আগের পর্বগুলো জানতে এখানে পড়ুন | পর্ব ১ , পর্ব ২ , পর্ব ৩ , পর্ব ৪, পর্ব ৫ |
"Nemesis always walks at the feet of hubris" - ancient Greek proverb
জেরুসালেম , আনুমানিক ১০৫ BCE
(জুডিয়া সামারিয়া ও ইদুমিয়া আনুমানিক ১০৫ BCE) (সৌজন্য চ্যাটজিপিটি )
তার নিজের ঘরে আলোচনায় বসেছিলেন তার ছেলেদের সঙ্গে হাসমোনিয়ান ইহুদী সম্রাট জন হিরকানুস | আলোচনার জন্যে অনেক কিছুই ছিলো | তার তিন ছেলে আরিস্টোবুলুস , আলেকজান্ডার ও আন্তিগোনেস তিনজনের মধ্যেই তিনি খুব স্পষ্ট গ্রীক প্রভাব দেখতে পাচ্ছিলেন | ম্যাকাবি বংশের সম্মানের ক্ষেত্রে যেটা ঠিক মনে হচ্ছিলোনা তার | হাজার হোক তারা জেরুসালেমের গদীতে বসেছিলেন মিশর ও সিরিয়ার গ্রীক প্রভাব থেকে জেরুসালেমকে মুক্ত করতে ও ইহুদীদের মধ্যে থেকে গ্রীক প্রভাব মুছে দেওয়াই তাদের ধর্ম | হাজার হোক তিনি তো নিজেই জেরুসালেমের জিহোভার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত | এখন তিনি দেখছেন যে তার নিজের ছেলেরাই সবচেয়ে বেশী গ্রীক প্রভাবে পড়েছে | এরা নিজেদের নাম রাখছে গ্রিকে , গ্রিক ভাষা ছড়িয়ে পড়ছে জেরুসালেমের সর্বত্র , ইহুদীদের জুডিয়া মুলুকের সর্বত্র গ্রীক স্টাইল জিমনেশিয়াম দেখা যাচ্ছে সেখানে ছেলেমেয়েরা গ্রীক দার্শনিকদের ভাবনা চিন্তা অনুযায়ী তোরার ব্যাখ্যা করছে এমনকি গ্রীক দেবদেবীদের পুজোও ছড়িয়ে পড়ছে !!! যারা গ্রীক দেবদেবীদের মূর্তি গড়ে পুজো করছে তারা বলছে যে জিহোভা তো অনেক দূরের ভগবান তার এতো সময় নেই যে পৃথিবীর মানুষের ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবেন তিনি পৃথিবীর মানুষের ব্যাপারস্যাপার ছেড়ে রেখেছেন এই গ্রিক দেবদেবীদের উপরেই | সত্য বলতে কি একসঙ্গে রাজা আর জিহোভার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হওয়াটা খুবই কঠিন কাজ যেহেতু ইহুদী সমাজের প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী একমাত্র নবী দাউদের (বাইবেলে ডেভিড) বংশের পুরুষই রাজা হতে পারে আর জেরুসালেমের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হবার অধিকার শুধুমাত্র লেভী বংশের , তাদের ম্যাকাবি বংশ এর কিন্তু এই দুই বংশের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই কাজেই এই দুটো পদের একটাও তাদের হবার কথা নয় কিন্তু এখন তার দুটো পদই প্রয়োজন নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে | স্বয়ং হাসমোনিয়ান সম্রাটের বংশের ছেলেদের মধ্যে গ্রীক প্রভাব ছড়িয়ে পড়া নিয়ে ভীষণ চাঞ্চল্য তখন জেরুসালেমের আনাচে কানাচে | ইদুমিয়া আর সামারিয়দের ধ্বংস করেছেন বলেই কি এখন এতো দম্ভ বেড়েছে হাসমোনিয়ানদের এনিয়ে আস্তে আস্তে মেরুকরণ বাড়ছে জুডাতে | অনেক ইহুদী পুরোহিত প্রকাশ্যেই বলা শুরু করেছেন যে হাসমোনিয়ানরা জেরুসালেমের জিহোভার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হয়েও সিরিয়া আর মিশরের গ্রীক রাজাদের মত মূর্তিপুজো করছে , অপবিত্র হচ্ছে জেরুসালেম | এ সময়ে এসব ব্যাপার নিয়েই হাসমোনিয়ান সম্রাট জন হিরকানুস কথা বলছিলেন তার তিন ছেলে আলেক্সান্ডার , এন্টিগনুস ও আরিস্তোবলুসের সঙ্গে |
জন হিরকানুস : আলেকজান্ডার শুনলাম যে তুমি তোমার প্রাসাদের পাশে তোমার গ্রিক ব্যবসায়ী বন্ধুদের মিনার্ভা আর জিউসের মন্দির নির্মাণ করতে দিয়েছো !!! তুমি জানো এটা কত বড় অপরাধ তোরা অনুযায়ী !! আমার সন্তান বলে তোমরা পার পেয়ে যাচ্ছ নাহলে তোরাতে মূর্তিপূজার শাস্তি মৃত্যু তা জানো কি !!!
আলেক্সান্ডার : পিতা , আমার সিরিয়ার কিছু গ্রীক বণিকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে , ওরা অনেকদিন ধরেই এখানে সিডার কাঠ রোড্স্ দ্বীপের মার্বেল আর মধুর ব্যাবসা করছে | ওরা এতোদিন ধরে এখানে আছে , আমাদের লাভ ছাড়া কোন ক্ষতি করছেনা তাই ওদের নিজেদের ইচ্ছা মত ধর্ম পালনের অধিকার দিয়েছি | ভুলে যাবেননা যে আমাদের মন্দিরের খরচও কিন্তু এসব গ্রীক বণিকদের দেওয়া কর থেকেই আসে | ওদের চটানোটা কোনো ভাবেই ঠিকঠাক নয় |
জন হিরকানুস : আমার পুত্র হয়ে বেঁচে গেলে নাহলে জেরুসালেমের প্রধান পুরোহিতের কথার অবাধ্যতার শাস্তি মৃত্যু !
(একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ)
এবার মুখ খুললেন আরিস্টোবুলুস প্রথমে |
আরিস্টোবুলুস : পিতা , মিশর ও সিরিয়ার গ্রীক বণিকদের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রাখতেই হবে যেকোন মূল্যেই | ভুলে যাবেননা আমাদের ইদুমিয়া আর সামারিয়া বিজয়ের পরে রাজকোষ এখন শূন্য | সিরিয়ার আর মিশরের গ্রীক বণিকেরা জুডাতে বাণিজ্য না করলে আমাদের বংশের আর জিহোভার মন্দিরের খরচ কে চালাবে ? ওদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবার ব্যাপারটা খুবই সঠিক সিদ্ধান্ত | এব্যাপারে আমি আলেক্সান্ডারের কথার সমর্থন করছি |
জন হিরকানুস : তোমরা দুজনেই বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতেই পারছোনা | আমি জিহোভার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত কিন্তু তোরার নিয়ম অনুযায়ী একমাত্র লেভী বংশের অধিকার আছে প্রধান পুরোহিত হবার | আমরা ম্যাকাবি ভুলে যেওনা | তাও সামারিয়া আর ইদুমিয়া জয় করে অনেকের মুখ বন্ধ রেখেছি | কিন্তু তোমাদের দুজনের কাজেকর্মে এখন আবার অনেকে আমাদের ম্যাকাবি দের প্রধান পুরোহিত হবার অধিকার নিয়েই কথা বলছে | নিজেদের মধ্যে দল পাকাচ্ছে একটু একটু করে | আমার কাছে খবর আছে যে ওরা নিজেদের বলছে ফারিসী (pharisi) ওরা বলছে শুধুমাত্র তোরার শাসন শেষ কথা , আমাদের ম্যাকাবি বংশের শাসন ধর্মদ্রোহিতা | ভুলে যেওনা যে আমাদের ম্যাকাবি বংশের পূর্বপুরুষেরা মাট্টাথিয়াস আর জুডা ম্যাকাবি জেরুসালেম জয় করেছিলেন এই সিরিয়ার গ্রীক প্রভাব জুডা থেকে মুছে ফেলতে | এখন তো ফারিসিরা বলছে যে ওরাই আমাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে যেভাবে একদিন ম্যাকাবিরা জুডাতে সিরিয়ার সেলুকাস বংশের শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো |
(শিল্পীর কল্পনায় : নিজের তিন পুত্রদের সঙ্গে বৈঠক করছেন জেরুসালেমের হাসমোনিয়ান বংশের প্রধান পুরোহিত জন হিরকানুস : সৌজণ্যঃ চ্যাটজিপিটি )
আলেক্সান্ডার (ঠান্ডা শান্ত চোখে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে ) : পিতা , আমার মনে হয় ফারিসী ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলবার নীতিই প্রয়োগ করা উচিত | আমাদের শাসনে গত কয়েক বছরে জিহোভার মন্দিরের পুরোহিতদের মধ্যে থেকে একটা শ্রেণী যারা আমাদের শাসনের পক্ষে জনগণের কাছে প্রচার করে , তারা প্রচুর জমিজমা আর সোনাদানার মালিক হয়ে উঠেছে | ওরাই আমাদের শাসনের ফলেই যে আজ জুডিয়া কত উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়েছে তা জনগণের মধ্যে প্রচার করে | আমাদের শাসনের পতন হলে ওরাও সবই হারাবে | তাই আমাদের ছাড়া এদের কোনো গতি নেই | এদের গ্রীকরা সাদুসি বলে | এদেরকে ব্যবহার করেই আমাদের ফারিসী ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে জনমতকে গড়ে তুলতে হবে | তাতে দুপক্ষেরই লাভ | আর শেষ পর্যন্ত তাতেও ফারিসীরা জব্দ না হলে আমাদের লোহার মুঠি (সৈন্যবাহিনী) তো আছেই | কাজেই এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের এখনই অত চিন্তা করবার কিছুই নেই পিতা |
আন্তিগোনেস যিনি সম্রাট হিরকানুসের তৃতীয় সন্তান তিনি এতক্ষন চুপ করে ছিলেন | এবার তিনি বললেন , "পিতা , আপনি ঠিকই বলেছেন যে ধর্মান্ধ ফারিসীরা আমাদের বিপক্ষে গেছে কিন্তু পিতা আমার এখন মনে হচ্ছে যে সামারিয়া আর ইদুমিয়া জয় করতে গিয়ে আমরা এতো রক্তপাত করেছি যে এখন এই ফারিসীরা জিহোভার অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে | "
এই প্রসঙ্গ উঠতেই হঠাৎ যেন কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এলো ঘরের মধ্যে | ইদুমিয়া আর সামারিয়া জয় করা হয়েছে কয়েক বছর আগেই | সেসব অভিযানে জন হিরকানুস আর তার তিন ছেলেই অংশ নিয়েছিলেন | সামারীয়দের গেরেজিম পাহাড়ের উপরের জিহোভার মন্দিরের ধ্বংসের অভিযানের সময়েও এরা সবাই সেখানেই উপস্থিত ছিলেন | গেরেজিম পাহাড়ের সেই মন্দিরের পুরোহিত আরনের বলা সেই কথাগুলোও সবারই মনে পড়ে গেলো ঠিক এই সময়েই | তাহলে কি জিহোভার অভিশাপই আছড়ে পড়তে চলেছে তাদের ম্যাকাবি বংশের উপরে ? এ এমন একটা ব্যাপার যখন কেউই আর সেসময়ের কথা ভাবতে চাইছেননা | সেসময়ে ওসব করা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজনে ছিলো কিন্তু এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অন্যরকম | জন হিরকানুস নিজেও হয়তো সেই অপ্রীতিকর প্রসঙ্গটা ভুলে যেতে চাইবার জন্যই এবার কথা ঘোরাবার জন্যে আরিস্টোবুলুস আর আলেক্সান্ডারের দিকে তাকিয়ে বললেন "আন্তিগোনেস এর ইদুমিয়ার কথাতে মনে পড়লো যে তোমরা দুজনে তো ইদুমিয়া আর সামারীয়ার অনেক মানুষকে তোমাদের কাজে নিযুক্ত করছো আজকাল | এ নিয়েও কিন্তু জুডিয়াতে অনেকেই নানারকম বলছে | ফারিসীরাও কিন্তু এই ব্যাপারটা একেবারেই অপছন্দ করছে | “

(ছবিতে আনুমানিক ১০৫ BCE সময়কালে একজন ফারিসী , একজন সাদুসি , একজন ইদুমিয় ও একজন সামারিয় ) (সৌজন্য চ্যাটজিপিটি )
এই কথার উত্তর দিলেন প্রথমে আরিস্টোবুলুস | উনি একটু সময় নিয়ে বললেন , "পিতা আসল কারণটা তো মনে হয় আপনি বুঝতেই পারছেন | জুডিয়ার ইহুদী মানুষকে কি ঠিক বিশ্বাস করা যায় রাজকার্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে ? আমাদের নিজের বংশেই কি আমরা নিজের ঘরের লোকের হাতে ধোঁকা খাইনি ? ইদুমীয়দের একটা গুণ যে ওরা বিশ্বস্ত , আর তাছাড়া ওরাও জানে যে ওদের জাতিকে কোনোদিনই ফারিসীরা বা জুডিয়ার অন্যান্য মানুষেরা নিজেদের মত আসল ইহুদী বলে মনে করবেইনা | ওরা যতই সুন্নত করুক আর আমাদের মন্দিরের আচারানুষ্ঠানে অংশ নিক না কেন বা মোজেসের দশটা নিয়ম মেনেই চলুক না কেন , আমাদের জুডিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে ওরা নকল ইহুদী , নিজের কোনো না কোনো স্বার্থে ওরা আসলে সুন্নত করে ইহুদী হয়েছে আসলে মনে মনে ওরা এখনো ওদের ঐসব মূর্তিগুলো ওই কুস না কি যেন নাম সেইসব পুজো করে | কাজেই এসব ইদুমীয়দের আমাদের অনুগত থাকায় সুবিধা সবচেয়ে বেশী | তাই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসব ইদুমীয়দের নিয়োগ দিলে ভালো | আর তাছাড়া ওরা বিশ্বাসঘাতক বলে কেউ কখনো শোনেনি |" এই কথাটা শেষ করেই তিনি তাকালেন তার ভাইদের দিকে |
এই শেষ ব্যাপারটা মানুষ চিনবার ব্যাপারে অভিজ্ঞ জন হিরকানুস এর নজর এড়ালোনা | তাহলে কি তার মৃত্যুর পরেই তার নিজের বংশের মধ্যেই তার নিজের ছেলেদের মধ্যেই ক্ষমতার লড়াই লাগতে চলেছে ? তাহলে কি এটাই আসলে ছিল জিহোভার অভিশাপ যার কথাই বলেছিলেন জিহোভার মন্দিরের সেই প্রধান পুরোহিত আরন ? তাহলে কি গৃহবিবাদেই তাদের বংশের পতন হবে ? এসব চিন্তা নিয়ে তিনি আগেও একেবারে ভাবেননি তা নয় | উত্তরাধিকার নিয়ে যুদ্ধে জীবনের শুরুতেই তো তার স্বয়ং নিজের ভগ্নীপতির হাতেই তো তাদের ম্যাকাবি বংশের প্রায় সমাপ্তি হতে বসেছিলো | তাহলে তার নিজের ক্ষেত্রেও কি তার ছেলেদের মধ্যেই এই সংঘর্ষ লাগবে ?
তার শেষ কথাটা বলতে গিয়ে একটু গলাটা কেঁপে গেলো জন হিরকানুসের | "আমি না থাকলে তোমরা নিজেদের মধ্যে মিশর আর সিরিয়ার গ্রীক রাজাদের মত ভাইয়ে ভাইয়ে ক্ষমতার লড়াই করোনা | তোমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে আমি আমার পুরো রাজ্য ভাগ করেই দিচ্ছি | জেরুসালেমের প্রধান পুরোহিত হবে আরিস্টোবুলুস , সামারিয়ার গভর্নর হবে আন্তিগোনেস আর ইদুমিয়ার ক্ষমতা থাকবে আলেকজান্ডারের মধ্যে | এনিয়েই সবাই খুশী থাকো আর দয়া করে কেউই নিজে গ্রীকদের মত একছত্র সম্রাট হবার চেষ্টা করোনা তাহলে গৃহবিবাদে ধ্বংস হবে এই ম্যাকাবি বংশ |"
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।