'বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তারা কি মজুর না ধাঙড় যে ধর্মঘট করবে?' বেতন কম বলে, অনিয়মিত বলে, শিক্ষকরা ঐতিহাসিক ধর্মঘট করেছিলেন ১৯৫৪-তে। সেই নিয়ে গল্প লিখেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। টিচার।
রাজমাতা স্কুলের সেক্রেটারি রায়বাহাদুর অবিনাশ তরফদার স্কুলের টিচাররা ধর্মঘট করবে জেনে কিছু সদুপদেশ দেওয়া ঠিক করলেন।
'বুনো রামনাথ যাদের গর্ব ও গৌরব, তুচ্ছ দুটো পয়সার জন্য, সামান্য দুটো অসুবিধার জন্য, তারা নিজেদের নামিয়ে আনবে, আদর্শ চুলোয় দেবে, শিক্ষাদীক্ষাহীন মজুর-ধাঙড়দের মতো হাঙ্গামা করবে' রায়বাহাদুর এটা মানতে না পেরে শনিবারের ছুটির পর সদুপদেশ দিলেন।
এই বক্তব্য শুনে শিক্ষকদের নেতা গিরীন রায়বাহাদুরকে ছোটো ছেলের অন্নপ্রাশনের নেমন্তন্ন করে এল। উপহার দেওয়ার ভয়ে যদি না আসেন, তাই, বলে এল উপহার নিলে সর্বনাশ হবে। তাই উপহার নেওয়া বারণ। পরদিন রায়বাহাদুর গিয়ে দেখলেন কী চরম দারিদ্র্য স্কুলের প্রধান শিক্ষকের জামাই গিরীনের। এবং দেখেন ভোজের কোনও আয়োজন নেই। বাড়ির রান্নার জন্য শুধু একটু সামান্য হলুদ বাটা হচ্ছে।
আজ ২৫৭৫৩ জন শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি চলে যাওয়ায় কিছু লোকের উল্লাস দেখে মনে পড়ল গল্পটি। কী দারিদ্র্য গেছে শিক্ষকদের। এই চাকরি চলে যাওয়া শিক্ষকদের অনেকেই তো চরম গরিব।
রাজ কলেজ হোস্টেলে সেলিমের বউয়ের রান্নায় শুধু হলুদ ব্যবহারের কথা গত সপ্তাহে লিখেছিলাম।
আজ আবার মনে পড়ল।
মনে পড়ল শীতকালে ধান কাটতে আসা বাঁকুড়া পুরুলিয়ার আদিবাসী বা বাউড়িদের সন্ধেবেলা সিধে দেওয়া হতো। চাল ডাল আলু পেঁয়াজ নুন। সঙ্গে হলুদ আর লঙ্কা । কেবল যেদিন ওরা মুসলমান কসাইয়ের কাছ থেকে গোরুর মাংস নিতো সেদিন জিরে আর ধনে।
মনে পড়ছে সত্তর দশকের ১৯৭১-এ ইনফ্যান্ট বা শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমরা বলতাম ইনফিন। ক্লাস টু পর্যন্ত নিজেদের বসার আসন বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে হতো। ইনফিনে ছিলাম ১৫৭ জন। বেশিরভাগ জন স্কুলে আসতো না। শুধু শনিবার খুব ভিড় হতো। ওইদিন আমেরিকার সরবরাহ মাইলো গম রান্না করে খাওয়ানো হতো। কখনও গুড় থাকতো কখনও নয়। বেশিরভাগ ছেলে মেয়ে থালা নিয়ে আসতো খাবার বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। পরে অবস্থা বুঝে আমার প্রধান শিক্ষক মামা মাইলো রান্না না করেই বাড়িতে দিতে থাকেন। কত গরিব পরিবার যে মাইলো খেয়ে বেঁচেছে।
মানিকতলা খালপাড়েও দেখি বাচ্চাদের খাবার দিলে বসে না খেয়ে বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়।
সবচেয়ে বেদনার ঘটনা প্রত্যক্ষ করি ২০১৮ তে। এই গল্প পরের দিন লিখবো।
এখন যখন ডালিয়া ওটসের বিলাসিতা শুনি, মনে পড়ে এসব ছিল গরিবের অতি সম্বল। চালের খুদ কিন্তু সবাই খেতেন। সে দিয়ে চমৎকার ভুড়ভুড়ি রান্না হতো। একটু হলুদ নুন এলাচ আর তেজপাতা। এগুলো মধ্যবিত্ত পরিবারে। এলাচ তেজপাতা কেনার ক্ষমতা বেশিরভাগ মানুষের ছিল না।
ভুড়ভুড়ির সঙ্গে পোড়া লঙ্কা দিয়ে আলু সেদ্ধ মাখা হলে অমৃত।
কিছুদিন আগে ফেসবুকে রূপা সেনগুপ্ত চালের খুদ রান্নার কথা লিখেছিলেন।
বাঙালদের সঙ্গে এদেশিয়দের রান্নার তফাৎ যাঁরা খোঁজেন সেই খোঁজায় আরও তন্বিষ্ঠতা দরকার।
প্রয়োজন সবচেয়ে দামি খাবার।
পূর্ববঙ্গের মানুষ বা বাঙালদের মতোই আমাদের এলাকায় ব্যাপক শুঁটকি চলতো। সব ধরনের শুঁটকি। ইলিশ টাটকা খেতে আমাদের এলাকায় খুব একটা দেখিনি। নোনা ইলিশ চলতো যদিও। চরম উপাদেয় সেই খাবার। আমার মায়ের হাতের নোনা ইলিশ মনে পড়লে লালা ঝরে।
তবে একটা বিষয় এখনও ভালো বুঝিনি, ইলিশ ভূতের গল্প খুব চালু ছিল।
ইলিশ কিনে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে ফিরলেই ভূতেরা নাকি পিছু নিত।
রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বলতো, এঁকটুঁ ইলিশ দেঁনা।
এই গল্প বলতেন দাদি।
একসময় নাকি বাঘও আসতো।
বাঘ দেখিনি, সার্কাস আর চিড়িয়াখানা ছাড়া। একবার সুন্দরবনে আধ ঝলক। তবে হায়নার গল্প শুনেছি এত, তখন মনে হতো হায়না দেখেছি সর্ষে ডাঙ্গার মাঠে।
সেগুলো শেয়াল হতেও পারে। তবে আমাদের বিশ্বাস ছিল ওগুলো হায়না। রক্ত চুষে খায়।
এইসব বেশি বিদেশি রহস্য গল্প পড়ার প্রভাব হতে পারে।
তবে মুরগি হাঁস চুরি করে নিয়ে যেত শেয়াল। এবং বড় বড় ভামেরা। এই ভাম এবং শেয়াল শিকার করতেন আদিবাসী এবং যাযাবর ইরানিরা। এদের লোকে কাকতাড়ুয়াও বলতো।
শেয়াল ভাম মেরে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়ে ঝলসে বা রান্না করে খেতেন শিকারিদের দল।
সদ্য ইদ গেল। কাল আসছে রামনবমী।
রাম ছোটবেলায় এত প্রিয় ছিল হিন্দু মুসলমান সবার কাছে। রাম মানে লক্ষ্মণ ভাইয়ের জুটি। আমাদের দু ভাইকে রাম লক্ষ্মণ জুটি বলা হতো। বন্ধু বন্ধু মিল হলেও লোকে রাম লক্ষ্মণ জুটি বা মানিকজোড় বলতো।
আমরা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে তীর ধনুক বানিয়ে কত রাম লক্ষ্মণ খেলা খেলেছি।
সেই রামের জন্মদিনে নাকি কাল বের হতে ভয় করছে। অলিখিত কার্টুন মনে মনে। আতঙ্ক দেশজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে । এমনকী এই বাংলাতেও।
যদি দাঙ্গা ফ্যাসাদ বাধায়।
রাম তো সবার ছিলেন, একা হিন্দুদের নয়।
জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই রাম লক্ষ্মণ সীতার গল্প শুনছি বাড়িতে। স্কুলে। যাত্রাপালায়।
আমার বাবা ব্রজেন দে রচিত 'রাজলক্ষী' পালায় রাম চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
রাম যাত্রা কেষ্ট যাত্রা শুনতে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমান মেয়ে পুরুষের ভিড় বেশি হতো। রামের বনবাস বা সীতার পাতাল গমনে চোখের জলের কমবেশি হয়নি ধর্ম দেখে।
তবে রামনবমী মানেই মুসলমানদের বাড়ি বন্দি হয়ে থাকতে হবে কেন?
মসজিদের সামনে এসেই বা নাচানাচি হবে কেন?
আগে তো মসজিদের সামনে দিয়ে কোনও ধরনের ধর্মীয় শোভাযাত্রা গেলেই বাজনা বন্ধ করে দিত।
তার সঙ্গে এখন এত ডিজে হিন্দি গান তলোয়ার ত্রিশূল কেন?
রামকে তো লোকে দেখতো প্রজানুরঞ্জক হিসেবে। যিনি প্রজাদের জন্য স্ত্রী ত্যাগ করেন।
যিনি রাম তিনিই রহিম।
তাদের যুদো বা পৃথক করা হচ্ছে কেন?
কথা ছিল, রাম রহিম কো জুদা না করো ভাই।
আর বছর দশেক আগেও সেভাবে তো রামনবমীর নাম শুনিনি। যেমন নবীজির জন্মদিনে মিছিল বা ডিজে বাজানোও শুনিনি।
দুটোই ধর্ম নয় রাজনৈতিক কাজ।