এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • বেশ জটিল ব্যাপার 

    সমরেশ মুখার্জী লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয়। প্রথম দর্শনেই দুজনের দুজনকে পছন্দ হয়। বছর খানেক পূর্বরাগ পর্বের পর বিয়ের সময় বিকাশ সাতাশ, অনিমা বাইশ। বিয়ের পর ওরা কিছুদিন ঝাড়া হাত পা হয়ে থাকতে চেয়েছি‌ল। বছর চারেক পর অনিমা‌র‌ মনে হয় এবার ওদের ঘরে একটি কচির আগমন হলে বেশ হয়। বিকাশ সহমত হয়। শুরু হয় ওদের যৌথ উদ্যোগ। তবে বছর খানেক পরেও সে উদ‍্যোগে‌র কোনো ফল না দেখে অনিমা‌র আকাঙ্ক্ষায় ছায়া পড়ে আশাংকার।


    সুচিন্তিত পদক্ষেপ

    অনিমা অন্ধকারে তীর চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী নয়। নারীর মনের মতো (যা বোঝা দেবতার‌ও অসাধ্য) ওনাদের প্রজননতন্ত্রটি‌ও বেশ জটিল ব্যাপার, তাই ছ‍্যানাপোনা না হলে সচরাচর মনে করা হয় পত্নীর‌ই কোনো সমস‍্যা আছে। পতি স্টাড ফার্মের সার্টিফায়েড স্ট‍্যালিয়ন। অত‌এব অনিমার ইচ্ছা‌য় ওরা কনসাল্ট করলো গাইনোকোলজিস্ট ডাঃ সুকান্ত চ‍্যাটার্জীর সাথে। উনি বিকাশের পরিবারের সাথে বিশেষ পরিচিত। বিকাশ মুক্তমনা, স্বভাবে মেথডিকাল, তাছাড়া দেখেছে ‘ভিকি ডোনার’। তাই ডাক্তার‌ চ্যাটার্জী‌কে বলে, আচ্ছা, সমস্যা তো আমার‌ও থাকতে পারে। বিকাশের কথায় ডাক্তার‌বাবু বলেন, 'হ্যাঁ, তাও হতে পারে। তাহলে আপনারা দুজনেই কিছু রুটিন পরীক্ষা করিয়ে নিন। আপনাদের‌ই সময়‌ বাঁচবে'।

    ডাঃ চ‍্যাটার্জীর রেফারেন্সে ওরা গেল ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট ডাঃ নন্দিনী সেনের ক্লিনিকে। উনি বিকাশের মেল ফার্টিলিটি টেস্ট মানে সিমেন টেষ্টিং করলেন। অনিমার‌ও কিছু পরীক্ষা করলেন। বিকাশের আগ্ৰহে একটি বুকলেট‌ও দিলেন ব‍্যাপার‌টা সম্পর্কে ধারণা পেতে।

    বীর্য পরীক্ষার ধারণা

    পুরুষের বীর্যে প্রতি মিলিলিটারে দেড় থেকে কুড়ি কোটি শুক্রাণু থাকতে পারে। মিলনকালে গড়ে দুই থেকে পাঁচ মিলিলিটার বীর্যপাত হলে 'যৌথ নেতৃত্বে‌র ডাকে' রাণীপথের মিছিলে সামিল হতে পারে ন্যূনতম তিন থেকে সর্বাধিক একশো গড়ে তিরিশ কোটি শুক্রাণু। রাণীপথ প্রসঙ্গ আসবে পরে। তো বীর্য পরীক্ষা বলতে ঐ শুক্রাণু‌র কর্মক্ষমতা যাচাই। নারীর একটি ডিম্বাণু‌র সাথে পুরুষের একটি শুক্রাণু‌র মিলনে হয় নিষিক্তি (fertilisation) অর্থাৎ গর্ভসঞ্চার। তাহলে তিরিশ কোটির কী প্রয়োজন? এটা প্রকৃতির হাইপার বাফার মেকানিজম এবং বিশেষ কারণে। বিশদে আসবে পরে। এখন দেখা যাক ঐ পরীক্ষায় পাশ করতে শুক্রাণু‌র কী কী গুণাবলীর প্রয়োজন।

    ১) বীর্যের (Semen) পরিমাণ। আপাতভাবে মনে হতে পারে মিলনের সময় যত বেশী পরিমাণে বীর্য নির্গত হবে (Ejaculation volume) তত বেশী গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা। ভাবনায় ভুল নেই তবে সর্বদা তা ঠিক নয়।

    ২) কারণ বীর্যে কি পরিমাণ শুক্রাণু আছে বা Sperm Count সেটাও বিচার্য। অর্থাৎ মিলনের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে বীর্য নির্গত হলেও তাতে যদি Sperm count খুব কম হয় তাহলে গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা‌ কমবে এবং ভাইস-ভার্সা। তবে সেটা‌ও একমাত্র বিচার্য বিষয় নয়।

    ৩) পরবর্তী বিচার্য বিষয় Sperm Motility মানে শুক্রাণু‌র গতিময়তা বা চনমনেপনা। ধরা যাক বিগ্ৰেডে ‘জনতার গর্জন’ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জেলা থেকে ফ্রী ডিম ভাতের লোভ বা ভয় দেখিয়ে প্রচুর জনতাকে বাস ভর্তি করে আনা হোলো। এবার তারা যদি ডিম ভাত খেয়ে যতবার নেতা (বা নেত্রী) “বলুন” বলে হুঙ্কার ছাড়ছেন ততবার সমস্বরে গর্জন না করে খোলা মাঠে ঘোর গরমে গামছা মাথায় ঝিমোতে থাকে - তেমন সমাবেশ থেকে হবে না বিশেষ কিছু অর্জন। তুলনায় ১৬ মাস ধরে ট্র্যাক্টরে সাময়িক ঘর পেতে রাস্তায় মাটি কামড়ে পড়ে থাকা কৃষক আন্দোলনের ফলে তিনটি কৃষি আইনই তুলে নিতে হোলো। অত‌এব শুক্রাণু কেবল সংখ্যা‌য় বেশী হলে‌ই চলবে না, তাকে হতে হবে ডাকাবুকো। কারণ দিল্লী‌ যাওয়া রুখতে পথে সরকার নির্মিত নানা প্রতিবন্ধকতা‌র মতো রাণীপথে‌ও আছে নানা বাধা। আসবে সে কথা‌ও বিশদে পরে।

    এই তিনটি প্রধান কারণ ছাড়াও আছে আরো তিনটি বৈশিষ্ট্য যার ওপরেও নির্ভর করে শুক্রাণু‌র ডিম্বাণু‌কে নিষিক্ত করতে পারার সম্ভাবনা।

    ৪) শুক্রাণু‌র সুষম ঘনত্ব (Uniform Sperm Concentration) - অর্থাৎ বীর্যের মধ‍্যে তারা কতো সুষম‌ভাবে বন্টিত রয়েছে। এটা‌ বুঝতে Sleeper density (SD) বা রেল লাইনের তলায় কীভাবে স্লিপার পাতা হয় তার উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক কোনো ব্রডগেজ সেকশনে SD=L+3. মানে ওখানে একটি রেলের তলায় তার দৈর্ঘ্য‌র থেকে 3টি বেশী স্লিপার পাততে হবে। একটি রেলের দৈর্ঘ্য 12মি। তাহলে ওখানে 15টি স্লিপার 800মিমি অন্তর পাততে হবে। কিন্তু যদি 15টি স্লিপার‌ই পাতা হয় অথচ তাদের মধ্যে গ্যাপ হয় অসমান - কোথাও 400 কোথাও 1200 - তাহলে ট্রেনের ওজনে রেল বা স্লিপারে ক্র‍্যাক আসতে পারে।

    ৫) শুক্রাণু‌র আকার (Sperm Morphology) - সুষম আকারের শুক্রাণু‌র নিষিক্ত‌করণের সম্ভাবনা বেশী। তাই স্পার্ম কাউন্ট এবং কনসেনট্রেশন ঠিক‌ থাকলেও তাদের মধ‍্যে অধিকাংশ‌ই যদি হয় বকচ্ছপ বা কুমড়োপটাশের মতো বিদঘুটে আকারের তাহলে নিষিক্তকরণের সম্ভাবনা কমবে।

    ৬) বীর্যের অম্লতা (pH of semen) - অম্লতা বা pH বেশী হলে তেমন বীর্যে থাকা শুক্রাণু শীঘ্র মরে যাবে বা রাণীপথে ঠিকমতো এগিয়ে যেতে পারবে না।

    ডাঃ সেন বললেন ওদের দুজনের টেস্ট রিপোর্ট পাঠিয়ে দেবেন ডাঃ চ্যাটার্জী‌কে।


    বেশ জটিল ব‍্যাপার

    নিজের মেটার্নিটি হোমের ওপরে‌ই ডাঃ চ্যাটার্জী‌র বাসস্থান। রবিবার ভিজিটিং ডে নয়। বিকাশ ওনার বিশেষ পরিচিত। তাই ডাঃ সেনের রিপোর্ট পেয়ে এক রবিবার আসতে বললেন ওনার চেম্বারে। এর মধ্যে ডাঃ সেনের দেওয়া বুকলেটটি খুঁটিয়ে পড়েছে বিকাশ। তাই নিয়ে ডাঃ চ্যাটার্জী‌কে কিছু প্রশ্ন‌ও করেছে। ডাক্তার বুঝলেন ওর মন সংস্কারমুক্ত এবং কৌতূহলী। বিকাশের আগ্ৰহে ডাঃ চ্যাটার্জী একটা রঙিন ড্রয়িং বার করে নারী প্রজননতন্ত্রের (female reproductive system) মূল কার্যকলাপগুলি সংক্ষেপে বুঝি‌য়ে দিলেন। বায়োলজি বিকাশের ক্ষেত্র নয়। তবে আগ্ৰহের পরিসরে ও মনযোগী ছাত্র। পরে নেট থেকে অনেক আকর্ষণীয় ব‍্যাপার জানলো।




    মাতৃগর্ভে ভ্রণ অবস্থায় একটি কন্যা শিশুর ডিম্বাশয়ে প্রায় ৬০-৭০ লাখ ফলিকল (Follicle) থাকে যার ৯০ শতাংশ‌র মধ‍্যে থাকে অপরিণত ডিম্বাণু (Oocyte)। জন্মকালে ফলিকলের সংখ্যা‌ কমে দাঁড়ায় ১০-২০ লাখে। ঋতু‌মতী হ‌ওয়ার বয়সে (১২-১৪ বছর) সংখ্যা‌টি আরো কমে দাঁড়ায় ৩-৪ লাখে। সচরাচর ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ‍্যে মহিলাদের মেনোপজের ফলে ঋতু‌চক্র বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে গড়ে ১৩ থেকে ৫১ বছর বা ৩৮ বছর ঋতুময় জীবনকালে নারীর ৫০০টি ফলিকল থেকে ডিম্বাণু পরিণত হয়ে ডিম্বস্ফোটন (ovulation) হতে পারে। অর্থাৎ ঐ সংখ্যক Ovum বা পরিণত ডিম্বাণু‌র সাথে‌‌ শুক্রাণু‌র মিলনে‌ই গর্ভবতী হ‌ওয়া সম্ভব। বাকি সংখ্যক অপরিণত ডিম্বাণু শারীবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় অবক্ষয় হয়ে (Atresia) শরীরে‌ই বিলীন হয়ে যায়। ঋতুময় জীবনকালে‌ অতীতে অধিক সন্তানধারণের পরম্পরায় নারীর ৫০০টি সম্ভাবনার মধ্যে‌ পাঁচ থেকে পনেরোটি অবধি সন্তান হোতো। বর্তমানে সেই সংখ্যা এক, দুয়ের মধ্যে নেমে এসেছে। তাহলেও পরিণত বয়সে ৫০০টি সম্ভাবনার জন্য ভ্রুণাবস্থায় ৬০ লক্ষের বন্দোবস্ত রাখা - শুক্রাণু‌র মতো ডিম্বাণু‌র ক্ষেত্রে‌ও তা প্রকৃতির অতিরিক্ত redundancy provision.

    গর্ভধারণ উপযোগী বয়সে (reproductive age) ঋতু‌চক্রের মাঝামাঝি সময়ে নারী‌র দুটি ডিম্বাশয়ে‌র (Ovary) একটি থেকে “সচরাচর” (১) একটিই পরিণত ডিম্বাণু (Oocyte) নির্গত হয়ে ডিম্বনালীতে (Fallopian tube) প্রবেশ করে। কিছু প্রক্রিয়ার মাধ‍্যমে সেটি পরিপক্ক ডিম্বতে (matured egg or Ovum) রূপান্তরিত হয়ে অপেক্ষায় থাকে ডিম্বনালীর প্রধান, প্রশস্ত অংশ এ্যাম্পুলাতে (Ampulla). ডিম্বম‍্যাম সেজেগুজে বসার ঘরে (Ampulla) সোফায় বসে - ‘আজি ফাগুন লেগেছে মম মনে' - গাইতে থাকুন, ততক্ষণ দেখা যাক ওদিকে রাণী‌পথে কী হচ্ছে।

    রাণীপথ কী?

    উপরের চিত্রটি দ্রষ্টব্য। জরায়ু বা গর্ভাশয়টিকে (Uterus) ভেবেছি ডিম্বাণুম্যামের বাপের বাড়ি‌র প্রশস্ত হলঘর। তাতে প্রবেশের দরজাটিকে (Cervical Internal Orifice) ভেবেছি ইন্ডিয়া গেট। তার সামনে একটি সংকীর্ণ প্যাসেজের অপর প্রান্তে আছে বাইরের সদর দরজা (Cervical External Orifice). ওটিকে ভেবেছি বুলন্দ দর‌ওয়াজা। যোনিমুখটিকে (Vaginal orifice) ভেবেছি গেট‌ওয়ে অফ ইন্ডিয়া - যেটি এই চিত্রে দৃশ্যমান নয়। গেট‌ওয়ে অফ ইন্ডিয়া থেকে বুলন্দ দর‌ওয়াজা অবধি পথটিকে ভেবেছি জনপথ (মানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পথ যেটি জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় যোনিপথ বা Vaginal Tract). সরকারের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা ও তা রূপায়ণের উদ্যোগ না থাকায় ভারত জনপথে হেঁটে‌ই এখন বিশ্বের এক নম্বর - প্রায় ১৪৭ কোটি। জনপথটিকে স্টেশনের বাইরে‌র গেট থেকে ওভারব্রিজের শুরু অবধি ভাবা যেতে পারে।

    অধিক ভীড়ে যাত্রীদের ঠেলাঠেলি চরমে ওঠে ঐ সংকীর্ণ ফুট ওভারব্রিজে - এটা মনে থাকলে আগে ‘বশুপা’ সদস্যদের বিড়ম্বনা বুঝতে সুবিধা হবে। বুলন্দ দর‌ওয়াজা থেকে ইন্ডিয়া গেট অবধি পথটিকে (Cervical Canal) বলেছি রাণীপথ। তবে রাণীপথ রাজপথ বা জনপথের মতো প্রশস্ত নয়, বরং ঠিক তার বিপরীত - কাশীর গলির মতো সংকীর্ণ। তবু রাণীপথ ভেবেছি কারণ এটিই হচ্ছে রাণীম্যামের (ovum) সাথে দেখা করতে যাওয়ার পথ।


    'বশুপা' সদস্যের বিড়ম্বনা

    ওদিকে তখন রাণীম‍্যামের সাথে দেখা করতে 'বহুজন শুক্রাণু পার্টির' তিরিশ কোটি সদস‍্য গেট‌ওয়ে অফ ইন্ডিয়া থেকে বুলন্দ দর‌ওয়াজায় এসে উপস্থিত। চলছে তুমুল ঠেলাঠেলি। যেমন করোনাকালে বান্দ্রা স্টেশনে একটি মাত্র ট্রেনের কাছে এসে বাড়ি ফেরার তাড়নায় মাথা কুটে মরছিল কয়েক হাজার পরিযায়ী শ্রমিক। কারণ রাষ্ট্র‌গুরু আচমকা চার ঘন্টার নোটিশে একুশদিনের লকডাউন ঘোষণা করে টিভির পর্দা থেকে অদৃশ‍্য হয়ে গেছেন। পরে আকাশ‌ থেকে বর্ষিত হবে তাঁর পরবর্তী মনের বাণী। অনেকেই ট্রেন ধরতে না পেরে ফিরে গেল (leaking of semen from the vaginal opening).

    নেতা, নেত্রীরা প্রায়শই ব্রিগেড চলো, লালপথে র‌্যালিতে নামো ইত্যাদি বলে তাদের সমর্থকদের জমায়েতে আহ্বান জানান।‌ তেমন‌ই বশু পার্টির কর্ণধার স্বামীনাথন মহালিঙ্গম মাঝে মাঝেই উত্তেজিত বক্তৃতা দিয়ে তার অনুগামী কয়েক কোটি 'বশুপা' সদস‍্যকে গেট‌ওয়ে অফ ইন্ডিয়ায় ডেকে এনে জনপথে ছেড়ে দিয়ে নিজে সটকে পড়েন। এবার তারা বুলন্দ দর‌ওয়াজা থেকে ইন্ডিয়া গেট যেতে গিয়ে পুলিশের ঠ্যাঙানি খেয়ে মরলো কিনা তা নিয়ে স্বামীজীর কোনো মাথাব্যথা নেই।

    সেদিন বান্দ্রা স্টেশনে ঢোকার মুখে ভিনদেশী পরিযায়ী শ্রমিকদের‌ও পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করেছে। তেমনি বুলন্দ দর‌ওয়াজা থেকে রাণী‌পথ ধরে ইন্ডিয়া গেটের দিকে এগোতে‌ই AK47 নিয়ে রে রে করে তেড়ে এলো একপাল প্রহরী (ম্যামের ইমিউনিটি সিস্টেম)। বেশ কয়েক কোটি 'বশুপা' সদস‍্য ওখানে‌ই খতম হয়ে গেল। বেঁচে যাওয়ারা ভয়ে ভয়ে বলে, 'যাঃ বাবা, আমরা তো প্রায়ই এ পাড়ায় ল্যাজ নাড়িয়ে আসি ম‍্যামের সাথে দেখা করতে, ম‍্যাম না থাকলেও আসি। এভাবে জালিয়ান‌ওয়ালা বাগে ডায়ারের ডেয়ারিং পুলিশের মতো তেড়ে এসে গুলি চালানোর কী মানে?' ততক্ষণে কুইনস ম‍্যানসন (Ampulla) থেকে প্রহরী‌দের কাছে রাণীর রাসায়নিক বার্তা চলে আসে, 'ওরে ছেড়ে দে, ওরা কুটুম মানুষ।' ধড়ে প্রাণ আসে বাঁচাবুচা 'বশুপা' সদস‍্যদের।


    কঠিন ট্রেক




    রাণীপথ মোটেই সুগম নয়, বরং নানা প্রতিকূলতায় ভরা। তা যেন পশ্চিম‌ঘাট পর্বতমালার সহ‍্যাদ্রী রেঞ্জে বিখ্যাত 'সন্ধান ভ‍্যালি' বা Valley of Shadows ট্রেকের মতো। মুম্বাই থেকে ১৮০ কিমি দূরে আহমেদনগর জেলায় সামরাদ গাঁও থেকে শুরু হয় এই ট্রেক। পুরোটাই নামা। সংকীর্ণ, গভীর, আলোছায়াময়, স্যাঁতসেঁতে, মাঝে মাঝে জলমগ্ন সে গিরিখাত ধরে হাঁচোড়পাঁচোড় করে চলতে গিয়ে পাথরে ঘষে কনুয়ের নুনছাল উঠে, পিচ্ছিল ঢালে হড়কে গড়িয়ে, বুকজলে হাবুডুবু খেয়ে দেহনু অবধি দু কিমি ট্রেকে‌ই অনেকের অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। প্রতিবার 'বশু' পার্টির অনেকেই তাই দেহনু (ইন্ডিয়া গেট) অবধি পৌঁছনোর আগেই দেহ রাখে রাণীপথে।

    রাণীপথের প্রধান অন্তরায় তার অম্লীয় পরিবেশ (acidic environment) যা শুক্রাণুর পক্ষে প্রাণঘাতী। আগেই বলা হয়েছে বীর্যের অম্লতা‌ও (কোনো কারণে) বেশি হলে অধিকাংশ শুক্রাণু সেখানেই মারা যায়। রাণীপথের অম্লতা নারী‌র গর্ভসঞ্চার এড়াতে প্রাথমিক রক্ষাকবচ। এহেন নানা প্রতিবন্ধকতা (গেট‌ওয়ে অফ ইন্ডিয়া থেকেই ঘাড় ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাওয়া, রাণীপথে পুলিশের গুলি, প্রাণঘাতী অম্লীয় রাণীপথ) অবশেষে মাত্র কয়েক শো সক্ষম ট্রেকার এসে পৌঁছয় ম্যামের বাপের বাড়ির হলঘরে।

    অতঃপর সেখান থেকে আবার যেতে হবে চতুর্দিক ঘেরা অলিন্দ (Fallopian tube) হয়ে ছাঁদনাতলায় (Ampulla). সেখানে গেলে দেখা হতে পারে ম‍্যাডামের সাথে। কিন্তু ম‍্যাডামের দুমহলা বাপের বাড়ি (two ovaries)। কোন মাসে (ঋতুচক্রে) কোন মহল থেকে ম‍্যাডাম আসবেন বোঝা দায়। তাহলে কী উপায়? খেয়াল করলে ম‍্যাডামের কণ্ঠনিঃসৃত মৃদু আনন্দসঙ্গীত কানে আসতে পারে (তিনি রাসায়নিক সিগন্যাল পাঠাচ্ছেন)। চোখকান খোলা মুষ্টিমেয় 'বশুপা' সদস‍্যরা চললো সেদিকপানে। উদোমার্কা তালকানার দল অন্ধকার হলঘরে বেফালতু ঘুরে মরলো বা চললো অন‍্য ডিম্বনালী অভিমুখে। সঠিক নলাভিমুখী কয়েকজন অভিযাত্রী‌ক মানসিক‌তার শুক্রাণু এসে পৌঁছালো দোতলায় সঠিক ছাদনাতলায়।

    এই দুর্গম যাত্রায় বশুপা সদস্য‌রা তাই নিজেদের মধ্যে কেবল প্রতিযোগিতা‌ই করে না, সহযোগিতা‌ও করে। ঐ কঠিন পিচ্ছিল অম্লীয় রাণীপথে তারা সংঘবদ্ধভাবে সাঁতরে যায় যাতে অনেকেই মারা গেলেও অন্তত কয়েকজন ম্যামের সাথে মিলিত হ‌ওয়ার সুযোগ পা‌ওয়ার জন্য জীবিত থাকে।

    সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট - কারণ ফুলশয‍্যাকক্ষে ঢোকাও কঠিন কসরৎ

    এত কষ্ট করে শেষবেষ ছাঁদনাতলায় আসতে পারার উল্লাসে সেই মুষ্টিমেয় কিছু উদ‍্যমী 'বশুপা' সদস‍্য হুমড়ি খেয়ে পড়তে যাবে ম‍্যাডামের গায়ে। কিন্তু ম‍্যাডামের সাথে দেখা করা অতো সোজা নয়। কারণ ম্যামকে ঘিরে আছেন তার সঙ্গিনীর দল (layer of cells - Corona Radiata)। আর বশুপা সদস্যদের আসতে দেখে ম্যাম ততক্ষণে ঢুকে গেছেন আরো অন্দরে ফুলশয্যার ঘরে (thick glycoprotein shell - Zona Pellucida)।

    এতদূর ট্রেক করে এসে কর্দমাক্ত, হতক্লান্ত কজন বশুপা সদস্যদের মধ্যে মাত্র একজনকে ম্যামের সঙ্গিনী‌রা মুখ হাত পা ধু‌ইয়ে, গায়ে বডি স্প্রে ছিটিয়ে ফুলবাবুটি করে সাজিয়ে দেবেন (process of sperm capacitation) ফুলশয্যার ঘরে ঢুকে ম্যামের সাথে দেখা করার জন্য।

    কিন্তু ম্যামের সঙ্গিনীররা কঠিন চিজ। তারপরেও তেনারা ঘিরে থাকবেন ফুলশয্যার ঘর। তবে ফুলবাবুর সঙ্গীরাও নাছোড়বান্দা। তারা সম্মিলিত‌ভাবে কনু‌ইয়ের গুঁতোয় (strong movement of sperm tail) এবং পেপার স্প্রে ছিটিয়ে (Enzymatic action with Acrosin enzyme) তাদের ঠেলে সরিয়ে ফুলবাবু‌র সাথে তারাও গিয়ে পৌঁছবে ফুলশয্যার গৃহদ্বারে।

    ডিম্বম্যাম ভিতরে খিল এঁটে বসে আছেন। বশুপা সদস্য‌রা সম্মিলিতভাবে দরজা‌ ধাক্কিয়ে দরজার খিল ঢিলা করে দেবে (thinning of shell wall thru enzymatic action)। এক ফাঁকে নড়বড়ে খিল এক ধাক্কায় ভেঙে (puncturing Zona Pellucida shell wall thru Acrosome Reaction) ফুলবাবু চকিতে প্রবেশ করবেন ফুলশয্যার ঘরে। পত্রপাঠ ম্যাম নতুন খিল লাগিয়ে দেবেন (Cortical Reaction) যাতে আর কোনো উটকো বশুপা সদস্য ঢুকে পড়তে না পারে। অচিরেই ফুলশয্যার ঘরটি পরিণত হবে বেহুলার লৌহবাসরে (hardening of shell wall) যাতে আর কেউ তথায় খিল ভেঙে ঢুকতে না পারে। তবে ফুলবাবুর সঙ্গীরা উদার হৃদয়। তারা ফুলবাবুকে বাইরে থেকে চেঁচিয়ে - ঠিক আছে কমরেড, বেস্ট অফ লাক বলে, আবার আসিব ফিরে - রাণীপথ ধরে সাঁতরে গাইতে গাইতে ফিরে যাবে।

    মহাভারতে দ্রৌপদীর ফুলশয্যা‌র কোনো উল্লেখ নেই। তাকে পর্যায়ক্রমে পাঁচ স্বামীর সঙ্গে পালা করে এক বছরের দাম্পত্য জীবন পালন করতে হয়। সে সময় বাকি চার স্বামী‌র ছিল সে কক্ষে (তা ফুল বা কাঁটার যাই হোক) প্রবেশ নিষিদ্ধ। দ্রৌপদীর দ্বন্দ্ব, পছন্দ, অপছন্দ ছিল গৌণ। ধর্ম পালন ছিলো মুখ্য দায় কারণ শাশুড়ি কুন্তী বলেছেন - যা এনেছো পাঁচ ভাই ভাগ করে ভোগ করো।

    কিন্তু বাস্তবে‌ “একটি ফুলশয্যা কক্ষে” একটি বর‌ই প্রবেশ করতে পারে। তেমনি রাণীম্যামের ক্ষেত্রে‌ও “একটি ফুলশয্যার ঘরে” প্রবেশাধিকার মাত্র একটি শুক্রাণু‌র। তার মানে কি রাণীম্যামের ক্ষেত্রে‌ দুটো ফুলশয্যার কক্ষ‌ও হতে পারে? (২) সেদিন সুরঞ্জনার ঘরে দুটি শিশু ভাইবোন‌কে খেলতে দেখে কৌতূহলবশত জাল ঘাঁটতে গিয়ে আমার ঘেঁটে ঘ হ‌ওয়ার দশা হয়েছিল। তার কিছু নির্যাস‌ই এখানে ধরতে চেয়েছি। দুটি ফুলশয্যা‌ও হতে পারে‌। সে কথা আসবে পুনশ্চতে। আপাতত একটি ফুলশয্যা‌তেই আবদ্ধ থাকি।

    তো যা বলছিলাম, ফুলশয্যার ঘরে ঢোকার আগে ফুলবাবুকে তার ল্যাজটি (sperm tail) খুলে রাখতে হবে দরজার বাইরে। যে ল্যাজ তাকে বুলন্দ দর‌ওয়াজা থেকে এতদূর সাঁতরে ফুলশয্যার দরজা‌য় এনেছে - এখন আর তার কোনো ভূমিকা নেই। তাই এখন তা সাপের খোলসের মতো পরিত্যাজ্য।

    ফুলশয্যার ঘরে ঢুকে ‘সব পথ এসে মিলে গেল শেষে, তোমারি দুখানি নয়নে’ মোডে রোমান্সে গদগদ হয়ে পুচ্ছহীন ফুলবাবু চাইলেন ম্যামের দিকে। অতঃপর যেভাবে দুটি নরনারী আশ্লেষে আবদ্ধ হয়েছিল বাস্তবে (যার ফলে ফুলবাবু আসতে পারলেন এতদূর) তার‌‌ই একটা মাইক্রোস্কোপিক রোমান্টিক এ্যাকশন রিপ্লে হবে এখানে। ফুলবাবু মিলিত হবেন ম্যামের সাথে। এই ঘটনাটিকে বায়োলজি‌র পাঠ্যপুস্তকের ভাষায় বলা হয় নিষেক (Fertilisation). কুমারী ডিম্বাণু‌টি শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয়ে তৈরী হবে একটি নিষিক্ত যুগ্মাণু (Zygote or fertilized egg) যা একত্রে ধারণ করবে মা ও বাবার জিনগত বৈশিষ্ট্য (Genetic traits).

    কিন্তু কে সেই ভাগ‍্যবান ফুলবাবু?

    বেপাড়া থেকে বিয়ে করতে আসা বরকে ফুলশয‍্যার ঘরে ঢুকতে দেখে পাড়ার ব‍্যর্থ প্রেমিকের দল বাইরের হলে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কারণ সে কক্ষে প্রবেশাধিকার মাত্র একজনের। কে সেই ভাগ‍্যবান এবং কেন‌ই বা তার কণ্ঠে জুটলো বরমাল‍্য - তা জানা নেই। এ যেন কলেজে প্রথম বর্ষের কোনো ডাকসাইটে সুন্দরী‌ ছাত্রী‌র পিছনে ঘুরঘুর করছে কিছু ছাত্র। মেয়েটি কার দিকে কৃপাদৃষ্টি বর্ষণ করবে কেউ জানে না। ঘুরন্ত সবাই যোগ‍্য। তবু সুন্দরী‌র মন বোঝা ভার। তিনি হয়তো কারুর দিকেই তাকালে‌ন না।

    ঠিক তেমনি, আন্দাজ তিরিশ কোটি শুক্রাণু‌র মধ‍্যে যে মুষ্টিমেয় কজন অতি পরিশ্রমে ল‍্যাজ (sperm tail) নেড়ে সাঁতরে ছাঁদনাতলায় এসে পৌঁছলো, যোগ্যতা‌র নিরিখে তারা সবাই A+ ক‍্যাটাগরীর। তবু সেবার হয়তো ডিম্ববিবির কাউকেই পছন্দ হোলো না। অপছন্দের কারণ‌ অজানা হলেও প্রকৃতিতে অকারণে কিছু হয় না। এ হচ্ছে প্রকৃতি উদ্ভাবিত জন্মনিয়ন্ত্রণ ব‍্যবস্থা। প্রতিবার নারীর ঋতুচক্রে ডিম্বস্ফোটনের উর্বরা সময়ে যদি শুক্রাণু‌র গলায় বরমাল‍্য জোটে তাহলে সে নারীর অত‍্যধিক গর্ভধারণের ধকলে‌ অকাল‌মৃত্যুর সম্ভাবনা। তাই প্রকৃতির নিয়মেই বহুবার ডিম্বম‍্যাম অনিষিক্ত হয়ে‌ স্বেচ্ছায় কুমারী অবস্থায় প্রাণত‍্যাগ করবেন। ফলে সেবার নারী‌র মহার্ঘ পাঁচশোটি ডিম্বাণু‌র একটি (যেটি তার জন্মকাল থেকে শরীরে লালিত হয়েছে) বিনষ্ট হবে। তবে নারী‌র সুস্থ জীবনের জন‍্য অধিকাংশ ডিম্বাণুর এহেন আত্মত্যাগ অপরিহার্য।

    কঠিন জীবনসংগ্ৰাম - বাঞ্ছিত আত্মহত্যা

    রাণীপথে শুক্রাণু‌র এহেন জীবনসংগ্ৰাম মুম্বাইয়ে লোকাল ট্রেনে‌র নিত্যযাত্রী‌র সাথে তুলনীয়। ধরা যাক অফিস টাইমে এক নিত‍্যযাত্রী গোরেগাঁও স্টেশন থেকে উঠলো ভীড়ে ঠাসা চার্চগেটগামী বোরিভিলি লোকালে। ফুটবোর্ডে (বুলন্দ দর‌ওয়াজা) লটকে ঝুলে গেলে পোষ্টে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়া‌র সম্ভাবনা। তাকে ঠেলে গুঁতিয়ে কোনোরকমে ঢুকতে হবে বগির ভেতরে (রাণীপথ হয়ে ইন্ডিয়া গেট পেরিয়ে জরায়ুর অভ‍্যন্তরে)।

    বগির ভিতরে ঢুকেও হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না, তাকে যেতে হবে আরো ভিতরে (ডিম্বনালীতে)। লক্ষ‍্য থাকবে সীটের কাছে (Ampulla) পৌঁছানোর। সেখানে‌ গিয়ে ওপরের তাকে এ্যাটাচী রেখে দাঁড়িয়ে‌ই চলে যাবো ভাবলে‌ও চলবে না। প্রতিটি বসা যাত্রী‌র দিকে শ‍্যেনদৃষ্টিতে নজর রেখে বুঝতে হবে অন্ধেরী থেকে দাদারের মধ‍্যে কে কোথায় নামতে পারে। কেউ সামান‍্য ওঠার ভঙ্গি করলেই কয়েকজনকে ডজ করে ফিশিং ঈগলের মাছ ধরা‌র মতো স‍্যাঁৎ করে বসে পড়তে হবে সেই সীটে (অর্থাৎ ফুলশয‍্যা কক্ষের দরজার খিল ভেঙে ঢুকে পড়তে হবে)। মুম্বাই সেন্ট্রালেও‌ বসার সীট না পেলে আর আশা নেই, বাকি পাবলিক সব চার্চগেট যাত্রী (অর্থাৎ ম‍্যাডাম‌ সে যাত্রা‌য় কাউকেই পাত্তা না দিয়ে রাণীপথ ধরে গিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মত্যাগ করবেন ন‍্যাপকিনে।

    কেন তিরিশ কোটি?

    রাণীম্যাম খুব‌ই স্বল্পায়ু। মানে ডিম্বস্ফোটন (ovulation) হয়ে একটি পরিণত ডিম্ব (ovum) জন্মানো‌র পর সেটি মাত্র ১২ থেকে ২৪ ঘন্টা বেঁচে থাকে। অর্থাৎ তিনি যেন জলসাঘরের বেলোয়ারী ঝাড় অথবা নিশি পোহানো খালি আতরের শিশি। তবে গেট‌ওয়ে অফ ইন্ডিয়া থেকে বুলন্দ দর‌ওয়াজা হয়ে, রাণীপথের নানা প্রতিকূলতা সয়ে, শয়ে শয়ে মরে হেজে গিয়ে‌, ইন্ডিয়া গেট পেরিয়ে ছাঁদনাতলা অবধি সাঁতরে আসা মুষ্টিমেয় বশুপা সদস্যরা - উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা। তারা বেঁচে থাকতে পারে তিন থেকে পাঁচদিন। ম্যামের স্বল্পায়ুর কারণে শুধুমাত্র ঐ স্বল্প সময়কালের মধ্যে যদি ডিম্বাণুর সাথে শুক্রাণু সঠিক মিলন হয় তবেই হবে নিষিক্তি (fertilisation). ঋতু‌চক্রে দিন দশেকের ডিম্বস্ফোটন পর্যায়ে (ovulation period) কখন সেবার একটি ম্যামের আবির্ভাব হবে সেটা জানা‌ পার্বতীর‌ও অসাধ্য। এইবার হয়তো বোঝা গেল স্বামীনাথন মহালিঙ্গম সাহেব কেন শুরুতে তিরিশ কোটি বশুপা সদস্যদের ডেকে এনেছিলেন গেট‌ওয়ে অফ ইন্ডিয়ায়।


    ঘরজামাই

    ফুলশয‍্যায় ‘মিলন তিথি‌র পূর্ণিমা চাঁদ ঘোচায় অন্ধকার’ পর্ব ঠিকঠাক মিটলে নিষেকের ৩০ ঘণ্টা পর ১টি থেকে ২টি, ৩ দিনে ৮টি, ৪ দিনে জাইগোটে ১৬টি কোষ তৈরী হলে নবদম্পতি‌র অষ্টমঙ্গলায় শ্বশুরবাড়ি যাত্রা‌র মতো কোনো ব‍্যাপার নেই। বস্তুত এ বিয়েতে ম্যামের শ্বশুরবাড়ির মানে স্বামীনাথন মহালিঙ্গম স্যারের বাপের বাড়ি‌র কোনো ভূমিকা‌ নেই। জামাই বিয়ের পর ঘরজামাই হয়ে থেকে যাবে মেয়ের বাপের বাড়িতে। তবে বেডরুম থেকে বেরিয়ে তারা যাবে হলঘরে (জরায়ু বা গর্ভাশয়ে)

    পঞ্চম দিনে তথায় প্রবেশ করে জাইগোট দম্পতি পরিণত হবেন ব্লাস্টোসিস্ট-এ যার কোনো মান্য বাংলা প্রতিশব্দ নেই। প্রাথমিক ভ্রুণীয় স্তর ভাবা যেতে পারে। ব্লাস্টোসিস্ট জরায়ু বা গর্ভাশয়ের দেওয়ালে চিপকে যাবে (implantation). তথায় কোষ বিভাজন হয়ে ক্রমশ বাড়তে থাকবে কোষের সংখ‍্যা‌। ব্লাস্টোসিস্টের পরবর্তী পরিণত রূপ অপরিণত ভ্রূণ (embryo). কিছুদিন পর গর্ভজল থলি (Amniotic sac) তৈরি হয়ে আশ্রয় দেবে অপরিণত ভ্রূণটিকে। Zygote থেকে ব্লাস্টোসিস্ট হয়ে Embryoতে রূপান্তরিত হতে নিষেকের পর ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। অতঃপর আগামী দশমাস (যতক্ষণ না প্রসববেদনা ওঠে) এটি থাকবে গর্ভাশয়ে এবং চলবে গুরুত্বপূর্ণ ভ্রুণীয় বিকাশ পর্ব (Embryonic Development Phase or Embryogenesis). কমবেশি আট সপ্তাহে অপরিণত ভ্রুণটি পরিণত হবে গর্ভস্থ শিশু‌তে (Fetus) - যেটি ভবিষ্যতে জন্মগ্ৰহণ করা সন্তানের মিনিয়েচার সংস্করণ।


    ম‍্যাডাম ও মিস্টারের পার্থক্য

    এখানে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মধ‍্যে কিছু পার্থক্যের মধ‍্যে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সচরাচর জীবজগতে পুরুষের আকার মহিলা‌দের থেকে বড়সড় হয়। এক্ষেত্রে তা উল্টো। 'বশুপা' সদস‍্যরা যদি হয় আকারে ব‍্যাঙাচি তবে ডিম্বাণুম‍্যাম ডাইনোসর। শুক্রাণু মানবশরীরের ক্ষুদ্রতম এবং ডিম্বাণু বৃহত্তম কোষ, আকারে শুক্রাণু‌র প্রায় দশহাজার গুণ বড়।

    দ্বিতীয়‌ত, শুক্রাণুরা 'আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের‌ পিয়াসি' সম্প্রদায়ের অস্থিরমতি চরিত্র। তারা 'অকারণে‌ই চঞ্চল'। তাদের এই ছটফটে স্বভাব‌ অভিহিত হয় sperm motility বা শুক্রাণু‌র সঞ্চরণশীলতা বা গতিময়তা দ্বারা, যার উল্লেখ আগে করা হয়েছে। তুলনায় ডিম্বাণুম‍্যাম মাধুরী ফিদা হুসেন সাহেবের সাধের ছবি - 'গজগামিনী' গোত্রের। ওভারি থেকে ফ‍্যালোপিয়ান টিউব, মাত্র এই টুকু পথ তিনি মাসে একবার অতিক্রম করেন।

    তবে তৃতীয়‌ তফাৎ‌টিই অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত এই তথ‍্যটির ব‍্যাপক প্রচারের ফলে গ্ৰামাঞ্চলে (কিছু শহরাঞ্চলে‌ও) লোকজন একটু সচেতন হলে এখন‌ও এই একটি কারণে বহু নারীনির্যাতন কমতে পারে।

    জীবজগতের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ‌কারী জিন DNA নামক এক জটিল রাসায়নিক উপাদানে নির্মিত। এই জিন কয়েকশো থেকে কয়েক লক্ষ DNAএর সমন্বয়ে তৈরী হতে পারে। দীর্ঘদিন‌ব‍্যাপী হিউম‍্যান জেনোম প্রকল্পের গবেষণালব্ধ ফলাফলে জানা গেছে মানবদেহে কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার জিন থাকতে পারে।

    কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত ক্রোমোজোমের মধ‍্যে‌ই লাটাইয়ে গুটোনো সূতোর মতো DNA গুটোনো অবস্থায় থাকে। প্রতিটি জীবকোষে এই ক্রোমোজোমের সংখ‍্যা নির্দিষ্ট। যেমন মানুষের ক্ষেত্রে ২৩ জোড়া বা ৪৬টি এবং কুকুরের ক্ষেত্রে ৩৯ জোড়া বা ৭৮টি। মানবদেহের প্রতি‌টি কোষে থাকে এই ২৩ জোড়া বা ৪৬ টি ক্রোমোজোম।

    ব‍্যতিক্রম শুধু প্রজনন কোষের (Gamete / Sex cell) বেলায়। মহিলা‌র ক্ষেত্রে সেটি ডিম্বাণু‌ ও পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণু। এই দুটি কোষে জোড়া‌য় নয় শুধু ২৩ টি করে‌ ক্রোমোজোম থাকে যার ২৩তম ক্রোমোজোম‌টি হোলো লিঙ্গ নির্ধারক বা Sex Chromosome.

    যৌনকোষ বা ডিম্বাণু ছাড়া নারীশরীরের বাকি সমস্ত কোষে থাকে XX ক্রোমোজোমের জুড়ি এবং পুরুষের ক্ষেত্রে XY জুড়ি। ফলে ডিম্বাণু‌র ক্ষেত্রে ২৩তম Sex ক্রোমোজোম‌টি সর্বদাই হয় X তবে শুক্রাণু‌র ক্ষেত্রে পুরুষের শরীরে যত শুক্রাণু তৈরী হয় তার অর্ধেকে থাকতে পারে X এবং বাকি‌তে Y ক্রোমোজোম। এটি‌ই সাধারণ নিয়ম। তবে কিছু ব‍্যতিক্রম হতে পারে যা Genetic disorder বলে পরিগণিত। সে আলোচনা আরো জটিলতা‌ময় এবং এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।

    স্বাভাবিক বুদ্ধি‌তেই বোঝা যায় ডিম্বাণু‌র সাথে শুক্রাণু‌র নিষেকের ফলে যে যুগ্মাণুটি (Zygote) তৈরী হবে তাতে থাকবে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম। সেক্ষেত্রে ২৩তম ক্রোমোজোম জুড়ি‌টি XX অথবা XY হতে পারে। XX হলে সেটি রূপান্তরিত হবে কন‍্যাভ্রুণে এবং XY হলে পুত্রভ্রুণে। অর্থাৎ একটি গর্ভবতী মহিলা‌র অজাত সন্তান মেয়ে হবে না ছেলে, সেটা কখোনো‌ই তার ওপর নির্ভর করে না। তা নির্ভর করে কেবলমাত্র তার স্বামী‌র ওপর। তবু এখোনো ভারতে বহু জায়গায়, অশিক্ষা ও কুসংস্কারের ফলে পুত্রসন্তানের জন্ম না দিতে পারায় বহু মহিলা‌ অযথা নির্যাতনের শিকার হন। এটি তথাকথিত সভ‍্যতার কলঙ্ক।

    ডিম্বাণু‌র সাথে যে শুক্রাণু‌টির মিলন হবে তাতে ২৩তম ক্রোমোজোমটি কী হতে পারে - X না Y - তা বলতে পারা শিবের‌ও অসাধ‍্য। মহাবিশ্বের উৎপত্তি রহস‍্যের মতো জন্মপ্রক্রিয়ায় এত জটিলতা স্বত্ত্বেও মানুষের হস্তক্ষেপ না হলে (যেমন সিলেক্টিভলি কন‍্যাভ্রুণ হত‍্যা) প্রকৃতি‌র কোনো আশ্চর্য ম্যাজিকে বহুকাল সমাজে নারী ও পুরুষের সংখ্যা‌য় মোটামুটি একটা সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়ে এসেছে। এসব ভাবলে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী মানুষকে হতবুদ্ধি হতে হয়। ঈশ্বর‌বিশ্বাসী‌দের সে সমস‍্যা নেই - তাদের কাছে সব‌ই মা ষষ্ঠী‌র লীলা।

    মূল্যবান পরামর্শ

    সেদিন অবশ‍্য ডাঃ চ্যাটার্জী‌র সংক্ষিপ্ত ভাষণে বিকাশ এতো কিছু জানেনি। ওর অধীত বিষয় না হ‌লেও পরে কৌতূহলী আগ্ৰহে নেট ঘেঁটে এসব জেনেছে। তবু সেদিন‌ ও যতটুকু বুঝেছি‌ল তাতেই বলে‌ ফেলেছিল, 'বাবা, এতো বেশ জটিল ব‍্যাপার মনে হচ্ছে।'

    ডাঃ চ্যাটার্জী হেসে বলেছিলেন, 'তা তো বটেই, তবে এতসব না জানলেও চলে। বরং বেশি না জানাই ভালো। আমাদের পেশায় একটি ধারণা‌ চালু আছে - Psychogenic Infertility অর্থাৎ কোনো শারীরিক অসুবিধা না থাকলেও Stress, Anxiety, Depression ইত্যাদির ফলে কনসিভ করতে অসুবিধা হয়। কারণ মানসিক চাপের ফলে Hormonal imbalance হয়ে মহিলাদের Menstrual cycle, Ovulation এবং পুরুষের ক্ষেত্রে Sperm count, motility etcetera disturbed হতে পারে।

    তাই এসব নিয়ে বেশি ভাববেন না। আপনাদের সব রিপোর্ট নর্মাল। ওনার পিরিয়ড খুব রেগুলার। আপনাদের বয়স‌ও বেশি নয়। সুতরাং আপনারা যদি ঋতুচক্রের নয় থেকে কুড়ি - এই বারো দিনে - একদিন অন্তর মিলিত হন, মনে হয় অচিরেই সাফল‍্য আসবে।'

    অনিমাকে আলাদা করে বলেন, 'হালকা মনে থাকবেন। জানেন তো, কথায় বলে, প্রত‍্যাশা‌ই জন্ম দেয় হতাশার। বাচ্ছা হলে মিষ্টি খাইয়ে যাবেন। আগাম শুভেচ্ছা র‌‌ইলো।' সেদিন ডাঃ চ্যাটার্জী‌র সুন্দর ব‍্যবহার ও আশ্বাস ওদের খুব ভালো লেগেছিল। ভরসা‌ও পেয়েছিল।

    ওহ সাত দিন


    বিকাশ বিনদাস মানুষ। ওর সন্তানের আকাঙ্ক্ষা অনিমার মতো প্রবল নয়। মাসের সেই বিশেষ সাতদিন কবে থেকে শুরু হচ্ছে সেটাও ওর জানার কথা নয়। ওসব অনিমার খেয়াল রাখার কথা। তাই সেদিন বিকেলে অনিমাকেই লজ্জার মাথা খেয়ে বিকাশ‌কে বলতে হয়, 'আজ থেকে কিন্তু আমাদের একদিন ছাড়া সাতদিন ...।'

    মিলন যদি স্বাভাবিক প্রেরণা‌য় হয় তাহলে তার মাধুর্য অন‍্য। অনেকটা কলেজে জেনারেল লাইনে পাসকোর্সে পড়ার মতো। ইচ্ছে হলে ক্লাস করো, না হলে বাঙ্ক মেরে ক‍্যান্টিনে আড্ডা মারো। কিন্তু ডাঃ চ্যাটার্জী‌র পরামর্শে 'ওহ সাত দিনের' কুচকাওয়াজ যেন মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষার শিডিউল। একদিন‌ও কামাই করা যাবে না। তাই অনিমার কথা শুনে বিকাশ মজা করে পা ঘষে। তা দেখে হাসে অনিমা। কপট গাম্ভীর্যে বিকাশ বলে, ‘তোমার আর কী। জমির ভূমিকা তো চিরকাল‌ই প‍্যাসিভ। হাল চালানোর মেহনত তো চাষীর‌ই।’

    অনিমা‌ও দুষ্টু হেসে বলে, ‘আচ্ছা, শুধু‌ই মেহনত? আর পাম্প চালিয়ে জমিতে পাইপে করে জল দেওয়াতে বুঝি কোনো‌ই মজা নেই?’

    অতীতে সম্পর্ক করে বিয়েতে থাকতো বয়সে‌র অনেক ব্যবধান। রাশভারী পতিকে পত্নী দেখতো দেবতাজ্ঞানে। ফলে পত্নী সচরাচর একহাত ঘোমটা টেনে পতির সাথে সম্ভ্রমের সাথে বাক্যালাপ করতো। বর্তমানে বিবাহিত দম্পতি‌র মধ্যে বয়সের ব্যবধান হয় কম। প্রেম ভালোবাসা করে বিয়ে হলে বন্ধুর মতো সাবলীল সম্পর্কে একান্তে তুই তোকারি‌ও চলে। ফলে নিজেদের মধ্যে এমন তির্যক রসিকতা‌ও হয়েই থাকে। তাই শিডিউল ধরে কসরৎ অন্তে অনিমা মুচকি হেসে বিকাশের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, 'আহা রে, মনে হচ্ছে যেন এখন তোমা‌র চলছে গব্‌ভোযন্তনা।'

    বিকাশ ‌ঐ কদিন অতীতে সদ্য উপনয়নের পর সন্ধ্যা আহ্নিক করার মতো নিষ্ঠা‌য় রাতে ওর দায়িত্ব পালন করতো। তবু সেবার ছিপে মাছ উঠলো না। যথাসময়ে শুরু হয়ে গেল পিরিয়ড। অনিমার মুখ ভার। বিকাশ নরম গলায় বোঝায় 'মন খারাপ ক‍রছো কেন, ডাঃ চ্যাটার্জী‌ তো বলেইছেন, কিছুদিন সময় লাগতে পারে।'

    তবে বেশি‌দিন অনিমার মুখ ভারাতুর পর্ব চললো না। তৃতীয় মাসে‌ই ডাঃ চ্যাটার্জী‌র আশ্বাসবাণী ফলে গেল। নির্দিষ্ট সময়ে সেবার পিরিয়ড শুরু হোলো না। দিন সাতেক পরেও হোলোনা দেখে অনিমা ল্যাবে ইউরিন টেস্ট‌ করালো। রিপোর্ট দেখে অনিমার মুখ ঝলমলে। শুনে বিকাশের মনে হোলো, নেট ঘেঁটে, ডায়াগ্ৰাম দেখে ও যে জটিল ব্যাপার বোঝা‌র চেষ্টা করেছি‌ল তার শুরুটা তো ওদের অগোচরে, অনায়াসে‌ই হয়ে গেল। সত্যি প্রকৃতির বিচিত্র লীলা কী বিষ্ময়কর!

    পুনশ্চ:

    ‘বেশ জটিল ব্যাপার’ পর্বে “সচরাচর" শব্দটিতে টীকা নম্বর (১) দিয়েছিলাম। অর্থাৎ কখনো ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বস্ফোটন পর্বে একের অধিক ডিম্বাণু‌ও নির্গত হতে পারে। দুটি সম্ভব - তিনটি বিরল - তার বেশি অতিবিরল ঘটনা।

    ‘সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট’ পর্বে - দুটো ফুলশয্যার প্রেক্ষিতে টীকা নম্বর (২) দিয়েছিলাম। অর্থাৎ যদি দুটি ডিম্বাণু নির্গত হয় তবে দুটি ফুলশয্যাকক্ষে (Zona Pellucida) দুটি ডিম্বাণু‌র সাথে দুটি শুক্রাণু‌র মিলন হবে। সেক্ষেত্রে দুটি জাইগোট থেকে দুটি গর্ভস্থ শিশু (fetus) গর্ভাশয়ে ধারণ করে মা দুটি যমজ শিশু প্রসব করবেন।

    এই প্রক্রিয়ায় যমজ শিশু জন্মালে তাদের বলে Dizygotic Twins - কারণ ডিম্বাণু (ovum) থেকে গর্ভস্থ শিশুর (fetus) - পুরো যাত্রা‌ই আলাদা। তিরিশ কোটি শুক্রাণু‌র ২৩তম ক্রোমোজোমটি (সম্ভাবনার হিসেবে) আধাআধি‌ X বা Y হতে পারে। তাও যদি দুটি ডিম্বাণু‌র সাথে‌ই X বা Y শুক্রাণু‌র মিলন হয় তাহলে দুটিই ছেলে বা মেয়ে হবে। যদি একটি ডিম্বাণু‌র সাথে X এবং অন্যটি‌র সাথে Y শুক্রাণু‌র মিলন হয় তাহলে যমজ শিশু‌দুটির একটি হবে কন্যা, অন্যটি পুত্র। যেমন হয়েছে সুরঞ্জনার ক্ষেত্রে - যারা এই লেখাটির স্ফূলিঙ্গ। এভাবে দুটি‌ই ছেলে বা মেয়ে হলেও তাদের মুখাবয়ব ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কিন্তু অভিন্ন যমজ সন্তানের (Monozygotic Twins) মতো মিল থাকবে না। যদি দুটি যমজ সন্তান ছেলে এবং মেয়ে হয় - তাহলে (অতি বিরল ব্যতিক্রম ব্যতীত) তারা অবধারিতভাবে Dizygotic Twins হবে এবং সেক্ষেত্রে তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য‌ও প্রাকৃতিকভাবে‌ই অনেকটা‌ ভিন্ন হবে।

    যমজ সন্তান জন্মানোর আর একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে - Monozygotic Twins অর্থাৎ একটি ডিম্বাণু ও শুক্রাণু‌র মিলনের ফলে যে যুগ্মাণু সৃষ্টি হয় তার থেকেই একটি শিশুর পরিবর্তে দুটি বা চারটি (Quadruplets) প্রায় অভিন্ন শিশুর জন্ম হতে পারে। কিন্তু এভাবে তিনটি বা পাঁচটি বিজোড় সংখ্যা‌র শিশুর জন্ম হ‌ওয়া অতি বিরল সম্ভাবনা।

    Monozygotic Twins এর ক্ষেত্রে নিষেকের পর যুগ্মাণু ১টি থেকে, ২টি, ৪টি, ৮টি, ১৬টি এভাবে বহু কোষে বিভক্ত হয়ে ক্রমশ পরিণত হতে থাকে। এই প্রাথমিক পর্যায়েই অল্প কিছু ক্ষেত্রে (হাজারে চারটি) যুগ্মাণু হঠাৎ করে দুইটি পৃথক কোষগুচ্ছে বিভক্ত হতে পারে। এটিকে‌ই বলা হয় যুগ্মাণুর বিভাজন (Splitting of Zygote). এভাবে দুটি খণ্ডিত যুগ্মাণু ক্রমশ দুটি গর্ভস্থ শিশুতে (fetus) পরিণত হয় এবং দুটি যমজ শিশুর জন্ম হয়। যেহেতু যুগ্মাণুতেই ভবিষ্যৎ শিশুর সম্পূর্ণ জিনগত তথ্য সঞ্চিত থাকে ফলে একটি যুগ্মাণুর বিভাজনের ফলে জন্মানো দুটি এক‌ই লিঙ্গের অভিন্ন শিশুর মুখাবয়ব ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনেকটা‌ই একরকম হয়।

    যুগ্মাণুর এই বিভাজন যদি নিষেকের দ্বিতীয় থেকে ত্রয়োদশ দিনের মধ্যে সুষ্ঠু‌ভাবে সম্পন্ন হয় তাহলে দুটি ভ্রুণ (embryo) আলাদাভাবে দুটি গর্ভজল থলির (Amniotic sac) আশ্রয়ে দুটি আলাদা গর্ভস্থ শিশু (fetus) হিসেবে গর্ভাশয়ে বেড়ে উঠে নির্দিষ্ট সময়ে দুটি অভিন্ন যমজ সন্তান (identical twins) হিসেবে জন্মগ্ৰহণ করে।

    কিন্তু বিভাজন যদি হয় আরো পরে, তাহলেই সমস্যা। তখন অসম্পূর্ণ বিভাজনের ফলে জন্ম হয় জোড়া-যমজ (conjoined twins) সন্তানের। তেমন জন্ম ঐ দুটি জোড়া-যমজ সন্তান ও তাদের পিতামাতার কাছে হয়ে দাঁড়ায় অত্যন্ত সমস্যাময় ও দুর্ভাগ্যজনক। যদি দুটি শরীরের জোড়ের জায়গা পেট, কাঁধ, কোমর ইত্যাদি non-critical অংশে হয় তাহলে তাদের অপারেশন করে আলাদা করার ঝুঁকি নেওয়া যায়। যেমন নিচের ছবিতে Maria ও Teresa. কিন্তু যদি তারা মাথায় যুক্ত থাকে - তখন অপারেশন করে তাদের আলাদা করা অত্যন্ত ঝুঁকি‌পূর্ণ। যেমন নীচের ছবিতে Ladan ও Laleh Bijani মাথাজোড়া অবস্থায় ২৯ বছর বেঁচে থেকে অপারেশনের অনতিবিলম্বে‌ই মারা যায়। হয়তো তারা এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় অতো দিন বেঁচে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি‌ল তাই অত্যন্ত ঝুঁকি‌ সত্ত্বেও অপারেশনে রাজি হয়েছিল।

    লেখাটির সূত্রপাত হয়েছিল নিছক কৌতূহলে। ক্রমশ নানা জটিলতা‌য় আকৃষ্ট হয়ে চলে গেছি বহুদূরে। কখনো কমিক রিলিফের মতো একটু রসিকতা করে হালকা হতে চেয়েছি। তবে শেষে Conjoined Twins প্রসঙ্গে Ladan ও Laleh বোনদের ছবি দেখে মনটা খুব ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। মনে হোলো যারা নিজেরা মোটামুটি সুস্থ হয়ে জন্মেছে বা যাদের সন্তান স্বাভাবিক হয়ে জন্মেছে তারা নিয়তি‌ বা ঈশ্বরের দয়ায় অশেষ ভাগ্যবান।




     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ৫১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন