

অলংকরণ: রমিত
শরৎচন্দ্র যখন বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করেন তখন বাংলা সাহিত্যের প্রাসাদ গড়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র আর সেই প্রাসাদ নানা কারুকার্যে ও মহার্ঘ মণি মুক্তায় সাজিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তবু মোটামুটি বাংলা সাহিত্যের নীতি দুর্নীতির মাপকাঠি ধরে নেওয়া যেত বঙ্কিমচন্দ্রকেই। এই নিয়ে শরৎচন্দ্রকে সচেতনভাবে অনেক বিদ্রোহ ও আপোষ, দুইই করতে হয়েছে।
সাহিত্য শুধু আর্ট বা শিল্প হবে কিনা অথবা তথাকথিত সামাজিক নীতি মেনে নেবে কিনা এ বিষয় নিয়ে শরৎচন্দ্র বেশ চিন্তা করেছেন এবং কিছু দ্বন্দ্বেরও পরিচয় রেখেছেন। আমি সেই চিন্তার কিছু নমুনা দেব ও কিভাবে তাঁর দ্বন্দ্বের সঙ্গে আপোষ করেছেন বিভিন্ন উপন্যাসে ও গল্পে তার কিছু কিছু উদাহরণ দেব।
আমি বলি সাহিত্যে নীতি দুর্নীতি শ্লীলতা অশ্লীলতা উচ্চারিত হচ্ছে মোটামুটি তিন দিকে – বিষয় নির্বাচনে, বর্ণনায় ও পরিবেশনায়।
শরৎচন্দ্র বলছেন --- “আর্টের জন্য আর্ট, এ কথা আমি পূর্বেও কখনও বলিনি, আজও বলিনে। এর যথার্থ তাৎপর্য আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।” (সাহিত্যে আর্ট ও দুর্নীতি )।
অন্যত্র বলেছেন --- “গোটা দুই শব্দ আজকাল প্রায়ই শোনা যায়, Idealistic and Realistic। আমি নাকি এই শেষ সম্প্রদায়ের লেখক। এই দুর্নামই আমার সবচেয়ে বেশী। অথচ, কি করে যে এই দুটোকে ভাগ করে লেখা যায় তা আমার অজ্ঞাত। Art জিনিষটা মানুষের সৃষ্টি, সে Nature নয়। সংসারে কিছু ঘটে --- এবং অনেক নোংরা জিনিষই ঘটে --- তা কিছুতেই সাহিত্যের উপাদান নয়। প্রকৃতির বা স্বভাবের হুবহু নকল করা Photography হতে পারে, কিন্তু সে কি ছবি হবে?” ( সাহিত্য ও নীতি )।
শরৎচন্দ্র নিজেই স্বীকার করেছেন Idealism ও Realism তিনি কিছুতেই ভাগ করতে পারেন নি। এটা তাঁর দ্বন্দ্ব। আমার তো মনে হয়েছে তিনি realism-র দরজায় কড়া নেড়ে বার বার ফিরে এসেছেন। দুএকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বঙ্কিমের কৃষ্ণকান্তের উইল শরৎচন্দ্রকে নাড়া দিয়েছে। রোহিণী গোবন্দলালকে প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মের ন্যায় নীতি রক্ষা করতে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে গুলি করে মারতে হল রোহিণীকে। শরৎচন্দ্র মন্তব্য করেছেন রোহিণীর মৃত্যুতে “সমাজের বিধি, নীতির Convention সমস্তই বেঁচে গেল, সন্দেহ নেই, কিন্তু ম-ল সে, আর তার সঙ্গে সত্য, সুন্দর ও Art।” এই মন্তব্য মনে রেখে শরৎচন্দ্রের দু-একটি চরিত্র দেখা যাক।
পল্লীসমাজের বিধবা রমা বাল্যবন্ধুকে ভালবেসেছে। তখনকার হিন্দু সমাজ হা হা করে উঠেছে – এতবড় দুর্নীতির প্রশয় দিলে গ্রামে বিধবা আর কেউ থাকবে না। শরৎচন্দ্রের কথায় ---“রমার মত নারী ও রমেশের মত পুরুষ কোন কালেই কোন সমাজেই দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে জন্মগ্রহণ করে না। উভয়ের সম্মিলিত পবিত্র জীবনের মহিমা কল্পনা করা কঠিন নয়। কিন্তু হিন্দু সমাজে এ-সমাধানের স্থান ছিল না। তার পরিণাম এই হল যে, এতবড় দুটি মহাপ্রাণ নর-নারী এ জীবনে বিফল, ব্যর্থ, পঙ্গু হয়ে গেল।”
অথচ শরৎচন্দ্র এই Realism-র গণ্ডি ছাড়িয়ে Idealism-র দরজা খোলেন নি। তাঁর মতে ‘আমরা সমাজ সংস্কারক নই’। সত্যই তাই।
সেই একই কারণে বুঝি দেবদাসেরও না মরে কোন উপায় ছিল না।
বর্ণনা ও পরিবেশনে শ্লীলতার একটা মাত্রা ছিল সেকালের সাহিত্যে। বঙ্কিম রক্ষণশীল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ কাব্যে এবং কথাসাহিত্যে নারী পুরুষের বর্ণনায় ও পারস্পরিক সম্পর্কে তখনকার সমাজপতিদের ক্রোধের কারণ হয়েছেন। এদিকে কল্লোল ও কালিকলমের দলের সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতার ব্যবধান ক্রমশই কমতে থাকল।
শরৎচন্দ্র কিন্তু নিজেকে প্রায় মধ্যবর্তী রাখলেন। ‘সাহিত্যের রীতি নীতি’ প্রবন্ধ থেকে ডঃ নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের কথায় বলি --- “শারীর ব্যাপার মাত্রই তো অপাংক্তেয় নয়, কেন না, চুম্বনের স্থান সাহিত্যে পাকা করিয়া দিয়াছেন বঙ্কিমচন্দ্র হইতে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকল সাহিত্য-সম্রাট। আলিঙ্গনও চলিয়া গিয়াছে।”
শরৎচন্দ্র বলছেন --- “কিন্তু আলিঙ্গন তো দূরের কথা চুম্বন কথাটাও আমার বইয়ের মধ্যে নিতান্ত বাধ্য না হইলে দিতে পারি না। ওটা পাশ কাটাইতে পারিলেই বাঁচি। নরনারীর মধ্যে ইহা আছে জানি, চলেও জানি, দোষেরও বলিতেছি না, তবু কেমন যেন পারিয়া উঠি না। আমাদের সমাজে এ-বস্তুটিকে লোকে গোপন করিতে চাহে বলিয়াই বোধহয় সুদীর্ঘ সংস্কারে ইয়ুরোপীয় সাহিত্যের ন্যায় ইহার প্রকাশ্য demonstration-এ লজ্জা করে। খুব সম্ভব আমার দুর্বলতা। কিন্তু ভাবি এই দুর্বলতা লইয়াই তো অনেক প্রণয়-চিত্র লিপিবদ্ধ করিয়াছি --- মুশকিলে তো পড়ি নাই।”
বিশ শতকের শেষ দশকে বাংলা সাহিত্য পড়ে এ কথা অনুমান করা কঠিন হবে যে, বিষয় নির্বাচনে ও পরিবেশনায় সে যুগে শরৎচন্দ্র কি প্রচণ্ড বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের সারাজীবনের রচনা থেকে এর উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে অনেক। সমাজ, ধর্ম, অধর্ম, অবৈধ প্রেম, সংস্কার ও সতীত্ব ভ্রষ্টতা ইত্যাদি প্রায় অনেক চোখ বুজে ঠেলেরাখা চরিত্ররা সব ভিড় করেছে তাঁর কথা সাহিত্যে। আমি শুধু উদাহরণ দিই একটা ছোট গল্প থেকে। ‘পথনির্দেশ’ গল্পে হেমনলিনী তার সম্পর্কিত এক ভাই গুণেন্দ্রকে ভালবাসে। কিন্তু সেদিনের সমাজের সঙ্গে তাল রেখে জোর করে হেমনলিনীর বিবাহ দেওয়া হল অন্যত্র। এক বছর পরে হেমনলিনী বিধবা হয়ে ফিরে এলো। শরৎচন্দ্র হেম এবং গুণীকে আবার কাছাকাছি আনলেন -- কিন্তু খুব কাছে না। একদিন কাছে বসে হেম বলল ---“গুণীদা, তোমার পায়ের কাছে বসলেই আমার হাত দেয়ার লোভ হয়।” পরে গুণী বলছে --- “তোমার স্বামীকে তুমি ভালবাসতে, হেম?” হেম বলল, “একটুও না। সে কথা আমার কোনদিনই মনে হয়নি …।”
গুণী বলল, --- “কিন্তু যারা সতী লক্ষ্মী তারা নিজের স্বামীকে ভালবাসে। বিধবা হলে তার মুখ মনে করে আর বিয়ে করে না। তোমার মার মত তাঁরা মরণকালে স্বামীর কাছে যাবে মনে করে।”
হেম বলল – “আমাকে তোমরা জোর করে ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়েছিলে। আমি সতীলক্ষ্মী, তাই মরণকালে তোমার কাছে যাচ্ছি, তাই মনে করব।”
ন্যায় অন্যায় নীতি দুর্নীতি শ্লীলতা অশ্লীলতা ইত্যাদি কোথায় কীভাবে পরিবেশিত হবে বা হবে না, Art বা শিল্প হিসাবে উত্তীর্ণ হবে বা হবে না তা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন তিনি। সাহিত্যে art এবং morality নিয়ে শরৎচন্দ্রের মতামত একটু তুলে দিই। “ঐশ্বর্যকে একাকী ভোগ করার চেষ্টা করলেই সে আপনাকে আপনি ব্যর্থ করে দেয়। যা সর্ব মানবের, একার লোভ সেখানে পরাভূত হবেই হবে। আর সেই ঐশ্বর্যের চরম পরিণতি কোথায়? সুন্দর ও মঙ্গলের সাধনায় --- art, morality ও ধর্মে। এ একলার নয়, এ ঐশ্বর্য বিশ্ব-মানবের জেনে এবং না জেনে, মানুষের চেষ্টা মানুষের উদ্যম এই ঐশ্বর্য আহরণের দিকেই অবিশ্রাম চলেছে --- অতএব যা অসুন্দর, যা immoral, যা অকল্যাণ, কিছুতেই তা art নয়, ধর্ম নয়।”
এ উক্তি মেনে নিলে সততার খাতিরে এটা মেনে হবে যে শরৎচন্দ্র যা চিত্রিত করেছেন, যা সৃষ্টি করেছেন তাতে অন্যায়, অশ্লীলতা বা immorality নেই। যা আছে তা এসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে শিল্প হয়ে উঠেছে।