যুদ্ধ ও ধার : ইউরোপের সাম্রাজ্যের পতন আম্রিকার উত্থান
এই যুদ্ধ ও ধার সিরিজটাতে এর আগে অনেক কিছু লিখেছি | আজকে আমরা ফিরে যাবো পঁচাত্তর বছরের আগে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবে শেষ হয়েছে | জার্মানী ইতালি ও জাপান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের পৃথিবীটাকে তাদের নিজেদের ইচ্ছামত গড়ে তুলতে গিয়ে যুদ্ধে হেরে বিদ্ধস্ত ও আত্মবিলোপের প্রায় দোরগোড়াতে | ব্রিটেন ফ্রান্স যুদ্ধে জিতলেও জার্মান বোমাতে টুকরো টুকরো হয়ে আর পৃথিবীর অধিকারের জায়গাতে নেই | পড়ে আছে শুধু শেষ দুই পরাশক্তি আম্রিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন | নতুন পৃথিবীর বিলি ব্যবস্থা ভাগ বাঁটোয়ারা করতে বৈঠকে বসছে আম্রিকা ও তার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এলায়েন্স পার্টনার , সেসময়ের সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন ও ফ্রান্স | ঘটনা হচ্ছে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জেতবার জন্যে এই দুই দেশই আম্রিকার কাছে প্রচুর ধার করেছিলো | বর্তমান আম্রিকাকে দেখে সেসময়ের আম্রিকাকে কল্পনাই করা যাবেনা | সেই আম্রিকার ছিলো প্রচুর সারপ্লাস ক্যাপিটাল | এবং বর্তমান আম্রিকার মত ফিনান্সিয়াল speculation নির্ভর অর্থনীতিও ছিলোনা সেই আম্রিকার | তাই সারা পৃথিবী বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেকটাই যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেলেও টিকে ছিল আম্রিকা এবং যুদ্ধের পরের দুনিয়ার আবার গড়ে তুলতে দরকার ছিলো আম্রিকার সারপ্লাস ক্যাপিটালের | কিন্তু আম্রিকার চোখে তখন স্বপ্ন ইউরোপের বিশেষ করে ব্রিটেনের হাত থেকে তার এশিয়া ও অন্যান্য কলোনিগুলো যেখানে এতদিন ব্রিটিশ প্রভুত্ব ছিলো সেগুলো থেকে ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল মনোপলি কে হটিয়ে সেখানে নিজের ইন্ডাস্ট্রি আর সারপ্লাস ক্যাপিটাল কে একচেটিয়া হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা | যুদ্ধে জিতবার জন্যে যে বিপুল ধার ব্রিটেন ও ফ্রান্স করেছিলো সেগুলোই তখন হয়ে দাঁড়িয়েছে আম্রিকার হাতিয়ার |
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জেতার জন্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্স বিশাল ধার করতে বাধ্য হয়েছিলো আম্রিকার কাছে | এছাড়া তাদের কোন উপায়ও ছিলোনা | মূলতঃ যুদ্ধের জন্যে ফাইন্যান্স জোগাড় করতেই ব্রিটেনকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিশাল ধার আম্রিকার কাছ থেকে নিতে হয়েছিলো | ব্রিটেনের কাছে আম্রিকা হচ্ছে এংলো-স্যাক্সন জাতভাই কিন্তু আম্রিকা নারাজ ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন ধার মকুব করতে | ব্রিটেনের দাবী দাওয়া নিয়ে আলোচনা করতেই এসময়ে বসেছেন ব্রিটিশ আর আম্রিকি রাষ্ট্রপ্রধানরা | ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে একটি মিটিং হয়েছে | নিচে একটি কল্পিত কথোপকথন দেওয়া হলো |
১৯৪৫ সালের মার্চ মাস , ওভাল অফিস , ওয়াশিংটন ডিসি , একটি কল্পিত বৈঠক
গোলটেবিল বৈঠকে বসেছেন ব্রিটিশ আর আম্রিকার নেতৃবৃন্দ |
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল : মিস্টার প্রেসিডেন্ট , আপনারা আমাদের যুদ্ধকালীন মিত্র (kindred blood) , আমাদের দেশ থেকেই আপনারা এতো বছর আগে নতুন এই দেশে এসেছিলেন | আমাদের প্রচুর ধার আপনাদের কাছে | কিন্তু আপনাদের কাছে আবেদন আপনারা দয়া করে কিছু ঋণ মকুব করুন যেহেতু এখন ব্রিটেনের ধার শোধ করবার ক্ষমতায় নেই |
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ঠিকই বলছেন কিন্তু ভুলে গেলে চলবেনা আমাদের ধার | ১৯১৪ - ১৮ এই পাঁচ বছর ধরে যুদ্ধ করেও আপনারা অনেক ধার করেছিলেন কিন্তু এখনো সেসব পুরো শোধ হয়নি |
চার্চিল : আপনি চাইলেই সব ধার মাফ হয়ে যেতে পারে , আপনি তো প্রেসিডেন্ট |
রুজভেল্ট : না না মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার , আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমাদের দেশে আপনাদের মত কোন রাজা নেই , কংগ্রেস আর সিনেটের কাছে আমাকে জবাব দিতে হয় | এতো বড় ধার শোধ না করলে আমাকে কংগ্রেস আর সেনেট ছেড়ে কথা বলবেনা |
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্স যিনি ওই ব্রিটিশ প্রতিনিধি দলেই ছিলেন | তিনি বললেন |
কেইন্স : দেখুন আমাদের হাতে ধার শোধ করবার উপায় দুটোই আছে | হয় জার্মানী আর জাপান থেকে যুদ্ধ বাবদ ক্ষতিপূরণ অথবা আপনাদের বাজার খুলে দেওয়া যাতে আমরা এক্সপোর্ট করে আপনাদের ধার শোধ করতে পারি |
আম্রিকি অর্থনীতিবিদ লিও ক্রাওলি ছিলেন আম্রিকার দলে |
ক্রাওলি : মিস্টার কেইন্স আপনাদের হাতে আরো দুটো এসেট আছে যেগুলোর কথা আপনি কিন্তু বলছেন না | আপনাদের সোনা আর সবচেয়ে বড় এসেট আপনাদের সারা দুনিয়া জোড়া সাম্রাজ্য যেখানে সূর্য অস্ত যায়না | আপনাদের শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাতেই কত হীরে বলুন তো ! ভারত মিশর ইরাক ইরান এসব তো ছেড়েই দিচ্ছি ! আপনাদের ইম্পিরিয়াল প্রিভিলেজ আমাদের দরকার না হলে আমাদের ধার কোনোভাবেই শোধ হবেনা |
রুজভেল্ট : দেখুন মিস্টার ক্রাওলি যা বলছেন তাতে আমার সমর্থন আছে | আপনাদের বোঝা উচিত এর আগে ভার্সাই চুক্তিতে জার্মানীর উপরে আপনারা এতো বেশি ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে ছিলেন যার ফলেই গত পাঁচ বছর ধরে এই যুদ্ধ | আপনাদের বোঝা উচিত যে সোভিয়েতরা এখন বার্লিনের খুবই কাছে পৌঁছে গেছে | এখন জার্মানী আর জাপানের উপরে বেশী ক্ষতিপূরণের বোঝা চাপিয়ে দিলে হয় আরেকজন হিটলার আসবে নাহলে সোভিয়েতরা পুরো জার্মানি আর জাপান নিয়ে নেবে | সেটা নিশ্চয় আপনারা চাইবেন না | আর আমাদের বাজার খোলবার ব্যাপারে বলতে পারি যে সেনেট আর কংগ্রেস এখনই এতোটা উদারতা দেখাতে নাও দিতে পারে | ওরা ভাববে যে ব্রিটেনের যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আমরা কেন ভরবো নিজেদের বাজার খুলে ! আফটার অল , আপনারা তো আমাদের পরামর্শ নিয়ে এই যুদ্ধটা করেননি !!!
চার্চিল (গলায় বেশ উষ্মা ) : তার মানে আপনারা বলছেন যে ধার শোধ করবার জন্যে we must liquidate the British empire ? মিস্টার ক্রাওলি আপনারা আয়ারল্যান্ড থেকে বস্টনে এসেছিলেন এতো বছর আগে এখন সেই গ্রেট আইরিশ famine এর শোধ তুলছেন আমাদের বাগে পেয়ে তাই না !!! গত তিনশ বছর ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা আমাদের সাম্রাজ্য আজকে এইভাবে আপনারা চাইছেন কব্জা করতে তাই তো !!!
ক্রাওলি : যুদ্ধ আর ধারের মহিমা দেখলেন তো !! আপনারা এতো যুদ্ধ করে এতো বছরের সাম্রাজ্য বানিয়েছিলেন যেখানে সূর্য অস্ত যেতোনা এখন মাত্র পাঁচ বছরের একটা যুদ্ধেই ধার করে করে আপনারা এতো গুলো শতাব্দী ধরে বানানো সাম্রাজ্য হারাতে যাচ্ছেন !!! আমাকে দোষারোপ করে এখন লাভ আছে কি মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার ?
তো এই হলো সংক্ষেপে ব্রিটেনের আর তার সঙ্গে ইউরোপের কয়েক শতাব্দী ধরে বানানো সাম্রাজ্যের পতনের গল্প | যুদ্ধ এমন একটা প্রোজেক্ট যেখানে জিততে গেলে প্রচুর অর্থ লাগে কিন্তু জিতলেও সবসময়ে যে টেকে না সাম্রাজ্য !!!
আরো একটা জিনিস দেখলাম আমরা যে শেষপর্যন্ত ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নয় , ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যাওয়া শুরু হয়ে গেছিলো আরো অনেক আগেই !!!
ইউরোপের হাতের তাস
এসবই সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের গল্প | কিন্তু এখন ইউরোপের হাতেও একটা তাস আছে | জার্মানী সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে আছে প্রচুর সারপ্লাস ক্যাপিটাল | ওদিকে আম্রিকার মোট ধার তার টোটাল জিডিপির থেকে বেড়ে গেছে অনেক | ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড আর কানাডা নিয়ে নেবার হুমকি দেবার পরে একটি রিপোর্টে দেখা গেছে ইউরোপের হাতে আছে বেশ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের আম্রিকি এসেট | যেহেতু আম্রিকি অর্থনীতিতে মিলিটারী যুদ্ধ এসবে খরচ না কমিয়ে এবং নতুন ট্যাক্স বসিয়ে আয় না বাড়িয়ে ধার করে চলাই দস্তুর কাজেই আম্রিকা নির্ভরশীল ইউরোপের সারপ্লাস ক্যাপিটালের উপরে | কিন্তু ইউরোপের পেনশন ফান্ডস ইত্যাদির পক্ষে কি আদৌ সম্ভব তাদের সমুদ্রপাড়ের সাদা চামড়ার জাতভাইদের আম্রিকি ট্রেজারী বন্ডস ফেলে অন্য কোনো জায়গাতে ইনভেস্ট করা ? এর উপরেই নির্ভর করছে আম্রিকি সাম্রাজ্যের ভাগ্য !!! ইউরোপ কি পারবে আম্রিকার কাছে তার সাম্রাজ্য হারাবার বদলা নিতে এতো গুলো বছর পরে ???
রেফারেন্স
১ | হীরেন সিংহরায় , "নোবেল প্রাইজ ২০২২ : a critique " (বঙ্গানুবাদ ) , গুরুচণ্ডালী
২ | Michael Hudson, "Super Imperialism_ The Economic Strategy of American Empire" Chapter 5 LEND-LEASE, THE BRITISH LOAN AND FRACTURING OF THE BRITISH
EMPIRE,1941-1946 (2013 edition)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।