এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  নাটক  শনিবারবেলা

  • ওয়ালেস! ওয়ালেস!

    শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়
    নাটক | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ৩৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ৫ম (শেষ অঙ্ক)

    অন্ধকার মঞ্চের এক কোণে বসে আছে ফ্যানি, ওয়ালেসের বৃদ্ধা দিদি, স্পট-লাইটের আলোয়। ফ্যানির হাতে ওয়ালেসের লেখা
    একটা চিঠি, চিঠিটা যতক্ষণ পড়া হবে, ফ্যানিকে স্পট-লাইটেই দেখা যাবে। পর্দা উঠলে ফ্যানি চিঠিটা পড়তে শুরু করবে; কিছুক্ষণ
    এ ভাবে চলার পর ফ্যানি চিঠিটা পড়তেই থাকবে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শোনা যাবে না, তার বদলে শোনা যাবে ওয়ালেসের নিজের কণ্ঠস্বর। চিঠি পড়া যত এগোবে, ফ্যানির চোখের জলে তার সারাটা মুখ ততই ভিজে যেতে থাকবে। চিঠির একেবারে শেষের দিকে ফ্যানির পেছনে একটু একটু করে আলো বাড়তে বাড়তে একটা সাদা পর্দা দেখা দেখা যায়। পর্দায় একটা কফিন ঘাড়ে শববাহকদের সিল্যুটেড একটা ছায়া ধীরে, অতি ধীরে এগোতে থাকে।


    ফ্যানি। (চিঠি পড়ে) দিদি, খবরের কাগজে আজ ডারউইনের মৃত্যুর খবর পড়েছিস নিশ্চয়ই। এখন সবার আগে শোন্‌ অন্ত্যেষ্টির খবর। এ চিঠি আজই পাবি।

    ডারউইনের মৃতদেহ এখন মাটির নীচে, ভূগর্ভে। এ মাটি তাঁর শেষ বাসগৃহ ডাউন হাউসের মাটি নয়, শ্রফ্‌শায়ারে তাঁর পূর্বপুরুষের বাসস্থান দ্য মাউন্টের মাটিও নয়, এ মাটি দশম শতাব্দীর বেনেডিক্টিন সাধুদের নিত্যপূজার মন্দির-প্রাঙ্গণের, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের! হুঁ, অবিশ্বাসী ডারউইনের জন্যে এই মাটি! কিন্তু তাঁর তো কোন উপায় নেই। তিনি যে ইংলণ্ডের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান! তাই ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের মাটিই তাঁর শেষ মাটি। শ্রেষ্ঠ সন্তানের উপযুক্ত মাটি! চসারের, নিউটনের, কোলরিজের, স্যামুয়েল জনসনের, ট্র্যাফালগার বীর নেলসনের, স্যর চার্লস লায়েলের! ডারউইনেরও!

    কিন্তু সে যাক। মনে আছে তোর, অনেক বছর আগে মাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম বোর্ণিওর থেকে? আজ মা নেই, তোকেই লিখছি। সে চিঠিতেও ডারউইনের কথা ছিল। আর ছিল অনেক আশার কথা। ডারউইন-ওয়ালেস পেপারের দৌলতে ওয়ালেসের নাম-ডাক হবার আশা, ভালো চাকরি পাবার আশা, আর হার্টফোর্ডে মাকে অন্তত শেষ জীবনটায় সুখে রাখার আশা। দেখা গেল সব মিথ্যে! মিথ্যে আশা! মা যেখানে ছিল, সেখানেই থেকে গেল। সারাটা জীবন!

    কিন্তু ডারউইনের কী দোষ, তিনি তো চেষ্টা করেছিলেন! বৃটিশ ম্যুজিয়মের অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যুরেটরের চাকরিটা তো হয়েই গিয়েছিল প্রায়! যখন শেষ পর্যন্ত হলো না, হাসতে হাসতে স্যর চার্লস বলেছিলেন ইটন-কেম্ব্রিজে পড়া লর্ড পরিবারের ছোট ছেলে যদি প্রতিদ্বন্দী থাকে, তাহলে প্রাইম মিনিস্টারও চাকরিটা দিতে পারতেন না তোমাকে!

    আমার অদৃষ্ট!

    স্যামূয়েল স্টীভেন্সকে মনে আছে তোর? আমার এজেন্ট, সেই অ্যামাজনের দিন থেকে। কত যে উপকার করেছেন আমার! ডারউইন-ওয়ালেস পেপারের আগে আমার যত লেখা ছাপা হয়েছে, যত রেকগনিশন, সবই তো স্টীভেন্সের দৌলতে। বোর্ণিওর থেকে যখন ফিরে আসি লণ্ডনে, স্টীভেন্সের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। খুব ধমকালেন। বললেন, ফিরে এসে বোকামি করেছি। ইংল্যাণ্ডের বড়লোক বিজ্ঞানীরা এখানে টিকতেই দেবে না আমাকে বিজ্ঞানী হিসেবে। ঠিকই বলেছিলেন উনি। টাকাপয়সার অভাবে সামান্য কিছুও আয় করার জন্যে যখন আমি হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখন নাকি আমার চলন-বলন একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে একেবারেই অশোভন ছিল, মোস্ট আনবিকামিং অব আ সায়েন্টিস্ট! বিশেষ করে পৃথিবী যে সমতল নয়, সেটা প্রমাণ করার ব্যাপারে জন হ্যাম্পডেনের মতো একটা অতি নগণ্য, অতি তুচ্ছ লোকের সঙ্গে বিবাদটা! ওরা তখন বলেছে কোন বিজ্ঞানী আমাকে সমর্থন করবে না, কারণ, কারণ ওয়ালেস হ্যাজ কনসিডারেবলি লস্ট হিজ কাস্ট—আমি নাকি জাত খুইয়েছি! শুনে আমার হাসি পেল দিদি, মোরিয়ার কথা মনে পড়ল, ও বলেছিল ওরা নাকি হাঁচোড়-পাঁচোড় করিয়ে টানতে টানতে আমাকে জাতে তুলেছে। ফেলে দেওয়ার সময় আর হাঁচোড়-পাঁচোড়ও নয়, ছুঁড়ে ফেলে দিল! ওরা কি জানত পাঁচশো পাউণ্ডে আমার কতদিনের বাজার হয়! কিন্তু ডারউইন ন'ন দিদি, তাঁর নামে বদনাম করব না, ডারউইনের বরাবর সহানুভূতি ছিল আমার জন্যে। প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোনকে চিঠি লিখে আমার একটা পেনশনের ব্যবস্থা উনিই তো করেছিলেন। আজও তো ওঁরই চেষ্টায় মাসে মাসে দুশো পাউণ্ড পেয়েই যাচ্ছি!

    আজ ঠিক দুপুর বারটায় সেই ডারউইন করলেন শেষ যাত্রা। স্যর আইজ্যাক নিউটনের কবর থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে ডারউইনের জন্যে নির্দিষ্ট জায়গা। সেন্ট ফেথ চ্যাপেল থেকে কাদের কাঁধ বয়ে আনল ডারউইনকে? সবচেয়ে যাঁরা গণ্যমান্য, তাঁদের একেবারে সামনে, ডারউইনের বাঁদিকে, যার কাঁধ বয়ে আনছিলো ডারউইনকে, সে, কে বল্‌ তো? ভাবতে পারিস? এই খেতে-না-পাওয়া, মহান ইংল্যাণ্ডের বিজ্ঞানী সমাজে অপাঙ্কতেয়, তোর এই ছোট ভাইটা। শেষ পর্যন্ত ডারউইন যাত্রা করলেন ওয়ালেসেরই কাঁধে। স্যামুয়েল স্টীভেন্স কী বলবেন, অরিজিন অব স্পীশিসের ডারউইন ওয়ালেস পেপারের কাঁধে?

    কে জানে! কিন্তু আজ তো তাঁর শেষ যাত্রা। ইংলণ্ডের গণ্যমান্যরা বললেন, আর আমি তাঁকে কাঁধ দিলাম। আমি নিজে ভাবিনি, গণ্যমান্যরা বললেন। আমার কাঁধে যেতে হলো তাঁকে, শেষ যাত্রায় গেলেন তো! আজ মা থাকলে কী বোল্‌তো!




    চিঠি পড়া শেষ হলে স্পট-লাইট নিভে যায়। মঞ্চে শুধু দেখা যায় সাদা পর্দায় শববাহকদের ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে
    এগোচ্ছে; নেপথ্যে একটি গান শোনা যায়। যতক্ষণ গান চলে, চলন্ত ছায়ামূর্তিরা ততক্ষণই দৃশ্য। গান—

    রাম নাম সচ্‌ হ্যে

    চিরকালই সচ্‌ হ্যে।
    হিন্দু হোক্‌ বা ক্রীশ্চান
    ইহুদি মুসলমান
    পুরোহিত-বিজ্ঞানী
    আন্‌পড় বা জ্ঞানী
    নাৎসী-কম্‌নিস্টি
    সব রামেরই সৃষ্টি!
    ভাঁটিখানায় চিৎপাত
    রামের নামই ঠিক বাত!
    রাম নাম সচ্‌ হ্যে
    রাম নাম সচ্‌ হ্যে।
    করো রামের কীর্তন
    যোগ্যের উদ্বর্তন।
    বাঁচার লড়াই কে জেতায়?
    রাম নাম সচ্‌ হ্যে।
    সাত পুরুষের যে ধন
    (সে)ন্যাচারাল সিলেকশন?
    এক পুরুষেই চাও তা?
    (বুঝি) রামকে দেবে ভাঁওতা?
    সাধুর কথায় মন দাও
    (শুধু) রামের জয়গান গাও।
    (শোন) আক্কেল হবার কী উপায়
    রাম নাম সচ্‌ হ্যে।
    রাম নাম সচ্‌ হ্যে।
    রাম নাম সচ্‌ হ্যে।
                                            ।।পর্দা।।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • নাটক | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ৩৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:২৬738201
  • অসাধারণ! 
     
    যদি অনুমতি দেন , যোগ করি - আপনার 
    ,ওয়েসটমিনসটার এ‍্যাবি যদিও লেখা হয় Abbey
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন