তর্ক/বাদ/বিতণ্ডা
বাংলার নিজের সম্পত্তি নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই উঠে আসে যে তিনটি বিষয়ের নাম,তারা হল: হিমসাগর আম, কীর্তন আর নব্য ন্যায়। হিমসাগর আম নিয়ে আর নতুন করে কী বা বলি? কীর্তন কী? সে হল নাড়ীর গভীর থেকে উঠে আসা হাহাকার : রাধে... এ.! সে বুঝি মানব জনমের সেই সার্থক অনুভূতি যেখানে সব খুইয়ে সব পেয়েছির অভিযান! বাকি রইল নব্য ন্যায়। সে কী দিলে আমাদের?
সে দিলে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে চিন্তা ভাবনার বাস্তব তলোয়ার! সে তলোয়ারের সাথে প্রাচীন ন্যায় আমাদের চেনা করিয়ে দিলেও নব্য ন্যায় তাতে শান দিয়ে দিয়ে কোন কাজে কোনটি কেমন ভাবে ব্যবহার করব সেটি হাতে কলমে শিখিয়ে ছেড়েছে! প্রয়োজনমাফিক আসে তারা! কিছু তোলা রইলো বুঝদার মানুষের সাথে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলার জন্য, তার নাম তর্ক। এখানে যুক্তি দিয়ে সম্ভব আর অসম্ভব কে দেখিয়ে দেওয়া হয়। শুধু যুক্তিতে পেট ভরেনা, যদিনা সত্য ও কল্যাণ কে খুঁজে পাই। তার অনুসন্ধান করতে বন্ধুত্বপূর্ণ বিতর্ক হল বাদ। কিছু ক্ষেত্রে নিজের মত জোর করেই তুলে ধরতে লাগে, সেটি হলো জল্প। তবুও সেখানে কিছু থাকে। আর নিজের কোনো সদর্থক বক্তব্য ছাড়াই কেবল কুযুক্তি মারামারি,দাঙ্গা হাঙ্গামা করে অন্যকে হটিয়ে দেবার চেষ্টার অপর নাম বিতণ্ডা।
বিতণ্ডা খুব যে সভ্য পথ তা নয়। তাই বলে বিতণ্ডা মোকাবিলায় ভদ্রলোকের কখনোই বিতণ্ডার আশ্রয় নেওয়া যাবেনা এমন নয়। কারণ তর্ক, বাদ, ইত্যাদিকে বর্বর কুল আমলই দিতে চায়না! তাই বিতণ্ডার উত্তর সে নিজেই। সভ্য মানুষরাও আত্মরক্ষায় ও শাস্ত্র রক্ষায় এটি কিছুদূর পর্যন্ত ব্যবহার করতেই পারেন। অবশ্যই সে পথ শাস্ত্র সম্মত। নয়তো পুঁথিতে উল্লেখ থাকবে কেন? বর্বর গুন্ডাদের হাত থেকে সুচিন্তার কচি ও স্পর্শকাতর চারা গাছটি রক্ষা করতে তাদের তাড়ানোই একমাত্র উপায়। যুক্তি তর্কে বুঝিয়ে ফল নেই। বাগানে ঢুকে পড়া ছাগলকে লাঠি মেরেই তাড়াতে হয়, যুক্তিতে তাকে বোঝানো যায়না!
ছাগল খাওয়া গাছ বাঁচেনা। তাই ছাগল তাড়ানোর কাজটি সম্পন্ন করতে হবে সবার আগে,যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। তারপর আসবে বাদ ও তর্ক - কিবা ঠিক পথ, কিবা ভুল পথ।,কোনটা সম্ভব আর কোনটা অসম্ভব। সেটা জরুরী বটেই। তবে যখন ছাগল তাড়ানোই আশু প্রয়োজন, তখন সেটি আগে না করে তর্কে ঢোকার চেষ্টা করলে তর্ক করার পরিবেশটিই আর এ জীবনে আসেনা!
যুক্তি,বুদ্ধি,বিবেক ইত্যাদির ও কিছু ওয়ার্ক কালচারাল পরিবেশ দরকার হয়। সে পরিবেশ রক্ষা করতে আগে ছাগল তাড়াতে হবে, পরে নাহয় বিপক্ষে যুক্তির সাথে যুক্তির চর্চা করা যাবে। কী সে করতে পারত, কী সে করেনি, কী ভাবে সে নিচে নেমেছিল একদা ইত্যাদি।কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তবে ভুলেরও নানান প্রকার থাকে। কুতর্ক সেই প্রকারগুলি গুলিয়ে দিয়ে মুড়ি মিছরি এক করে দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে এটি এখন বাঙালি তথা ভারতীয় সংস্কৃতির তর্কপ্রিয় বৌদ্ধিক ঐতিহ্য কে যেন ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়। সং এর মুখোশ চাপিয়ে দিচ্ছে সে আমাদের মুখে!
আপাতত সর্ব সাধারণ স্তরে একটা নৈতিক ও বৌদ্ধিক সংস্কার বড্ড প্রয়োজন। আর সেটার জন্য প্রয়োজন আমাদেরই নির্লোভ বিচারবুদ্ধি। পক্ষধরের পক্ষশাতন এর ঐতিহ্য বহন করতে হবেতো!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।