

অলংকরণ: রমিত
বাবাকে আর কাছে রাখা যাচ্ছে না।
কল্পনা ধপ করে বসে পড়ে বললো।
অণিমা মাসির মুখচোখ প্রচন্ড ফোলা। শরীরও। মোটা নয়। ফোলা। খুব পাতলা সুতির শাড়ি ছাড়া পরতে পারে না, শরীরের ওজন এবং আয়তনের কারণে।
বটগাছে অজস্র পাখির কলকাকলি। কাকেরও।
আনোয়ারার পোশাকে পাখির মল পড়ার পরে হেসে গড়িয়ে পড়া মেয়ের দল গবেষণা করতে বসে, পাখিটা হিন্দু ছিল, না মুসলমান। আনোয়ারার মুখে হাগলে নিশ্চয়ই হিন্দু পাখি।.অণিমামাসির মুখে হাগলে মুসলমান।
দুজনেই গাছতলায় বসে একটিপ ঘুম দিয়ে নেয় কাজের ফাঁকে।
গাছের চারধার বাঁধানো হয়েছিল তিনযুগ আগে। এখনো সেটা অবশিষ্ট আছে।
কেউ দুবাড়ি, কেউ তিনবাড়ি, কেউ কেউ আবার পাঁচবাড়িও করে। যাতায়াতের পথে বটগাছতলাতে বসা। বড় গাছ এই তল্লাটে আর নেই।সবেধন নীলমণি। পাশেই নির্মল জলাধার। পাড়ার কমিশনার বানিয়ে দিয়েছে। মেয়ে বৌরা অনেকেই সঙ্গে জলের দু তিনটে বোতল বা জ্যারিকেন রাখে। বাড়ি ফেরার পথে খাওয়ার জল নিয়ে ফেরে।
কল্পনা রোগা। দোহারাও বলা যেতে পারে। তবে শক্ত, পেটানো শরীর। শাড়ি পরা ছেড়ে দিয়েছে। চারশো টাকার কুর্তা পাজামা যখন তিনশোতে পাওয়া যায়, তখন একসঙ্গে অনেকগুলো কিনে নেয়। বছর ভর চলে। নিজেরও, মেয়েরও। তবে মেয়ে এখন মোবাইল দেখে দেখে সালোয়ার কুর্তা আর পরতে চায় না। জিনস পছন্দ। টি শার্ট। কিনেও দিয়েছে কল্পনা।
জিনস আর টি শার্ট। আল্পনা মন্ডল। কেয়ার অব কল্পনা প্রামাণিক। বাবা পরেশ মন্ডল। নিখোঁজ হয়েছে বারো বছর আগে। আল্পনার ভাই বিকাশের জন্মের ঠিক পরপর।
আল্পনা মন্ডলের জিনস আর টি শার্ট পরা কল্পনা প্রামাণিকের বাপ সহ্য করতে পারেনি। বাপের ভীমরতি ধরেছে। নব্বই পার করে কেউ সতেরোটা লুচি পুরি খায়? কল্পনা গাছতলে বসে হাঁপায়। যে বাড়িতে রান্না করে দুবেলা, সেটা পাঁচতলাতে। দুদিন হল লিফ্ট খারাপ। হাঁটুর ব্যথার জন্য নামতেও কষ্ট। কাশি ওঠে যখন তখন।
অণিমা মুখ বাড়িয়ে কল্পনার মাথায় জলের থাবড়া দেয়।
বাবা কি করেছে রে?
বেটিকে মেরেছে। কুরকুরে খেতে না করেছিল, হাতের কাছে লাঠি ছিল, লাঠি দিয়ে মেরেছে।
নব্বই উর্ধ বুড়ো কুরকুরে খাচ্ছে, না খেতে দিলে মেরে ধরে একাকার করছে, আর মুখ তো নর্দমা।
দৃশ্যটা ভেবে অণিমা মাসি একটু হাসল।
তোর বাপকে ভাইরা দেখে না কেন?
ইইইহ!, ভাই দিদিরা সব গেস্ট গো। কেউ বাবাকে রাখবে না।আমার ঘাড়ে ফেলে সব ভেগেছে। আর যা মুখ বাবার! কোন ছেলের বৌ সহ্য করবে? নোংরা,নোংরা একেবারে।
খাবে, পেট ছাড়বে, কাপড় নোংরা করবে..সব আমার আর আমার বেটির ঘাড়ে।
শ্যামলী দুবাড়ির ঠিকে সেরে এসে বসেছে। কল্পনার বাড়ির কাছেই বাড়ি। শ্যামলীর ঠিক পাশে মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছিল আনোয়ারা। একটু আগেই তার গায়ে পাখির হাগা নিয়ে হাসি রসিকতা হয়েছে। শ্যামলী তার গায়ে একটা ঠেকা মেরে বললো, আর হাঁ করে ঘুমাস না। এরপর মুখে পড়বে।
আনোয়ারা চোখ পিটপিট করে দেখলো কল্পনা হাতমুখ নেড়ে বাপের শ্রাদ্ধ করছে। শ্যামলী মুখ বেঁকিয়ে নিচুস্বরে আনোয়ারার কানে কানে বললো, আর বাপ যে তোর জোয়ান বয়সে তোকে আগলে রাখল, তার কি? বর ছেড়ে যাবার পর যদি বাপ সঙ্গে না থাকত, তাহলে শেয়ালে টেনে নিয়ে যেতো। এখনও যে ছেলে মেয়ে ছেড়ে কাজে যেতো পারিস, বুড়ো বাপ আছে বলেই তো। একটু নাহয় মুখখিস্তি করে।
আনোয়ারা ভোর চারটে থেকে উঠে ঘরের কাজ করে। সত্যি বলতে এসময়টা তার টেনে ঘুম পায়। রান্নার কাজ করে বটগাছতলায় এক ঘুম দিয়ে সে বাড়ি ঢুকবে। কারণ বাড়িতে ঘুমাবার সময় নেই। তার তিন মেয়ের কেউ জিনস পরার কথা ভাবতেই পারে না। হিজাব পরতেই হবে মেয়েদের। আনোয়ারা একটাই বাড়িতে কাজ করে। এখানে মুসলমানের বাড়িতে মুসলমান কাজ করবে, এরকম স্বতঃসিদ্ধ আছে। হিন্দু লোকালিটিতে আনসারুলের ফ্ল্যাট। অনেক কষ্টে বেশি টাকা দিয়ে আনোয়ারাকে পেয়েছে।
আনোয়ারা দেখল কল্পনা হাতমুখ নেড়ে অনেককিছু বলছে। সে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকল। কাশ্মিরে গন্ডগোল হয়েছে পর থেকে এ পাড়াতে কাজ করতে আসা নিয়ে টেনশন চলছে। তমরেজ চেঁচাচ্ছে, শাশুড়ি চেঁচাচ্ছে, কেন, মুসলমান পাড়া নাই?
আছে। মুসলমান পাড়া আছে। কিন্তু আনসারুল মোটা টাকা দেয়। তার বৌ ফিরোজা অনেকটা টানে আনোয়ারাকে। চাকরি করা বৌ। আনোয়ারার হাতে মাঝেসাঝে একশো, দুশো একস্ট্রা দিয়ে দেয়। সাবান, পুরোনো চুরিদার, এটা ওটা।সব বাড়িতে এতটা পাওয়া যাবে না। তাছাড়া খাওয়া দেয়।
কান খাড়া করে শুনলো আনোয়ারা।
কল্পনার গলার স্বর চেরা। বাপকে নিয়ে অশান্তি। বাপের মেজাজ নিয়ে অশান্তি। নব্বই বছর বয়স পার হয়ে গেল, এখনো কী নোলা, কী নোলা! শালা শুধু খেতেই থাকছে, খেতেই থাকছে..
খাওয়ার কথায় অণিমামাসি চড়বড় করে উঠল। ইদানীং তারও খুব খিদে পায়। লুচি, পরোটা, মিষ্টি জিনিস খুব টানে। ঝাল ঝাল করে রাঁধা মাংস। পাঁঠা হলে ভালো। কিন্তু পেট ছেড়ে দেয় খুব সহজ। তখন আবার আর এক জ্বালা। পেট ছাড়লো তো ছাড়লোই। ছেলে ছেলের বৌ রেগে যায়। সারাদিন বাথরুম আটকে বসে থাকলে চলবে?
যুদ্ধ নাকি লেগেই গেল?
সীমী একটু বাইরের খবর, দুনিয়ার খবর বেশি রাখে। কাজের বাড়িতে খবরের কাগজে চোখ বোলায়। টিভিতে খবর শোনে।
কাশ্মীরে লোক মরেছে। হিন্দু লোক।.তাই অপারেশন সিনদুর চলছে। সিনদুর মোছার বদলা গো।
আনোয়ারার চোখ এমনিতেই একটু ফোলাফোলা।.ঘুমিয়ে আর একটু ফোলা লাগছে। তার মাথায় এসব কথা তেমন কিছু ঢুকছিল না।
সীমী চোখ বড়বড় করে যুদ্ধের কথা বলে চলেছিল। ইন্ডিয়ার প্লেন। পাকিস্তানের প্লেন। বর্ডার।সাইরেন..সব সীমী জানে।
নন্দবালা উঠে পড়লো। বিশ্রাম শেষ। তৃতীয় বাড়ির রান্নাতে যাবে। সে বাড়িতে শুধু বুড়ো বুড়ি। রিটায়ার্ড। দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে। জলখাবারে দৈ খৈ খায়। বা দুধ মুড়ি কলা। বুড়ি টুকটাক সব্জি কেটে লাখে। নন্দবালা এগারোটার দিকে গিয়ে রান্না চাপায়। একটা ডাল, শাক, একটা সবজি, মাছের ঝোল। ব্যস। নন্দ চুল মুড়িয়ে খোঁপা করতে করতে ভাবল, যুদ্ধ হলে বুড়ো বুড়ির কী হবে? ছেলে তো থাকে পাঞ্জাবে। মেয়ে দুবাইতে। কেউ তো আসতে পারবে না। এদের বাজার হাটের হবে কি? করোনার সময় যা দুর্দশা হয়েছিল। তার বর সকালেই বলেছে বেশি করে চাল আর আলু কিনে রাখতে।
সীমী যুদ্ধ থেকে এবারে সিনেমার গানে ঢুকছে..সন্দেশে আতে হ্যায়, সন্দেশে যাতে হ্যায়. অণিমামাসি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, সন্দেশ খেতে দেয় নাকি ক্যাম্পে?
সানি দেওল বা সুনীল শেঠি হাঁ করে সন্দেশ খাচ্ছে ভাবতেই মেয়েরা হেসে গড়িয়ে পড়লো।
এ সন্দেশ সে সন্দেশ নয় গো মাসি...এ হল চিঠি। অণিমা মুখ ভ্যাচকালো।
কল্পনা টিফিন বাটি বার করে একগাল মুড়ি চানাচুর সবে মুখে ফেলেছে কি ফেলেনি, সাবিত্রী হুড়মুড় করে ছুটে এলো..একেবারে পাকা খবর। মিউনিসিপালিটি থেকে গাছ কেটে ফেলবে। বটগাছ কাটা পড়বে।
মূহূর্তে হাসিগুলো সব থেমে গেল। কেউ আর কথা বলে না।
নির্মল জলাধারের পাশে এই পুরোনো বটগাছ। কত বছরের পুরোনো, তা এই কাজের মেয়েরা কেউ বলতে পারবে না।পাড়ার লোকেও না। এখন আর কেউ গাছের ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামায় না।
সবার মন খারাপ। গাছের তলে এসে বসা, বাড়ি বাড়ি কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম, ঘুম, হাসি ঠাট্টা, ইয়ার্কি, ফাজলামি...এমনকি ঝগড়াঝাটি পর্যন্ত, এসব কি হবে তাহলে? কোথায় যাবে তারা।
পিচ রাস্তার দুপাশে সারি সারি বহুতল। সামনে সামান্য একটু ঘাসের ফালি, গাড়ি দাঁড় করানো, বছর পাঁচ ছয় আগে লাগানো কিছু গাছ নির্জীব ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু খেলার মাঠ, যেটাকে ইদানীং রেলিং টেলিং দিয়ে ঘিরে পার্ক বলা হয়, তার ডাইনে মোড় ঘুরতেই এই ঠাকুদ্দা বটগাছ। পাড়ার লোকে তাই বলে। বৃদ্ধ। প্রাচীন। প্রচুর ডালপালা ছড়িয়ে, ঝুরি নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির নাম ঠাকুদ্দা বট।
গাছের আবার নাম হয় বুঝি? গাছ তো গাছ। ঝুমি বড় বড় চোখ মেলে ওপর দিকে তাকালো। পাতায় আকাশ ঢাকা। একেবারে হাড় জিরজিরে রোগা ঝুমি। কন্ঠার হাড় ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। বৌদি অবশ্য বলে, কপাল করে এরকম কলার বোন পেয়েছিস ঝুমি। আমরা তো হাজার ডায়েট করেও পাই না।
সে কাজের বাড়ির বৌদি যাই বলুক না কেন, ঝুমি জানে এতো রোগা শরীর নিয়ে চলার হ্যাপা। তাকে দেখে মনে হয় ষোলো বছরেরটি, যদিও তেইশ পার হয়ে সে চব্বিশে পড়বে।পাঁচটা বেটা বেটি। চার মেয়ের পর একটা ছেলে পেয়েছে মানত করে। খুব আদরের ছেলে তার। বৌদির বাড়ির ফ্রিজে রাশি রাশি ক্যাডবেরি। যে বাড়িতে আসে, বাবুসোনার জন্য ক্যাডবেরি নিয়ে আসে। ওরা ছেলেকে অত চকলেট খেতে দেয় না। দাঁত খারাপ হয়ে যাবে বলে। নিজেরাও খায় না। বৌদি বাথরুমে গেলে ঝুমি তাই একটা আধটা ক্যাডবেরি সরিয়ে নেয়। বৌদি টেরও পায় না।
ঐরকম একটা সরানো ক্যাডবেরির সামান্য একটু দাঁতে কেটে, একটু ভেঙে অণিমামাসীর হাতে দিয়ে ঝুমি ভাবতে লাগল, ঠাকুদ্দা বট কেটে ফেললে সে যাবে কোথায়। কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে, এই গাছের চাতালে নিজের শাড়ির আঁচল বিছিয়ে নিশ্ছিদ্র একটা ঘুম দেয় ঝুমি। বাড়িতে কখনো এতো আরামের ঘুম হয় না। বরের হম্বিতম্বি, বাচ্চাদের চ্যাঁ ভ্যাঁ লেগে থাকে। গাছটা না থাকলে ঝুমি ঘুমাবে কোথায়? মেয়েদের এই গপ্পো গাছা হাসি ঝগড়ার মধ্যে যে ঘুমটা বড় ভালো হয়।
তুমি ঠিক জানো সীমীদি? গাছ কাটবেই?
সীমী সরকারি অফিসারদের বাড়ি কাজ করে। হাবভাবে সেও সরকারি অফিসার। সব খবর ঠোঁটের ডগায়।
কাটবেই। অরডার বেরিয়ে গেছে। এই যুদ্ধ লেগে গেল। এখন লোকজন বাড়ি থেকে বেরোবে না। সেই সুযোগে কেটে ফেলবে।
আনোয়ারা ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকলো। উঠতে হবে। বললো, আমরা না করলে হয় না? গাছ কাটা তো নিষেধ শুনেছি?
মুখ ঝামটা দিল সীমী।
ওরে আমার বারণ রে। কে শুনবে শুনি? দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে মিনসিপালিটির লোক। তাছাড়া এই পাড়ার লোকই তো কিছু বলবে না গাছ কাটা নিয়ে। কে এসে বসে এখানে আমরা ছাড়া? আজকাল তো কেউ বাজারেও যায় না। সব বাড়িতে চলে আসে। অফিস যায় আর বাড়ি এসে জানলা বন্ধ করে এসি চালিয়ে মোবাইল হাতে বসে থাকে।
অণিমামাসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কল্পনার টেনশন বাড়ছে। বাপ আবার কি বাড়াবাড়ি শুরু করলো কে জানে। নাতি নাতনি পরোয়া করে না বুড়ো রাগলে। হাতের কাছে যা থাকে তাই দিয়ে পিটিয়ে দেয়। কোন দিন কী কুরুক্ষেত্র বাঁধবে কে জানে। ছেলে মেয়ে তো বড় হচ্ছে। এতসব টেনশনের মাঝে ঠাকুদ্দাবটের ছায়া,বাতাস বড়ো ভালো লাগে। বাপের পেটের অসুখের ওষুধ নিতে হবে ফিরতি পথে, ছেলে মেয়ের নতুন ক্লাসের বই।
চললাম গো মাসি। আজ কী রাঁধবা বাড়ি গিয়া?
অণিমামাসি সার্বজনীন মাসি।
শরীরের ভারে উঠতে বসতে কষ্ট। ধীরে ধীরে পায়ে চটি গলাচ্ছিল মাসি।
খাওয়েনর কথায় জিভে জল আসে। চোখেও। পেটে আর খাসির মাংস সহ্য হয় না। বাড়িতে সিলিং ফ্যানটা টিমটিম করে চলে। একটা স্ট্যান্ড ফ্যান মাথার কাছে। তবু এই পোড়া গরমে ঘুম আসে না। অথচ এই বটগাছতলায় বসলে জিরেন কাকে বলে টের পাওয়া যায়।
রসুন পোড়াতে আমতেল দাও নাকি গো মাসী?
সুরভি এসে বসলো। রান্নাবাড়ির কাজ। এখানে খানিক জিরিয়ে, চিড়া ভিজানো খেয়ে তিন নম্বর বাড়ি ঢুকবে। সে বাড়ির পোয়াতি বৌয়ের অরুচি সারাতে সুরভি মুখরোচক খুঁজছে। অণিমা মাসির চেয়ে ভালো রান্না আর কে বাতলাবে।
মুখে খৈনি ঠুসে মাসি বললো, বড়িগুলান কিন্তু ভেজে নিবি আগে। পরে মিক্সিতে গুড়া করে নিবি।
অতঃপর কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা, থেঁতো রসুনপোড়ার মধ্যে নুন, মিষ্টি, হলুদের সুঘ্রাণে সবাই একজোট হয়। মুখরোচক সবার ভালো লাগে, ফিরে আনোয়ারা আজকেই বানাবে তমরেজের মেজাজ ঠান্ডা করতে, সীমী বানাবে মায়ের জন্য, কল্পনা ভাবলো নিজের জন্যই বানাবে। যারা আজ বানাবে না, তারা কাল বা পরশু বানাবে আলু, কুমড়ো, পেঁপে সহযোগে।
রান্নার তরিকা মনে গেঁথে সুরভি টিফিন করলো।
লেবুর কাজিটা শিখিয়ে দিও মাসি গো। এইসময়ে ভালো যত্নআত্যি করলে বখশিস ভালো দেবে।
সীমী মুখে সানস্ক্রিন মাখছিল।
খবর কিন্তু কনফার্মড। বটতলা থাকছে না। বিল্ডিং উঠবে। ওপরে হল, নিচে দোকান।
সুরভি উঠতে গিয়ে আহ্ করে উঠল।
বর কাল বেদম মেরেছে। থাইতে কালশিরে। দোষের মধ্যে অন্য মেয়েমানুষের কাছে যাওয়া নিয়ে ফের ঘ্যানঘ্যান করেছিল।
কল্পনাও উঠল।
নাকি কান্না কাঁদবি না সুরভি। আবার মেরেছে? উল্টে দু ঘা বসিয়ে দিবি। কি তেলটা যেন লাগালে ব্যথা তাড়াতাড়ি কমে মাসি?
মাসি ততক্ষণে টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে গেছে।
দিদিকে ফোন করতে হবে, বাবাকে কয়েকদিনের জন্য হলেও নিয়ে যা...আমার ওপর চাপ পড়ছে বেশি, বলতে বলতে কল্পনা উঠে পড়লো।
এখানে কেউ কাউকে আয় বা যাই বলে না। যে যার মতো আসে, বসে, ঘুমায়, যায়।
পার্মানেন্ট একজন আছে। সে পাগল। রাতের বেলা বটগাছতলে ঘুমায়। বকবক করে। কখনো হাতরুটি, কখনো পাউরুটি চিবায়।
দুপুর গড়াতে ফাঁকা হয়ে আসা গাছতলায় কেউ নেই প্রায়।
সবশেষে উঠল সীমী।
পাগল বসে আছে জলের কলের পাশে। যেতে যেতে পাগলকে চোখ ঠেরে বলে গেল সীমী - গাছ তো কেটে ফেলবে রে...তুই কোথায় যাবি?
কিছুটা শুনল, কিছুটা শুনল না পাগলা।
সীমী চলে যাচ্ছে হনহন করে।
পাগলা খানিক নিজের মনেই বলে উঠলো - দেখি। খুঁজি কোথায় গাছ আছে!