আমার বিয়ের পর থেকেই | এই হাসমোনিয়ানদের বংশে বোধহয় কোন অভিশাপ আছে এরা কখনোই বিশ্বাস করতে পারেনা কাউকেই ! বিশেষ করে নিজেদের বংশের লোককে ! আরিস্টোবুলুস যেমন একদিন এক ভোজসভাতে ওর নিজের মায়ের পেটের ভাইকে সামরিক পোষাকে আসতে দেখেই ওকে বিদ্রোহী মনে করে জেলে পুরে দিলো, এমনকি যে মায়ের পেট থেকে ও জন্মেছে তাকেও জেলে ঢুকিয়ে দিলো ! এসব দেখে কোন মানুষ কি মাথা ঠিক রাখতে পারে ! আরিস্টোবুলুসকে অনেক বুঝিয়েছিলাম বললাম যে তুমি নিজেই রাতে ঘুমোতে পারবেনা তোমার মা আর নিজের ভাইকে জেলে পুরে ! শেষমেশ তাই হলো ! আমি তো ওকে বারণ করেছিলাম পইপই করে যে ও যেন রাজা হতে না যায় ওই গ্রীকদের মত কোনো ভাবেই ! এরপরে ভবিষ্যতে ফারিসীরা যে ওদের বিরুদ্ধে চলে যাবে ও কেন যে বুঝলোনা একেবারেই ! কে যে ওকে চালাতো তার নিজের বুদ্ধিতে কে জানে ? ফারিসীরা আমার নিজের জাতি ওদের আমি খুব ভালো করেই চিনি, কোনোভাবেই নবী দাউদের (বাইবেলে ডেভিড ) বংশের বাইরের কারুর রাজা হওয়া তাও বা গ্রীকদের স্টাইলে শাসন চালানো ওরা কোনোভাবেই মেনে নেবেনা, নেয়ওনি | তবে জেলখানায় না খেয়ে ওর মা আর ভাই চলে যাবার পরে মনের দিক থেকে ও খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলো আর একবছরের বেশী বাঁচেওনি এরপরে | কিন্তু শুধুই কি মন ভেঙ্গে পড়লেই এতো তাড়াতাড়ি কেউ চলে যেতে পারে নাকি ! ওকে কেউ কি বিষ খাওয়াছিলো ! কে জানে !
ইয়ানাইকে জেল থেকে বের করে বিয়ে করবার সিদ্ধান্তটা হটকারী ছিলোনা একেবারেই | হাসমোনিয়ানদের বংশে পুরুষ বলতে তখন একমাত্র ইয়ানাই ছাড়া কেউই বেঁচে ছিলোনা আরিস্টোবুলুস অকালে চলে গেলে | কিন্তু আমি ভুলে গেছিলাম যে আরিস্টোবুলুসের মতই ইয়ানাইও কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা | ওর অবশ্য কাউকে বিশ্বাস করবার কথাও নয় ! ওর জন্মের সময়েই ওর মাকে শত্রুর হাতে পড়ে চরম অসম্মান সহ্য করতে হয়েছিলো আরো খারাপ ব্যাপার ফারিসীরা তো ইয়ানাইকে সম্রাট জন হারকানুসের সন্তান বলতেও মেনে নিতে রাজী ছিলোনা | এজন্যই শুরু থেকেই ইয়ানাই ফারিসিদের ঘৃণা করতো | ইয়ানাই ফারিসীদের মুখ বন্ধ করে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে একটাই রাস্তা খুঁজে পেয়েছিলো, যুদ্ধ | যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে দিয়েই ও একমাত্র ভুলে থাকতে পারতো ওর জীবনের সমস্যা আর সীমাবদ্ধতাগুলো ! আমার কোনো কথাই ও শুনতে চাইতোনা যুদ্ধ করতে যাবার আগে | পরের দিকে ওর এই ব্যাপারটাকে ব্যাবহার করেছে ওই ইদুমীয় অ্যান্টিপেটার ! ওই ইদুমীয় শয়তানের জন্যে এখন আর ইয়ানাই আমার কোনো কথাই শুনতে চায়না ! গাজাতে গণহত্যা, হাজার হাজার ফারিসীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেও ওকে আটকাতে পারিনি কেননা ওর ভিতরে যে ভীতু বাচ্চাটা বসে আছে সে কোনোদিনই বাইরের দুনিয়াকে বিশ্বাস করতে পারেনি, সে যুদ্ধ আর প্রবল হিংসার মাধ্যমে নিজের মনের ভয়গুলোকে গলা টিপে মারতে চেয়েছে কিন্তু নিজের মনের ভয়কে কি কেউ মারতে পারে !
ইদানীং দেখছি মদ আর নগরবধূদের নিয়েই পড়ে আছে ইয়ানাই | এই সুযোগেই নিজের পায়ের মাটি আরো শক্ত করছে ওই ইদুমীয় অ্যান্টিপেটার | যুদ্ধ আর মদ এই দুটোই এখন চালাচ্ছে ইয়ানাইকে | আমাকে আর ছেলেদুটোকেও এখন আর খুব বেশী সময় দিতে চাইছেনা ইয়ানাই | কালকেই সৈন্যসামন্ত নিয়ে নাবাতিয়ার পাহাড়ের দিকে ও বেড়িয়ে পড়বে | এবার রেগেভ শহরটা দখল করতে চায় | যথারীতি আমাকে আর ছেলেদুটোকেও সাথে নিয়ে যাবে ইয়ানাই কেননা ওই ইদুমীয় অ্যান্টিপেটার ওকে বুঝিয়েছে যে যুদ্ধ করতে গিয়ে জেরুসালেমে অনুপস্থিত থাকলেই আমাকে গদীতে বসিয়ে দেবে ওই ফারিসীরা |
(আকণ্ঠ মদ ও নগরবধূদের মধ্যে ডুবে আছেন ইয়ানাই, দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন সালোমে )
রেগেভ, ৭৬ BCE,
জেরুসালেম থেকে খুব সকাল বেলাতেই সৈন্যসামন্ত নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন আলেক্সান্ডার ইয়ানাই | নাবাতিয়ার আরব রাজা ওবদাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ | এর কিছুদিন আগেই অতর্কিত আক্রমণে গাদারা উপত্যকার রণপ্রান্তরে হাসমোনিয়ানদের পর্যুদস্ত করেছেন ওবদাস | রেশম পথের সিল্ক আর মশলা ও সুগন্ধ যেসব নাবাতিয়ার শহর ঘুরে ভূমধ্যসাগরের বন্দর গুলোতে পৌঁছয় তার মধ্যে অন্যতম এই রেগেভ বা রাগাবা শহর | শহরের দুর্গ খুব উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা | তাই সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধ না করে শহরটাকে ঘিরে সব পথ আটকে বসে আছেন ইয়ানাই | খাবারে টান পড়লেই হয়তো আত্মসমর্পণ করবে নাবাতীয়রা | কিন্তু কতদিন লাগবে তা হতে ? জেরুসালেম থেকে এখানে আসতে আসতে ঘোড়ার পিঠ থেকে একবার পড়েই গেছিলেন ইয়ানাই অবশ্য তিনি আকন্ঠ মদ পান করে থাকেন বলেই হয়তো ঘোড়ার পিঠে বসা থাকা অবস্থায় সবসময় নিয়ন্ত্রণ থাকছিলোনা তার হাতে | চিকিৎসকেরা বারবার বারণ করেছেন তাকে এতো আকণ্ঠ মদ না খেতে কিন্তু ইয়ানাই একেবারেই শুনছেননা এসব কথা |
রাগাবা ঘেরাওয়ের প্রথম কয়েকদিন দেখা গেলো যে দুই পক্ষের কেউই একে অপরকে পর্যুদস্ত করতে পারছেনা সহজে | ইয়ানাইয়ের সৈন্যসামন্ত শহরের দুর্গের প্রাচীরের কাছে যাবার চেষ্টা করলেই প্রাচীরের উপরের থেকে বিষাক্ত তীর আর ফুটন্ত জল ফেলছে নাবাতীয়রা | সহজে তাই তারা হার স্বীকার করবেনা বলাই যায় | আবার রাতের আঁধারেও দুর্গপ্রাচীর টপকাতে গেলেই ছুটে আসছে নাবাতীয়দের বিষাক্ত তীর | প্রথম তিন চার দিন সরাসরি সৈন্যদের পাশে থেকে তদারক করছিলেন ইয়ানাই, তবে পঞ্চম দিনের দিন সকালে নিজের তাঁবু থেকে বেরুলেন না তিনি | কিছুক্ষন পরে সেনাপতিদের ইয়ানাইয়ের লিখিত নির্দেশ পাঠিয়ে দেওয়া হলো যুদ্ধ আর ঘেরাও চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে | সেনাপতিদের মাঝে মাঝে নিজের তাঁবুতে ডেকে বৈঠক করতে লাগলেন ইয়ানাই যুদ্ধের হালহকিকত নিয়ে | ইয়ানাইয়ের তাঁবুতে খানাপিনার আসরে মাঝে মাঝে ডাক পড়তে লাগলো অ্যান্টিপেটারএরও | তাঁবুতে বসেই দিনের অনেকটাই সুরা আর নগরবধূদের নিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন ইয়ানাই, মাঝে মাঝে সেনাপতিদের নির্দেশ দিচ্ছেন প্রয়োজনমত | এভাবেই আরো দুটোদিন কাটলো | সপ্তমদিনের দিন সন্ধেবেলা নাগাদ হঠাৎই সালোমের ডাক পড়লো ইয়ানাইয়ের তাঁবুতে | এ কটাদিন সালোমে নিজের তাঁবুতে শুধু যুদ্ধজয়ের প্রার্থনা আর ছেলেদের দেখাশুনো করেই কাটিয়েছেন | জেরুসালেম থেকে রওনা হবার পরে সালোমের বা ছেলেদের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা হয়নি এতোদিন ইয়ানাইয়ের |
ইয়ানাইয়ের তাঁবুতে তার বিছানার উপরে শুয়ে ছিলেন ইয়ানাই | ইয়ানাইয়ের পাশে শুধু তার ব্যক্তিগত একজন দাসী | ইয়ানাইয়ের মুখ দেখে খুব শুকনো ক্লিষ্ট মনে হলো সালোমের | এই কয়দিনেই যেন ইয়ানাইয়ের অনেক বয়স বেড়ে গেছে | চোখের তলায় কালিও পড়েছে | সালোমেকে দেখে কাছে বসতে ইশারা করলেন ইয়ানাই | বলে উঠলেন, "সালোমে আজ রাতটা মনে হয় আমার কাটবেনা | তবে আমার মৃত্যুর খবর এখনই বাইরে চাউর করবার দরকার নেই যতক্ষণ না যুদ্ধে আমরা জিতছি | আমি না থাকলে তুমিই এই সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হয়ে শাসন করবে | ছেলেদুটোই ভীষণ ছোট বয়সে ওদের উপরে ক্ষমতা চাপিয়ে ওদের সর্বনাশ করোনা | আর আমার মৃতদেহ জেরুসালেমে নিয়ে গিয়ে কবর দিয়ো আর ফারিসীদের সঙ্গে বিবাদ শেষ করো | তুমিই পারবে সালোমে জেরুসালেমে সব বিবাদ শেষ করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে | আরেকটা কথা, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো তোমার কোনো কথাই এজীবনে শুনিনি আমি |" সালোমের চোখে জল এসে গেলো এসব শুনে | ইয়ানাইয়ের হাতটা ধরে ফেললেন সালোমে "তোমাকে ক্ষমা করলাম ইয়ানাই |"
(মৃত্যুশয্যায় ইয়ানাই, কথা বলে ক্ষমতা হস্তান্তর করছেন স্ত্রী সালোমের কাছে )
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।