প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক রোগ হচ্ছে হাম, আর এই হামে এখন পর্যন্ত ২৫০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে! এইটা একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা। যদি দৈব ঘটনা হত তাহলে একে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু সত্য বড় নির্মম, এইটা কোন দৈব ঘটনা না। এর পিছনে আছে অভাগা জাতির দুর্ভাগ্য, আছে স্বেচ্ছাচারিতা, আছে অবহেলা, আছে মূর্খতা, আছে দাম্ভিকতা। আর এই কারণেই এই জিনিস মেনে নেওয়া কষ্টকর। শিশুর নিথর দেহ নিয়ে যখন বাবা মায়ের বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে তখন ঘেন্না আসে সেই সব মানুষদের জন্য যারা এর পিছনে দায়ী।
কেন এমন হল? এমন দিন আসল কারণ হচ্ছে শিশুদের টিকা নিয়ে রীতিমত ফাইজলামি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কোন অজ্ঞাত কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সকল যন্ত্র ধরেই নিয়েছিল আগে যা করা হয়েছে সব খারাপ, প্রতিটা পদক্ষেপ খারাপ, বিচার খারাপ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন খারাপ, বইপত্র খারাপ, বিচার খারাপ এবং এই টিকা কেনাও খারাপ! ফলাফল আমরা দেখেছি এমন সব অবিশ্বাস্য কাণ্ড যা কোন সভ্য দেশে হতে পারে না। সাজাপ্রাপ্ত আসামি জেল থেকে মুক্তি পেল, জঙ্গি সরদার হাসতে হাসতে ফুলের মালা নিয়ে মিছিল করে চলে গেল! একই ফর্মুলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের যে টিকা কেনার পদ্ধতি তা বাতিল করে দিল। আগে টিকা কেনা হত ইউনিসেফ মাধ্যমে। গাভি (GAVI) আর বাংলাদেশ সরকার মিলে এই টিকার খরচ দিত। শিশুর জন্মের পরে টিকা দেওয়া হয় এবং প্রতি চার বছর পর পর একটা বিশেষ ক্যাম্পেইন চালিয়ে আবার সবাইকে হামের টিকা দেওয়া হয়। নোবেলজয়ী সরকারের আমলে দেওয়ার কথা ছিল সেই বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা দানের সময়। ক্যাম্পেইন তো পরে, সাধারণ ভাবে যে টিকা দেওয়া তাও দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ তাদের মনে হয়েছে এমন করে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনে লীগ সরকার, নিশ্চয়টি কোন ঘাপলা আছে। তাই তারা উম্মুক্ত পদ্ধতিতে টিকা কিনবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।
আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণা-ভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্সের বরাদ দিয়ে ডেইলি স্টার লিখেছে যে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সেই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে বলেছিলেন, "দয়া করে… ঈশ্বরের দোহাই, এটা করবেন না,” কিন্তু না, তার কথায় কাজ হয়নি। সরকার কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই টিকা কেনা বাতিল করে। এবং দরপত্র আহবানেও দেরি করে। যতদিনে দরপত্রসহ নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শেষ হতে যায় ততদিনে দেশ টিকা শূন্য হয়ে যায়। এই ঘাটতি আর পূরণ হয় না, এখন পর্যন্ত না! এবং এত বড় একটা নির্মম ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিকার থেকে যায় সেই সময় সরকার। মানুষ এর কথা জানা শুরু করে যখন শিশু মৃত্যু শুরু হয়। মানুষ বিশ্বাসই করতে পারছে না হামের মত রোগে প্রাণ যাচ্ছে প্রাণের চেয়ে প্রিয় সন্তানের!
নির্বাচিত সরকারেরও যে এইটা নিয়ে খুব একটা হেলদোল ছিল তেমন বলার পায় নাই। তারা সংসদে তুমুল তর্ক করায় ব্যস্ত দেশকে মুক্তিযুদ্ধর নামে বিভাজন করা যাবে কি না তা নিয়ে, ব্যস্ত জুলাই সনদ নিয়ে, ব্যস্ত জামাতের আমিরকে কচালাকচলি করতে! এরপরে যখন শিশু মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেল তখন প্রধানমন্ত্রী মুখস্ত বলে দিল এর দায় অন্তর্বর্তী সরকার ও আগের লীগ সরকারের! ব্যাস, এরপরে আবার শুরু হল সংসদে কমেডি ক্লাবের কার্যক্রম! তারেক রহমান ভুলটা করেছে এমন একটা দায় লীগকে দিয়ে যা আসলে লীগের সাফল্যের পালক। লীগ সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে মোট তিনবার আন্তর্জাতিক পুরস্কার পায় টিকা দানের সাফল্যের জন্য! ২০১৯ সালে পায় ভেকসিন হিরো পুরস্কার! এর আগে ২০০৯ ও ২০১২ সালে পায় বেস্ট পারফরমেন্স এওয়ার্ড! টিকা দানের কর্মসূচি বাংলাদেশের কর্মসূচিকে মডেল বলা হত। এইটা ছিল গর্বের বিষয়। এই অর্জন একদিনে হয়নি। দশকের পর দশক ধরে যা অর্জন করা হয়েছিল — দেড় বছরের অব্যবস্থাপনা সেটাকে ধ্বংসের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে। এবং এর মূল্য দিচ্ছে শিশুরা — যারা কোনো রাজনীতির অংশ না। ইউনুস প্রেমীরা এরপরেও ইউনুসের প্রতি প্রেম জারি রেখেছে, বিশ্বাস হয়?
শুধু যে হামের টিকা তা না। ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হত নিয়মিত, তাও বন্ধ। হাসপাতালে সঙ্কট আছে সাপে কামড়ের ভেকসিনের, আছে জলাতঙ্কের ভেকসিনের! যক্ষ্মার ওষুধ নাই, জন্ম নিয়ন্ত্রণের যে সরঞ্জাম সরকার সরবরাহ করত তাও নাই। পুরো একটা সিস্টেম ভেঙে ফেলার কারণে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে টিকাদানের হার ছিল ৯০% উপরে সেখানে ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। আপনি না বুঝে শুধু মাত্র গাওজরামি করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনার সিদ্ধান্তের খেসারত দিচ্ছে হাজার হাজার শিশু।
আমার যতদূর জানা আছে তাতে লীগ সরকারও বের হয়ে আসতে চেয়েছিল এই সিস্টেম থেকে। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ছিল। ধীরেধীরে বের হয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছিল। অযোগ্যদের হাতে ক্ষমতা গেলে কী হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে রইল ইউনুস সরকারের ১৮ মাস!
পুরো সময়টা এরা ব্যস্ত ছিল শো অফের ব্যস্ততায়। নানা ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। প্রতি নিয়ত শাওয়া মাওয়া ছিঁড়ে ফেলতে চাওয়া এক তরুণ তুর্কিকে কে গুলি করে মেরে ফেলছিল, তাকে রাতারাতি হিরো বানানো হয়। লাখো মানুষ আসে তার জানাজায়। অথচ এই ছেলে মুক্তিযুদ্ধেই বিশ্বাস করত না, বিশ্বাস করত ভারতের ষড়যন্ত্রে দেশ ভাগ হয়। রাজাকার কাদের মোল্লার জন্য তার আহাজারির ভিডিও অনলাইনে সয়লাব। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে দিয়ে এসেছে আওয়ামীলীগের নেতারা এই সব ছিল তার বক্তব্য। একেই নায়ক বানায় তারা! এমন নানা আজাইরা কাজে ব্যস্ত থেকেছে। আমেরিকা থেকে ফর্মুলা এসেছে তারা তা শুধু পালন করে গেছে। অবিশ্বাস্য চুক্তি করেছে একটা যা নিয়ে আলদা করে লেখার ইচ্ছা আছে বলে এখানে আর লিখব না। আমেরিকার ফর্মুলার নমুনা একটা দেই, ক্ষমতা ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউনুস সরকার একটা প্রজ্ঞাপন জারি করেন। তাতে বিদেশি কোম্পানিকে দেশের শ্রমিকদের তাদের লাভের ৫% প্রণোদনা দেওয়ার যে আইন ছিল তা বাতিল করে ১.৫% নামিয়ে আনা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে এতে লাভ কার?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।