এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  অন্যান্য  শোনা কথা

  • কে রবীন্দ্রনাথ ??? 

    সমরেশ মুখার্জী লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | শোনা কথা | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • আমি এখানে যা করেছি, তা আর কিছুই নয়, বিভিন্ন জায়গায় অনুভব করা কিছু ভাস্বর ভাস্কর সত্তার কোলাজ পরিবেশনের প্রয়াস, যা আমার আঁখো দেখা নয়, অন্যের মাধ্যমে জানা। সুনীলের কিছু লেখায় ভাস্কর দত্তকে আমার এক প্রাণবন্ত, বর্ণময় চরিত্র বলে মনে হয়েছে। গুরুতে অমলেন্দু বাবুর আত্মজীবনীতেও ভাস্কর তার আন্তরিক আতিথেয়তা, অফুরন্ত আড্ডা‌বাজ, অথচ সামাজিক‌ভাবে দায়িত্ব‌বান - এমন নানা সত্তায় উদ্ভাসিত। অমলেন্দু‌বাবুর লেখাতেই জানলাম অত্যন্ত সামান্য এক ভুলের ফলে মানালিতে ভাস্করের অকালমৃত্যু‌র কথা। পড়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। সেই মন খারাপে একটু অন্য রকমের প্রলেপ লাগলো সুনীল ও সন্দীপনের কিছু লেখায় ভাস্করের সেই মজারু, মেজাজী রূপ ফিরে দেখায়। তার‌ই কিছু নির্বাচিত, সংক্ষেপিত অংশ পেশ করলাম এখানে।


    ১ - দুরন্ত বালক

    উত্তর কলকাতার টাউন স্কুলে ক্লাস থ্রি-ফোর থেকে আমার সহপাঠী ছিল ভাস্কর দত্ত। কলেজে এসে আমাদের স্ট্রিম আলাদা হয়ে গেল বটে, কিন্তু ভাস্করের সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ রইলো। আমাদের স্কুল-কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একটা দল প্রায়ই আড্ডা দিতে যেতাম ভাস্করের বাড়িতে। ভাস্কর উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির ছেলে। ওদের বাড়িতে একটা বৈঠকখানা-কালচার ছিল। আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা, তর্কাতর্কি চলতো আর মাঝে মাঝেই বাড়ির ভেতর থেকে চা-জলখাবার চলে আসতো।

    পরে আমি কৃত্তিবাস পত্রিকা চালানো এবং লেখালেখির জগতে অনেকখানি চলে আসায় অন্য একটি বন্ধু গোষ্ঠী তৈরি হয়। ভাস্কর এই লেখক-গোষ্ঠীর মধ্যেও মিশে গেল। সে কিন্তু লেখে না। তার ভাষাজ্ঞান ও সাহিত্য জ্ঞান যথেষ্ট। কবিতার প্রতি তার বিশেষ ভালোবাসা আছে, কিন্তু ইচ্ছে করেই সে লেখালেখির লাইনে একেবারেই এলো না। এক সময় ভাস্করের বাড়িটাই ছিল কৃত্তিবাস পত্রিকার অফিস, পত্রিকা ছাপার ব্যাপারে সে বিশেষ উদ্যোগী, কিন্তু কখনো সে নিজের কবিতা ছাপানোর দুর্বলতা প্রকাশ করেনি। সে আমলে বহু তরুণ লেখক-লেখিকা ভাস্করকে বিশিষ্ট বন্ধু বলে গণ্য করতো।

    আমাদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম লন্ডন গিয়েছিলেন শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, উচ্চশিক্ষার্থে। তিনি ফিরে এলেন দু'তিন বছরের মধ্যেই। তারপর দৈবাৎ আমি। আমিও সাত রাজ্য ঘুরে ড্যাং ড্যাং করে ফিরে এলাম এক সময়ে। তখন ভাস্কর বললো, তা হলে আমিও একবার বিলেতটা ঘুরে আসি, ওখানে আমার নামে একটা রাস্তা করে আসবো। এখানকার চাকরি ছেড়ে ভাস্কর চলে গেল লন্ডনে, তারপর কিছুদিন বাদে সে ডেকে নিল উৎপলকুমার বসুকে। এক সময় উৎপলও প্রত্যাবর্তন করলো স্বদেশে, কিন্তু ভাস্করের আর ফেরা হলো না।

    অনেকদিন ভাস্করের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও যেদিন দেখা হয় মনে হয় যেন আগের রাত্রেই এক সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দেবার পর ছাড়াছাড়ি হয়েছিল। উত্তর কলকাতার সেই আড্ডাবাজ মেজাজটি ভাস্করের অবিকল একই রয়ে গেছে। ওদেশের চাকরিতে আগে থেকে বলে-কয়ে না রাখলে ছুটি নেওয়া যায় না। কিন্তু ভাস্কর যে-কোনোদিন বলতে পারে, দূর ছাই, আজ আর অফিস যাবো না। বিলেত-আমেরিকায় পাশ বালিশ বা কোল বালিশ নামে কোনো বস্তু নেই, কিন্তু ভাস্কর পাশ বালিশ, কান-বালিশ, পা-বালিশ নিয়ে শোয়। ইংল্যান্ডে তার প্রায় দু'যুগ কেটে গেল, কিন্তু ওদেশের অনেক নিয়ম কানুনই সে মানে না, মাঝে মাঝে তার মধ্যে থেকে একটা দুরন্ত বালকের রূপ বেরিয়ে আসে।


    ২- ভিক্টোরিয়া কিন্তু মেমসাহেব নয়

    ভাস্করের স্ত্রীর নাম ভিকটোরিয়া। নতুন কেউ দেখা করতে এসে হয়তো বাইরের ঘরে বসে গল্প করছে, ভাস্কর বললো, আমি ভিকটোরিয়াকে ডাকছি। অমনি সেই লোকটি ভাবে, এই রে, এবারে বুঝি একজন মেমসাহেব আসবে, তার সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলতে হবে। আসলে ভিকটোরিয়া বাঙালী এবং হুগলির মেয়ে। ফর্সা ফুটফুটে গায়ের রং বলে তার ঠাকুমা-দিদিমারা তাকে ছোটবেলায় আদর করে রানী ভিকটোরিয়া বলে ডাকতো। ভিকটোরিয়া কখনো কিছু খুব রাগ করে বলতে গেলেও হেসে ফেলতো, আর সেই জন্যই তার অবাধ্য স্বামীটি যা খুশি করার প্রশ্রয় পায়। ভিকটোরিয়া নিজেও চাকরি করে। ভোরবেলা উঠে তাকে অফিস যেতে হয়, তবু বাড়িতে কোনো অতিথি এলে সে অন্তত দশ রকম ব্যঞ্জন না খাইয়ে ছাড়ে না।

    ৩- বাই ডিফল্ট দলনেতা

    প্যারিস থেকে লন্ডনে এসে ভাস্করদের সঙ্গে হৈ চৈ করে কাটানো গেল কয়েকটা দিন। প্যারিসের অসীম রায়ের সঙ্গে ভাস্করের পরিচয় ছিল না, আমাদের সূত্রে যোগাযোগ হলো, তারপর থেকে বেশ কয়েক বছর প্যারিসই হলো আমাদের আড্ডার একটা কেন্দ্র। সেবার রাশিয়া পরিদর্শনের একটা নেমন্তন্ন পেলাম। ভাবলাম, ওদের টিকিটের সঙ্গে সামান্য কিছু জুড়ে দিলেই তো ফ্রান্স ঘুরে আসা যায়। অসীম রায়ের সঙ্গে এর মধ্যে আমার আপনি থেকে তুমি'র সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তাকে সেই মর্মে চিঠি দিতেই সে উৎসাহের সঙ্গে জানালো, ঠিক আছে, চলে এসো, আমি ছুটি নিয়ে রাখবো, গাড়ি করে দূরে কোথাও বেড়াবার পরিকল্পনা করা যাবে। মস্কো থেকে প্যারিসে উড়ে এসে দেখি সেখানে আগে থেকেই ভাস্কর বসে আছে, সঙ্গে তার এক বন্ধু মৃণাল চৌধুরী - বর্ধমানের এক জমিদার বাড়ির ছেলে, এখন লন্ডনপ্রবাসী‌ তবে মৃণালের স্বভাবে একটুও জমিদারি মেজাজ নেই, অতি বিনীত, ভদ্র ও নির্ভরযোগ্য মানুষ।

    কোথায় কোথায় বেড়াতে যাওয়া হবে, সেই নিয়ে অনেক আলোচনা হলো। চারজনের এই দলটির দলপতি কে হবে, তা নিয়ে একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা চললো ভাস্কর আর অসীমের মধ্যে। অসীম গাড়ি চালাবে, নেতৃত্বে তারই অধিকার, কিন্তু যে-কোনো পরিবেশে ভাস্কর তার ব্যক্তিত্ব জাহির করতেই অভ্যস্ত। দেশে থাকতে আমরা যখন ধলভূমগড় কিংবা চাইবাসার দিকে বেড়াতে গেছি, তখন ভাস্করই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলপতি হয়েছে। কিন্তু এখানে মুশকিল এই যে, ভাস্কর ফরাসী ভাষা একবর্ণ‌ও জানে না। ফ্রান্সের রাস্তাঘাট সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা‌ই নেই।

    অসীম নির্দেশ দিল বেরুতে হবে খুব ভোরে, শেষ রাতে উঠে তৈরি হয়ে নিতে হবে সবাইকে। ভাস্কর তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, কেন, অত তাড়া কিসের? আমরা প্লেন ধরতে যাচ্ছি না, কোথাও ঠিক সময়ে পৌঁছোবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। এসেছি আরাম করে বেড়াতে, হুড়োহুড়ি করতে যাবো কেন? ব্রেকফাস্ট ও তিন কাপ চা খেয়ে বেরুবো!’ আমাদেরও সেরকমই ইচ্ছে, তাই প্রথম রাউন্ডেই হেরে গেল অসীম।

    ঠিক হয়েছে যে, প্যারিস থেকে বেরিয়ে আমরা ছোট ছোট রাস্তা দিয়ে গ্রামের পথে যাবো ফ্রান্সের দক্ষিণ দিকে। রাতে যেখানে পছন্দ হবে, সেখানে কোনো হোটেলে উঠে পড়বো। দুপুরবেলা রুটি, মাখন, চিজ, সসেজ, পাতে, ওয়াইন আর কিছু ফল কিনে নিয়ে রাস্তার ধারেই কোনো গাছতলায় পিকনিক হবে। রাত্তিরবেলা কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে টেবিল-চেয়ারে বসে খাওয়া হবে খাঁটি ফরাসী ডিনার।

    পশ্চিম দেশগুলিতে ড্রাইভার ও পাশে যে বসে তাকেও সিট বেল্ট বাঁধতে হয়। আমার অভ্যাস নেই, তাই পেছনে বসেছি। মৃণাল আমার পাশে। ভাস্কর বসেছে অসীমের পাশে। দূরপাল্লার যাত্রায় একজন ন্যাভিগেটর লাগে, ম্যাপ ছাড়া উপায় নেই। ভাস্কর কোলের ওপর একটা ম্যাপ খুলে বসেছে।

    বাঁ হাতের আঙুলের ফাঁকে একটা চুরুট। সেটা জ্বালানো হয়নি। অসীম রায়ের গাড়িতে চাপতে গেলে কয়েকটা নিয়ম মানতে হয়। অসীম যদিও স্মোকার, কিন্তু তার গাড়িতে চলন্ত অবস্থায় কেউ সিগারেট খেতে পারবে না। একবার তার গাড়িতে অতি হাওয়ার বেগে কারুর হাত থেকে সিগারেট ফসকে উড়ে গিয়ে পড়েছিল অন্য একজনের গায়ে। সেই থেকে তার চলন্ত গাড়িতে সিগারেট নিষিদ্ধ। ভাস্কর নিয়মিত ধূমপান করে না, কিন্তু কখনো ব্যক্তিত্ব বাড়াবার জন্য সে হাতে একটা জ্বলন্ত সিগার রাখতে ভালোবাসে।

    খানিক দূর যাবার পর অসীম জিজ্ঞেস করলো, ভাস্কর, দ্যাখো তো ভাই, সাঁ শেরোঁ কোন্ দিকে? ভাস্কর ঝুঁকে পড়ে ম্যাপ দেখতে লাগলো। এক মিনিট যায়, দু' মিনিট যায়, ভাস্কর আর কোনো কথা বলে না। অসীম অস্থির ভাবে বলে, কী হলো? সামনে ক্রশিং আসছে, বলো কোন্ দিকে যাবো? ভাস্কর বলে, ম্যাপে ঐ নামে তো কোনো জায়গা দেখছি না! অসীম ম্যাপটা টেনে নিয়ে একটু দেখে বলে, এই তো। এটা কি? ভাস্কর বলে, এটা তো আগেই দেখেছি। কিন্তু এটা তো সেইন্ট চেরন। অসীম বলে, এটা ইংল্যান্ড নয়। মনে রাখবে, সেন্ট ফরাসীতে হয় সাঁ, আর সি এইচ-এর উচ্চারণ শ। ভাস্কর বলে, আর যেখানে সেখানে একটা করে চন্দ্রবিন্দু বসিয়ে দিলেই হয়, তাই তো! অসীম ভাস্করের দিকে করুণার চোখে তাকালো। যেন ভাস্কর একটি অবোধ শিশু!

    একটু পরে সিগারেট খাওয়ার জন্য গাড়ি থামতে ভাস্কর বলে, আমি পেছনে বসবো, মৃণাল ভালো ন্যাভিগেটর হতে পারবে! পেছনের সিটে আসা মানে নেতৃত্বপদ থেকে ভাস্করের স্বেচ্ছায় অবতরণ। তাই হয়তো আধ ঘন্টাটাক মন-মরা হয়ে রইলো ভাস্কর। তারপর হঠাৎই আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলো তার ব্যক্তিত্ব। বাইরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাস্কর বলে, বাঃ, এই জায়গাটা বেশ সুন্দর তো! দারুণ সবুজ! অসীম, আমরা এখানেই কোথাও থেমে দুপুরের খাবার খাবো! অসীম বলে, আর একটু এগিয়ে যাই, সামনে আরও ভালো জায়গা পাওয়া যাবে! ভাস্কর বলে, এই জায়গাটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এখানে‌ই গাড়ি থামাও। ঐ তো সামনেই একটা খাবার-দাবারের দোকান আছে দেখতে পাচ্ছো না! খানিকক্ষণ তর্ক-বিতর্কের পর অসীমকে মেনে নিতেই হলো, ভাস্করের জয় হলো।


    ৪- বীরের ভঙ্গিতে ভাস্কর

    ফ্রাঙ্কফুর্টের বিশ্ব বইমেলা সাঙ্গ হতে বাদল (আনন্দ‌বাজারের বাদল বসু) ও আমি চলে এলাম হাঙ্গেরিতে। ইউরোপে আমাদের দুই ভ্রমণসঙ্গী ভাস্কর দত্ত ও অসীম রায়। এর আগে আমরা এক সঙ্গে অনেক ঘুরেছি। এবারেও খবর পেয়ে ওরা দু'জন ছুটি নিয়ে চলে এলো হাঙ্গেরিতে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে। অসীম অনেক কিছু জানে, তার স্বভাবটা সাবধানী ধরনের। ভাস্কর অতিশয় এলোমেলো ও বেপরোয়া। এই দুই পরস্পর-বিরোধী চরিত্রের জন্য আমাদের ভ্রমণ-আড্ডা খুব জমে যায়।

    বুডাপেস্ট এয়ারপোর্টে আমাদের রাঁদেভু। অসীম ও ভাস্করের প্যারিস ও লণ্ডন থেকে আলাদা ফ্লাইটে আসবে। বাদল ও আমি যথা সময়ে পৌঁছে গেলাম, ভাস্করের আরও আগে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার দেখা নেই। খোঁজ নিয়ে জানলাম, লণ্ডনের ফ্লাইট এসে গেছে বটে, কিন্তু সেটা অন্য এয়ারপোর্টে। সেটা এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে। প্যারিসে যেমন ওর্লি আর শার্ল দ্যগল নামে দুটি এয়ার পোর্ট আছে, এখানেও সেইরকম। তা হলে ভাস্করের সঙ্গে যোগাযোগ হবে কী করে?

    আমরা রাত্তিরে কোথায় থাকবো তা ভাস্কর জানে না, এই অচেনা শহরে একবার যোগাযোগ হারিয়ে ফেললে খোঁজ পাওয়া খুব মুশকিল হবে। তবু আমার মনে হলো, ভাস্কর কিছু একটা ব্যবস্থা করবেই। অসীম পৌঁছে গেল প্যারিস থেকে আমাদেরই এয়ারপোর্টে, যথা সময়ে। তারও খানিক বাদে ভাস্কর এলো বীরের ভঙ্গিতে, প্রথমে দুই এয়ারপোর্টের ব্যাপারটা সেও বুঝতে পারেনি বটে, তারপর সে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে। এই শহরের অনেক কিছুর হদিশ জেনে নিয়েছে।

    ৫- উৎকোচ প্রদাণের উৎকৃষ্টতা

    হাঙ্গেরি থেকে আমরা রুমানিয়া যাত্রা করলাম বিখ্যাত ট্রেন ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে। বহু গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে, সিনেমা তৈরি হয়েছে এই ট্রেন নিয়ে। নাম ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস হলেও এই ট্রেন অবশ্য প্রাচ্যের মধ্য দিয়ে যায় না, লন্ডন থেকে যাত্রা করে ইওরোপের অনেকগুলি দেশ পেরিয়ে ইস্তামবুলে এসে প্রাচ্যের এক প্রান্ত ছোঁয় শুধু। ইস্তামবুল শহরটিরও অর্ধেক ইওরোপে। আমরা চারজন টিকিট কেটেছিলাম সেকেন্ড ক্লাসের। আন্তর্জাতিক যাত্রা হিসেবে ভাড়া খুবই শস্তা। আর একটু আরামদায়ক ক্লাসের টিকিট কাটার সাধ্য থাকলেও আমাদের স্বভাবই তো সস্তা খোঁজা। রাত ন'টা থেকে পরের দিন দুপুর পর্যন্ত থাকতে হবে ট্রেনে। ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের গৌরবের দিন আর নেই। তাছাড়া গল্প-উপন্যাসগুলি উঁচু ক্লাসেই ঘটে।

    আমরা যে-বগিতে উঠলাম তাতে বেশ ভিড়। যে কুপেতে আমাদের স্থান হলো, সেটি থ্রি-টিয়ার, কিন্তু ছ'জন মানুষ শুলে সেখানে মালপত্র রাখার জায়গা থাকে না। তাছাড়া ওপরের বাংক বেশ ছোট, লম্বা মানুষের অনুপযুক্ত। আমাদের দেশের ট্রেনের তুলনায় বেশ খারাপ। আরও দু'জন লোক এলে আমাদের চারখানা সুটকেস কোথায় রাখা হবে, এই চিন্তায় আমরা যখন বিচলিত তখন ভাস্কর একটা উপায় বার করে ফেললো।

    প্রথমে সে কন্ডাকটরকে বোঝাবার চেষ্টা করলো যে এইটুকু কুপেতে ছয়জন মানুষ যাবে কী করে? কন্ডাকটর বলে, এখানে তো ছ'জনেরই রিজার্ভেশান, অন্য দু’জন এলে জায়গা তো দিতেই হবে। ভাস্কর বলে, অন্য কুপেতে যদি সিট খালি থাকে, সেখানে তাদের চালান করে দেওয়া যায় না? আমরা চারজন এক সঙ্গে আছি...। কন্ডাকটর মানতে চায় না। তখন ভাস্কর একটা একশো ফোরিন্টের নোট এগিয়ে দিল তার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিকের মতন কাজ হলো। কন্ডাকটরটি অল্প বয়েসী যুবক, অত্যন্ত সুদর্শন, শুট-টাই পরা নিখুঁত পোশাক, চিত্র-তারকা হলে তাকে বেশ মানাতো, মাত্র একশো ফোরিন্ট (তিরিশ টাকা) পেয়ে তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সে জানালো কোনো চিন্তা নেই, আমাদের কুপেতে আর কেউ ঢুকবে না, সে আমাদের যে-কোনো সাহায্য করতে প্রস্তুত। সে নিজে ধরাধরি করে আমাদের ভারী ভারী সুটকেস তুলে দিল ওপরের বাংকে।

    সুষ্ঠুভাবে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবার পর ভাস্করের ঈষৎ গর্বিত মুখের দিকে চেয়ে অসীম ভর্ৎসনার সুরে বলে, ভাস্কর, তুমি কোন্ সাহসে লোকটিকে ঘুষ দিতে গেলে? আমি তো ইওরোপে কোনো লোককে এইভাবে ঘুষ দেবার কথা চিন্তাই করতে পারি না। ভাস্কর বলে, মানুষের চরিত্র স্টাডি করতে হয়। সে ক্ষমতা তোমার নেই। এ ছেলেটার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলেই বুঝে গেছি, এর লোভ আছে। দেখলে না, টাকাটা কী রকম খপ করে নিল!

    আমিও এই প্রথম এত সাবলীলভাবে ঘুষের ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করলাম। এমন সুসজ্জিত, সুদর্শন যুবকটি যে এই সামান্য কটা টাকার জন্য ব্যগ্র হবে, এ যেন কল্পনাই করা যায় না। ভাস্কর যখন নোটটা বাড়িয়ে দিল, তখন আমার‌ও বেশ ভয়ই করছিল, যদি সে উল্টে আমাদের অপমান করে।

    ৬- কে রবীন্দ্রনাথ ???

    সোহো স্কোয়ারে ## এক প্রস্টিটিউট আমার বন্ধু ভাস্করকে জিজ্ঞেস করেছিল, “সো ইউ কাম ফ্রম দা ল্যাণ্ড অব টেগোঅর?” ভাস্কর বাও করে বলেছিল, “বেগ ইঅর পার্ডন?” “সো ইউ কাম … টেগোঅর?” সে আবার পুরোটা বলে। মাথা নিচু করে কপালে গুনে গুনে দশটা টোকা মেরে তারপর ঝট করে মাথা তুলে ভাস্কর জিজ্ঞেস করেছিল, “ওয়েল? হু ইজ হী?” বজ্জাতি করেছিল।

    গত বছর একদিন একজন প্রগতিশীল বা সাম্যবাদী কবির সঙ্গে দক্ষিণমুখী টু-বি বাসের আপার-ডেকে দেখা। উনি বললেন, “সাজ্জাদ জাহির আসছেন অমুক দিন, রণজি ইনডোরে। আসছ ত?” কে সাজ্জাদ জাহির? আমি জিজ্ঞেস করি নি। হয়ত ভাবতেন বজ্জাতি করছি। সাজ্জাদ জাহির কিন্তু একজন নামকরা লোক, পরে জানতে চাওয়ামাত্র জানতে পারলুম, উনি একজন সাম্যবাদী বা প্রগতিশীল লেখক। মস্কোয় ভারতীয় লেখকদলের নেতৃত্ব করেছিলেন। যেমন, পি লাল আর কী। পি লাল-কে আবার জিজ্ঞেস করে বসবেন না যেন।

    ভাস্কর ইয়ার্কি করেছিল। ইয়ার্কিরই সম্পর্ক! কেননা কোন শালা বলতে পারে - কে উত্তমকুমার? ফিল্মিণ্ডিয়া কাগজে নার্গিসের পদ্মশ্রী-অনুষ্ঠানের বিস্তৃত বিবরণ ছাপা হয়েছিল। ইনট্রোডিউস করিয়ে দেবার সময় আন্ডার সেক্রেটারি শুধু নাম করেই চুপ করে গিয়েছিলেন। নেহেরু তার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকান। অর্থাৎ, কে? আরও বল! ভদ্রলোক তখন বাকিটা বলেন। তারপর নার্গিস বলেন, “পণ্ডিতজি আমাকে চিনতে পারলেন না, কিন্তু ওনার বাবা, লেট মতিলাল নেহরু আমার মা জদ্দনবাঈকে ভালই চিনতেন।”

    তেমনি রবীন্দ্রনাথ। সবাই জানে কে। কিন্তু কর্ণপুর কী? বা কে? কেউ বা অনেকেই জানে না। অথচ এক প্রফেসর-দম্পতি দেখেছিলুম। স্বামী আমাকে একটা থান ইট দিলেন, উপহার হিসেবে, ‘কবি কর্ণপুর ও তৎকালীন বাঙলা কাব্য', যা লিখে উনি ডক্টরেট পেয়েছেন। বইটাতে খালি ফুলস্টপ দেখলুম — কমা, সেমিকোলন, লিডার (...), ড্যাস এ-সব নেই বললেই চলে, সম্ভবত তার বদলে রয়েছে তথ্যাশ্রয়ী, তত্ত্বাশ্রয়ী, চৈতন্য, সত্তা, নিরঞ্জন, সূর্য, অভিব্যঞ্জনা, উচ্চকোটি — এইসব। খবরের কাগজে যেমন থাকে সমষ্টিউন্নয়ন, ত্রিপাক্ষিক কমিটি, জাতীয় সংকট বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা।

    এঁর সঙ্গে আলাপ করে দেখেছিলুম। ইনি “রূপনারানের কুলে জেগে উঠিলাম"- কে কবিতা বলে মনে করেন না (“পিওর প্রোজ!"), রবীন্দ্রনাথের ছবি তাঁর অন্ধকার দিককে তুলে ধরে বলে মনে করেন, পঁচিশে বৈশাখ জোড়াসাঁকোয় যান। ভোরে ভৈরবী ও সন্ধের ঝোঁকে পূরবী শোনেন। ‘সো মোই কান্তা, দূর দিগন্তা' সম্পর্কে ইনি লিখেছেন দেখলুম ‘অবিনাশী কবিত্ব’। আমার বন্ধু সুনীল খুব স্মার্ট লেখে। ‘গোটা চর্যাপদে গোয়েন্দা লাগিয়েও কবিতা খুঁজে পাই নি, - সে লিখেছিল।

    ডক্টর এটা পড়েন নি মনে হয়, এইসব। পড়লেও ইগনোর করেছিলেন। কেননা, তাহলে ত, মানে যদি চর্যাপদ তথা কর্ণপুরে কোনও কবিতা না থেকে থাকে, তা হলে কিছু অপরিচিত লোক এসে একদিন, “কর্ণপুর যখন কবিই নয় তখন আর এ-সব কেন,” বলে তাঁর ফ্রিজ, টেলিফোন, বাথরুম, বেডরুম, উড়ন্ত-পরদা এ-সবই খুলে নিয়ে যেতে পারে। গাড়ির ট্যাঙ্ক থেকে পেঁপের ডাঁটা দিয়ে চুষে নিতে পারে পেট্রল। 'নারীকেও নিয়ে যায়.....' সুনীলের কবিতায় পড়েছিলুম - ও হো। হয়ত সংবিধানগত কারণে তা ওরা পারে না। দেওয়ালে ঝোলা ফ্রেমে বাঁধানো ডক্টরেট ডিগ্রি‌টা অবশ‍্য তারা ছুঁয়ে‌ও দেখবে না। তবে একটা কথা ঠিকই, 'কর্ণপুর কোনও কবি নয়, আসলে কানপুর', এটা স্বীকার করা ওঁর পক্ষে বড় ব্যয়সাধ্য। কারণ, তাহলে,



    অন্তত এই বোধ নিশ্চিত ছেড়ে চলে যাবে প্রফেসরকে। তাই - তুলনামূলকভাবে যাঁরা রবীন্দ্রকাব্য পরিক্রমা করে চলেছেন - তাঁরা খানিক নিশ্চিন্ত।


    টীকা:-

    ১ থেকে ৫ - সুনীলের কিছু লেখার নির্বাচিত, সংক্ষেপিত অংশ।

    ৬ - শিরোনাম সমেত পুরোটাই সন্দীপনের রচনা যেখানে শুধুমাত্র শুরুতেই উপস্থিত ভাস্কর, তাই কেবল সেটুকু রাখলে‌ই চলতো - কিন্তু পুরোটাই রাখলাম, সন্দীপনের অনুকরণীয় রচনাভঙ্গির জন্য।

    ## Founded in 1661 (one year after the restoration of the monarchy) Soho Square is a garden square in Soho, London, hosting since 1954 a de facto public park led by the Soho Square Garden Committee of Westminster City Council. It was originally called King Square after Charles II. During the summer, Soho Square hosts open-air free concerts. Of its 30 buildings (including mergers), 16 are listed having statutory recognition and protection.
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • অন্যান্য | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন