

পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ এর নির্বাচন যেন ভারতীয় রাজনীতিতে এক হটস্পট। বাংলার গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে দিল্লির তরফে গরম বাড়ানো হচ্ছে বাংলায়। সেন্ট্রাল বাহিনীর উর্দীধারীদের মিটিং এর ছবি ফলাও করে প্রচার হচ্ছে, রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের সাঁজোয়া গাড়ি দেখা যাচ্ছে তবুও মানুষ চুপচাপ। শাসক দলের সভাতে যেভাবে বাংলার মানুষ আগেও ভিড় করে এসেছে সেই ভিড় এখনো অব্যাহত, ২০১৯ এর পর থেকে বিজেপির পালে যে হাওয়া লেগেছিল ২০২১ এর পরে যে ভাটার হাওয়া চলছে, প্রকাশ্যে এখনো তা অব্যাহত শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর সভাতে লোক হচ্ছে যথেষ্ট। এই সবকিছু মিলিয়ে পশ্চিমবাংলা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এক অভূতপূর্ব নির্বাচনে ভোট দিতে চলেছে। এখন দেখার এবারের এই ভোটের প্রচারে এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রচারে কী নজর কাটলো এবং এই নির্বাচনের যদি আমরা প্লেয়িং ইলেভেন ইস্যুভিত্তিক তুলে ধরি সেগুলি কী ছিল।
পশ্চিমবঙ্গ যে মেরুকরণের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে তা হঠাৎ করে মানুষ বুঝতে পারে ২০১৯ এর নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সাথে সাথে। প্রথম দফায় যে ১৫২ টি আসনে ১৬ টি জেলায় ভোট হতে চলেছে সেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৮৪ টি আসন ২০১৯ সালে, তৃণমূল ৫৯ টি। কিন্তু ২০১৯ এর লোকসভা ভোটের পর বিজেপির দাপাদাপি এবং দিল্লী বাসীদের অতিরিক্ত উৎসাহ ও তৃণমূল ত্যাগ করে নেতাদের বিজেপিতে যোগদান করার হিড়িকে তিতিবিরক্ত মানুষ ২০২১ শে ওই একই ১৫২ টি বিধানসভায় মাত্র ৫৯ টি দিয়েছিল বিজেপিকে এবং ৯২ টি তৃণমূলকে। ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি আরো কমে হয় ৫৭টি এবং তৃণমূল মোটামুটি শক্তি ধরে রাখে জয়লাভ করে ৮৩ টি তে। বিধানসভাতে খাতা না খুলতে পারলেও লোকসভা গুলিতে কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট এগিয়েছিল ১০-১২ টি আসনে। এই পটভূমিকায় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ এর ফলাফল কি হতে চলেছে তা যে নির্ধারণ করবে এই প্রথম দফার ভোট অন্তত বিজেপি শিবিরের জন্য সে সম্পর্কে কোন শিবির এই সন্দেহ নেই। তাই শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি তুঙ্গে সমস্ত দলেরই অন্যদিকে সিপিএমের লড়াই শুধুমাত্র খাতা খোলার এবং কংগ্রেসের ক্ষেত্রে মালদা, উত্তর দিনাজপুর,মুর্শিদাবাদ এবং পুরুলিয়াতে ত্রিমুখী লড়াইয়ে নিজেদের ভোটব্যাঙ্কে ধরে রেখে বিশেষত সংখ্যালঘু মানুষকে কংগ্রেস মুখী করে ডাবল ডিজিটে পৌঁছানো। নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের সাথে দলগুলি যে জন মুখী কর্মসূচি গুলো নিয়েছিল তার ফ্যাক্টরগুলো আলোচনা করলেই আমরা এই প্রথম দফার নির্বাচনে বাংলা কী ভাবছে সেই সম্পর্কে একটা ধারণা পাবো।
ইস্যু ১ : লক্ষীর ভান্ডার বনাম অন্নপূর্না ভান্ডার:: সারাদেশে একক ভাবে চলা কোন সর্ববৃহৎ সরাসরি অর্থ প্রদানের প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ্মীর ভান্ডার যাতে প্রায় আড়াই কোটি মহিলা মাসে দেড় হাজার টাকা এবং জনজাতি হলে ১৭০০ টাকা পায়। অন্যান্য সময় ভোট এলেই এই টাকাটিকে ভিক্ষা বলে এক শ্রেণীর দল কটাক্ষ করলেও ২০২১ এবং ২০২৪ এ তৃণমূলের ভোট বাক্সে মহিলা ভোট উজাড় করে পড়ে যাওয়া কি আটকাতে বিজেপি এবারে নিয়ে এসেছে জুন মাস থেকে চালু করবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যাতে মাসিক ৩০০০ টাকা পাবে মহিলারা এরকম একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু লক্ষীর ভান্ডার যেভাবে গ্রামের এবং প্রান্তিক শহরের মহিলাদেরও স্বশক্তিকরণ করেছে সেখানে প্রতিশ্রুতি কতটা এই মোবাইল ফোনের জমানায় দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, সে সম্পর্কে সন্দেহ আছে। তৃণমূলের তরফ থেকে প্রচার করা হচ্ছে যে বিজেপির প্রচার করেও বিভিন্ন জায়গাতে এই টাকা দেয়নি এবং তার উদাহরণ হাতের কাছে আছে বিহার, ওড়িশা এবং দিল্লী। দুটি দলেরই আইটি সেলের তরফ থেকে প্রচার এবং পাল্টা প্রচারে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের অন্যতম নির্ণায়ক হতে চলেছে মহিলা ভোট কোন দিকে থাকবে তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অন্তত এই ১৬ টি জেলার ১৫২ টি বিধানসভায় ক্ষেত্রে এই মহিলা ভোট যে এবারেও বেশিরভাগটাই তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে যাবে সে সম্পর্কে বিরোধীদল অবহিত তাই নির্বাচন চলাকালীন তারা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের জন্য ফর্ম ফিলাপ শুরু করেছে কিন্তু তবু দিনের শেষে অন্নপূর্ণার থেকে অ্যাডভান্টেজ লক্ষীই।
ইস্যু ২ : বাংলার ডোল বনাম ডাবল ইঞ্জিনের ডোল:: পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর নির্বাচনের প্রথম দফার অন্যতম বড় ইস্যু ছিল শাসকদলের জনমুখী পরিকল্পনা। মমতা ব্যানার্জির সরকারের মানবিক প্রকল্প এবং মানুষের কাছে সরাসরি সরকারি সুযোগ-সুবিধা গুলো পৌঁছে দেওয়া যে সারা পশ্চিমবঙ্গে জনমত দলনির্বিশেষে বাস্তবায়িত হয়েছে সে সম্পর্কে বিরোধী দলগুলোও স্বীকার করে একবাক্যে। কেন্দ্রের সাথে সম্পর্ক ঠিক না থাকার জন্য কৃষক বন্ধু, স্বাস্থ্য সাথী যেমন কেন্দ্রীয় সরকারের বিকল্প তেমনি সারা পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বিনামূল্যে চাল দেওয়া কেন্দ্রীয় সরকারকে সাথে নিয়ে রাজ্য সরকারের একটি অভাবনীয় পদক্ষেপ। এর সুফল ভোট বাক্সে পড়বেই এ আশা শাসক শিবির করে। কেন্দ্রীয় সরকারের টাকা না পাওয়াই রাজ্য সরকার নিজেরাই এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা করে দিয়ে গ্রামে যে বাড়ি তৈরির প্রকল্প নিয়েছে তার সুফল অনেক মানুষ পেলেও এই টাকাতে বাড়ি হচ্ছে না এই ধারণাও সাধারণ মানুষকে খুব একটা সরকারের প্রতি আস্থাশীল রাখতে পারেনি। চাষীদের ফসলের দাম ঠিকঠাক না পাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও, সারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে এবং কালোবাজারি নিয়ে বাংলার কৃষক সমাজ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আস্থাশীল নয়। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ না থাকায় ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধি সহ অন্যান্য ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কম এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই। এই সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য মানুষের ভরসা যে বর্তমান তৃণমূল সরকারের প্রতি বেশি সে সম্পর্কে নিঃসংশয় শাসক শিবির।
ইস্যু ৩ : বহিরাগত বনাম ঘুষপেটিয়া :: নির্বাচনের ন্যারেটিভ ঠিক করার জন্য নিজস্ব যন্ত্র কে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ রোহিঙ্গাতে ভরে গেছে। নির্বাচন তালিকা সংশোধন হলে প্রায় দেড় কোটি রোহিঙ্গা ধরা পড়বে। এস আই আর এর প্রথম পর্বে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ মৃত অথবা স্থানান্তরিত হিসেবে বাদ যায়, রোহিঙ্গা মুক্ত পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ্যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই পরবর্তীকালে লজিক্যাল ডিস্ক্রিমিনেন্সি নিয়ে আসা হয় এবং তাতে আরো ২৭ লক্ষ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়। যদিও সবমিলিয়ে দেখা যায় মোট বাতিল ভোটারের প্রায় ৭০ শতাংশই হিন্দু। ৯০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৬৩ লক্ষ হিন্দু এবং ২৭ লক্ষ মুসলমানের নাম বাদ যায়। এই এস আই আর পর্বে সাধারণ মানুষকে যেভাবে তাদের তথ্যের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অথবা নাকানি চোপানি খেতে হয়েছে, তাতে এস আই আর এর শুরুতে যে সমস্ত মানুষজন ভাবছিল যে রোহিঙ্গা ধরা পড়বে কিন্তু দিনের শেষে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর যেভাবে নাম বাদের খাড়া নেমে এসেছে তাতে ন্যারেটিভ হিসেবে যতই আকর্ষণীয় লাগুক না কেন ঘুসপেটিয়া শব্দটি এস আই আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে অযথা হয়রানির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের মত তাই এর সুফল কতটা শাসকদলের বিপক্ষে বিরোধী দলের কাছে যাবে, এ সম্পর্কে সন্দিহান সব পক্ষই। তবে বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচন যেগুলি ২০২১ এ কম মার্জিনে ফলাফল হয়েছিল, সেখানে এই নাম বাদ যাওয়া এবং যদি তা এক শ্রেণীর বিশেষত হয় তাহলে শাসকদলের কাছে চিন্তার এর সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। আবার খড়গপুর এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার কিছু আসনে হিন্দু ভোট বেশি মাত্রায় বাদ পড়ে শাসক শিবির কে যে অ্যাডভান্টেজ দিচ্ছে সে সম্পর্কেও কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
ইস্যু ৪ :: কেন্দ্রীয় এজেন্সি বনাম রাজ্য প্রশাসন :: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে যেভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গুলি ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়ার অধীনে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পশ্চিমবঙ্গে হিংসা মুক্ত নির্বাচন করার কথা বলছে, এবং তা আসলে রাজ্য প্রশাসনকে যে চাপে রাখছে সে সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অন্যান্য রাজ্যের মতন না হলেও পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের তৈরি করা রাজ্য প্রশাসনের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত যেভাবে বদলি করে নাড়া দিয়েছে নির্বাচন কমিশন এবং তাতে রাজ্য প্রশাসনকে কার্যত অসহায় লেগেছে সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল শাসক শিবির। আঘাত আসতে পারে এ সম্পর্কে আগাম ধারণা থাকা সত্ত্বেও ব্যাপকতা আন্দাজ করতে পারেনি তারা। যদিও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাঁজোয়া বহরের সাথে সাথে, বিজেপির পালে হাওয়া লাগছে বলে ভাসিয়ে দেওয়ার যত চেষ্টাই হোক না কেন ২০১১ এর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ভয় মুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। তবে প্রশাসন নির্ভর শাসনকার্য পরিচালনা করার পরে নির্বাচনের মুহূর্তে শাসক শিবির কিছুটা ব্যাকফুটে এ সম্পর্কে কোন দ্বিমত নেই।