লেখ্য মাধ্যমে ভাব প্রকাশে সাবলীল মানুষের পরিণত বয়সে আত্মজীবনী লিখতে ইচ্ছে করে। যদি সে জীবনের চালচিত্র হয় বৃহৎ, বর্ণময়, যদি সে লেখার বিষয়বস্তু নিজস্ব পরিসরের গণ্ডি ছাড়িয়ে সেই সময় ও সমাজের কিছু ছবি তুলে ধরে, তাহলে তেমন আত্মজীবনী আত্মীয় পরিজনের পরিসর ছাড়িয়ে বৃহৎ পরিমণ্ডলেও আদৃত হয়। তেমন আত্মজীবনীর ভবিষ্যতের জন্য একটা রেফারেন্স ভ্যালুও থেকে যায়।
তেমন কিছু আত্মজীবনী পড়ে বেশ লেগেছিল। যেমন তপন রায়চৌধুরীর বাঙালনামা, অশোক মিত্রর তিন কুড়ি দশ, সলিল চৌধুরীর জীবন উজ্জীবন, তপন সিংহর মনে পড়ে, মৃণাল সেনের তৃতীয় ভূবন, নারায়ণ সান্যালের পঞ্চাশোর্ধ্বে ও ষাট একষট্টি ইত্যাদি।
বড় ক্যানভাসে লেখা অমলেন্দুবাবুর আত্মজীবনীতেও ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ছাড়াও আরো অনেক উপাদান আছে। যেমন ইরাণের রাজনৈতিক পালাবদলের যুগসন্ধিক্ষণে তাঁর সেখানে অবস্থান, সত্তর থেকে নব্বই দশকে কম্পিউটারের বিবর্তন, লন্ডনে টেগোর সেন্টার সম্পর্কে নানা বিবরণ, কিছু বিশিষ্ট মানুষের কথা ইত্যাদি। এইসব উপাদান লেখাটিকে ব্যক্তিগত জীবনচরিতের বাইরে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
এই আত্মজীবনীর ভূমিকায় (পর্ব-১) লেখক বলেন - নিজের জন্য লেখা, যা বাক্সবন্দী থাকবে, তাতে যা মনে হয় তাই লেখা যায়। পাঠক যখন পুত্র ও উত্তরসূরিরা হতে পারে তখন লেখায় সেই লাগাম-ছাড়া ভাব থাকে না আর। তারপর প্রস্তাব এলো এটাকে ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করার। তার অর্থ আমার সকল কর্মকান্ড উন্মোচিত হয়ে যাবে পৃথিবীর আপামর জনতার কাছে। আমার জীবনের কথা আর ‘রবে না গোপনে’। আমার জীবনের খঁটিনাটি কেউ জানে না। আমার সমগ্র ‘আমি’কে একাধারে কেউ দেখেনি। জীবনের সব ঘটনা, সকল আলো অন্ধকারের দিনগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরা সহজ নয়। এটি কঠিন কর্ম --- প্রচুর সাহসের প্রয়োজন। আমার সে সাহস আছে কি?
পাঠক হিসেবে এ লেখায় আমি লেখকের জীবনের তেমন কোনো ‘অন্ধকার’ নিদর্শন দেখিনি যা উন্মোচন করতে ‘প্রচুর সাহসের’ প্রয়োজন। তাহলে হয় লেখকের জীবনে তেমন কোন অন্ধকার উপাদান নেই অথবা থাকলেও তা এ লেখায় তা আসেনি।
এই আত্মজীবনী শুধুই আলোয় ভরা। জীবনের বহু প্রতিকূলতা তিনি পেরিয়ে এসেছেন নিরলস পরিশ্রম ও নিয়মিত পড়াশোনায়। অভিযাত্রীক মানসিকতায় পেশাদার জীবনে বহুবার পেশা বদলানোর ঝুঁকি নিয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে বিফলতা এসেছে। তবে ভেঙে না পড়ে আবার চরৈবেতি মন্ত্রে এগিয়ে গেছেন। এই উদ্যম ও লেগে থাকার মানসিকতা (Enthusiasm and perseverance) সত্যিই প্রশংসনীয়।
জীবনের ‘অন্ধকার দিনগুলো’ লেখকের কাছে হয়তো বাস্তব সমস্যায় জীবনের কঠিন সময়গুলি। আমার কাছে তা নয় - কারণ তা তো ভাগ্যের মার - তা লিখতে কোনো সাহসের প্রয়োজন হয় না। আমার ধারণায় জীবনের কিছু ‘অন্ধকার’ পর্ব হচ্ছে এমন কিছু ঘটনা যা সাময়িক আবেগ, উত্তেজনা, আবিস্কারের তাড়নায় মানুষ করে ফেলে, কিন্তু পরিণত বয়সে তার জন্য লজ্জাবোধ হয়, মুষ্টিমেয় ঘনিষ্ঠ সঙ্গেও তা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ হয় - বই হিসেবে প্রকাশ করা তো দূরের কথা।
যেমন কিছুটা করেছেন লন্ডনে ঘরোয়া আড্ডায় শক্তি, শরত, ভাস্কর। মলয় রায়চৌধুরীর আত্মজীবনীমূলক লেখায় কিছু অংশ পড়ে থমকাতে হয়। তা যদি অকপট সত্যভাষণ হয় - প্রচুর সাহসের প্রয়োজন। তা যদি হয় সযত্নে নির্মিত ‘অন্ধকার’- পরিবেশনের গিমিক, তাহলে অবশ্য অন্য কথা। সুনীল, শক্তি, শরত, দীপক গোষ্ঠীর সন্দীপনের কিছু লেখাতেও এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা লিখতে সাহসের প্রয়োজন। তেমন কিছু লেখা গল্পের মতো অন্য চরিত্রর নাম দিয়ে লিখলেও - বাস্তব প্রোটাগনিস্টকে পরিস্কার বোঝা যায়।
তাহলে জীবনের ‘অন্ধকার’ দিক বলতে কি এমন কিছু পর্ব বা মানসিক অবস্থা যেখানে যৌনতার ভূমিকাই মুখ্য? হতে পারে, কারণ প্রবল উন্মুক্তমনা, দারুণ দুঃসাহসী মানুষের কথা বাদ দিলে, আপামরের কাছে যৌনতার কিছু hues and layers ট্যাবু বলে মনে হয়। তবু কিছু তির্যক প্রতিভাস (manifestation) সত্ত্বেও যৌনতা - তার একই অঙ্গে বহু রূপ নিয়ে - মানবজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য প্রবৃত্তি।
তাহলে আরো কিছু অন্ধকার দিকগুলি হতে পারে - ইর্ষা - লোভ - শঠতা - সংকীর্ণতা - কৃতঘ্নতা - প্রতিহিংসা ইত্যাদি যা আদর্শ, মহান মানবচরিত্রে অবাঞ্ছিত ও নিন্দিত বলে পরিগণিত হয়।
কিন্তু অমলেন্দুবাবুর লেখায় এসবেরও কোনো উল্লেখ নেই। বরং উন্মোচিত হয়েছে ঠিক তার উল্টো - মহানুভবতা। তাই সহোদর ভাইয়ের অকল্পনীয় অকৃতজ্ঞতা, অচিন্তনীয় দুর্ব্যবহারে সাময়িক দুঃখ পেলেও তাঁর ভাইয়ের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ হারিয়ে যায় না।
নানা মনীষীর উক্তি লেখা তাঁর স্ত্রীর একটি একান্ত খাতার প্রথম পাতায় লেখা - আমায় মনুষ্যত্ব দাও - আমায় মানুষ করো - শ্রী অরুন্ধতী। স্বামী হিসেবে লেখকের মতে ‘অনু সামগ্রিক অর্থে সত্যই একজন ‘মানুষ’ ছিল। ‘মানুষ’ হওয়ার জন্য এমন আকুলতা, এমন ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা যে না দেখেছে সে কল্পনা করতে পারবে না। মনুষ্যত্বের এমন পূর্ণ আধার আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি।’ (পর্ব-৩৩)।
এমন স্ত্রীর দীর্ঘ সাহচর্যে অমলেন্দুবাবুর জীবনালেখ্যও এক আদর্শ স্বামী, পিতা, ভ্রাতা, বন্ধু, পেশাদার কর্মী, সামাজিক মানুষের প্রতিচ্ছবি। সেখানে কোনো কারণে সাময়িক মনঃক্ষুন্নতা থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব নেই।
যৌবনে কলকাতার বন্ধুদের মধ্যে প্রেসিডেন্সিতে বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হেমন্ত তার বন্ধুদের লেখার ক্ষেত্রে মনরাখা প্রতিক্রিয়া জানানোয় বিশ্বাসী নয়। সে ক্ষুরধার সমালোচক। অমলের কবিতার ওপর হেমন্তের নৈর্ব্যক্তিক সমালোচনা শুনে কখনো অমলের চোখে জল আসত। বাড়ি ফিরে প্রতিজ্ঞা করতো আর কোনোদিন কবিতা লিখবে না। তাও দেশ ছাড়ার তিরিশ বছর পর প্রকাশিত হয় লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত অমলের কবিতার বই “সংবেদন" - কারণ, অমলের মতে, কবিতা লেখার রোগ মরলেও যাবে না। সেই বইয়ের ওপর হেমন্তের ০৫.০২.৯৮তে লেখা চিঠি অমলের আত্মজীবনীতে এসেছে। (পর্ব-৯)
বিদেশ, প্রবাস পর্বের কবিতাগুলোর আকর্ষণ অন্য দিক থেকে। তোমার জীবিকা ও জীবনের সংহতি, স্থিতি তোমার লেখার চেহারা পালটে দিয়েছে। “তিরাশির কলকাতা: আবার দেখা”-য় নস্টালজিক আবেগ-কল্পনার চেয়েও যে “আশাবাদ” তোমার উপর ভর করেছে তা কিন্তু যুদ্ধ-বিক্ষত তরুণের স্বপ্ন নয় বরং এস্টাবলিশমেন্ট-এর সুখী গৃহকোণের মিথ্যাচার। …. তোমার এই পর্বের কবিতায় সন্ধানের চেয়ে কখনো আত্মসমাহিত প্রাপ্তির সুখ, কখনো অবিচ্ছেদ নিজের দিকে তাকানোর চিহ্নই বেশি। …. কবিতা যাকে ছুঁতে পারেনি, ভালোবাসা যাকে লজ্জা দিলো, কী সেই অনুচ্চারিত কথা অমল যা তোমার কাছে আজও অধরা! একি কেবল রোমান্টিক অতৃপ্তি না অন্য কিছু? একি সেই বিপন্ন বিস্ময় যা আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে, আজও আমাদের ক্লান্ত করে! কিন্তু তুমি যে সেই হৃদয়ের সন্ধান পেয়ে গেছ সেখানে স্বর্গ এসে বাসা বেঁধেছে! এখানেই তোমার কাব্যে একটু খটকা রয়ে গেছে আমার। এত সব কিছুকে তুমি মেলাচ্ছ কী করে? বৈপরীত্যের ভিতর দিয়ে অগ্রগতির তত্ত্বে সম্ভবত এখনও বিশ্বাস তোমার যায়নি, তাই হৃদয়ের “সংবেদন“কে পুঁজি করে আজো কবিতা চর্চা। শখের কবিদের জীবন এতো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তোমার কলমের কালি যেন শুকোয় না।
হেমন্তের এই চিঠিটা ওনার আত্মজীবনীতে রেখে অমলেন্দুবাবু সাহসী উদারতার নিদর্শন দিয়েছেন।
লেখায় দুটি জায়গা আমার গোল্ডেন মোমেন্ট বলে মনে হয়েছে। এক, যখন ইরানে পরিস্থিতি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও, সুযোগ পেয়েও অরুন্ধতী তার দুই সন্তানকে নিয়ে অমলেন্দুকে ছেড়ে কলকাতা যেতে রাজি হয় না। যা থাকে কপালে ভেবে থেকে যান একসাথে ইরানে। (পর্ব-১৬)
দুই, শেয়ার বাজারে বিরাট মার খেয়ে যখন পিতা অমলেন্দু বিমর্ষ হয়ে রয়েছেন, গৌতম এককথায় তার সঞ্চয় থেকে সত্তর হাজার পাউন্ড বাবার এ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেয়। (পর্ব-৩৩)
বুবাই ও গৌতম - দুজনেই পুত্র হিসেবে অনবদ্য - এবং মানুষ হিসেবেও বেশ বিচিত্র - স্টিরিওটাইপের বাইরে চরিত্র - বিশেষ করে বুবাই। এমন সন্তানের জন্য গর্ববোধ করা ছাড়াও পিতামাতা নিজেদের সৌভাগ্যবানও মনে করতে পারেন।
এই আত্মজীবনী একটি মানুষ এবং তার পেশা - পরিবার - বন্ধুবান্ধবের আখ্যান নয়। আগে উল্লেখিত কয়েকটি মনে রাখার মতো আত্মজীবনীর মতো - এটিও বহমান সময়ের কিছু অংশের দলিল।
অধ্যাবসায় ও অভিনিবেশ সহকারে ছিয়াশি বছর বয়সে দীর্ঘদিন ধরে এমন বিরাট পরিসরে এই আত্মজীবনী ধারাবাহিকভাবে লেখার জন্য লেখককে জানাই অশেষ অভিনন্দন। যখন এটা প্রকাশিত হচ্ছিল তখন পড়া হয়নি। তাই প্রতি পর্বে মতামত জানাতে পারিনি। হালে কয়েক সপ্তাহ ধরে একটানা পড়ে শেষ করে বুকমার্ক করে রাখলাম - পরে কখনো কোনো রেফারেন্সের জন্য যাতে ফিরে যেতে পারি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।