

নিপাহ ভাইরাস নামটা মাঝেমধ্যেই খবরে আসে। তবে বাংলার মানুষ আগে অতটা চিন্তিত ছিল না কারণ বেশিরভাগেরই ধারণা, ভাইরাস টাইরাস কেরালা থেকে আসে। বাংলা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য বা রাষ্ট্র গুলিতে নিপাহ যে মাঝেমধ্যেই হানা দেয়, এ খবরটা অনেকেরই অজানা। এখন অনেকেই আতঙ্কিত কারণ পশ্চিমবঙ্গে কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী নিপাহ ভাইরাস এ আক্রান্ত। রোগটা সুবিধের নয়, মারণহার খুব বেশি, আর বাদুড় থেকে এই রোগ ছড়ায় - এই তথ্যগুলো কম বেশি সবার জানা। আজকাল সবাই সব ক্ষেত্রে ভিলেন খোঁজে। অতএব বলাই বাহুল্য, এবারের ভিলেন বাদুড়। বাদুড় তাড়াও। গাছে বাদুড়ের বাসা? কেটে ফেলো গাছ! এটা কি কখনো সমাধান হতে পারে? তার চেয়ে আসুন, আলোচনা করি নিপাহ ভাইরাস থেকে কি করে বাঁচা যায়।
নিপাহ-র উৎপাতের ইতিহাস:
Covid ইত্যাদি অনেক ভাইরাস-এর মতই নিপাহ-র ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরে প্রায় ৩০০ লোক আক্রান্ত হয়েছিল এবং তার মধ্যে ১০০ লোক বাঁচেনি। মারণহার প্রায় ৪০%। দেখা গেল আক্রান্ত অনেকেই শুয়োর খামার এর সাথে নানাভাবে জড়িত। মালয়েশিয়া সরকার তখন প্রায় ১০ লাখ শুয়োরকে মারার আদেশ দিয়েছিল - রোগকে আটকে রাখার জন্য। অবশ্যই এসব থেকে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল মারাত্মক। শুয়োরগুলি কিন্তু আক্রান্ত হয়েছিল বাদুড় থেকে। এই যে বাদুড় থেকে শুয়োর, শুয়োর থেকে মানুষ রোগ ছড়ানো - একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে Zoonosis। আমার সাম্প্রতিক প্রবন্ধের Zoonosis নিয়ে আরেকটু বিশদ আলোচনা আছে।
দু-বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ২০০১ সালে নিপাহ হানা দিল এবং প্রতি শীতেই হানা দেওয়া শুরু করল। ২০০১ সালে শিলিগুড়িতেও নিপাহ-র ভালোমতো আক্রমণ হয়েছিল , আক্রান্ত ৬৬ জনের মধ্যে ৪৫ জনই মারা যায়। মারণহার ৬৮%। ২০০৭ সালে নদীয়াতে পাঁচজন আক্রান্ত, পাঁচ জনই মৃত। মারণহার ১০০% । ২০১৮ থেকে কেরালায় প্রতিবছর নিপাহ-র প্রাদুর্ভাব ঘটে, আক্রান্তের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও মারণহার যথেষ্ট বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নিপাহ-র উপকেন্দ্র ধরে। কারণ এই রোগ ফিলিপিন্স ও থাইল্যান্ডেও মাঝেমধ্যেই হানা দেয়।
বাদুড় কি করে?
বাদুড় একটা অদ্ভুত প্রাণী - পাখির মত ডানা ঝাপটে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু স্তন্যপায়ী। এই ডানা ঝাপটানোর জন্য এদের শক্তি খরচ হয় দৌড়বাজ প্রাণীদের ও তিন গুণ। এই অপরিসীম শক্তি খরচার ধাক্কায় এদের অক্সিজেন অণুগুলো সদা সক্রিয় হয়ে থাকে, যেগুলো কোষের সমস্ত মালমসলাকে ভাংচুর করে। এত ভাঙচুর করলে আবার বাদুড় বাঁচবেই বা কি করে? বাদুড়ের শরীর সেই জন্য তৈরি করেছে অন্যপ্রাণীদের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধ ক্ষমতা , আর ঝটপট সমস্ত ভাঙচুর সারিয়ে ফেলার ক্ষমতা। এই ক্ষমতাগুলিও আবার একটু অদ্ভুত। প্রকৃতি থেকে অন্যান্য প্রাণীদের মতই বাদুড়ের শরীরেও নানা রকম ভাইরাস ঢোকে। কিন্তু রোগ সৃষ্টি করতে পারে না। ভাইরাসগুলি কিন্তু ধ্বংস হয় না, বাদুড়ের শরীরেই থেকে যায়। একাধিক রকম ভাইরাস নিজেদের মধ্যে জীন দেওয়া নেওয়া করে আবার নতুন জাতের ভাইরাস ও সৃষ্টি করে। তাছাড়া প্রাকৃতিক নিয়মে যে ছোট ছোট পরিবর্তন আসে জিনের মধ্যে, যাকে মিউটেশন বলা হয়, তার মাধ্যমেও তৈরি হয় নতুন নতুন প্রজাতির ভাইরাস। এই সব পুরোনো, নতুন ভাইরাস বাদুড়ের শরীরকে আক্ষরিক অর্থে “রোগের ডিপো” বানিয়ে ফেলে - অর্থাৎ কিনা বাদুড়ের শরীরে এইসব ভাইরাস আরাম করে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে বসবাস করে কিন্তু বাদুড়ের কিছুটি হয় না। বাদুড়ের শরীর থেকে যে সমস্ত রস বেরোয়- থুতু, লালা, মূত্র, মল, তার মাধ্যমে তারা প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে, অন্য প্রাণীর শরীরেও ঢোকে। বাদুড়কে এই জন্য বৈজ্ঞানিক ভাষায় বাহক অর্থাৎ carrier বলে।
বাদুড় থেকে মানুষে ভাইরাস বা রোগ ছড়াতে পারে চার ভাবে।
১) সরাসরি: বাদুড়ের এঁটো কোন কিছু মানুষ খেলে। কেরালাতে বলা হয়, বাদুড়ে ঠুকরানো ফল থেকে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। বাংলায় বাদুড় থেকে মানুষে রোগ ছড়ানোর মাধ্যম মনে করা হয় বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় একটা জিনিসকে - টাটকা খেজুরের রস। বাংলাদেশের বাৎসরিক নিপাহ-র আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নানা রকম গবেষণা কে উৎসাহিত করেছে। আমেরিকার সুবিখ্যাত জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ব্লুমবার্গ জনস্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সাথে হাত মিলিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেছিল।
যেসব জায়গায় নিপাহ-র আক্রমণ দেখা গেছে, সেই অঞ্চলের যে সব গাছে রাতে খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয় সেখানে তারা ক্যামেরা ফিট করে রাখা হল। সারা রাতে রসের হাঁড়ির মুখের কাছের ছবি রেকর্ড করা হল । দেখা গেল ফলখেকো বাদুড়, এবং ছোট বাদুড় (microbat) - যারা মোটামুটি সর্বভুক, দু ধরণের প্রাণীই হাঁড়ির আশে পাশে ঘুরছে। কিন্তু ফল খেকো বাদুড় অনেক বেশি সময় হাঁড়ির একদম কাছটাতে থাকছে। ওই সব হাঁড়ির রস সংগ্রহ করে তাতে বাদুড়ের লালা এমন কি মল মূত্র অনেক কিছু পাওয়া গেল। আসলে বাদুড় তো গাছেই ঝুলে মল মূত্র ত্যাগ করে - যেখানে রসের হাঁড়ি রাখা হয়েছে , তার ওপরের কোনো ডালে বসে যখন মল মূত্র ত্যাগ করে, তা সোজা হাঁড়ির খোলা মুখের মধ্যে পড়ে। এছাড়া হাঁড়ির মুখে মুখ লাগিয়ে বাদুড় রস খাচ্ছে, এমন ছবিও ধরা পড়ল। শুধু তাই নয়, বাদুড়ের এঁটো এই রস ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করার পর তাতে নানারকম ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আর ওই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় এমন বাদুড়ে পাওয়া গেছে নিপাহ ভাইরাস। অন্য একটি পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, খেজুর রসের মত কোন তরলের নিপাহ ভাইরাস ২২ ডিগ্রী তাপমাত্রায় সাতদিন দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। এই সমস্ত তথ্য মিলিয়ে বৈজ্ঞানিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে বাংলায় বাদুড়ের এঁটো খেজুর রস থেকেই নিপাহ ছড়াতে পারে ।

২) শুয়োর ইত্যাদি খামারের পশুর মাধ্যমে: বাদুড়ের লালা কিংবা মল মূত্র খামারে পশু খাদ্যের সাথে অনেক সময়েই মিশে যায়। এর মাধ্যমে শুয়োরের শরীরে ভাইরাস ঢুকে আরও বংশবৃদ্ধি এবং রোগ সৃষ্টি করে। ভাইরাস অনেক সময় মিউটেশন হয়ে আরো সাংঘাতিক ও হয়ে যায়। এই সময় খামারে যেসব মানুষ পশুদের দেখাশোনা করে, তাদের সংক্রমণ হতে পারে।
৩) বাদুড়ের কাঁচা মাংস থেকে: Covid এর শুরু সম্ভবত এভাবেই শুরু হয়েছিল। একটা প্রশ্ন সবার মনে জাগতেই পারে, যে চীনেরা তো এরকম নানা প্রাণীর মাংস সবসময়ই খেয়ে থাকে তাহলে সব সময় তো প্রাদুর্ভাব হয়না। এর উত্তর হল বাদুড়ের শরীর নানা ভাইরাসের ডিপো হতে পারে কিন্তু সব ভাইরাস রোগ সৃষ্টিকারী নয়। যেমন বলেছিলাম, বাদুড়ের শরীরে প্রতিনিয়ত যেসব নতুন ভাইরাস সৃষ্টি চলে, হঠাৎ হঠাৎ তারা রোগসৃষ্টিকারী হয়ে পড়তে পারে। অথবা প্রকৃতির অন্য কোথাও তৈরি কোন নতুন রোগসৃষ্টিকারী ভাইরাসও বাদুরের শরীরে ঢুকে পড়ে বাদুড়কে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে মহামারী ছড়াতে পারে। এখনো নিপাহ ভাইরাস সম্বন্ধে এই পথে ছড়ানোর কোনো রিপোর্ট নেই।
৪) বাদুড় থেকে/অজানা ঘুরপথে আক্রান্ত মানুষের ছোঁয়াচ থেকে/স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে যেটাকে ইংরেজিতে nosocomial infection বলে।
পশ্চিমবঙ্গে এখন যে কটা কেস দেখা গেছে তারা সবাই স্বাস্থ্যকর্মী। এখনো পর্যন্ত যা জানা গেছে, একজন স্বাস্থ্যকর্মী পূর্ব বর্ধমানে দেশের বাড়িতে গিয়েছিল ছুটিতে। সে কাজ করে বারাসাতে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। কাজে ফিরে আসার পরেই সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তার একজন সহকর্মীও একই সময় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে একই লক্ষণ নিয়ে। স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষায় প্রমাণিত হল এদের দুজনের নিপাহ সংক্রমণ হয়েছে। এরা দুজন এখন খুবই অসুস্থ, সম্ভবতঃ ভেন্টিলেটর এ। আরো তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী ও নিপাহ ভাইরাসের মৃদু সংক্রমণে আক্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। এরা সকলেই ওই প্রথম স্বাস্থ্যকর্মীর সংস্পর্শ এসেছিল। এদেরকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে এবং এই পাঁচ জনের সংস্পর্শে কারা কারা এসেছে গত ১৫-২০ দিনে তাদের খোঁজা চলছে - যাকে contact tracing বলে। প্রায় ১৫০ জনকে আপাতত চিহ্নিত করে ঘরবন্দি করে রাখা হয়েছে। প্রথম রোগী “হয়ত খেজুরের রস খেয়েছিল” বলে মনে করা হলেও রোগের কারণ প্রমাণিত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের পুরোনো বছরগুলির কেস গুলিতে একজন প্রথমে আক্রান্ত হওয়ার পর তার পরিবারের দু-একজন তার থেকে আক্রান্ত হয়েছিল। খেজুরের রস বা বাদুড় সংক্রান্ত সরাসরি কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় কি করে?
নিপাহ ছড়ানোর ধরণ অনেকটা Covid এর মত - আক্রান্ত মানুষের দেহ রস যেমন হাঁচি কাশি মূত্র ইত্যাদি থেকে কাছাকাছি থাকা সুস্থ মানুষের দেহের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ায়।
তাহলে বাদুড় কি ভিলেন নয়?
প্রকৃতি যাকে যে ভাবে সৃষ্টি করেছে, তাকে আমরা ভিলেন ভাবি কোন অধিকারে? আমরা, মানুষরাই তো ওদের অরণ্যের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে সর্বত্র অনুপ্রবেশ চালাচ্ছি। বাদুড় পরিবেশের ভারসাম্য অনেকটাই রক্ষা করে। পরাগমিলনে সাহায্য করে, ছোটবাদুড় ও চামচিকেরা পোকামাকড় খেয়ে প্রাকৃতিক ভাবে ক্ষতিকারক পোকামাকড়কে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষকেই সাবধান হতে হবে।
শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্ত ঠোকরানো ফল খাবে না, তাদের উদ্দেশ্যে বলা যায় বেড়াতে গিয়ে কাঁচা খেজুরের রস খেয়োনা। কিন্তু ফল, খেজুর রস ইত্যাদি আমাদের কৃষিভিত্তিক কুটির শিল্প। অনেক মানুষকে রুটি রুজির জোগাড় দেয়। তাদের বাঁচার জন্য ফলও সংগ্রহ করতে হবে, খেজুর রসও। এখনো পর্যন্ত ফল বা রস নাড়াঘাঁটার কারণে নিপাহ সংক্রমণের কথা সরাসরি কোথাও বলা হয়নি, কারণ বাংলাদেশের কেসগুলিতে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার উল্লেখ আছে। হয়ত এমন হতে পারে, বাদুড়ের শরীর থেকে লালা ইত্যাদিতে বেরোনো ভাইরাস সরাসরি গলায় ঢুকলেই সংক্রমণ হতে পারে। হাতে লেগে শরীরে ঢুকলে হয়ত অনেকটা নিস্তেজ হয়েই ঢোকে। কিন্তু এগুলো সব অনুমান মাত্র।
অনুমানের আরো অনেক সুযোগ আছে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশে যেখানে শুয়োর থেকে নিপাহ ছড়ায়, সেখানে দেখা গেছে শুয়োরের মধ্যে নিপাহ ঢুকে আরো তেজী হয়ে মানুষকে আক্রমণ করে। হয়ত মানুষের মধ্যেও এরকম বাহক আছে, যারা নিপাহ সংক্রমণের পর তেমন কিছু গুরুতর লক্ষণ দেখায় না, কিন্তু তাদের মারফৎ নিপাহ আরো তেজী হয়ে আশপাশের লোককে সংক্রমিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাহকে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখতে বলেছে চড়া মারণহারের জন্য, কিন্তু ঠিক কত মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এক একটি প্রাদুর্ভাবে এবং ঠিক কতগুলো বাদুড় নিপাহ বহন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এ সম্বন্ধে কোনো পরিষ্কার ধারণাই নেই কারুর। সেই ধারণাটা পেতে গেলে অনেক গবেষণা করা দরকার, কিন্তু গবেষণার টাকা কে দেবে? মূর্খরা দেশ চালানোর অধিকার পেয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার টাকা ছাঁটতে ছাঁটতে তলানিতে এনে ফেলেছে। এমত অবস্থায় যেহেতু নিপাহ-র ইতিহাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা সে রকম বেশি নয় বলে অহেতুক আতঙ্ক ছড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই।
যারা আমাদের অন্ন যোগায়, তারা প্রতি নিয়ত অনেক বিপদের ঝুঁকিতেই কাজ করে - বিষাক্ত পোকা মাকড়, সাপ, বাঘ, কুমির, জীবাণু … এদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার সরঞ্জামের প্রয়োজন। কিন্তু আজও পৃথিবীর চতুর্থ ধনীদেশ বলে দাবি করা ভারতের এদের সুরক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থাই নেই। অন্ততঃ পক্ষে, যখন কোনও প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে, তখন গ্রাম দেশে কি করা উচিত আর অনুচিত এই নিয়ে সরকারি বেসরকারি সবার ঠিক মত প্রচারের ব্যবস্থা করা উচিত। যেসব লোকেরা এমন কি শিশুরা ফল এবং রস সংগ্রহ করে, তাদের ঠোকরানো ফল এবং কাঁচা খেজুর রস খাওয়ার লোভ সংবরণ করতে শিক্ষা দেওয়া উচিত।
যেখানে মানুষ থেকে মানুষ সংক্রমণ চলছে, যেমন রোগীর বাড়ির মধ্যে বা হাসপাতালে যারা সংক্রমিত রোগীর কাছাকাছি আসছে, তাদের সবার Covid আমলের মত PPE পরা এবং ধোয়াধুয়ি করে নিজেদের পরিষ্কার রাখা দরকার।
নিপাহ সংক্রমণের লক্ষণ:
বিভিন্ন দেশে পাওয়া নিপাহ ভাইরাসের প্রজাতি ভিন্ন, এবং তার সাথে সংক্রমণের পর রোগের লক্ষণ ও ভিন্ন। মালয়েশিয়া তে পাওয়া ভাইরাসের নাম NiVM, কেরালায় NiVI (I=Indian) এবং বাংলাদেশে NiVB। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের গায়ে বলে এখানেও NiVB ই পাওয়া যায়। NiVI এবং NiVB জীনগত ভাবে অনেকটা কাছাকাছি হলেও সংক্রমণের পর NiVI তে আগেই মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফেলাইটিস শুরু হয় , জ্বর শ্বাসকষ্টের সাথে। NiVB তে জ্বর শ্বাসকষ্ট প্রবল, পরের দিকে এনসেফেলাইটিস। NiVM তে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এসব দেখা যায়, যদিও এখানে মৃত্যুহার কম। সব প্রজাতির সংক্রমণ ই কিন্তু শুরু হয় সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মত লক্ষণ দিয়ে অর্থাৎ জ্বর মাথাব্যথা গায়ে ব্যথা বমি গলা ব্যথা ইত্যাদি। Covid এর দৌলতে আমরা incubation period শব্দটার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি অর্থাৎ কিনা সংক্রমণ থেকে লক্ষণ প্রকাশিত হওয়ার মধ্যে সময়ের তফাৎটা । এই সময়টা NiVM এ আট দিনের কম, ভারতীয় প্রজাতি গুলিতে নদিনেরও বেশি। এই লম্বা incubation period টা খুব বিপদজনক। অগোচরে কতজন সংক্রমিত হয়ে যাবে। শুধু তাই নয় অন্য অনেক রোগের মতোই, Covid এর মতই এখানেও নিশ্চয়ই অনেকজন সংক্রমিত থাকবে যাদের লক্ষণ প্রায় ধরাই যাবে না বা মৃদু । এদের সংস্পর্শে অজান্তে রোগ ছড়াতে পারে অনেক । NiVI বা NiVB আবার একবার লক্ষণ দেখা দিলে খুব তাড়াতাড়ি বাড়াবাড়ির দিকে যেতে পারে। NiVM তুলনামূলকভাবে ধীরে এগোয়।
নির্ণয়:
নিপাহ ভাইরাসের নির্ণয় পদ্ধতি Covid এর মত ই। RTPCR দেহে সক্রিয় ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করে। ELISA পদ্ধতি নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে কোন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কিনা নির্ণয় করে। যদিও পুরনো কালে কখনো নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকলে সেটাও এই পদ্ধতি ধরে। বুঝতেই পারছেন এই পদ্ধতি গুলোর জন্য কিন্তু স্যাম্পল পাঠাতে হয় বড় এবং নামি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। খরচ সাপেক্ষ তো বটেই। কেস খুব ই কম বলে খরচ বেশি পড়ে।
আক্রান্ত মানুষের নিপাহ ভাইরাসের নির্ণয় এর সাথে সাথে এই মুহূর্তে খুব জরুরী বাদুরের মধ্যে সক্রিয় ভাইরাস কতটা কি আছে সেই নজরদারি চালানো। এই নজরদারি থামিয়ে দিলে চলবে না, সারা বছর ধরে, বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া উচিত। আগেই বলেছি বাদুর হল ভাইরাসের ডিপো। নতুন নতুন ভাইরাসের সৃষ্টি ও হয় এর মধ্যে। কাজেই লাগাতার নজরদারি শুধু নিপাহ ভাইরাসের অস্তিত্ব দেখে ক্ষান্ত হবে না, নতুন আর কোন ভাইরাস পাকাচ্ছে, তার সম্বন্ধেও আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে। এর থেকে মহামারী, প্রাদুর্ভাব সবকিছুই আটকানো সম্ভব।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, পশ্চিম বঙ্গের সাম্প্রতিক কেস গুলিতে খুব তাড়াতাড়ি নির্ণয় করা যাওয়াতে আপাতত নিপাহ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। সবচেয়ে প্রশংসনীয় একজন মহিলা ডাক্তারের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। যে মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে প্রথম রোগের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল সেখানে ওই ডাক্তার প্রথমে সন্দেহ করেন এ সাধারণ জ্বরজারি, ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়, নিপাহ , সংক্রমণ হতে পারে। অবিলম্বে তিনি স্যাম্পল নিপাহ পরীক্ষার জন্য পাঠান এবং অন্যান্য ডাক্তারদের ও অবগত করেন যাতে অবিলম্বে কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু করা যায়। আশার খবর হল যে ৫ জন আক্রান্ত হয়েছিল অর্থাৎ নিপাহ পসিটিভ এসেছিল, তাদের তিনজন এখন সম্পূর্ণ সুস্থ , এবং একজন নিপাহ-নেগেটিভ ও হয়ে গেছেন। যে দুজন অসুস্থ ছিলেন তাদের মধ্যে মহিলা নার্সটির অবস্থা এখনো সংকটজনক অন্যজন অর্থাৎ পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীটির অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
চিকিৎসা:
অন্য অনেক ভাইরাল অসুখের মত এর ও সরাসরি চিকিৎসা নেই। কোভিড এ যেমন চিকিৎসা করা হয় বা হয়েছিল এখানেও সংকটজনক অবস্থার রোগীকে একই ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়। অর্থাৎ জ্বরের জন্য সাধারণ প্যারাসিটামল, IV তরল দিয়ে জলসাম্য বজায় রাখা, খিচুনি ও মস্তিষ্কের প্রদাহের ওষুধ এবং প্রয়োজনে অক্সিজেন দেওয়া বা ভেন্টিলেশন। তার সঙ্গে সংকট অনুযায়ী চিকিৎসকরা আরো অন্য জরুরী ওষুধ বা সাপোর্ট ব্যবহার করেন। Remdesivir গবেষণাগারে ইঁদুরে কাজ করেছে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক কেসগুলোতে এখনো পর্যন্ত কাজ করেনি বলেই খবরে প্রকাশ। অন্য আরো ওষুধ এবং মনোক্লোনাল এন্টিবডি বানানোর প্রচেষ্টা চলছে, বাজারে আসেনি কেউ। একই অবস্থা ভ্যাকসিনের। ট্রায়াল চলছে, বাজারে আসেনি।
আমাদের কি করণীয়?
সবার আগে করণীয় হচ্ছে প্যানিক না করা বা আতঙ্ক না ছড়ানো। কতকগুলো সাধারণ জ্ঞান মনে রাখবেন। ভাইরাস বেশিরভাগ সময়, ৬৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এর ওপরে বাঁচতে পারে না। সাবান জলেও বাঁচে না। কাজেই রান্না করা বা গরম জিনিস খেলে এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যেস রাখলে অনেক রোগকেই দূরে রাখা যায়। কোভিড আমলের পর থেকে অনেককেই দেখি রাস্তাঘাটে ঘুরছে। মাস্ক পরে ঘুরছে। ভিড় ভাট্টা, বদ্ধ জায়গা, এসি ঘর, এরোপ্লেন এর মাস্ক পরে থাকতে পারলে অনেক বাঁচোয়া। তার সাথে শরীর সুস্থ, চনমনে রাখুন, প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। সংক্রমণ এলেও ঢুকতে পারবে না। প্রাণ ভরে নলেন গুড় খান, পাটালি খান, গোটা গোটা ফল খান, আনন্দে থাকবেন।
Kalyani | 103.2.***.*** | ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৫১738036
Juin | 2405:201:901c:40ce:f1d1:7403:f522:***:*** | ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৪738040
Dr. Barnali Ray Basu | 2402:3a80:42e0:b57d:178:5634:1232:***:*** | ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৪738044
Bratin Das | ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪২738045