একবিংশ শতাব্দীতে এসে জ্বালানি তেলের মতোই আরেকটি উপাদান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আর সেটি হলো ‘সেমিকন্ডাক্টর’ বা মাইক্রোচিপ।
আমাদের হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), আধুনিক যুদ্ধ বিমান, হাইস্পিড ট্রেন, স্মার্ট কার কিংবা চিকিৎসা সরঞ্জাম—সবকিছুর মগজ হিসেবে কাজ করে এই চিপ।
আর এই চিপ উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পূর্ব এশিয়ার একটি ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র—তাইওয়ান। বর্তমান বিশ্বে তাইওয়ানের মাইক্রোচিপ ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং তা কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
চিপ ডিজাইনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশ এগিয়ে থাকলেও, সেই ডিজাইনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অর্থাৎ চিপ তৈরির (Manufacturing) মূল কাজটি হয় তাইওয়ানে। তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানি হলো 'তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি' (TSMC)। এটি বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা।
বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও ক্ষুদ্রতম চিপগুলোর (যেমন ৩ ন্যানোমিটার বা ৫ ন্যানোমিটার চিপ) প্রায় ৯০%-এর বেশি উৎপাদিত হয় তাইওয়ানে। অ্যাপল, এনভিডিয়া, কোয়ালকম এবং এএমডি-র মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টরা তাদের প্রিমিয়াম চিপ তৈরির জন্য সম্পূর্ণরূপে TSMC-এর ওপর নির্ভরশীল।
তাইওয়ানের চিপ শিল্পের ওপর পুরো বিশ্বের প্রযুক্তি খাত কতটা নির্ভরশীল, তা করোনাকালীন চিপ সংকটের সময় স্পষ্ট হয়েছিল। তাইওয়ানে উৎপাদন সামান্য ব্যাহত হলেই বিশ্বজুড়ে গাড়ি, ল্যাপটপ এবং স্মার্টফোনের উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ে, যার ক্ষতি বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে।
বর্তমান যুগে ডাটা সেন্টার এবং এআই (AI) বিপ্লবের যে জোয়ার চলছে, তার চাবিকাঠিও তাইওয়ানের হাতে। তাইওয়ান যদি চিপ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি রাতারাতি থমকে যাবে।
তাইওয়ানের এই চিপ শিল্প কেবল তাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং দেশটিকে একটি অনন্য নিরাপত্তা কবচ দিয়েছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা 'সিলিকন শিল্ড' (Silicon Shield) বলে অভিহিত করেন।
> তাইওয়ানের চিপের ওপর চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্ব এত গভীরভাবে নির্ভরশীল যে, তাইওয়ানে কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধসে পড়বে। ফলে, চীন চাইলেই সহজে তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে না, আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও নিজের প্রযুক্তি খাতের স্বার্থেই তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকে।
>ভৌগোলিক আয়তনে ছোট হলেও মাইক্রোচিপ ইন্ডাস্ট্রির কল্যাণে তাইওয়ান আজ বিশ্বমঞ্চের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ বর্তমানে নিজেদের দেশে চিপ কারখানা (Fabrications Lab) তৈরির চেষ্টা করলেও, তাইওয়ানের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনবল এবং উন্নত ইকোসিস্টেমকে প্রতিস্থাপন করা অসম্ভব বললেই চলে।
আধুনিক ডিজিটাল বিশ্বের চাকা সচল রাখতে তাইওয়ানের মাইক্রোচিপ ইন্ডাস্ট্রি কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং সম্পূর্ণ অপরিহার্য।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।