মুম্বাই হাইকার্স সাইট থেকে খোঁজ পেয়ে অনিকেতের সাথে যোগাযোগ করলাম। ওর দলের সাথেই গেলাম সহ্যাদ্রিতে আমার প্রথম ট্রেকে - হরিহরগড়। ঐ কেল্লার অবস্থান নাসিক জেলায় পশ্চিমঘাটের ত্রিম্বক রেঞ্জে। ট্রেক শুরু হবে রবিবার (৭.১০) ভোরে। ওটা ডে-ট্রেক। রবিবার রাতেই মুম্বাই ফেরা। ভোরে ঐ ট্রেক শুরু করতে শনিবার (৬.১০) রাতে রওনা হতে হবে। কারণ বেস ভিলেজের দূরত্ব খারঘর থেকে প্রায় ১৮০কিমি। ট্রেনপথে একশো, বাকিটা গাড়িতে। অনিকেত বললো, থানে থেকে লাস্ট কাসারা লোকালে উঠবেন সামনে থেকে তৃতীয় কম্পার্টমেন্টে।
বছর ত্রিশের অনিকেত আগে অন্য দলের সাথে যেতো। হালে নিজে ট্রেক অর্গানাইজ করছে। অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে গোটা দশেক ট্রেক আয়োজন করে। ওর সাথে রেগুলার জনা আটেক যায়। বাকিরা ফ্লোটিং মেম্বার। কয়েকটিতে গিয়ে আর যায় না। আবার আমার মতো নতুন কেউ দলে যোগ দেয়। এভাবে আসাযাওয়া চলতে থাকে। পরে হৃদ্যতা বাড়লে অনিকেত বলেছিল, শুধু পয়সা রোজগারের জন্য ও এটা করেনা। ও খুব রিজনেবল চার্জ করে। জনা বারো গেলে খরচ খরচা বাদ দিয়ে ট্রেকপিছু হাজার দুয়েক বাঁচে। কেরানীর চাকরী করে। মাইনে বেশি নয়। এইভাবে নিজের শখও মেটে, কিছু অতিরিক্ত আয়ও হয়। ওর দলে এযাবৎ আমিই প্রথম বাঙালি সদস্য।
অনিকেতের সাথে প্রথম ট্রেকটি খুব ভালো লেগেছিল। ওখানেই আলাপ হয়েছিল কয়েকজন আকর্ষণীয় মানুষের সাথে। বিশেষ উল্লেখযোগ্য সমবয়সী হাসিখুশি রোহিণী ম্যাম ও বিশ বছরের সিনিয়র যশোয়ন্ত মাড়কে। বাকি কয়েকজন রেগুলার ট্রেকার সবাই তিরিশের আশপাশে। দীর্ঘদেহী সন্তোষ কানসে ও বডি বিল্ডার গৌরব তিওয়ারি দলের পক্ষে নির্ভরযোগ্য সদস্য। শৈলেশ মোরে, রীতেশ দ্বিবেদী, পরাগ যোশি অত্যন্ত হাসিখুশি মজারু স্বভাবের। অনিকেতের সাথে যে দশটি ট্রেকে গেছি তার অধিকাংশতেই এরা ছিলো।
মুম্বাই থেকে সেন্ট্রাল লাইনে নাসিক অভিমুখে সাবর্বান ট্রেন সার্ভিসের অন্তিম স্টেশন কাসারা। লাস্ট কাসারা লোকাল থানে আসে রাত পৌনে বারোটা নাগাদ। খারঘর থেকে ট্রান্স হারবার লাইনে (পানভেল-থানে) রাত সাড়ে দশটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম থানে। ট্রেন আসতে কম্পার্টমেন্টে উঠে একটা দলের জটলা দেখে জিজ্ঞাসু চোখে এগিয়ে গিয়ে বলি - অনিকেত সিন্ধে?
একটি ছেলে হাসিমুখে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বলে - সমরেশজী? অনিকেতের সাথে সেই বছর দেড়েকের মনোরম ভ্রামণিক সম্পর্কের এভাবেই শুরু। অনিকেত বলেছিল, আপনার নামটা একটু বড়। বাংলায় তো বড়দের দাদা বলে, আমরা কি আপনাকে স্যামদা বলতে পারি? বলি, অবশ্যই পারো। সেই থেকে সবার কাছে হয়ে গেলাম স্যামদা। এমনকি ৭২ বছরের যশোয়ন্তজীও ডাকেন - স্যামদা। আপত্তি করলে আপাত গম্ভীর অন্তরে রগুড়ে মানুষটি হয়তো স্যামদাজী বলে ডাকবেন।
আমি মুম্বাই থেকে চলে যাওয়ার পরেও ও ফোন করে বলেছিল, স্যামদা, আমরা সবাই আপনাকে খুব মিস করি। আবার কবে আসবেন এদিকে? কী বলবো? জাহাজ একই বন্দরে ঘুরে ফিরে আসে কিন্তু আমার জীবনভেলা আমায় কোথায় নিয়ে যাবে জানা নেই। অনিকেতের এই ছবিটা আমি তুলেছিলাম পরে, অন্য একটা ট্রেকে।
কাসারা পৌঁছলাম রাত দেড়টা। প্ল্যান ছিল তখনই জীপ বুক করে ইগতপুরী, নাসিক হয়ে ৮০ কিমি দূরে নির্গুদপাড়া বেস ভিলেজে চলে যাওয়া। ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। তাহলে ওখানে গিয়ে শেষ রাতে ঘণ্টা দুয়েক ঝপকি নেওয়া যাবে। দিনে খাড়ঘর - কুরলা ট্রেনে যাতায়াত, সারাদিন অফিস - তারপর এই ১৮০ কিমির জার্নির পর ঘন্টা দুয়েক বিশ্রাম নিতে পারলে ভালোই হোতো। কিন্তু সে গুড়ে বালি।
দলের এক সদস্য, উদয় শা আসবে গুজরাতের ভালসাড থেকে। সে ফোনে জানিয়েছে নির্ধারিত ট্রেন মিস করে অন্য ট্রেনে আসছে। ওকে ছেড়ে যাওয়া যায় না। সে বন্ধু দেরী করে আসাতে আমরা কাসারা থেকে রওনা হলাম রাত তিনটেয়। জনা কুড়ি মেম্বার হয়েছে। দুটো দশ সীটের জীপ নেওয়া হয়েছে। মাঝে এক ধাবায় অনিকেত বলে, দেরি যখন হয়েই গেছে চা ও টা খেয়ে যাওয়া হবে। এইসব করে যখন নির্গুদপাড়া পৌঁছলাম, আকাশে ঊষার আলো দেখা দিয়েছে।
জীপ থেকে নেমে ক্লান্ত লাগছিলো। একটা খালি বাড়ির বাঁধানো দাওয়া দেখে প্লাস্টিক শীট পেতে বডি ফেলি। দেখাদেখি রোহিণী ম্যাম, যশোয়ন্তজীও লম্বা হলেন। ৪৫ মিনিটও হয়নি, অনিকেত ডাকে যাবার জন্য, না হলে মুম্বাই ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। সোমবার সবার কাজ আছে। একজন গ্রামবাসীকে অনিকেত নিয়েছে গাইড হিসাবে। ভোরের আলোয় আমরা চলতে শুরু করি ছটা নাগাদ।
মোদের যাত্রা হোলো শুরু
সদ্য সমাপ্ত বর্ষায় চারপাশ সবুজ। একটু পরে অনুভব করি প্রকৃতির ম্যাজিক! একটু আগেও ক্লান্তিতে চোখ জুড়িয়ে আসছিল। এক কাপ চাও পাওয়া যায়নি কোথাও। কিন্তু ভোরের তাজা বাতাসে আধঘণ্টা হেঁটেই ঘুম, ক্লান্তি উধাও।
গোলাপ বাগান অথবা টিউলিপ গার্ডেন অবশ্যই নয়নমনোহর তবে ভোরের নরম নীলাভ আলোয় পথের পাশে এমন শোভা দেখেও মন বলে - বাঃ! একটা খালি জায়গা দেখে সবাইকে গোল হয়ে দাঁড়াতে বলে অনিকেত বলে - আমরা অনেকেই রেগুলার, তবে এবারে কয়েকজন প্রথম এসেছেন, তাই একটা ছোট্ট সেল্ফ ইন্ট্রোডাকশন হয়ে যাক।
ছবির বাঁদিকে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আমুদে রীতেশ দ্বিবেদী - সাদা টি শার্ট পরে অনিকেত ট্রেক পথে Do’s and Don't s বলছে - পাশ থেকে কালো ট্রাউজার পরা যশোয়ন্তজী শুনছেন। ভোরের নীলচে ভাব কেটে আকাশ সোনালী হয়ে উঠছে।
ইন্ট্রোর পর আবার চলা শুরু। একদম আগে আছে লোকাল গাইড। তার কয়েকজনের পিছনে অনিকেত। একটু বাদে আলপথ মিলিয়ে গিয়ে জঙ্গল শুরু হোলো। তখন আর দূরে সবাইকে দেখা যায় না। অনিকেত মাঝে মাঝে টারজানের মতো মুখের দুপাশে তালু রেখে 'ওয়ে' বলে জোরে আওয়াজ ছাড়ছে। একদম পেছনে যে আছে তারও 'ওয়ে' বলে সাড়া দেওয়ার কথা। তাহলে বোঝা যাবে পিছনে কেউ রয়ে গেল না। দুদিকের ‘ওয়ে’ শুনে মাঝে থাকাও জনতাও বুঝবে তারা ঠিক ওয়েতেই যাচ্ছে।
পিছিয়ে পড়া পাবলিকের হারিয়ে যাওয়া এড়াতে এটা অনিকেতের দস্তুর। লোনাভালার কাছে পুনার সেই পাঁচজনের দলটা এই ফর্মুলা নিয়মিত দূরত্বে পালন করলে অনভিজ্ঞ পিছিয়ে পড়া ছেলেটি জঙ্গলে হারিয়ে যেত না। এটা দেখে পরের ট্রেকেই আমি একটা হুইশল কিনে গলায় ঝুলিয়ে গেছি। চেঁচানোর চেয়ে হুইশলের তীক্ষ্ম শব্দ অনেকদূর যাবে।
আজও ওটা আমার ছোট প্লাস্টিকের ফার্স্ট এড বক্সে আছে। সব ভ্রমণে সাথে থাকে। ২০২০তে একাকী ভ্রমণে মধ্যপ্রদেশে নর্মদার মাঝে এক নির্জন দ্বীপে জনহীন পরিত্যক্ত কেল্লায় গেছিলাম। বোটম্যান ওখানে ছেড়ে দিয়ে, দেখা হয়ে গেলে ডাকবেন, বলে চলে গেল ওপারে কোনাকুনি দূরে একটা ঘাটে। ঘুরেফিরে বোটম্যানকে ডাকতে গিয়ে দেখি সিগন্যাল নেই। সঙ্গে সদ্য পরিচিত এক বছর উনিশের তরুণ। সেই আমাকে ওর বাইকে বাইশ কিমি দূরে সেই দ্বীপে নিয়ে এসেছে। তাকে বলি, টিশার্ট খুলে ঐ লাঠিটায় লাগিয়ে পতাকার মতো নাড়াও। সে তাই করে। আমি হুইশল বাজাই। পতাকার নাচন, হুইশলের আওয়াজ দেখে/শুনে দূর থেকে গামছা নাড়ায় বোটম্যান। ছেলেটি বলে, আঙ্কল, আইডিয়াটা তো দারুণ! মনে মনে বলি - হরিহরে শেখা, জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা।
ঘণ্টাখানেক হেঁটে একটা সমতল জায়গায় এলাম। দূরে 'ফনি দুঙ্গার' (লাল তীর ৩২৫৫’)। সাপের ফনার মতো পাথরটা (Rock Outcrop) এখান থেকে পুঁচকে লাগলেও প্রায় ১০০ ফুট উঁচু।
ডানদিকে স্বমহিমায় বিরাজমান হরিহর কেল্লা। তিনকোণা প্রিজমের মতো পাহাড়। তার তিনটি গাত্র এবং দুটি প্রান্ত একদম খাড়া। ওঠার কোন সম্ভাবনাই নেই। তৃতীয় খাড়া প্রান্তটি আমাদের দিকে ৮০ ডিগ্ৰি ঢালে তাকিয়ে আছে। ঐ ঢালেই অতীতে পাথর কেটে ফুট তিনেক চওড়া সিঁড়ি বানানো হয়েছিল (1)। ওই সিঁড়িই হরিহর কেল্লার মাথায় (৩৬৭৬’) চড়ার একমাত্র উপায়। Led Zeppelin এর একটি বিখ্যাত গান - Stairway to heaven. হরিহরগড়ের সিঁড়ি দেখেও স্বর্গের সিঁড়ির মতোই লাগলো। অসাবধানে নামতে গিয়ে বা ভার্টিগো থাকলে মাথা ঘুরে পা হড়কালে - সটান স্বর্গে।
পাখির চোখে হরিহরগড় (আন্তর্জাল)। 1-স্বর্গের সিঁড়ি 2-রক কাট ব্যালকনি পথ 3- পাহাড়ের পেটের ভেতর দিয়ে সুরঙ্গ সিঁড়ি চড়ে এইখানেই আমরা ভুঁইফোড়ের মতো বেরোলাম 4- নন্দী তালাও 5- আজও বেঁচে থাকা বারুদঘর - এর পাশে একটি রক কাট জলাধারের পাশে বসে আমরা লাঞ্চ করেছি 6- হরিহরের শীর্ষ বুরুজ 7- স্কট কাডা - এখান দিয়েই উঠেছিলেন দুরন্ত ডগলাস।
স্বর্গের সিঁড়ির ড্রোন ভিউ (আন্তর্জাল)
প্রায় ৬০০ ফুট খাড়া SE গাত্র ধরে ১১/৮৬ বিখ্যাত পর্বতারোহী ডগলাস স্কট দু'দিনে উঠেছিলেন হরিহরগড়ের শিরে। ওনার আরোহণের জন্যই হরিহরগড়ের ঐ গাত্রটা ‘স্কট কাডা' নামে প্রচলিত। মারাঠি ভাষায় 'কাডা' মানে খাড়া পর্বত গাত্র (cliff)। এখানে একটু পার্শ্বচারণা হয়তো মন্দ লাগবে না।
পদবি স্কট হলেও ডগলাস (১৯৪১-২০২০) ব্রিটিশ। জন্ম নটিংহ্যাম। পুলিশ পিতা জর্জ ১৯৪৫ সালে অ্যামেচার হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়নের খেতাব পান। ডগলাস পান পিতার মজবুত কাঠামো। স্কুল শিক্ষকের মতো নিরীহ পেশায় থেকেও ডগলাস পর্বতারোহণের মতো সিরিয়াস এ্যাডভেঞ্চারে আগ্ৰহী হয়ে পড়েন। ক্রিশ বনিংটনের নেতৃত্বে ডগলাস স্কট ও ডুগল হাস্টন ১৯৭৫ সালে এভারেস্ট SW ফেস আরোহণ করেন। পর্বতারোহণ মহলে ওটা একটি মাইলস্টোন বিগ ওয়াল হিমালয়ান ক্লাইম্ব। অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক রুট। তাই এযাবৎ এভারেস্টে বিভিন্ন রুটে হাজার এগারো সামিট হলেও SW ফেস রুটে হয়েছে মাত্র ১৫~২০টি। ১৯৭৭ সালে ডগলাস ও বনিংটন, কারাকোরাম হিমালয়ে The Ogre (২৩৯০০’) আরোহণ করেন।
Ogre পশ্চিমি রূপকথায় একটি বীভৎস নরখাদক দৈত্য। আরোহণের ভয়াবহতা অনুধাবন করেই হয়তো পশ্চিমী পর্বতারোহীরা শৃঙ্গটির ঐ নাম রাখেন। The Ogre কেন কঠিন পর্বতশিখর তা আরোহণের পরিসংখ্যান থেকেই অনুমেয়। প্রথম আরোহণের (১৯৫৩) পর এযাবৎ এভারেস্ট সামিট হয়েছে প্রায় এগারো হাজার। দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ K2 এভারেস্টের থেকে অনেক কঠিন ও ভয়াবহ। তাই K2 তে প্রথম আরোহণের (১৯৫৪) পর এযাবৎ সামিট হয়েছে আন্দাজ ন’শো। কিন্তু ১৯৭৭এর পর এযাবৎ টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিং হিসেবে (steep rock & ice mixed route) অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক The Ogre সামিট হয়েছে ২০০১, ২০১২ ও ২০১৯ - ব্যস! প্রায় পঞ্চাশ বছরে মাত্র চারটি সামিট! প্রথম আরোহণের চব্বিশ বছর পর দ্বিতীয় সামিট। The numbers say it all.
The Ogre আরোহণ অন্তে দড়ি বেয়ে (Rappelling) নামার সময় সন্ধ্যার অন্ধকারে প্রায় ২৩ হাজার ফুট উচ্চতায় ডগলাসের পা পিছলে গেল। দড়িতে বাঁধা ছিলেন বলে সেযাত্রা উপরে যেতে হয়নি। তবে পাথরে সজোরে ধাক্কা লেগে দুটো পাই সাংঘাতিক জখম হয়। ঐ উচ্চতা থেকে বেস ক্যাম্পে নেমে আসতে ডগলাস অসীম মনোবল ও সহ্যক্ষমতার পরিচয় দেন। যেখানে সম্ভব Rappelling করে, নয়তো পাছায় ভর দিয়ে স্লাইড করে বা হাঁটু ও কনুইয়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে নামতে হয়। ঠাণ্ডায়, খারাপ আবহাওয়ায়, হতক্লান্ত শরীরে আটদিন ধরে ৫ কিমি দূরত্ব হামাগুড়ি দিয়ে নেমে আসেন বেস ক্যাম্পে। অবশ্য অনেকটা এভাবে নামার পর দলের বাকি দুই সদস্য, ক্লাইভ রোল্যান্ড ও মো অ্যান্থনিও তাঁকে নেমে আসতে সাহায্য করেন। ডগলাসের সেই তেইশ হাজারে পা ভেঙে আটদিন ধরে হামাগুড়ি দিয়ে পাঁচ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে পাহাড় থেকে ফেরা - পর্বতারোহণ মহলে একটি এপিক সারভাইভাল এপিসোড হিসেবে পরিচিত।
১৯৮৮তে ক্রিশের Everest years - A climber's life বইটি কিনেছিলাম। তাতেই ঐ দৈত্যের মুখ থেকে অদম্য মনোবলে ডগলাসের বেঁচে ফেরার কাহিনী পড়েছি। দুর্ঘটনায় দমে যাওয়ার পাত্রই নন ডগলাস। তার দু বছর পরেই ১৯৭৯ সালে অক্সিজেন ছাড়াই চড়লেনন কাঞ্চনজঙ্ঘা। গঙ্গোত্রী হিমবাহ এলাকায় ভাগীরথী, শিবলিং, কারাকোরামে K2 সহ হিমালয়ে ডজন দেড়েক কঠিন অভিযানে অংশ নেন। ষাটোর্ধ্বেও ছিলেন সক্রিয়। বড় দল, বিশাল লটবহর নিয়ে নয়, ডগলাসের স্পৃহা ছিল হালকা চালে অ্যালপাইন স্টাইলে হিমালয়ে টেকনিক্যালি ডিফিকাল্ট ক্লাইম্ব।
ডগলাসের অভিযান সঙ্গী স্যার ক্রিশ বনিংটন ৯২ বছরেও বেঁচে আছেন কিন্তু পাহাড়ে অদম্য ডগলাস ৭৯ বছর বয়সে ক্যান্সার ধরা পড়তে অচিরেই চলে গেলেন। এহেন ডগলাস সাহেব এখানে চড়েছিলেন শুনে হরিহরগড়ের প্রতি সমীহ হয়েছিল।
দ্বাদশ শতাব্দীতে যাদব রাজবংশ প্রাকৃতিকভাবে দুর্ভেদ্য ঐ পাহাড়ে হরিহর কেল্লা বানান মূলত গোন্ডা ঘাট বাণিজ্যপথের ওপর নজর রাখতে। ১৬৩৬ সালে এটি মুঘলদের দখলে যায়। শিবাজী মহারাজের পেশোয়া মরোপন্ত পিঙ্গলে ১৬৭০ সালে এটি কব্জা করেন, তবে দখলে থাকেনি বেশিদিন। মোগল সর্দার মাতব্বর খান ১৬৮৯-এর জানুয়ারিতে পুনরায় দখল করেন এটি। আবার কবে মারাঠা দখলে যায় জানা নেই। ক্যাপ্টেন ব্রীগস-এর নেতৃত্বে ১৮১৮ সালে তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সৈন্য হরিহরগড়ের দখল নেয়। এই কেল্লার দখল নিয়ে এহেন কাড়াকাড়ির কারণ ত্রিম্বক পরিসরে, ত্রিম্বক ফোর্টের পর হরিহরগড় ছিল সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেল্লা দখল করে ব্রিটিশ ফৌজ কামান দেগে পাথরে কাটা সিঁড়িগুলি গুঁড়িয়ে দিতো যাতে কেল্লায় ওঠার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে তারা আলং, মালাং, আউন্ধ, পাদারগড়, ভৈরবগড় ইত্যাদি কেল্লা ব্যবহারের অনুপযোগী করে দেয়। কিন্তু হরিহরগড়ের সিঁড়ি দেখে ক্যাপ্টেন ব্রীগস এতোটাই অভিভূত হয়ে যান, যে এটাকে অক্ষত রেখে দেন।
প্রায় ৫০ ডিগ্ৰি ঢালে ৯০টি সিঁড়ি ধরে প্রথমে আমরা পৌঁছলাম সামান্য কারুকার্য মণ্ডিত মহাদরওয়াজা। দুপাশে দুটি বুরুজ। সেখান থেকে দ্বিতীয় দরজা ১২০টি সিঁড়ি। এগুলি আগের থেকেও খাড়া, প্রায় ৭৫ ডিগ্ৰি ঢাল। বাড়ির সিঁড়ির ধাপ ১০ ইঞ্চি চওড়া, ৬ ইঞ্চি খাড়া ৩০ ডিগ্ৰি ঢাল। এখানে উল্টো। পা রাখার জায়গা ইঞ্চি সাতেক কিন্তু খাড়া ২০~২১ ইঞ্চি। অতো খাড়া ঢালে সিঁড়ি বানাতে গেলে অমনই হবে। সিঁড়ির দুপাশে একটুখানি করে গর্ত করা, হাত দিয়ে ধরার জন্য। আমরাও উঠেছি চার হাত পায়ে। হেমন্তের বোধহয় উচ্চতাজনিত ভীতি আছে। এখান দিয়ে নামতে হবে ভেবেই ওর হৃৎকম্প হচ্ছে।
দ্বিতীয় দরজার পর পথ পাহাড়ের গা থেকে পাথর কেটে বানানো (2) রক কাট ব্যালকনি পথে মাথা ঝুঁকিয়ে যেতে হচ্ছে। পথ গেছে টানা ওভারহ্যাং-এর তলা দিয়ে। সরু পথে অন্ধকারে হোঁচট খেলে প্রায় ৭০০ ফুট নীচে পড়বে। তাই পাথরে গর্ত করা আছে। হয়তো অতীতে রাতে মশাল গুঁজে রাখা হোতো। তখনও পাহাড়ে বর্ষার জমা জল চুঁইয়ে পড়ছে। পথ ভিজে।
সেই অলিন্দ পথের শেষে ডানদিকে পাহাড়ের পেটের ভেতর দিয়ে সুরঙ্গ কেটে আরো কিছু সিঁড়ি উঠে গেছে। আটশো বছর আগে ছেনি হাতুড়ি দিয়ে কঠিন পাথরে এসব করা হয়েছে। তাদের শ্রম এবং উদ্ভাবনীর অভিনবত্ব অনুধাবনযোগ্য। অবশেষে উঠে এলাম হরিহর গড়ের মাথায় ত্রিভুজের মতো অনেকটা সমতল জায়গায়। সামনে চারদিকে পাথর সাজানো ছোট পরিসরে রাখা পাথরের হনুমান - সিঁদুর মাখানো। অতীতে হয়তো মন্দির ছিল। এখন বিদ্ধস্ত। হনুমানজী রয়েছেন খোলা আকাশের নীচে।
আরো আগে বড় জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে পারে বসে আছেন নন্দী - পাশে এককালে হয়তো গৌরিপট্ট সহ শিবলিঙ্গ ছিল - অধূনা লিঙ্গ বিলুপ্তপ্রায়।
কাছে দূরে নানা খাড়া পাহাড়। মেঘের মতো কুয়াশা উঠে আসছে নীচ থেকে। দুটো অক্ষত পাথরের ঘর নজরে পড়লো। গাইড বললো অতীতে গোলাবারুদ রাখার ঘর। তার ফোকর দিয়ে একটা সাপ ভেতরে ঢুকে গেল।
বারুদ ঘরের কাছে পাথর কেটে বানানো চৌবাচ্চায় টলটলে জল। অতীতে কেল্লাবাসীদের ব্যবহারের জন্য বর্ষার জল ধরে রাখতে এমন অনেকগুলি Rock cut cistern রয়েছে। আমাদের দলে একটি বছর এগারোর বালক ছিল, বাবার সাথে এসেছে। খুব উৎসাহ তার। হালকা শরীরে চরকির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। রোহিণীম্যামকে জলে পা ডুবিয়ে বসতে দেখে সেও ওভাবে বসলো। আর একজনও ডোবালো। ছোট্ট ছোট্ট মাছ এসে পায়ের তলায় ঠুকরে মরা চামড়া খেয়ে যাচ্ছে। বেশ সুরসুরে মজা। পাহাড়ের মাথায় চৌবাচ্চায় কে মাছের পোনা ছেড়েছে কে জানে।
বছর পঁচিশের উদয়। এই মক্কেল ট্রেন মিস করতেই সেদিন রাতে আমরা কাসারাতে দেড় ঘণ্টা বসে ছিলাম। সুদর্শন উদয় আমুদে যুবক। এমন সদস্যরাই দলের ভিটামিন। এসো, তোমার একটা ছবি তুলি, বলতে, সে পত্রপাঠ একটা ইমার্সিভ পোজ নিয়ে দাঁড়ালো। পোট্রেট ছবিতে প্রায়শই সাবজেক্টের ভূমিকা ফটোগ্ৰাফারের থেকে মুখ্য হয়ে যায়।
অনিকেত বলে, স্যামদা একটা গ্ৰুপ ছবি নিন। এখন মোবাইলেই 200mp ক্যামেরা। তখন আমি ২০০৬তে কেনা Sony-DSC-H1(5mp)তে ছবি নিতাম। এই সিরিজের সব ছবি যা আসবে তা ওতেই তোলা। ট্রেকের পর কিছু ছবি ওয়ার্ড ফাইলে সাজিয়ে সবাইকে মেলে পাঠাতাম। অনিকেত বলতো, স্যামদা ছবিগুলো এমনভাবে সিকোয়েন্সে সাজিয়ে, ক্যাপশন দিয়ে পাঠান যে ট্রেকের শুরু থেকে শেষ অবধি সুন্দর একটা ধারণা পাওয়া যায়।
আমি ওর ছবি তুলতে উদয় বলে, ক্যামেরাটা দিন, আপনারও একটা তুলি। কেরালার রোহিত শেট্টি অত্যন্ত ভদ্র ছেলে। ওকেও ডাকি পাশে। আমার পিঠে ওয়েস্ট বেল্টওয়ালা, ল্যাপটপ স্যাকের থেকে একটু বড় স্যাকটা এই ট্রেকের জন্য কুরলা থেকে মাত্র চারশো টাকায় কিনেছিলাম। ১৯৮৭ সালে পাহাড়ি ক্লাবের সাথে কাঠমান্ডুতে মাউন্টেনিয়ারিং ইকুইপমেন্ট কিনতে গিয়ে নিজের জন্য কিনেছিলাম নরওয়ের Ajungilak ব্র্যান্ডের একটা ৭০ লিটারের স্যাক। মোক্ষম জিনিস। আজও অটুট। ওতে টু-মেন টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ সব এসে যায়। কিন্তু ঐ দুম্বো স্যাক সহ্যাদ্রির হালকা ট্রেকে অচল। তাই কুরলা থেকে কিনেছিলাম ওটা - ভালো সার্ভিস দিয়েছে।
খানিক ঘোরাঘুরি করে আমরা ঐ চৌবাচ্চার ধরে বসেছি প্যাকড লাঞ্চ নিয়ে। একদম বাঁদিকে গান্ধী টুপি পরে আমাদের লোকাল গাইড। দূরে দেখা যাচ্ছে কেল্লার সর্বোচ্চ পয়েন্ট - নজর বুরুজ - পাশের জমি থেকে ফুট পঁচিশেক উঁচু। লাঞ্চের পর ওদিকে গেলাম। দেখি দলের প্রবীণ সদস্য যশোয়ন্তজী সবার আগে পাথর ধরে ওপরে উঠে হাত নাড়ছেন সবাইকে। ছিপছিপে চেহারার মানুষটির উৎসাহ ও এনার্জি বিষ্ময়কর।
বুরুজের উপর থেকে চারপাশের দৃশ্য অপূর্ব লাগছে। চতুর্দিকে নানা খাজানা। উত্তরে ভাগেড়া কেল্লা, উত্তর-পূবে ত্রৈম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির, ব্রহ্মগিরি পাহাড় ও অঞ্জানেরী কেল্লা, পশ্চিমে ভাস্করগড়। দক্ষিণে নির্গুদপাড়া গ্ৰাম, যেখান থেকে আমরা এসেছি আর দক্ষিণ-পূবে দূরে নীচে (নীল তীর) বিশাল 'আপার বৈতরনা' জলাধার। এখান থেকে দেড়শো কিমি পাইপলাইনে মুম্বাই শহরে জল যায়।
পশ্চিমে দেখা যাচ্ছে ‘ফণী দুঙ্গার’ - এখন আমাদের নীচে। সবাই ‘শিবাজী মহারাজ কি জয়' ধ্বনি দিয়ে ওপরে টাঙানো গেরুয়া পতাকা দণ্ড তুলে দোলাচ্ছে, ছবি তুলছে। আমাকেও ডাকছে। আমি যে এক বয়স্ক পরদেশী বাঙালি, সে ভেদ ঘুচে গেছে কখন। মনেই হচ্ছে না, কয়েক ঘণ্টা আগে আলাপ। উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে মনের আগল এভাবেই খুলে যায়।
বুরুজে যাওয়ার পথে ঝোপে খুব জোরে আওয়াজ হচ্ছিল। ঝিঁঝিঁর মতো কোনো পোকা সম্মিলিতভাবে ডাকছে। তবে তীব্রতা কানে তালা লাগানোর মতো। ফিরে আসার পথে ভালো করে খুঁজে ঝোপে এই মক্কেলকে দেখলাম। বাড়ি গিয়ে নেট ঘেঁটে জানলাম এগুলো সিকাডা (Cicada) পোকা (family Cicadidae). এরা জীবনের সিংহভাগ মাটির নীচে থাকে। যৌবনে প্রজননের তাগিদে বাইরে এসে পুরুষ সিকাডার দল সম্মিলিতভাবে কানে তালা লাগানো মেটিং কল দেয়। তবে অতো ফিমেল সিকাডা থাকে না, তাই ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে মুষ্টিমেয় কজনের। বাকিরা চিরকুমার অবস্থাতেই মারা যায়। ভাগ্যবানেরাও মাটির বাইরে আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইহলীলা সাঙ্গ করে। প্রকৃতির কতো বিচিত্র লীলা!
দুটো নাগাদ আমরা নীচে নামতে শুরু করি। অনেকটা এসে পিছন ফিরে শেষবারের মতো দেখে নিলাম হরিহরগড়কে। ডানদিকে ওপরে আঁচিলের মতো লাগছে নজর বুরুজটিকে। নির্গুদপাড়ায় জীপদুটি অপেক্ষা করছে আমাদের ফেরৎ নিয়ে যাবে কাসারা। সেই রবিবার সহ্যাদ্রির অঙ্গনে প্রথম খাতা খুলে বেশ লাগলো।
পুনশ্চ:-
১. এই লেখাটি সংক্ষেপিত আকারে ২০১৮ সালে ভদ্রেশ্বর থেকে প্রকাশিত ‘ভ্রমণ আড্ডা’ বিংশ বার্ষিক সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এটা তার পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ।
২. স্থানীয় হর্ষাওয়াড়ী গ্ৰামের জন্য হরিহরগড় কেল্লার আর এক নাম হর্ষাগড়। আমরা ২০১২তে দূরের গ্ৰাম নির্গুদপাড়া থেকে গেছিলাম। এখন দেখলাম অধিকাংশ ট্রেকার নিকটবর্তী হর্ষাওয়াড়ী গ্ৰাম থেকেই যায়। এখন ওখানে ট্রেকিং সীজনে সপ্তাহান্তে এতো লোক যায় যে এভারেস্টের টঙে ব্যালকনির মতো হরিহরের সংকীর্ণ সিঁড়িতেও লোকের মেলা লেগে যায়। বনদপ্তর এখন জনপ্রতি ৩০টাকা করে নেয়। ফলে আমদানি ভালোই হয়। বড় পার্কিং হয়েছে। বেশ কিছু দোকানপাট হয়েছে।
১৪ বছর আগে আমরা যখন গেছিলাম সেদিন আর কাউকে ওখানে যেতে দেখিনি। কেল্লার দিকে চলার পথে তো দূর অস্ত - বেস ভিলেজ নির্গুদপাড়াতেও একটা চায়ের দোকান দেখিনি। বিকেলে জীপে কাসারা ফিরে যাওয়ার পথে একটা ধাবায় চা নাস্তা করেছিলাম। ১৯৮৬ তে ডগলাস সাহেব এসে ঐ হরিহরকে হয়তো আরো আদিম অবস্থায় দেখেছেন। সময়ের সাথে - উন্নয়নের ফলে - ক্রমশ অনেক কিছুই বদলে যাবে। আমার সৌভাগ্য তার আগেই দেখে নিয়েছি হরিহরকে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।