

ছবি: রমিত
অবশেষে এসে গেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একেকবার একেকরকম বয়ানের মাঝখান থেকে জানা গেছে, এই তালিকাই চূড়ান্ত তালিকা নয়। এর পর আরও তালিকা আসবে। যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, সেই তালিকায় যেমন আছে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম, তেমন আছে মুছে দেওয়া মানুষের নাম। কেন মুছে দেওয়া হয়েছে তার কারণ অবশ্য লেখা নেই, আর আছে বিবেচনাধীন নাম। অর্থাৎ এখনও যে মানুষদের নামের নথি যাচাই শেষ হয়নি, তাঁদের নাম। এইটাকে অনেকে কলেজে বা স্কুলে ভর্তির প্রথম তালিকাও বলতে পারেন। আবার কিছুদিন পরে দ্বিতীয়, তার কিছুদিন পরে তৃতীয়, চতুর্থ আরও কত তালিকা প্রকাশিত হবে কেউ জানে না। গোটা বিষয়টাই হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে এবং বাংলার বিচারবিভাগের তত্ত্বাবধানে।
অনেকে প্রশ্ন করছিলেন বারোটি রাজ্যে তো এসআইআর হচ্ছে তাহলে শুধু বাংলাতেই অসুবিধা কেন? অসুবিধা বারোটি রাজ্যেই হচ্ছে। কোথাও খবর পাওয়া যাচ্ছে কোথাও খবর পাওয়া যাচ্ছে না বিষয়টা আসলে এমন ভাবে সাজানো হয়েছে যে বিরোধী যারা তারা বুঝতে অব্দি পারলেন না যে তাদের ভোটার বেস কিভাবে মুছে দেওয়া হলো। তারা অন্য বিষয় নিয়ে চিৎকার করে গেলেন তারা, ফেসবুক ভরিয়ে দিলেন আরো অনেক বিষয় নিয়ে, কিন্তু মাঝখান থেকে বাদ পড়লেন অসংখ্য সংখ্যালঘু দলিত প্রান্তিক মানুষজন এবং অবশ্যই মহিলারা। গত লোকসভা নির্বাচনে ‘আবকি বার ৪০০ পারে’র স্লোগান যখন ব্যর্থ হয় তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে ভোটার তালিকা তে এমন গোলমাল করতে হবে যাতে বিরোধীরা আর মাথা তুলেই দাঁড়াতে না পারে। সেই অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে এস আই আর করার জন্য বলা এবং সেটাও কোন লিখিতভাবে নয়। সেই অনুযায়ী বিরোধী ভোটারদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা এই সমস্ত কিছুই এইএসআইআর প্রক্রিয়ায় হলো আর সম্পূর্ণ বিরোধী দল ব্যর্থ হল এই চক্রান্ত বুঝতে।
ভোটার তালিকায় আগে চুরি ছিল আর এখন যে তালিকা হয়েছে তা রীতিমত পুকুরচুরি। দেশের অন্যতম একটি স্বশাসিত সংস্থা, কীভাবে প্রধান শাসকদলের হয়ে কাজ করলো, তা ইতিহাসে লেখা থাকবে। গুজরাটেই প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে। ৩৪ লক্ষ মধ্যপ্রদেশে, ৩১ লক্ষ রাজস্থানে এবং ৩৪ লক্ষ ছত্তিশগড়ে। প্রাথমিকভাবে উত্তরপ্রদেশেই ২.৫ কোটি মানুষের নাম বাদ গিয়েছিল। এই রাজ্যগুলোর প্রত্যেকটিই বিজেপি শাসিত। বিরোধী শাসিত রাজ্য তামিলনাডুতে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ৭৪ লক্ষ। দেশের গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ বেশ কিছুদিন আগে বলেছিলেন যে তারা আরো ৫০ বছর রাজত্ব করবেন। এই এসআইআর প্রক্রিয়া তার বক্তব্যকেই সিলমোহর দিল। বাংলায় কি হবে জানা নেই কতজন বাদ যাবেন জানা নেই, কিন্তু সারাদেশে বিরোধী ভোটারদের বাদ দেওয়ার এই চক্রান্তে সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকলো নির্বাচন কমিশন এবং তাকে সর্বতোভাবে সহায়তা করল চোখ বুজে থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। যখন সবার আগে এই এসআইআর প্রক্রিয়ার আদৌ সাংবিধানিক স্বীকৃতি আছে নাকি সেইটা নিয়ে আদালতের বিচার হওয়া উচিত ছিল তখন তারা কি করে এসআইআর প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেছে। অবশ্যই বলতে হবে গদি মিডিয়ার কথা যারা দেখেও না দেখার ভান করেছে। বিহারের উদাহরণ তাদের সামনে থাকা সত্ত্বেও তারা চুপ করে থেকেছে এবং এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে গেছে। সুতরাং আজকে যদি কেউ ভাবেন, যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নজরদারিতে প্রকাশিত হওয়া এই তালিকা শুদ্ধ এবং কোনও ভুল নেই এই তালিকায়, তাহলে তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন।
অন্য রাজ্যে এইরকম ধাপে ধাপে তালিকা প্রকাশ হয়নি, শুধু বাংলাতেই এই প্রক্রিয়া কেন, তা নিয়েও অনেক কথা বলতে হয়। প্রাথমিকভাবে মৃত, স্থানান্তরিত এবং খুঁজে না পাওয়া ভোটারদের সংখ্যাই ছিল ৫৮ লক্ষ। তার মধ্যেও বেশ কিছু জীবিত মানুষ ছিলেন, তাঁদের নাম ও ছিল। প্রাথমিকভাবে দেখা গিয়েছিল, যে ২০০২ সালের তালিকায় নাম থাকা এবং সেই নামের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা প্রায় সমস্ত ব্যক্তিরই নাম ছিল। অসুবিধা শুরু হয় তার পরে। তারপরেই নির্বাচন কমিশনের দৌলতে আমরা নতুন একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হই- ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’। শোনা গেল নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রযুক্তি যাঁদের মনে করছে সন্দেহজনক, তাঁদেরকেই কমিশন শুনানিতে ডেকে নথিপত্র দেখতে চাইছে এবং সেটা একবার নয়, বারংবার। দীর্ঘদিন এই দেশে থেকে, ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করার পরে, যদি কোনও ব্যক্তিকে শুনানিতে ডেকে প্রমাণ দিতে হয় তিনি এই দেশের নাগরিক এবং তাঁর বাপঠাকুর্দারা এই দেশে এসেছেন স্বাধীনতার পরে কিংবা কমিশন নির্ধারিত সময়সীমার আগেই, তাহলে মান এবং হুঁশ সম্পন্ন একজন ব্যক্তির কেমন লাগতে পারে? সেই জন্যেই এত হয়রানির পরে, অনেকেই নির্বাচন কমিশনকে নির্যাতন কমিশন বলে অভিহিত করতেও দ্বিধা করছেন না। কিন্তু কোনও কিছুই বিচার্য হয়নি নির্বাচন কমিশনের কাছে, এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলা সত্ত্বেও তাঁরা ঐ ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র তালিকায় কাদের নাম আছে সেই তালিকা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করেনি। কী কারণে কাদের ডাকা হয়েছে, তার তালিকাও সাধারণ মানুষের হাতে নেই। বুথ স্তরের কর্মী বা এআরওদের প্রশ্ন করলে, তাঁরা বলেছে বটে যে তালিকা বুথে বুথে টাঙানো হয়েছে কিন্তু তা সম্পূর্ণ সত্যি নয়। যার ফলে একদিকে যেমন সাংবাদিকেরাও এই বিষয়টা নিয়ে খবর করতে পারেননি, তেমনি রাজনৈতিক দলেরাও পারেনি ভুক্তভোগী মানুষদের সহায়তা করতে।
শুধু এখানেই থেমে থাকেনি বিষয়টা। যাঁদের কোনও নথি নিয়ে সমস্যা খুঁজে বের করা যায়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে কেউ বা কারা ছাপানো ফর্ম ৭ জমা করা হয়েছে এবং সেখানে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ‘ভারতীয় নাগরিক নন’। আরও বলা হয়েছে ঐ ব্যক্তিকে তাঁর ভারতীয়ত্বের স্বপক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ দাখিল করতে শুনানিতে আসতে হবে। প্রতিটি ফর্ম ৭ যে জমা পড়েছে, তার মধ্যে একটাই মিল। প্রতিটি ফর্মই জমা পড়েছে সংখ্যালঘু মুসলমানদের নামে এবং যাঁরা জমা করেছেন, তাঁরা কেউই সংশ্লিষ্ট বুথের কোনও বিএলএ নন, অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের অঞ্চল স্তরের কর্মী নন। এই ঘটনার কয়েকটি মাত্র খবর এসেছে, আর বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই খবর আসেইনি। সন্দেশখালিতে দেখা গেছে, প্রায় ৪০০০ মুসলমান মহিলা এবং পুরুষের নামে এইরকম ফর্ম ৭ জমা পড়েছে। খোঁজ নিতে গিয়ে বেশ কিছু সমাজকর্মী দেখেছেন, অঞ্চলের বিজেপি’র কর্মীরা অবধি জানেন না, কারা এই ফর্ম ৭ জমা করেছেন। শুধু সন্দেশখালি নয়, হাওড়াতেও এই ধরনের একটি ঘটনার খবর এসেছে। দেখা গেছে ভারতীয় রেলের এক প্রাক্তন কর্মী শেখ লিয়াকৎ হোসেনকে বলা হয়েছে, তিনি যেন তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার জন্য শুনানিতে হাজির হন।
এই ফর্ম ৭ সংক্রান্ত অভিযোগ শুধু বাংলা থেকেই এসেছে এমনটা নয়। রাজস্থানে আলওয়ারে এক বিএলও’র কাছে ফোন এসেছিল, মুসলমান ভোটারদের নাম বাদ দিতে হবে এবং সেই সংক্রান্ত ফর্ম ৭ জমা হয়েছে বলে। গুজরাটে পদ্মশ্রী প্রাপ্ত লোকশিল্পী হাজিভাই কাসমভাই যিনি ঐ রাজ্যে হাজি রামকাডু নামে পরিচিত, তাঁর নামে ফর্ম ৭ জমা করেছিলেন বিজেপির এক নেতা। যেদিন তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপক হিসেবে ঘোষণা করে, তার ৪৮ ঘণ্টা পরে এই খবরটি প্রকাশিত হয়, যে তাঁর নামেই ঐ ফর্ম ৭ এর অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। ঐ অভিযোগ তাঁর নামে জমা পড়েছে শোনার পরে ঢোল শিল্পী বলেন, তিনি ৬০ বছর ধরে এই দেশে ঐ অঞ্চলে বসবাস করছেন, সরকার তাঁর কাজের জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করছে আর বিজেপির নেতারা তাঁকেই দেশের নাগরিক নন, এই কথাটা প্রমাণ করতে চাইছেন, এই বিষয়টা অত্যন্ত দুঃখজনক। গবাদি পশু কল্যাণের জন্য ৩,০০০ টিরও বেশি দাতব্য অনুষ্ঠানে এবং ১,০০০ স্টেজ শোতে ঢোল বাজানো এই শিল্পী এই পদক্ষেপে গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন। তারপরে এই বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত শোরগোল হওয়ার পরে অভিযোগকারী বিজেপি নেতা বলেন, কোথাও একটা ভুল হয়েছে, তিনি হাজি রামকাডু’র নাম বাদ দিতে চাননি। ভোটার তালিকায় অন্য নাম দেখাচ্ছিল, তাই সেটা ঠিক করার উদ্দেশ্যেই এই কাজটা করেছেন। এইরকম অজস্র খবর পাওয়া গেছে উত্তরপ্রদেশ থেকেও। ঐ রাজ্য থেকেও এই ফর্ম ৭ এর অপব্যবহার সংক্রান্ত মামলাও হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। আসামে তো আরও বড় ঘটনা ঘটেছে। বিজেপি শাসিত ঐ রাজ্যের এক বুথ স্তরের কর্মী, সুমনা রহমান চৌধুরী অভিযোগ করেছেন সর্বসমক্ষে যে তাঁর কাছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ৬০টি ফর্ম ৭ এর অভিযোগপত্র দিয়ে বলা হয়েছে খতিয়ে দেখতে, যে আদৌ অভিযোগগুলো সঠিক কি না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে সুমনা দেখতে পান যে তিনি যে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা, সেই স্কুলের যিনি প্রধান শিক্ষক, যার কাছে তিনি রোজ হাজিরা দেন, সেই প্রধান শিক্ষকের নামেই অভিযোগ জমা পড়েছে। শুধু তাঁর নামেই নয়, আরও অসংখ্য জীবিত মানুষ, যাঁরা দীর্ঘদিন এই দেশের বাসিন্দা, এমনকি যাঁদের নাম আসামের নাগরিকপঞ্জীর তালিকাতেও আছে, তাঁদের নামেও এই ফর্ম ৭ জমা পড়েছে যাতে তাঁদের নাম নতুন ‘শুদ্ধ’ ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়। এই ঘটনাটি সামনে নিয়ে আসার কারণে ঐ বিএলও সুমনা রহমান চৌধুরীকে কর্তব্যে গাফিলতির কারণে তাঁর চাকরি থেকে নিলম্বিত করা হয়েছে।
তালিকার বাইরে যারা থাকবেন তারা আবারও সেই আশঙ্কায় ভুগবেন যে তাদের নাম থাকবে তো? আদালত বলেছে ধাপে ধাপে নাকি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে এরপরে নির্বাচন ঘোষণা হয়ে যাবে তখন আদালত বলবে যাদের নাম তালিকায় নেই তারা মনোনয়ন জমা দেওয়ার সাত দিন আগে অব্দি ফর্ম ৬ জমা করতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন ও তাতে সায় দেবে। এরপর নির্বাচন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরে কোন একজন ব্যক্তিও কি কোনও রাজনৈতিক দলকে আর সঙ্গে পাবে? কোনো রাজনৈতিক দল কি আর উৎসাহী হয়ে কোনও বাদ যাওয়া ব্যক্তির হয়ে কথা বলবে কিংবা ফর্ম ৬ জমা করবে? তাহলে সেই মানুষগুলোর কী হবে? যে রাজনৈতিক দল বলেছেন একজনও বৈধ ভোটারকে বাদ দিতে দেব না, কিংবা যারা এখনো বলছেন একজন বৈধ ভোটার এর নাম বাদ গেলে আমরা নির্বাচন কমিশনের জিনা হারাম করে দেবো সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে তখন কোনো একজন ভোটারও খুঁজে পাবেন তো? যখন এই কথাটা বলা জরুরি, একটি সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের কারণে একজন ভোটারের নাম ও বাদ না যায়, এবং সেটা আইনত, সংবিধানগতভাবে অসঙ্গত ও অগ্রহণযোগ্য, তখন নাগরিক সমাজ যদি চুপ থাকে তখন ভয় হয়। ভোটার তালিকা সংশোধন কোনও মতেই কোনও একজন ব্যক্তিরও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কৌশল হতে পারে না, এই কথা শুধু রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নয়, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও বলতে হবে এবং সেটা সজোরে, তাহলে যদি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের টনক নড়ে। কী পদ্ধতিতে হবে জানা নেই, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের রাজ্যে কিংবা দেশে নাগরিক সমাজও অনেকখানি রাজনৈতিক দলের মুখাপেক্ষী, এবং সেটাই ভয়ের কারণ। নাগরিক সমাজ যদি এই বিষয় নিয়ে আরো সচেতনতা দেখাতে পারতো, এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিত, তাহলে হয়তো কিছু সুবিধা হতো, তাহলে হয়তো দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে বাধ্য করানো যেত, এই প্রক্রিয়া বন্ধ করাতে।