

পাড়াগাঁয়ে, গ্রীষ্মের শেষে
হ্ঠাৎ তুমুল কড়ানাড়া
ফুৎকারে উড়ে যায় ধুলো,
ভেজা চুলে, ডাহুক, মেয়েরা।
চমকে উঠি। পড়ে। ডাহুক তো অনেক দেখেছি। ডুব মারতো পানা পুকুরে। পানকৌড়িও। পানকৌড়ি, ডাহুক ঢিল দিয়ে মেরে ফিস্ট করতেও দেখা।
ভেজা চুলে মেয়েদের সৌন্দর্য খুব খোলে। ওই যে খরাজ অপরাজিতাকে বলেছিলেন, ভেজা চুলে খোলা পিঠে যখন চান করে বের হও...
এতো তা নয়, স্নিগ্ধ স্নাত প্লেটোনিক বিষয়।
মুগ্ধতা তো কোনও দিন মরে না। মরতে চায় না। অষ্টাদশ ফিরে ফিরে আসে চোখের কাজ আর কোমরের ভাঁজ নিয়ে।
মেরে ফেলে মেরে ফেলে প্রৌঢ় বিকেলেও।
কিন্তু সায়ন কর ভৌমিক যখন লেখেন,
'অযথা বিকেলে খেলা ফেলে
চলে যায় দূরে, খামারের সীমানা আকুল
কোলাহল এখনো প্রবল
বিকেলে খোলামকুচি হাওয়া
রাধিকা চলেছে দূরে রাধিকার পথভরা ভুল
বিকেলের খেলা ফেলে, স্নান শেষে, পাড়ায় পাড়ায়
রাধিকা চলেছে দুরে, দোলখেলা সেরে
রাধাচূড়া পিচ ঢালা পথে
অযথা রেখেছে এতো ফুল।'
রাধিকা সংবাদ
স্ফটিকে পতঙ্গ শরীর (গুরুচণ্ডা৯)
আমরা 'জাস্ট' মরে যেতে চাই, বুনুয়েলের 'বেলে দ্য জুঁর' ছবির সেই বনবীথিকার মতো হারাতে চাই আটটি সাদা ঘোড়ার এলোমেলো গাড়িতে।
রাধিকা এসেছে 'রাধা' শব্দ থেকে। রাধার আগমন আবেস্তা 'রাধ' থেকে। রাধ মানে প্রেমিক। প্রথম ব্যবহার কাশ্মীরে।
বাংলায় রাধ-এর সঙ্গে আ যোগ করে রাধা। রাধা, রাধিকা, রাই-- কত কত আদরের নৌকা ভাসানো নাম।
সায়ন মনে করিয়ে দিলেন কাদামাটির দিনগুলোতে কেষ্টযাত্রায় রাধা আর কৃষ্ণের প্রেম। কানু বিনে গীত নাই-- কিন্তু কৃষ্ণকে নিয়ে যাত্রা খুব কম হতো গ্রাম বাংলায়।
রাধার সঙ্গে যে কৃষ্ণের বিবাহ হয়েছিল, সেটা একটা মাত্র নাটকে দেখানো হয়েছে, পণ্ডিত প্রবর রূপ গোস্বামীর নাটকে। ললিত মাধব।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে রাধা কৃষ্ণের বিবাহ প্রসঙ্গ আছে।
রাধা নাই, তবে তার অন্য এক রূপ দেখেছি। 'মীরার বঁধুয়া' পালায়।
সে পালায় কী অসাধারণ সব সঙ্গীত।
সম্রাট আকবর আসছেন ছদ্মবেশে মীরার গান শুনতে। সে নিয়ে কত নিন্দা।
কিন্তু মীরার ভ্রূক্ষেপ নেই। ভক্ত সে তো সন্তান। সন্তানের আবার জাত ধর্ম আছে নাকি।
এই কথাই পরে পড়েছি, মা সারদার কথায়। ছত্রিশ জাতের এঁটো বাসন মেজেছেন তিনি। ডাকাত আমজাদকে পাশে বসে খাইয়েছেন। এইসব পড়ে শুনে বড় হয়েছি।
সরস্বতী পূজার দায়িত্ব পাওয়ার জন্য মুসলিম ছেলে মেয়েদের আকুতি দেখেছি। শীতের দিনে স্নান করে না খেয়ে অঞ্জলি দিতে দেখেছি, আমার গ্রামেই বছরের পর বছর।
আজকাল কী সব উৎটপটাং কথা শুনি।
রাজ কলেজে পড়ার সময় ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সরস্বতী পূজার আগের দু রাত ঘুমাতাম না।
সারাদিন রাত জেগে দেড়শো ফুট আলপনা।
বেঞ্চগুলোয় বিয়ে বাড়িতে খাওয়ার টেবিলে পাতার কাগজ আঠা দিয়ে লাগিয়ে তাতে ছবি ও কবিতার কোলাজ, কাগজের শিকলি নির্মাণ।
সুমনা এখন দিল্লিতে থাকে, আল্পনা দিত আমাদের সঙ্গে দিনের বেলায়। রাতের বেলায় আমি, বিশ্বনাথদা, প্রকাশ আলেকজান্ডার (মালয়ালি খ্রিস্টান), সমাপ্ত, জাহাঙ্গির, সোমনাথদা।
একজনের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়ে সরস্বতীকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ার খুব ইচ্ছা জাগল। তাকে অতি কষ্টে সামাল দেওয়া হল।
পরদিন প্রচুর প্রসাদের আয়োজন। ফলমূল চিঁড়ে দই বাতাসা। ভাঁড়ার ঘরের দায়িত্বে দিয়েছিলাম নূর আর জালালকে। ওটা ছিল একটা পরীক্ষা। যে খিদে পেলেও নিজে না খেয়ে অন্যদের খাওয়ার পর খেত সেই তো সাচ্চা কমরেড।
সরস্বতী পূজা দেখতে দূর দূর থেকে আসতো ছেলে মেয়েরা।
মেমারি থেকে কাকলি ফাল্গুনী এসেছিল খুব সুন্দর শাড়ি পরে।
তখন সরস্বতী পূজা ছিল ভ্যালেন্টাইন ডে। কিন্তু আমাদের বন্ধুরা ওইদিন কেউ কাউকে প্রেম নিবেদন করেছে বলে মনে পড়ছে না। বরং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিন প্রেম নিবেদন খুব হতো।
আমাকে একজনকে বলতে হয়েছিল, আরেকজনের হয়ে।
সে এক কাণ্ড।
কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠান। শহরে এগুলো ছিল বিরাট ঘটনা। সারা শহর ভেঙে পড়তো গান শুনতে। হেমন্ত মান্নাও এসেছেন সত্তর দশকে।
সেবার আমার জোরাজুরিতে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান না করে দুপুর দুটো থেকে।
আমার যুক্তি ছিল, কলেজের ৯০ ভাগ ছেলে মেয়ে আসে দূর থেকে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরু হলে আসল শিল্পী উঠতে রাত নটা দশটা। তখন তারা কেউ থাকে না। অতএব দিনের বেলায় হলে মূল শিল্পী সন্ধ্যার মুখে। ওরাও শুনতে পাবে।
তাতে ফল খুব একটা ভালো হয়নি। পরে বুঝেছি, ছেলেমেয়েদের বড় অংশ ক্লাস থাকলে তবেই কলেজ আসতে আগ্রহী। শুধু পয়সা খরচ করে অনুষ্ঠান দেখতে নয়।
আর তখন তো বামপন্থী রাজনীতির একটা নির্দিষ্ট ছক ছিল।
একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, একজন নজরুল সঙ্গীতশিল্পী, একজন গণসঙ্গীত শিল্পী।
সেবার ছিলেন চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, ধীরেন বসু, হেমন্ত কণ্ঠী হীরক চৌধুরী এবং গণসঙ্গীতে অনুপ মুখোপাধ্যায়। নিজে নিজেই গান লিখতেন অনুপ মুখোপাধ্যায়। গাইতেনও চমৎকার। হীরক চৌধুরী ও অনুপ মুখোপাধ্যায় মাতিয়ে দিয়েছিলেন। দুজনকেই থেকে যেতে হয়েছিল। রাতের শেষ ট্রেন পাননি। চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় ও ধীরেন বসু গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। গাড়ি নিয়ে ফিরে যান।
চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় এক আশ্চর্য মানুষ। সারাজীবন বিয়ে করেন নি। প্রেম ও বিরহের গান গাইতেন। বর্ধমান শহরে জনশ্রুতি ছিল, শহরের এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। তাঁর বিয়ে হয় এক চিকিৎসকের সঙ্গে। সেই দুঃখে আর বিয়ে করেননি। চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় খুব মদ্যপান করতেন। এর আগে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে আগে বেশি খেয়ে ফেলায় সমস্যা হয়েছিল।
ফলে আমার বাড়তি দায়িত্ব ছিল, যাতে মদ্যপান করতে না পারেন।
মদের বোতলগুলো ছিল একটা প্লাস্টিকের ঝুড়িতে। সেটি বগলদাবা করি আমি। মদ খাবেন না এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তিনি একশো টাকা বেশি চান। আমি বলি, একশো নয়, তিনশো দেবো।
কেউ বিশ্বাস করবেন, ১৯৮৫তে গাড়ি যন্ত্রী সমেত তাঁর সঙ্গে ১৮০০ টাকার চুক্তি।
শেষ পর্যন্ত ২২০০ টাকা দিয়েছিলাম।
দু'ঘণ্টার বেশি সময়- প্রায় আড়াই ঘণ্টা গেয়েছিলেন।
সেদিন দুজনে
সুন্দর বটে তব অঙ্গদখানি তারায় তারায় খচিত..
একের পর এক গান।
এদিকে এক মিষ্টি মেয়েকে বলে রেখেছি, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে তাকে বলি, একটা কথা ছিল।
বলো।
না মানে....
বলো।
তুমি কিছু মনে করবে না তো...
বলছি তো না। বলো....
তার আগে দুদিন একসঙ্গে আলপনা আঁকা কবিতা কোলাজ সব করেছি।
বললাম, গলায় সাহস এনে, তোমাকে.... ভালোবাসে।
আমাকে তার হয়ে তোমাকে বলতে বলেছে। তুমি যদি রাজি হও...
বলা মাত্র ছিটকে চলে গেল মেয়েটি।
ওদিকে চিন্ময় তখন সুর ঝরিয়ে চলেছেন...
পম্পা ঘোষ | 2409:40e0:105d:5e3b:8000::***:*** | ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:২২738089
r2h | 134.238.***.*** | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০০:১২738091