

ফ্যানি। (চিঠি পড়ে) দিদি, খবরের কাগজে আজ ডারউইনের মৃত্যুর খবর পড়েছিস নিশ্চয়ই। এখন সবার আগে শোন্ অন্ত্যেষ্টির খবর। এ চিঠি আজই পাবি।
ডারউইনের মৃতদেহ এখন মাটির নীচে, ভূগর্ভে। এ মাটি তাঁর শেষ বাসগৃহ ডাউন হাউসের মাটি নয়, শ্রফ্শায়ারে তাঁর পূর্বপুরুষের বাসস্থান দ্য মাউন্টের মাটিও নয়, এ মাটি দশম শতাব্দীর বেনেডিক্টিন সাধুদের নিত্যপূজার মন্দির-প্রাঙ্গণের, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের! হুঁ, অবিশ্বাসী ডারউইনের জন্যে এই মাটি! কিন্তু তাঁর তো কোন উপায় নেই। তিনি যে ইংলণ্ডের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান! তাই ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের মাটিই তাঁর শেষ মাটি। শ্রেষ্ঠ সন্তানের উপযুক্ত মাটি! চসারের, নিউটনের, কোলরিজের, স্যামুয়েল জনসনের, ট্র্যাফালগার বীর নেলসনের, স্যর চার্লস লায়েলের! ডারউইনেরও!
কিন্তু সে যাক। মনে আছে তোর, অনেক বছর আগে মাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম বোর্ণিওর থেকে? আজ মা নেই, তোকেই লিখছি। সে চিঠিতেও ডারউইনের কথা ছিল। আর ছিল অনেক আশার কথা। ডারউইন-ওয়ালেস পেপারের দৌলতে ওয়ালেসের নাম-ডাক হবার আশা, ভালো চাকরি পাবার আশা, আর হার্টফোর্ডে মাকে অন্তত শেষ জীবনটায় সুখে রাখার আশা। দেখা গেল সব মিথ্যে! মিথ্যে আশা! মা যেখানে ছিল, সেখানেই থেকে গেল। সারাটা জীবন!
কিন্তু ডারউইনের কী দোষ, তিনি তো চেষ্টা করেছিলেন! বৃটিশ ম্যুজিয়মের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যুরেটরের চাকরিটা তো হয়েই গিয়েছিল প্রায়! যখন শেষ পর্যন্ত হলো না, হাসতে হাসতে স্যর চার্লস বলেছিলেন ইটন-কেম্ব্রিজে পড়া লর্ড পরিবারের ছোট ছেলে যদি প্রতিদ্বন্দী থাকে, তাহলে প্রাইম মিনিস্টারও চাকরিটা দিতে পারতেন না তোমাকে!
আমার অদৃষ্ট!
স্যামূয়েল স্টীভেন্সকে মনে আছে তোর? আমার এজেন্ট, সেই অ্যামাজনের দিন থেকে। কত যে উপকার করেছেন আমার! ডারউইন-ওয়ালেস পেপারের আগে আমার যত লেখা ছাপা হয়েছে, যত রেকগনিশন, সবই তো স্টীভেন্সের দৌলতে। বোর্ণিওর থেকে যখন ফিরে আসি লণ্ডনে, স্টীভেন্সের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। খুব ধমকালেন। বললেন, ফিরে এসে বোকামি করেছি। ইংল্যাণ্ডের বড়লোক বিজ্ঞানীরা এখানে টিকতেই দেবে না আমাকে বিজ্ঞানী হিসেবে। ঠিকই বলেছিলেন উনি। টাকাপয়সার অভাবে সামান্য কিছুও আয় করার জন্যে যখন আমি হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখন নাকি আমার চলন-বলন একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে একেবারেই অশোভন ছিল, মোস্ট আনবিকামিং অব আ সায়েন্টিস্ট! বিশেষ করে পৃথিবী যে সমতল নয়, সেটা প্রমাণ করার ব্যাপারে জন হ্যাম্পডেনের মতো একটা অতি নগণ্য, অতি তুচ্ছ লোকের সঙ্গে বিবাদটা! ওরা তখন বলেছে কোন বিজ্ঞানী আমাকে সমর্থন করবে না, কারণ, কারণ ওয়ালেস হ্যাজ কনসিডারেবলি লস্ট হিজ কাস্ট—আমি নাকি জাত খুইয়েছি! শুনে আমার হাসি পেল দিদি, মোরিয়ার কথা মনে পড়ল, ও বলেছিল ওরা নাকি হাঁচোড়-পাঁচোড় করিয়ে টানতে টানতে আমাকে জাতে তুলেছে। ফেলে দেওয়ার সময় আর হাঁচোড়-পাঁচোড়ও নয়, ছুঁড়ে ফেলে দিল! ওরা কি জানত পাঁচশো পাউণ্ডে আমার কতদিনের বাজার হয়! কিন্তু ডারউইন ন'ন দিদি, তাঁর নামে বদনাম করব না, ডারউইনের বরাবর সহানুভূতি ছিল আমার জন্যে। প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোনকে চিঠি লিখে আমার একটা পেনশনের ব্যবস্থা উনিই তো করেছিলেন। আজও তো ওঁরই চেষ্টায় মাসে মাসে দুশো পাউণ্ড পেয়েই যাচ্ছি!
আজ ঠিক দুপুর বারটায় সেই ডারউইন করলেন শেষ যাত্রা। স্যর আইজ্যাক নিউটনের কবর থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে ডারউইনের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা। সেন্ট ফেথ চ্যাপেল থেকে কাদের কাঁধ বয়ে আনল ডারউইনকে? সবচেয়ে যাঁরা গণ্যমান্য, তাঁদের একেবারে সামনে, ডারউইনের বাঁদিকে, যার কাঁধ বয়ে আনছিলো ডারউইনকে, সে, কে বল্ তো? ভাবতে পারিস? এই খেতে-না-পাওয়া, মহান ইংল্যাণ্ডের বিজ্ঞানী সমাজে অপাঙ্কতেয়, তোর এই ছোট ভাইটা। শেষ পর্যন্ত ডারউইন যাত্রা করলেন ওয়ালেসেরই কাঁধে। স্যামুয়েল স্টীভেন্স কী বলবেন, অরিজিন অব স্পীশিসের ডারউইন ওয়ালেস পেপারের কাঁধে?
কে জানে! কিন্তু আজ তো তাঁর শেষ যাত্রা। ইংলণ্ডের গণ্যমান্যরা বললেন, আর আমি তাঁকে কাঁধ দিলাম। আমি নিজে ভাবিনি, গণ্যমান্যরা বললেন। আমার কাঁধে যেতে হলো তাঁকে, শেষ যাত্রায় গেলেন তো! আজ মা থাকলে কী বোল্তো!
হীরেন সিংহরায় | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:২৬738201