আগের পর্বগুলো জানতে এখানে পড়ুন। পর্ব ১ , পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬, পর্ব ৭, পর্ব ৮ ।
জেরুসালেম ৮৩ BCE,
অ্যান্টিপেটার এর দিনলিপি
আবার লিখছি অনেকদিন পরে | রাজা আলেক্সান্ডার ইয়ানাই আর রাণী সালোমে দুজনে মিলে ভালোই রাজ্য চালাচ্ছেন | ওদের জেরুসালেমের লোকে বলে লোহা আর মখমল | রাজা ঠিক করেছেন উনি ওর বাবা জন হিরকানুসের মতোই আবার যুদ্ধযাত্রা করবেন | রাজা ইয়ানাই এর ধারণা যেহেতু উনি ওনার ভাইয়ের মতোই নিজেও "ব্যাসিলাস" উপাধি নিলেন তাই ফারিসীরা ওনার উপরেও বেশ চটে আছেন | রাণী সালোমে চেষ্টা করছেন ওনার ভাই সাইমনকে পাশে নিয়ে ফারিসীদের রাগ কিছুটা কমাতে | ওদিকে গ্রীক বণিকদের কাছ থেকে গত বেশ কিছুদিন ধরেই খারাপ খবর আসছে | সিরিয়াতে গ্রীকদের শাসন খুবই দুর্বল অবস্থায় এখন | ওখানে গ্রীকদের রাজ্য দুটো স্পষ্ট ভাগে এখন ভাগ হয়ে গেছে | এন্টিওক থেকে আন্টিওকুস গ্রাইপার শাসন করছেন কিন্তু রাজধানী দামাস্কাসে তার নিয়ন্ত্রণ নেই কোনো | সেখানে রাজা হলেন আরেকজন আন্টিওকুস, আন্টিওকুস সিজিসনুস | এন্টিওকের আন্টিওকুস আর দামাস্কাসের আন্টিওকুস এর মধ্যে সাপে নেউলে সম্পর্ক | প্রায় প্রতি মাসেই দুজনের বাহিনী একে অপরকে আক্রমণ করছে | গ্রীক বণিকদের রোমে বাণিজ্য নিয়ে যাওয়াটাই খুবই চাপের | ওদিকে গ্রীক বণিকেরা না এলে জুডিয়া কর পাবে কোত্থেকে আর আমাদের অর্থনীতি বাঁচবে কি ভাবে সেটা বোধয় কেউই জানেনা !!! বড় খারাপ সময় এটা সত্যি !!!
এদিকে গ্রীক বণিকদের থেকে আরেকটা খবর পেয়েছি | রেশমপথ বলে একটা ব্যাপার নাকি গত বেশ কয়েকবছর ধরে চলছে | শুনেছি আমাদের জুডিয়া থেকে অনেক পূর্বে নাকি চীন বলে একটা দেশ আছে | সেখানকার বণিকদের কাছে থেকে নাকি রেশম নামের একটা কি যেন জিনিসের খুব সুন্দর কাপড় পাওয়া যায় | এই চীনের বণিকেরা এসব কাপড় বেচতো আমাদের কাছের এই সিরিয়ার গ্রীক বণিকদের কাছে | এই রেশমের কাপড় আবার বড় প্রিয় রোমের মানুষদের কাছেও | রোমে গিয়ে এই কাপড় আমি আর আরন দেখেছি | তো সিরিয়ার বণিকেরা এসব কাপড় বিক্রি করতেন রোমের কাছে | রোমে যাবার পথে আমাদেরও পথে কিছু কর মিলতো | কিন্তু এখন সিরিয়াতে এই গৃহযুদ্ধে সব চৌপাট হবার জোগাড় | গণেশ উল্টেছে এখন সব ব্যাবসার | তাই এখন রাজা আলেক্সান্ডার ইয়ানাই একটা পরিকল্পনা ভেবেছেন | উনি চাইছেন যুদ্ধ করে আশেপাশের সব বড় বন্দরগুলো গাজা থেকে কার্মেল জিতে নেবেন, এগুলো এমনিতে সিরিয়ার গ্রীকদের অধিকারের বন্দর কিন্তু যেহেতু এখন সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ চলছে তাই সিরিয়ার গ্রীকেরা খুববেশী বাধা দিতে পারবেনা | তখনই উনি যুদ্ধে জয়ী হয়ে মুখবন্ধ করে দিতে পারবেন ফারিসিদের | যুদ্ধে বিজয়ী রাজার ক্ষমতা খুবই বেশী হয় তখন সবাই তাকে ভয় করে চলে | তাছাড়া গ্রীক বণিকেরাও এতে খুবই খুশী হবে কেননা বন্দর শহরগুলোতে শান্তি ফিরে এলে ওরাও মন দিয়ে বাণিজ্য করতে পারবে রোমের সাথে | আমাদেরও ধনভাণ্ডার সোনা রুপোতে উপচে পড়বে |
আরো বড় কথা এসব পরিকল্পনা আর কাজের জন্যে রাজা আলেক্সান্ডার ইয়ানাই আর বিশ্বাস করছেননা ওর জুডিয়ার মানুষকে | কে জানে আবার যদি ফারিসীরা জানতে পেরে সব ভেস্তে দেয় ! তাছাড়া রাজাকেও এখন খুব একটা বিশ্বাস এমনিতেই করেনা ফারিসীরা | কাজেই রাজা এখন আমাকে আর আরনকে এসব অনেক কাজে ব্যাবহার করছেন বিশেষ করে গ্রীক আর রোমানদের সঙ্গে কথাবার্তার জন্যে | গ্রীক ভাষাটায় আমাদের দখল খুবই বেশী ওদিকে জুডিয়ার সাধারণ ইহুদীদের কাছে এই ভাষাটা কেই অনেকে ঘেন্না করে বিধর্মী পৌত্তলিক গ্রীকদের ভাষা বলে | কিন্তু এখন আমাদের বিশেষ কিছুই যায় আসেনা এসব ব্যাপারে | আরন তো বলেইছেন যে রেশম পথ আর গ্রীক রেশম ব্যবসায়ীরা ছাড়া বাণিজ্য, মন্দিরের ভাঁড়ার, যুদ্ধ, রাজ্যবিস্তার কোন কিছুই গ্রীক ব্যবসায়ীদের থেকে পাওয়া সোনারূপো ছাড়া চলবেনা আর আমরাই রাজা আলেক্সান্ডার ইয়ানাইয়ের হাত শক্ত করছি গ্রীক বণিকদের জুডিয়াতে ডেকে এনে | আমাদের ছাড়া ওনার চলবেইনা |
আচ্ছা এখন আরেকটা কথা বলে এখানেই শেষ করছি | আরন তার মেয়ে নাওমীর সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চাইছেন | উনি বলছেন যে ওনার বয়স হচ্ছে এখন আর বারবার দূরদেশে পাড়ি দিতে ইচ্ছে করেনা ওনার | আমার আর নাওমীর বিয়েটা হয়ে গেলেই ওনার সবচিন্তা দূর হয়ে উনি শান্তিতে জিহোভার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে প্রস্তুত হতে পারবেন | তাছাড়া উনি মনে করেন যে আমাদের সন্তানের মধ্যে দিয়েই হাসমোনিয়ানদের আর তাদের সাধের জেরুসালেমের পতনের সূচনা হবে | এটাই নাকি জিহোভার ইচ্ছা | কে জানে ! নাওমীকে অবশ্য আমার খুবই ভালো লাগে | প্রত্যেকবারই যখন বাইরের দূরের দেশগুলো থেকে আসি তখন ওর জন্যে কিছু নিয়ে আসতে খুবই ভালো লাগতো | সিরিয়া আর মিশরের গ্রীক বণিকদের সিল্কের কাপড় আর মার্বেলের রান্নাবাটি নাওমী খুবই পছন্দ করতো | মনে হচ্ছে নতুন করে জীবনটা আবার শুরু হবে !
জেরুসালেম ৮০ BCE, রাজপ্রাসাদ
হাসমোনিয়ান সম্রাট আলেক্সান্ডার ইয়ানাই তার স্ত্রী সালোমের সঙ্গে এক সন্ধ্যায় রাজপ্রাসাদের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন |সন্ধেবেলার সময় | দূরে একটু করে করে ডুবে আসছে সূর্য | তাদের ব্যক্তিগত কক্ষে রাণী সালোমের সঙ্গে খুব বেশিক্ষণ থাকবার সময় হয়না হাসমোনিয়ান রাজ আলেক্সান্ডার ইয়ানাই এর | ইয়ানাই মূলতঃ যুদ্ধ করতে ও যুদ্ধের প্রস্তুতিতেই দিনের অনেকটা সময় ব্যয় করেন | যখন যুদ্ধ হচ্ছেনা তখনো তিনি ভবিষ্যতের যুদ্ধ পরিকল্পনা বা সে বাবদ অর্থ জোগাড় করতে সময় দেন | আজ বেশ কয়েক মাস পরে তিনি প্রাসাদে ফিরেছেন গাজা ও আশেপাশের বেশ কয়েকটা গ্রীক বন্দর জয় করে | এর ফলে হাসমোনিয়ানদের জুডা রাজ্যের আকার বেড়েওছে অনেকটাই | রাজা ইয়ানাই বেশ খুশী এর ফলে | আজকে তিনি গ্রীক বণিকদের উপহার বিশেষ রক্তবর্ণের রেশম বস্ত্র পড়েছেন | তাদের কক্ষে জুডিয়ার বিখ্যাত বালসামের সুগন্ধীতে ভরপুর | রেশম বস্ত্র ও বালসামের সুগন্ধী বিশেষ পছন্দ ইয়ানাইয়ের |
সালোমে অবশ্য রেশম বস্ত্র পছন্দ করেননা অতোটা | তিনি ফারিসী বংশের সন্তান, রেশম বস্ত্রকে তিনি বা তার পরিবার গ্রীকদের বিলাস ব্যাসনের রীতিনীতি বলে সেসব থেকে দূরে থাকেন | সালোমে নিজে পড়েছেন লিনেনের সাধারণ বস্ত্র | স্বামী আলেক্সান্ডারের যুদ্ধযাত্রা নিয়ে অবশ্য তিনি কিছু ভূমিকা পালন করেননা, তার মূল কাজ ইয়ানাইয়ের অনুপস্থিতিতে জুডিয়ার রাজ্য প্রশাসন চালানো | জুডিয়ার ইহুদীদের মধ্যে এখন স্পষ্টতঃই তিনটে ভাগ দেখা যাচ্ছে | ফারিসী, সাদুসি আর এসিন | এসিনরা অবশ্য রাজ্য রাজনীতি বিষয় আশয় এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায়না তারা জেরুসালেম শহরের বাইরে গ্যালিলীতে পর্বতের গুহা বা নেগেভে মরুভূমিতে থাকতে পছন্দ করে এবং মাঝে মাঝে শহরে এসে সাধারণ মানুষকে বিষয় ছেড়ে জিহোভার দিকে ফিরে যেতে বলে | ফারিসী আর সাদুসিদের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা | জেরুসালেমের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সানহেদ্রিনে আসন পাবার জন্যে এদের মধ্যে খুবই রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতেই থাকে | সাদুসিরা রাজার পক্ষেই মূলতঃ থাকতে ভালোবাসেন কিন্তু মুস্কিলটা হয় ফারিসীদের নিয়ে | এরা তোরা আর তার আইনের বাইরে প্রায় কিছুই মানতে চাননা তাই তাদের কে নিয়েই সমস্যাটা তৈরী হয় বেশী করে | রাজা আলেক্সান্ডারের যুদ্ধনীতি, অর্থনীতি সবই এই ফারিসীরা তোরার আইনের কষ্টিপাথরে বিচার করে দেখতে চান ! সানহেদ্রিনে সবসময়েই কিছু ফারিসী রাজার নীতি নিয়ে সমালোচনা করতে ছাড়েননা | এদের সঙ্গে হাসমোনিয়ান বংশের মোটামুটি একটা কাজ চালানোর মত সম্পর্ক রক্ষার কাজটা দেখতে হয় সালোমেকেই যেহেতু তিনি নিজেও একজন ফারিসী বংশের মেয়ে আর সবচেয়ে বড় কথা তিনি মানুষের মনের দিকটা খুব ভালোই বোঝেন |
স্বামী আলেকজান্ডারকে সবসময়ে বুঝতে পারেননা | তার আগের রাজা আরিস্টোবুলুসের মতোই ইয়ানাই রাজা উপাধী গ্রহণ করতে ছাড়েননি ! ফারিসীরা এমনকি স্বয়ং সালোমে নিজেও এই ব্যাপারটা পছন্দ করেননি সেরকম ভাবে | হাজার হোক, ফারিসী মতানুযায়ী তোরার নিয়মে নবী দাউদের (বাইবেলে ডেভিড ) বংশের কেউ ছাড়া কেউই ইহুদীরাজ হতে পারবেনা কিন্তু আলেক্সান্ডার সেসব মানেন নি | তাকে নজরবন্দী করে রাখা তার ভাই আরিস্টোবুলুসের মতোই গ্রীকদের মত শক্তিশালী রাজা ছাড়া টিঁকবেনা জুডিয়ার স্বাধীনতা | ফারিসীরা এমনকি সালোমে নিজেও মানেন যে জিহোভার কাছে ইহুদীজাতির প্রার্থনার ফলেই হাসমোনিয়ানদের রাজ্য ও গৌরব লাভ | কিন্তু আলেক্সান্ডার প্রথম থেকেই জিহোভার দৈব ক্ষমতা নয় তার ইদুমিয় আরব ও গ্রীক ভাড়াটে সেনা আর গ্রীক বণিকদের কর বাবদ দেওয়া সোনারূপোর মোহরের উপরেই বেশী বিশ্বাস রাখেন | এদিক দিয়ে তিনি আরিস্টোবুলুসের মতোই অনড় | মাঝে মাঝে সালোমের মনে হয় যে আরিস্টোবুলুস যেন নিজে বেঁচে থেকে যা করতে পারেননি সেসব করতেই মরবার পরে ঢুকে পড়েছেন ইয়ানাই এর দেহে |
আলেক্সান্ডার ইয়ানাই এখন গাজা থেকে কার্মেল জয় করে আনন্দের চরম শিখরে | তিনি গর্বোদ্ধত ভাবে বললেন
ইয়ানাই : সালোমজীয়ন, (এ নামেই মাঝে মাঝে সালোমে কে ডাকেন ইয়ানাই | সালোম কথাটার অর্থ হিব্রুতে শান্তি আর জীয়ন হলো জেরুসালেমের আরেক নাম ইহুদী ভাষাতে ) তুমি জানো আজকে কত আনন্দের দিন আমাদের | মনে হচ্ছে যেন আমি নবী দাউদ (বাইবেলে ডেভিড ) আর সুলেমানকেও (বাইবেলে সলোমন ) ছাড়িয়ে গেছি | আড়াইশো বছর আগের সেই ম্যাসিডোনিয়ার গ্রীক বীর আলেক্সান্ডার, ওহঃ আমি যেন তাকেই স্মরণ করতে পারছি | আমার নিজেকে দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার মনে হচ্ছে সালোমজীয়ন |
সালোমে : ইয়ানাই ভুলে যেওনা তোমার প্রধান পরিচয় এখনো কিন্তু তুমি জিহোভার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত | কে তোমাকে শিখিয়েছে ওই গোয়িমদের রাজা আলেক্সান্ডারের সঙ্গে নিজেকে ভাবতে ! তোমার ওই নতুন ইদুমিয় পরামর্শদাতা অ্যান্টিপেটার ?
সালোমে : ইয়ানাই ভুলে যেওনা তোমার প্রধান পরিচয় এখনো কিন্তু তুমি জিহোভার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত | কে তোমাকে শিখিয়েছে ওই গোয়িমদের রাজা আলেক্সান্ডারের সঙ্গে নিজেকে ভাবতে ! তোমার ওই নতুন ইদুমিয় পরামর্শদাতা অ্যান্টিপেটার ? ভুলে যেওনা যে অনেকেই ওকে এখনো ইহুদী নয় গোয়িম বলেই মনে করে | ওই তোমার মাথায় এসব দ্বিতীয় আলেকজান্ডার হবার অদ্ভুত খেয়াল ঢোকাচ্ছে ! তোমার জয় আসলে আমার আর জায়নের সব মানুষের প্রার্থনার আর জিহোভার আশীর্বাদের জিত !
ইয়ানাই (ঈষৎ রাগতঃ স্বর ) : সালোমজীয়ন, ভুলে যেওনা আমার তলোয়ারের জোরেই জেরুসালেম বেঁচে আছে | আর ইদুমিয় অ্যান্টিপেটার ? ওর পরামর্শেই তো আরব আর গ্রীক ভাড়াটে সৈনিকদের নিয়ে যুদ্ধ করলাম আর তাই তো বার বার জিতলাম নাহলে কিন্তু জেরুসালেমের বাইরে গাজা অবধি পোঁছতেই পারতামনা ! তোমাদের ফারিসী বংশের তো তোরা পড়া ছাড়া আর কিছুতেই জ্ঞান নেই ! আর ইহুদী সেনারা ? ওরা তো লড়তেই চায়না খালি নিজের গ্রামে বসে তোরা পড়া ! ওদের দিয়ে রাজ্যবিস্তার সম্ভবই নয় ! একমাত্র ইদুমিয়, নাবাতিয়ার আরব আর সিরিয়ার গ্রীক ভাড়াটে সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধ করেই রাজ্যবিস্তার সম্ভব | ওরা সবাই পেশাদার যুদ্ধব্যাবসায়ী | আর এটা ভুলোনা যে রাজা গদীতে থাকে তলোয়ারের জোরেই, প্রার্থনা বা জিহোভার দয়ায় নয় !!!
ফারিসী নেতা সাইমন যিনি ওদের অভ্যর্থনা করতে ঢুকছিলেন ঘরে তিনি এই ইয়ানাইয়ের এই শেষ কথাটা শুনেই থমকে গেলেন |
সাইমন (গলাতে উষ্মা ও শ্লেষ ) : "মাননীয় প্রধান পুরোহিত, আমি আপনাদের সপরিবারে আমন্ত্রণ করতে এসেছিলাম জেরুসালেমের জিহোভার মন্দিরে বার্ষিক সুকোট উৎসবে | কিন্তু মনে হচ্ছে যে আপনি ঠিক প্রস্তুত নন | আপনি যেন এখনো আপনার যুদ্ধযাত্রার মেজাজেই রয়েছেন | সত্য কথা বলতে কি পবিত্র সুকোট উৎসবে আপনি গত কয়েক বছর নিয়মিত ছিলেননা যেহেতু আপনি যুদ্ধ যাত্রায় ব্যাস্ত ছিলেন আপনার ওইসব গোয়িম আরব আর গ্রীক সেনাপতিদের সঙ্গে এবং মনে হচ্ছে ওদের সঙ্গে মিশে আপনি ভুলেই গেছেন পবিত্র সুকোট উৎসবের মাহাত্ম্য ! "
ইয়ানাই : (বেশ রাগতঃ ) “সাইমন তুমি বারবার সালোমের ভাই আর আমি খুব নরম মানুষ বলে পার পেয়ে যাও অন্য সিরিয়া বা মিশরের গ্রীক রাজাদের কেউ হলে বুঝতে রাজরোষে পড়া কাকে বলে ! যাহোক শোনো কালকে আমি প্রধান পুরোহিত হিসাবে যাবো জেরুসালেমের জিহোভার মন্দিরে বার্ষিক সুকোট উৎসবে | সালোমজিওনও থাকবে আমার সাথে |”
অদৃষ্ট যেন একথা শুনে অলক্ষ্যে হাসলেন ! জেরুসালেমের জিহোভার মন্দিরে বার্ষিক সুকোট উৎসব হচ্ছে যখন ইহুদী জাতি তাদের বিগত বছরের সব ভালো কিছুর জন্যে জিহোভার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করে | প্রধান পুরোহিত হিসাবে হাসমোনিয়ান বংশের সম্রাটদের উপস্থিত থাকতে হয় এখানে মন্দিরের বার্ষিক পবিত্রতা রক্ষাতে | সুকোট উৎসবের রীতি অনুযায়ী প্রথমে প্রধান পুরোহিত বালসাম ও সুগন্ধী গোলাপ জলে ধুয়ে দেন জিহোভার মন্দির | এই অনুষ্ঠানটিকে বলে আরবা মিনিম | এসময়ে ইহুদীরা একহাতে লুলাভ অর্থাৎ গাছের ডাল ও অন্য হাতে একটি এট্রোগ (একটি টক ভ্যালেন্সিয়া জাতীয় ফল ) নিয়ে উপস্থিত থাকেন |
কিন্তু এবারে উৎসবের শুরুতেই সমস্যা হলো | বালসাম ও গোলাপের সুগন্ধীর জল দিয়ে মন্দির পরিষ্কারের বদলে ভুল করে নিজের পায়ের উপরেই সব জল ঢেলে বসলেন আলেকজান্ডার ইয়ানাই | ব্যাস, ফারিসিরা যারা অনেকদিন ধরেই ইয়ানাইয়ের যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত কর বসানো আর ডেভিডের পবিত্র বংশের না হয়েও নিজেকে রাজা ঘোষণা করা ইত্যাদি কাজে বেশ ক্ষেপে গেছিলো এবার প্রধান পুরোহিত হিসাবে এই কাজে তাদের এতোদিনের চেপে রাখা রাগ আগ্নেয়গিরির মত ফেটে পড়লো | "ইয়ানাই ম্যাকাবী বংশের কলঙ্ক", "হাসমোনিয়ানরা গ্রীকদের সঙ্গে মিশে গোয়িম হয়ে গেছে" এসব উত্তপ্ত চিৎকারে ফেটে পড়লো মন্দির প্রাঙ্গন | সালোমের সুখ্যাতি আছে ফারিসীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষাতে | তিনি আর সাইমন উত্তপ্ত ফারিসী জনগণকে আলোচনা করে থামাতে চাইলেন কিন্তু জনগণ ক্রমশঃ নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলো | নিজেদের হাতের ফল ছুঁড়তে লাগলো ইয়ানাইয়ের উপরে | ইয়ানাইয়ের ইহুদী রক্ষীবাহিনী ছত্রভঙ্গ হতে লাগলো যখন জনগণ তাদের উপরে চড়াও হলো | পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে যেতে বসেছে সেসময়ে অ্যান্টিপেটার নামলেন আসরে | তিনি এতোক্ষন দর্শকদের পিছনের সারিতেই ছিলেন কিন্তু এখন বিপদ বুঝে ইয়ানাইয়ের আরব ও গ্রীক ভাড়াটে সৈন্যদলকে খবর দিলেন | ইহুদীদের এই পবিত্র জেরুসালেমের মন্দিরে অ ইহুদীদের প্রবেশ নিষেধ তাই মন্দিরের বাইরেই এদের রেখে দেওয়া হয়েছিলো বিপদের আশঙ্কায় ! কিন্তু এখন খবর পেয়েই সুশিক্ষিত এই পেশাদার যোদ্ধার দল তলোয়ার আর বর্শা নিয়ে ফারিসীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো | কিছুক্ষনের মধ্যেই বেশ কয়েকশো ফারিসির রক্তমাখা লাশ পড়ে রইলো জেরুসালেমের পবিত্র মন্দিরে আর ইয়ানাইয়ের ভাড়াটে সৈন্যেরা সপরিবারে ইয়ানাইকে সরিয়ে নিয়ে গেলো জেরুসালেমের কাছের বাসান দুর্গে |

(জেরুসালেমের জিহোভার মন্দিরে বার্ষিক সুকোট উৎসব : হাসমোনিয়ান সম্রাট ইয়ানাইকে ফল ছুঁড়ছেন ফারিসিরা )
সেদিন রাতেই ইয়ানাই কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন | জেরুসালেমের আট হাজার ফারিসী ইহুদীকে ক্রশ এ টাঙিয়ে হত্যা করবার নির্দেশ দিলেন ইয়ানাই | সালোমে চেষ্টা করেছিলেন অনেক তাকে আটকাতে কিন্তু সফল হলেননা | কয়েকদিন পরে নিজের প্রাসাদের ছাদ থেকে এই ক্রশবিদ্ধ দেহগুলোকে দেখে হাসছিলেন ইয়ানাই আর তার বিশ্বস্ত অ্যান্টিপেটার কয়েকজন নগরনটির সঙ্গে | দুঃখিত সালোমে একদিকে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন ইয়ানাইয়ের এই সিদ্ধান্তে |

(জেরুসালেমের প্রাসাদের ছাদ থেকে ক্রশবিদ্ধ ফারিসীদের দেহগুলোকে দেখে হাসছেন ইয়ানাই, নগরনটীরা আর তার বিশ্বস্ত অ্যান্টিপেটার | দূরে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছেন জেরুসালেমের বিবেক সালোমে )
ইয়ানাই : দেখো দেখ অ্যান্টিপেটার দেখ, ওই লোকটা, ওই বার লেভ আমাকে প্রথম ফল ছুঁড়েছিলো আজকে ওর নিজেরই ক্রশ এ ঝোলার অবস্থা দেখো দেখো | বলতে বলতেই ইয়ানাই এক নগরনটিকে নিজের কোলে বসালেন |
অ্যান্টিপেটার : যথার্ত বলেছেন সম্রাট | আপনি তাড়াতাড়ি ভাড়াটে সৈন্যদের নিয়ে এই বিদ্রোহ দমন না করলে আজকে এই ধর্মান্ধ ফারিসিরা কি করতো ভাবুন তো ! আপনিই দ্বিতীয় আলেকজান্ডার হবার উপযুক্ত |
সালোমে : নীচের ওই বাচ্চাগুলো আর ওদের মাদের দেখো ইয়ানাই | তুমি চিরকালের মত জেরুসালেমের আশীর্বাদ হারালে ! জিহোভার মন্দির আজকে তুমি অপবিত্র করেছো ফারিসীদের রক্তে | আজ থেকে জেরুসালেম তোমাকে আর রাজা মানবেনা | ভয় করো জিহোভার ক্রোধ আর অভিশাপকে ইয়ানাই |
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।