কিছু ব্যাপারে মাসখানেকের ওপর মন বেশ বিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তার ওপর হপ্তাদুয়েক আগে আচমকা মাত্র ৭১ বছর বয়সে অমলবাবুর চলে যাওয়ার খবর পেয়ে মন খুব ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। তাই তখন আর এখানে কিছু বলা হয়নি। এটা আমার কিছুটা অসৌজন্যতামূলক মনে হয়। এখন কিছু বলতে ইচ্ছা করছে:
অমলবাবুর কথা এখানেই লিখেছি “অতিমারীতে অন্য ভ্রমণ" শিরোনামে - "একা বেড়ানোর আনন্দে” সিরিজের ২৯তম পর্বে। শান্ত, অমায়িক, নির্বিরোধী মানুষটিকে তাঁর স্বভাব বৈশিষ্ট্যর জন্যই নাম দিয়েছিলাম ঋষিদা। ঋষিদা, সুজনবাবু ও জেমসদা (নামগুলি সব আমারই দেওয়া) সাড়ে চার বছর আগে মনিপালে আমাদের বাড়ি এসেছিলেন ১২.১১.২১. তখনও আমার প্রাচীন পুঁচকে মারুতি আটশোতেই আমরা চারজন, কর্ণাটক, অন্ধ্র ও কেরালার ওয়াইনাদ হয়ে একমাস ব্যাপী ৩৭০০ কিমি ঘুরেছিলাম। পশ্চিমঘাটের অন্দরে অরণ্য, পাহাড়ময় কিছু নির্জন জায়গায় সে ছিল এক অনবদ্য ভ্রমণ।
২৩ এর নভেম্বরে ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতায় এসেছিলাম। তখন ঋষিদার Wagon R নিয়ে আমি, ঋষিদা ও জেমসদা - বোলপুর, মলুটি, ম্যাসাঞ্জোর, মন্দার পর্বত, ভাগলপুর, কাহালগাঁও, দেওঘর, রাঁচি, চান্ডিল, জামশেদপুর, নরওয়া পাহাড় (হয়ে ঘুরে এলাম প্রায় ১৭০০কিমি। নরওয়া, যাদুগোড়া একদা ছিল গুরুতে আমার প্রিয় লেখক শিবাংশু দের এলাকা - ওনার “যাঃ" লেখাতে এসেছে তা।
গাড়ি ঋষিদার হলেও উনি আমার পাশে চুপটি করে বসে ছিলেন। গোটা পথে লং ড্রাইভের নেশারু আমিই চালিয়েছি। ঋষিদার সাথে মনিপাল, মন্দারের মধুর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ঋষিদার সাথে আসাম, মেঘালয় ভ্রমণের পরিকল্পনাও ছিল। সে আর হবে না। ঋষিদার অকালে চলে যাওয়াটা এখনও মেনে নিতে পারছি না। সময় লাগবে।
যাই হোক, কেকে প্রস্তাবিত লিঙ্গনিরপেক্ষ “লান” সম্বোধনের ধারণাটি আমার খাসা লেগেছিল। তাই আর একবার তা ঝালিয়ে নিই।
অরণ্যলান - ধন্যবাদ।
রমিতলান - ধন্যবাদ। একাকী ভ্রমণের আরো কিছু অভিজ্ঞতা মনের মধ্যে “প্রকাশের লাগি, করিছে সাধনা" - গোছের তরঙ্গ তোলে। ওগুলো মগ্ন হয়ে লিখতে গিয়ে ঐ পরিস্থিতিতে যেন আর একবার ভার্চুয়ালি ঘুরে আসা যায়। অমন আরো লেখার বিশেষ ইচ্ছা আছে। দেখি কবে পারি।
ডটলান - ডিসেম্বর থেকে মার্চে গাড়িতে সাড়ে আট হাজার কিমির ভ্রমণ নিয়ে সিরিজ লেখার বিশেষ তাগিদ নেই। কারণ অধিকাংশই বহুল পরিচিত জায়গা। তবে কিছু জায়গা ছিল পর্যটক বিরল অপ্রচলিত জায়গা - যেগুলি একাকী ভ্রমণে গেছিলাম - সেসব নিয়ে একাকী ভ্রমণ সিরিজে কিছু লেখাও হয়েছে। পরে বৌমণি বলেছিল - তুমি তো এক জায়গায় দুবার যেতে চাও না, তোমার মতো পিঠে স্যাক নিয়ে ট্যাঙস ট্যাঙস করে হাঁটতেও পারি না, তাই জানি, ওসব জায়গায় আমায় কখনো নিয়ে যাবে না।
ওর অভিমানে সিক্ত কথাগুলি মনে ছিল। তাই গাড়িতে ভ্রমণের পরিকল্পনায় অধিকাংশ ঐসব জায়গা রেখে ওর ধারণা ভুল প্রমাণ করেছিলাম। সেই কালিঞ্জর কেল্লা - যেখানে ২০২০’র জানুয়ারীর শীতে ৮x৮ সিকিউরিটি কেবিনের মেঝেতে শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলাম দুটি রাত - সেখানে এবার ওদের চিত্রকুটধাম থেকে নিয়ে গেছিলাম গাড়িতে। কিছু নতুন জায়গাও রেখেছিলাম - যেগুলি একাকী ভ্রমণে যাবো ভেবেও জনবাহনের অপ্রতুলতা হেতু যেতে পারিনি।
তার মধ্যে দুটি জায়গা অনবদ্য - দুটিই মধ্যপ্রদেশে। একটি এক অভিশপ্ত কেল্লা - যেখানে এক উৎসবের রাতে দলাদলির প্রতিহিংসায় এক দল অন্য দলের সবাইকে খতম করে দিয়েছিল। আর একটি চম্বল ঘাটির কাছে এক মনোরম মন্দির সমুহ যা ASI এর এক মুসলিম আধিকারিক চম্বলের ডাকাত সর্দারের সহযোগিতায় আমূল সংস্কার করেছিলেন। এসব জায়গায় গেলে অদ্ভুত কিছু আবেগে মন অবশ হয়ে আসে।
হীরেনদা - আপনিও বললেন মারুতি ভ্রমণ নিয়ে লিখতে, তাই ডটলানকে বলা কথা মানে আপনাকেও বলা। ঐ ভ্রমণপথে কিছু ছবির সাথে কিছু অনুভব আপনাকে 121 হোয়াতে শেয়ার করেছিলাম। আপনি রিলেট করতে পেরেছিলেন। তাই হয়তো আপনার মনে হয়েছে ওসব নিয়ে লেখা যায়। দেখবো কিছু যদি লিখতে পারি কখনো।
তবে হ্যাঁ, অন্য একটি ব্যাপার নিয়ে লেখা যায়। রীতিমতো রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা, তার কার্যকারণ সম্পর্কটি দারুণ ইন্টারেস্টিং। তবে সেটা গড়ির ইঞ্জিন অপারেশন সংক্রান্ত একটু জটিল এবং টেকনিক্যাল ব্যাপার। তিন দশকের ওপর গাড়ি চালিয়ে সাড়ে পঁয়ষট্টিতে এসে সেটা জানলাম। তা নিয়ে লিখলে কজনের তা আকর্ষণীয় মনে হবে জানিনা।
বিষয়টা হচ্ছে কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে আমার ২৭ বছরের ভিন্টেজ মারুতি যাওয়ার ঠিক আগে আমায় এমন ল্যাজে খেলিয়েছিল যে ২০শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় - পথে নেমেও একবার মনে হয়েছিল এ ট্রিপ ক্যানসেল করে দিই। একুশের নভেম্বরে আমাদের চার পুরুষ বন্ধুর মনিপাল থেকে একমাসের ভ্রমণ হলে অন্য কথা ছিল। কিন্তু এবার দলে আমার ও জেমসদার স্ত্রী ছিল। পথে কিছু অত্যন্ত নির্জন স্ট্রেচ ছিল - সেসব জায়গায় গাড়ি বিগড়োলে রীতিমতো অসুবিধায় পড়ে যেতাম।
তাও শেষবেষ অনেক দোলাচলে ভুগে, মনে বেশ সংশয় নিয়ে বেরোলাম। কলকাতা থেকে ভদ্রক নির্বিঘ্নে গেলাম। কিন্তু ভদ্রক থেকে কপিলাসের পথে ইঞ্জিন যেভাবে ল্যাজে খেলাচ্ছিল, একসময় সত্যিই মনে হচ্ছিল - পারবো তো পৌঁছতে কপিলাস? তবে গোঁয়ার্তুমি করে নয় - calculated risk নিয়ে, ডর কে আগে জিত হ্যায় মোডে, চরৈবেতি মন্ত্রে এগিয়ে চলে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ সম্পন্ন করে ফিরে এসেছি।
পথে দেখা পেয়েছি ঈশ্বরপ্রেরিত দেবদূতসম দুটি সুযোগ্য কার মেকানিকের - কপিলাস থেকে সম্বলপুরের পথে বাবলু সাহু এবং ঝাঁসিতে ইমতিয়াজ ভাই। ওকে দেখে মেকানিক বলে মনেই হয় না এবং অমায়িক হাসি দেখে মনে হয় যেন কতদিনের পরিচিত। আমার লেখার তাগিদ এনাদের মতো কিছু অনন্য মানুষের কথা বলতে চাওয়া। যোগ্য লেখক দ্বারা লিখিত বিখ্যাত সব পর্যটন স্থানের ওপর ইতিহাস, ভূগোল, চিত্রকলা, ভাস্কর্য সংক্রান্ত বিবরণ সমৃদ্ধ ভ্রমণ বৃত্তান্ত এখন ব্লগে পাওয়া যায়। অমন লেখার মুন্সীয়ানা আমার নেই।