এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  •  সম্ভাবনা তত্ত্ব: রাজার নতুন শিক্ষানীতি  অধ্যায় ৪: বেয়েসের উপপাদ্য —

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ মার্চ ২০২৬ | ৪৩ বার পঠিত
  • 1 | 2 | 3 | 4
    লিলির জাদুর সূত্র

    আগের অধ্যায়ে আমরা শিখেছিলাম শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনা — যদি কোনো ঘটনা আগে ঘটে থাকে, তাহলে অন্য ঘটনার সম্ভাবনা কীভাবে বের করতে হয়। লিলি আর মিমি এখন বুঝতে পেরেছে, 'যদি' দিয়ে চিন্তা করলে সম্ভাবনা বদলে যায়। আজকের অধ্যায়ে আমরা শিখব বেয়েসের উপপাদ্য (Bayes' Theorem) — শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনার উল্টোটা বের করার জাদুর সূত্র।

    পরদিন সকালে লিলি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, গতকাল আমরা শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনা শিখেছি। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছি না — যদি আমি জানি যে টেস্ট পজিটিভ এসেছে, তাহলে আমার রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কত? এটা কি শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনা নয়?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ, এটাও শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনা। কিন্তু এখানে সমস্যা হলো — টেস্টের নির্ভুলতা জানা থাকলেও, রোগের সম্ভাবনা বের করতে গেলে আমাদের উল্টোটা বের করতে হয়।"

    মিমি বলল, "উল্টোটা?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। আমাদের জানা আছে P(পজিটিভ|রোগ) — অর্থাৎ রোগী থাকলে টেস্ট পজিটিভ হওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু আমাদের দরকার P(রোগ|পজিটিভ) — টেস্ট পজিটিভ এলে রোগ হওয়ার সম্ভাবনা। এই উল্টোটা বের করার জাদুর সূত্রই হলো বেয়েসের উপপাদ্য।"

    লিলি বলল, "তাহলে শুরু করি?"

     বেয়েসের উপপাদ্যের ইতিহাস

    মা তাদের বেয়েসের উপপাদ্যের ইতিহাস বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, "বেয়েসের উপপাদ্যের নামকরণ হয়েছে থমাস বেয়েস নামের একজন ইংরেজ যাজক আর গণিতজ্ঞের নামে। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই উপপাদ্য আবিষ্কার করেন।"

    মিমি বলল, "যাজক? তিনি আবার গণিত করতেন?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। সে সময় অনেক যাজক গণিতচর্চা করতেন। বেয়েস তাঁর জীবদ্দশায় এই উপপাদ্য প্রকাশ করেননি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু রিচার্ড প্রাইস এই উপপাদ্য প্রকাশ করেন।"

    লিলি বলল, "তাহলে বেয়েসের উপপাদ্য প্রায় ৩০০ বছর পুরনো!"

    মা বললেন, "ঠিক। কিন্তু আজও এই উপপাদ্য বিজ্ঞান, চিকিৎসা, অর্থনীতি, মেশিন লার্নিং — সব জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে।"

     বেয়েসের উপপাদ্যের সূত্র

    মা তাদের বেয়েসের উপপাদ্যের সূত্র লিখে দিলেন:

    P(A|B) = [P(B|A) × P(A)] / P(B)

    লিলি লিখল:
    - P(A|B) = B ঘটেছে জেনে A ঘটার সম্ভাবনা (এটা আমরা জানতে চাই)
    - P(B|A) = A ঘটেছে জেনে B ঘটার সম্ভাবনা (এটা আমরা জানি)
    - P(A) = A ঘটার সম্ভাবনা (পূর্ব সম্ভাবনা)
    - P(B) = B ঘটার সম্ভাবনা (এটা বের করতে হবে)

    মিমি বলল, "মানে আমরা উল্টোটা জানি, আর এটা দিয়ে আসলটা বের করি?"

    মা বললেন, "ঠিক। এটাই বেয়েসের উপপাদ্যের ম্যাজিক।"

    মা আরও বললেন, "P(B) বের করার জন্য একটা সূত্র আছে: P(B) = P(B|A) × P(A) + P(B|A') × P(A')"

    লিলি লিখল:
    P(B) = P(B|A) × P(A) + P(B|not A) × P(not A)

     উদাহরণ ১: রোগ নির্ণয়

    মা প্রথম উদাহরণ দিলেন — চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ।

    ধরো, কোনো রোগ ১% লোকের হয়। অর্থাৎ P(রোগ) = ০.০১
    টেস্ট ৯৯% নির্ভুল। অর্থাৎ:
    - রোগী থাকলে ৯৯% বার পজিটিভ দেখায়: P(পজিটিভ|রোগ) = ০.৯৯
    - সুস্থ থাকলে ৯৯% বার নেগেটিভ দেখায়, অর্থাৎ ১% বার পজিটিভ দেখায়: P(পজিটিভ|সুস্থ) = ০.০১

    তোমার টেস্ট পজিটিভ এল। তোমার রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কত?

    প্রথমে P(পজিটিভ) বের করি:
    P(পজিটিভ) = P(পজিটিভ|রোগ) × P(রোগ) + P(পজিটিভ|সুস্থ) × P(সুস্থ)
    = ০.৯৯ × ০.০১ + ০.০১ × ০.৯৯
    = ০.০০৯৯ + ০.০০৯৯
    = ০.০১৯৮

    এখন বেয়েসের উপপাদ্য:
    P(রোগ|পজিটিভ) = [P(পজিটিভ|রোগ) × P(রোগ)] / P(পজিটিভ)
    = (০.৯৯ × ০.০১) / ০.০১৯৮
    = ০.০০৯৯ / ০.০১৯৮
    = ০.৫

    লিলি বলল, "মাত্র ৫০%? কিন্তু টেস্ট তো ৯৯% নির্ভুল!"

    মিমি বলল, "আমিও ভেবেছিলাম ৯৯% হবে।"

    মা বললেন, "এটাই বেয়েসের উপপাদ্যের ম্যাজিক। রোগ খুবই বিরল (১%), তাই পজিটিভ এলেও রোগ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%। বাকি ৫০% হলো 'ফলস পজিটিভ'।"

     ট্রি ডায়াগ্রামে বেয়েস

    মা তাদের ট্রি ডায়াগ্রাম দিয়ে বেয়েসের উপপাদ্য বুঝালেন:

    প্রথম ধাপ: রোগ (০.০১) আর সুস্থ (০.৯৯)

    দ্বিতীয় ধাপ:
    - রোগ থেকে: পজিটিভ (০.৯৯), নেগেটিভ (০.০১)
    - সুস্থ থেকে: পজিটিভ (০.০১), নেগেটিভ (০.৯৯)

    এখন পজিটিভ হওয়ার পথ দুটো:
    ১. রোগ → পজিটিভ: ০.০১ × ০.৯৯ = ০.০০৯৯
    ২. সুস্থ → পজিটিভ: ০.৯৯ × ০.০১ = ০.০০৯৯

    মোট পজিটিভ = ০.০১৯৮

    পজিটিভ এলাকায় রোগের অংশ = ০.০০৯৯ / ০.০১৯৮ = ০.৫

    মিমি বলল, "হ্যাঁ। ট্রি ডায়াগ্রাম বেয়েস বুঝতে খুব সাহায্য করে।"

     উদাহরণ ২: দুটো কারখানা

    মা আরেকটা উদাহরণ দিলেন। একটা কোম্পানির দুটো কারখানা আছে — কারখানা A আর কারখানা B।

    কারখানা A ৬০% পণ্য তৈরি করে, কারখানা B ৪০% পণ্য তৈরি করে।
    কারখানা A-তে ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের হার ২%, কারখানা B-তে ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের হার ৫%।

    একটা পণ্য ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেল। এটা কারখানা A থেকে আসার সম্ভাবনা কত?

    P(A) = ০.৬, P(B) = ০.৪
    P(ত্রুটি|A) = ০.০২, P(ত্রুটি|B) = ০.০৫

    প্রথমে P(ত্রুটি) বের করি:
    P(ত্রুটি) = P(ত্রুটি|A) × P(A) + P(ত্রুটি|B) × P(B)
    = ০.০২ × ০.৬ + ০.০৫ × ০.৪
    = ০.০১২ + ০.০২
    = ০.০৩২

    বেয়েস:
    P(A|ত্রুটি) = [P(ত্রুটি|A) × P(A)] / P(ত্রুটি)
    = (০.০২ × ০.৬) / ০.০৩২
    = ০.০১২ / ০.০৩২
    = ০.৩৭৫

    মিমি বলল, "৩৭.৫% — মানে ত্রুটিপূর্ণ পণ্য A থেকে আসার সম্ভাবনা ৩৭.৫%, B থেকে ৬২.৫%।"

    লিলি বলল, "A-তে ত্রুটির হার কম হলেও, A থেকে বেশি পণ্য আসে বলে ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের একটা বড় অংশই A থেকে আসে?"

    মা বললেন, "ঠিক। এটাই বেয়েসের উপপাদ্যের গুরুত্ব — পূর্ব সম্ভাবনা আর শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনা মিলিয়ে নতুন তথ্য বের করা।"

     উদাহরণ ৩: লিলির মিছরির জার

    লিলি তার মিছরির জারের কথা মনে করল। জারে দুটো বাটি আছে — বাটি ১ আর বাটি ২।

    বাটি ১-এ: ৪টা লাল, ৬টা নীল মিছরি — মোট ১০টা
    বাটি ২-এ: ৭টা লাল, ৩টা নীল মিছরি — মোট ১০টা

    লিলি চোখ বন্ধ করে একটা বাটি বেছে নেয় (দুটো বাটি বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা সমান), তারপর সেই বাটি থেকে একটা মিছরি তোলে। মিছরিটা লাল হলো।

    প্রশ্ন: মিছরিটা বাটি ১ থেকে আসার সম্ভাবনা কত?

    P(বাটি১) = ০.৫, P(বাটি২) = ০.৫
    P(লাল|বাটি১) = ৪/১০ = ০.৪
    P(লাল|বাটি২) = ৭/১০ = ০.৭

    P(লাল) = P(লাল|বাটি১) × P(বাটি১) + P(লাল|বাটি২) × P(বাটি২)
    = ০.৪ × ০.৫ + ০.৭ × ০.৫
    = ০.২ + ০.৩৫
    = ০.৫৫

    বেয়েস:
    P(বাটি১|লাল) = [P(লাল|বাটি১) × P(বাটি১)] / P(লাল)
    = (০.৪ × ০.৫) / ০.৫৫
    = ০.২ / ০.৫৫
    = ২০/৫৫ = ৪/১১ ≈ ০.৩৬৪

    মিমি বলল, "বাটি ২-এ লাল বেশি, তাই লাল পেলে বাটি ২ থেকে আসার সম্ভাবনা বেশি — ০.৬৩৬।"

    লিলি বলল, "ঠিক। বেয়েস আমাদের এই হিসাব করতে দেয়।"

     পূর্ব সম্ভাবনা আর পরবর্তী সম্ভাবনা

    মা তাদের দুটো গুরুত্বপূর্ণ শব্দ শেখালেন — পূর্ব সম্ভাবনা (Prior Probability) আর পরবর্তী সম্ভাবনা (Posterior Probability)।

    তিনি বললেন, "পূর্ব সম্ভাবনা হলো কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা, নতুন কোনো তথ্য জানার আগে। যেমন — রোগ হওয়ার পূর্ব সম্ভাবনা ছিল ১%।"

    মিমি বলল, "আর পরবর্তী সম্ভাবনা?"

    মা বললেন, "নতুন তথ্য পাওয়ার পর সেই সম্ভাবনা। যেমন — টেস্ট পজিটিভ আসার পর রোগ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%।"

    লিলি লিখল:
    - পূর্ব সম্ভাবনা: P(A)
    - পরবর্তী সম্ভাবনা: P(A|B)

    মা বললেন, "বেয়েসের উপপাদ্য আমাদের পূর্ব সম্ভাবনা থেকে পরবর্তী সম্ভাবনায় যেতে সাহায্য করে।"

     বেয়েসের উপপাদ্যের সাধারণ রূপ

    মা তাদের বেয়েসের উপপাদ্যের সাধারণ রূপ দেখালেন। যখন একাধিক সম্ভাবনা থাকে:

    P(Aᵢ|B) = [P(B|Aᵢ) × P(Aᵢ)] / [P(B|A₁) × P(A₁) + P(B|A₂) × P(A₂) + ... + P(B|Aₙ) × P(Aₙ)]

    লিলি বলল, "এটা একটু জটিল দেখাচ্ছে!"

    মা বললেন, "হ্যাঁ, কিন্তু ধারণাটা সহজ। নিচে সব সম্ভাবনার সমষ্টি, আর উপরে যেটা বের করতে চাই সেটা।"

    মিমি বলল, "আমাদের উদাহরণে দুটো সম্ভাবনা ছিল — রোগ আর সুস্থ।"

    মা বললেন, "ঠিক। এভাবে একাধিক সম্ভাবনার জন্যও কাজ করে।"

     লিলির নিজের উদাহরণ — ক্রিকেট ম্যাচ

    লিলি তার নিজের জীবন থেকে একটা উদাহরণ বানাল। বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ হবে।

    লিলির মতে:
    - বাংলাদেশ জিতবে: ৪০% (P(ব) = ০.৪)
    - ভারত জিতবে: ৬০% (P(ভা) = ০.৬)

    লিলি জানে, যদি বাংলাদেশ জেতে, তাহলে ৮০% বার বৃষ্টি হয়। যদি ভারত জেতে, তাহলে ৩০% বার বৃষ্টি হয়।

    ম্যাচের দিন বৃষ্টি হলো। বাংলাদেশ জেতার সম্ভাবনা কত?

    P(বৃষ্টি|ব) = ০.৮
    P(বৃষ্টি|ভা) = ০.৩

    P(বৃষ্টি) = ০.৮ × ০.৪ + ০.৩ × ০.৬ = ০.৩২ + ০.১৮ = ০.৫

    P(ব|বৃষ্টি) = (০.৮ × ০.৪) / ০.৫ = ০.৩২ / ০.৫ = ০.৬৪

    মিমি বলল, "বৃষ্টি দেখে বাংলাদেশ জেতার সম্ভাবনা বেড়ে ৬৪% হয়েছে!"

    লিলি বলল, "হ্যাঁ। কারণ বাংলাদেশ জিতলে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।"

     আরেকটা উদাহরণ — পরীক্ষায় পাশ

    মিমি তার নিজের উদাহরণ দিল। সে বলে, পরীক্ষায় পাশ করার সম্ভাবনা ৭০%। যদি সে পড়াশোনা করে, তাহলে পাশ করার সম্ভাবনা ৯০%। যদি না পড়ে, তাহলে পাশ করার সম্ভাবনা ৪০%।

    সে পড়াশোনা করে — এটা কি সত্যি? তার পড়াশোনা করার সম্ভাবনা ৮০%।

    সে পরীক্ষায় পাশ করল। সে পড়াশোনা করেছিল, এর সম্ভাবনা কত?

    P(পড়ে) = ০.৮, P(না পড়ে) = ০.২
    P(পাশ|পড়ে) = ০.৯, P(পাশ|না পড়ে) = ০.৪

    P(পাশ) = ০.৯ × ০.৮ + ০.৪ × ০.২ = ০.৭২ + ০.০৮ = ০.৮

    P(পড়ে|পাশ) = (০.৯ × ০.৮) / ০.৮ = ০.৭২ / ০.৮ = ০.৯

    লিলি বলল, "পাশ করার পর পড়াশোনা করার সম্ভাবনা বেড়ে ৯০% হয়েছে!"

    মা বললেন, "ঠিক। কারণ পাশ করলে পড়াশোনা করার সম্ভাবনা বেশি।"

     বেয়েসের উপপাদ্যের বাস্তব ব্যবহার

    মা তাদের বেয়েসের উপপাদ্যের কিছু বাস্তব ব্যবহার দেখালেন:

    ১. চিকিৎসা বিজ্ঞান — রোগ নির্ণয়, টেস্টের ফলাফল বিশ্লেষণ। আমরা আগেই দেখেছি।

    ২. স্প্যাম ফিল্টার — কোনো ইমেলে কিছু শব্দ থাকলে, সেটা স্প্যাম হওয়ার সম্ভাবনা বের করা। জিমেইল, ইয়াহু মেইল — সবাই বেয়েস ব্যবহার করে।

    ৩. মেশিন লার্নিং — নেভ বেইস ক্লাসিফায়ার (Naive Bayes Classifier) — খুবই জনপ্রিয় একটা অ্যালগরিদম।

    ৪. অর্থনীতি — শেয়ার বাজারের পূর্বাভাস, ঝুঁকি বিশ্লেষণ।

    ৫. ক্রিমিনোলজি — অপরাধের ধরণ বিশ্লেষণ করে অপরাধী শনাক্ত করা।

    ৬. ক্রীড়া — খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের পূর্বাভাস।

    লিলি বলল, "বেয়েসের উপপাদ্য তো আমাদের চারপাশে "

    মিমি বলল, "হ্যাঁ। আমরা প্রতিদিনই বেয়েস ব্যবহার করি, জানি না।"

     নেভ বেইস ক্লাসিফায়ার

    মা তাদের নেভ বেইস ক্লাসিফায়ার সম্পর্কে একটু বললেন। তিনি বললেন, "এটা মেশিন লার্নিং-এর একটা খুব সহজ আর জনপ্রিয় অ্যালগরিদম। এটা বেয়েসের উপপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।"

    লিলি বলল, "নেভ মানে?"

    মা বললেন, "নেভ (Naive) মানে সরল, নির্বোধ। কারণ এই অ্যালগরিদম একটা সরল ধারণা নিয়ে কাজ করে — সব ঘটনা স্বাধীন। বাস্তবে তারা স্বাধীন না হলেও, এই অ্যালগরিদম অনেক ভালো কাজ করে।"

    মিমি বলল, "যেমন — স্প্যাম ফিল্টারে, 'টাকা' আর 'জিতুন' শব্দগুলো হয়তো সম্পর্কিত, তবুও ক্লাসিফায়ার ধরে নেয় তারা স্বাধীন।"

    মা বললেন, "ঠিক। আর এই সরল ধারণা নিয়েই কাজ করে নেভ বেইস।"

     লিলির অনুশীলনী

    লিলি নিজে কিছু অনুশীলনী বানাল:

    ১. একটা ক্লাসে ৬০% ছাত্রী, ৪০% ছাত্র। ছাত্রীদের ৩০% চশমা পরে, ছাত্রদের ২০% চশমা পরে। একজন চশমা পরা ব্যক্তি ছাত্রী হওয়ার সম্ভাবনা কত?

    P(ছাত্রী) = ০.৬, P(ছাত্র) = ০.৪
    P(চশমা|ছাত্রী) = ০.৩, P(চশমা|ছাত্র) = ০.২
    P(চশমা) = ০.৩ × ০.৬ + ০.২ × ০.৪ = ০.১৮ + ০.০৮ = ০.২৬
    P(ছাত্রী|চশমা) = (০.৩ × ০.৬) / ০.২৬ = ০.১৮ / ০.২৬ = ১৮/২৬ = ৯/১৩ ≈ ০.৬৯২

    ২. একটা লটারিতে ১০% টিকিট জিততে পারে। যদি কোনো টিকিট জিতে, তাহলে ৮০% বার সেটা লাল রঙের হয়। জেতে না এমন টিকিটের ২০% লাল রঙের। একটা লাল টিকিট জেতার সম্ভাবনা কত?

    P(জিতে) = ০.১, P(না জিতে) = ০.৯
    P(লাল|জিতে) = ০.৮, P(লাল|না জিতে) = ০.২
    P(লাল) = ০.৮ × ০.১ + ০.২ × ০.৯ = ০.০৮ + ০.১৮ = ০.২৬
    P(জিতে|লাল) = (০.৮ × ০.১) / ০.২৬ = ০.০৮ / ০.২৬ = ৮/২৬ = ৪/১৩ ≈ ০.৩০৮

    মিমি বলল, "দুটোই সঠিক!"

     বেয়েসের উপপাদ্যের সীমাবদ্ধতা

    মা তাদের বেয়েসের উপপাদ্যের কিছু সীমাবদ্ধতাও বললেন:

    ১. পূর্ব সম্ভাবনা জানা দরকার — অনেক সময় পূর্ব সম্ভাবনা জানা থাকে না। তখন অনুমান করতে হয়।

    ২. নির্ভুল তথ্য দরকার — P(B|A) আর P(B|A') ঠিকঠাক না জানলে ফলাফল ভুল হবে।

    ৩. গণনার জটিলতা — অনেকগুলো ঘটনা থাকলে হিসাব জটিল হয়ে যায়।

    ৪. স্বাধীনতার ধারণা — নেভ বেইসে সব ঘটনাকে স্বাধীন ধরে নেওয়া হয়, যা বাস্তবে সবসময় সত্যি না।

    লিলি বলল, "কিন্তু তাও বেয়েস খুব দরকারি, তাই না?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। সব কিছুরই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, কিন্তু সুবিধা বেশি।"

    রাতে খাবার টেবিলে লিলি আর মিমি তাদের বাবাকে বেয়েসের উপপাদ্য শেখাতে লাগল।

    লিলি বলল, "বাবা, তুমি কি জানো, একটা রোগের টেস্ট ৯৯% নির্ভুল হলেও, রোগ বিরল হলে পজিটিভ রেজাল্টের পরও রোগ হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৫০% হতে পারে?"

    বাবা বললেন, "সত্যি? এটা তো অবাক করা!"

    মিমি বলল, "এটাই বেয়েসের উপপাদ্য। আমরা আজ শিখেছি।"

    লিলি বলল, "আরেকটা উদাহরণ — লাল মিছরি পেলে কোন বাটি থেকে এসেছে, সেটা বের করা।"

     শোওয়ার আগে

    রাতে শোওয়ার আগে লিলি আর মিমি তাদের আজকের পড়া রিভাইজ করল।

    লিলি লিখল:
    - বেয়েসের উপপাদ্য: P(A|B) = [P(B|A) × P(A)] / P(B)
    - P(B) = P(B|A) × P(A) + P(B|A') × P(A')
    - পূর্ব সম্ভাবনা: P(A)
    - পরবর্তী সম্ভাবনা: P(A|B)
    - বেয়েসের উপপাদ্য আমাদের পূর্ব সম্ভাবনা থেকে পরবর্তী সম্ভাবনায় নিয়ে যায়

    মিমি লিখল:
    - উদাহরণ ১: রোগ নির্ণয় — ৯৯% নির্ভুল টেস্টেও পজিটিভ এলে রোগের সম্ভাবনা ৫০%
    - উদাহরণ ২: দুটো কারখানা — ত্রুটিপূর্ণ পণ্য A থেকে আসার সম্ভাবনা ৩৭.৫%
    - উদাহরণ ৩: মিছরির জার — লাল পেলে বাটি ১ থেকে আসার সম্ভাবনা ৪/১১
    - উদাহরণ ৪: ক্রিকেট — বৃষ্টি দেখে বাংলাদেশ জেতার সম্ভাবনা ৬৪%
    - উদাহরণ ৫: পরীক্ষা — পাশ করলে পড়াশোনা করার সম্ভাবনা ৯০%

    লিলি লিখল:
    - নেভ বেইস ক্লাসিফায়ার — মেশিন লার্নিং-এর জনপ্রিয় অ্যালগরিদম
    - বেয়েসের ব্যবহার: চিকিৎসা, স্প্যাম ফিল্টার, অর্থনীতি, ক্রিমিনোলজি

    মিমি বলল, "কাল আমরা স্বাধীন ঘটনা আর নির্ভরশীল ঘটনা নিয়ে আরও বিস্তারিত শিখব।"

    লিলি বলল, "আমরা তো আগের অধ্যায়ে একটু শিখেছি, কিন্তু আরও গভীরে যাব।"

    তারা ঘুমিয়ে পড়ল।

    টিপস

    তোমরাও লিলি আর মিমির মতো বেয়েসের উপপাদ্য শিখে ফেললে। এখন তুমি জানো, কীভাবে শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনার উল্টোটা বের করতে হয়।

    তোমার চারপাশ থেকে বেয়েসের উপপাদ্যের উদাহরণ বের করতে পারো। যেমন:

    - স্কুলে যাওয়ার সময় দেখলে, রাস্তা ভিজে আছে। তাহলে রাতে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কত?
    - বন্ধু বলল, আজ তার খারাপ লাগছে। তাহলে সে সত্যি অসুস্থ, নাকি পরীক্ষা এড়াতে চায়?
    - তুমি একটা লটারির টিকিট কিনলে। টিকিটটা লাল রঙের। লাল টিকিট জেতার সম্ভাবনা কত?
    - মা রান্না করলেন। খাবারটা মসলাদার লাগছে। তাহলে এটা মুরগির মাংস না মাছ?
    - আকাশে মেঘ দেখলে, আজ বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কত?

    এভাবে প্রতিদিন ৫টা করে বেয়েসের উদাহরণ বের করার অভ্যাস করো।

    মনে রাখার মূল কথা:
    - বেয়েসের উপপাদ্য: P(A|B) = [P(B|A) × P(A)] / P(B)
    - P(B) = P(B|A) × P(A) + P(B|A') × P(A')
    - পূর্ব সম্ভাবনা আর পরবর্তী সম্ভাবনা
    - বেয়েস আমাদের নতুন তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাবনা আপডেট করতে সাহায্য করে

    এই অধ্যায়ে আমরা শিখলাম বেয়েসের উপপাদ্য — শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনার উল্টোটা বের করার জাদুর সূত্র। আমরা দেখলাম, কীভাবে এই সূত্র দিয়ে রোগ নির্ণয়, কারখানার ত্রুটি বিশ্লেষণ, মিছরির জারের সমস্যা — নানা কিছু সমাধান করা যায়। আমরা শিখলাম পূর্ব সম্ভাবনা আর পরবর্তী সম্ভাবনার ধারণা, আর বেয়েসের উপপাদ্যের বাস্তব ব্যবহার।

    লিলি আর মিমি তাদের নিজের জীবন থেকে অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছে — রোগ নির্ণয়, ক্রিকেট ম্যাচ, পরীক্ষায় পাশ — সবকিছুর জন্য। তারা দেখিয়েছে, কীভাবে নতুন তথ্য পেলে আমাদের সম্ভাবনা আপডেট করতে হয়।

    পরের অধ্যায়ে আমরা শিখব স্বাধীন ঘটনা আর নির্ভরশীল ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত। সেখানে আমরা দেখব, কীভাবে ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বের করতে হয়, আর সেই সম্পর্ক কীভাবে সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।

    ততক্ষণে, তোমরা নিজেরা নিজেদের জীবন থেকে বেয়েসের উপপাদ্যের উদাহরণ বের করতে থাকো।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    1 | 2 | 3 | 4
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন