এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইদবোশেখি  ইদবোশেখি

  • বানপ্রস্থ

    প্রতিভা সরকার
    ইদবোশেখি | ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১২৯ বার পঠিত
  • ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি | বানপ্রস্থ | বার্বিডল

    অলংকরণ: রমিত



    (১)


    সবার প্রথম তারে দেখেছিল কানু ঘোষ। বিড়ি খেতে খেতে সে জাল মেরামত করছিল আর বনের ভেতর থেকে ভেসে আসা বাঘের ডাক শুনছিল। শব্দটা কাছিয়ে আসছিল বলে তার একটু একটু অস্বস্তি হলেও সে জানে এই ভর দুপুরে দিনের আলোয় নদী সাঁতরে গ্রামের দিকে আসবার চেষ্টা বাঘের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী কখনই করবে না। তার প্রতিবেশী বৃন্দাবনের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “এবার ঝ্যান মামার হাঁকডাক এট্টু বেশি লাগতিছে রে বেন্দা।”

    বৃন্দাবন অন্যমনস্ক ভাবে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “বাপ রে, রাতের বেলা শুনতি পেলি পরানডার মাঝখানডা ঝ্যান কাঁপতি থাকে! কী গভীর গজ্জন !”

    “এডা নান্টু বাবু। সেদিন নৌকো বাইতে গিয়ে দেখিচি জালের ওপারে বিশাল গরান গাছটির গোড়ায় সামনের হাতায় মুখ রেখি বিশ্রাম কত্তিছে। মুখটা ঝ্যান কেমনপারা ছুঁচলো মতো। ভয়ে সাঁ করি লৌকা বাইয়ে চলি গেলাম, ভালো করি দেখতি পালাম না তারে!”

    কানুর কথা শুনে বেন্দাবন আরও উদাস সুরে বলল,“হুঁ, নান্টুবাবু বৌ খুঁজতিছে। তাই এত হাঁকডাক!”

    “সে তো তুইও খুঁজতিছিস বেন্দা!” কানু ঠাট্টার সুরে বলল, “মাকালপুরের মেয়াডারে রাজি করাতি পাল্লিনে ?”

    বৃন্দাবনের মুখ কানুর এই প্রশ্নে আরও কাচুমাচু হয়ে যায়, গলা আরও নামিয়ে সে বলে, “ভয় ধরে কানুদা। সে যদি বৌদির মতো হয় ?”

    শীতকালে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে মানুষ জঙ্গলের দিকে কড়া নজর রাখে। এই সময়েই মামার উপদ্রব খুব বাড়ে। মামা হোক বা মামি, সুন্দরবনের মানুষ কখনও বাঘকে বাঘ বলে ডাকে না, অনেক সুন্দর সুন্দর নামকরণ করে বিশালাকায় বনের রাজার, যেমন ফকির-বন্ধু, মামা, বড়বাবু, রাজাবাবু ! এমনকি নান্টু বা পিন্টু বলেও ডাকে তাদের কাছের জঙ্গলের রেসিডেন্সিয়াল বাঘকে। যেন সে তাদের ঘরের বাছা।

    তবে যে নামেই ডাকুক, শীতকালটা বড় সাবধানে থাকবার কাল, এটা সবাই জানে ও মানে। এই সময় মদ্দা বাঘ গ্রামের লাগোয়া জঙ্গলে ঘন ঘন সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়। আসঙ্গলিপ্সা বছরের এই সময়েই সবচেয়ে বেশি বেড়ে ওঠে বলে মাঝে মাঝেই বাঘের অকুণ্ঠ গম্ভীর গর্জনে রান্নাঘরের তাকে রাখা এলুমিনিয়ামের বাসনকোসন ঝনঝন করে পড়ে যায়। আবার এই সময়টাই মাদী বাঘের বাচ্চা হবার সময়। বাচ্চা হলে মদ্দার হাত থেকে তাদেরকে বাঁচাবার জন্য মা ঠাঁই-নাড়া হয়ে ছানাপোনা সমেত নদী সাঁতরে এ পারে চলে আসে। কখনও বা প্রসবের জন্যই গ্রামঘেঁষা পাতলা নিরিবিলি জঙ্গল বেছে নেয়। গাঁয়ের গরু বাছুর চরতে এলে সহজে শিকার মিলে যায়।

    প্রত্যেক বছর শীতকালে এসবই ঘটতে থাকে বঙ্গোপসাগরে মেশা বিভিন্ন নদীর মোহনায় সর্ষেদানার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপগুলোয়, যেখানে লোকসংখ্যা অল্প আর নদীর চওড়া মুখের অপর পারে রয়েছে বাঘের জঙ্গল। বনবিভাগের লোকেরা সেই জঙ্গলকে সবুজ ফাইবারে জড়িয়ে দেয়, যাতে সেই সীমারেখার মানসিক বাধা পার হতে না পেরে বাঘ জঙ্গলের ভেতরেই থেকে যায়। বেশিরভাগ সময়ে তাই-ই হয়। নদী সাঁতরে বাঘ আর এপারে গ্রামের কাছাকাছি আসে না, যদি না সঙ্গম কাতরতা তার বোধবুদ্ধি নষ্ট করে দেয়, যদি না সন্তানের নিরাপদ প্রসব বা পালন তার প্রধান বিচার্য হয়ে ওঠে।

    তবে ব্যতিক্রম তো সবেতেই থাকে, আর চোরা শিকারিরা যদি ফাইবারের নেট ছিঁড়ে রাখে সুবিধে মতো জঙ্গলের ভেতরে যাওয়া আসার জন্য, তাহলে আর কি হবে? দুই কারণের মধ্যে প্রথমটির জন্য এবং নেট ছেঁড়া থাকায় গ্রাম নসিবপুরের নসিবে এবার বাঘের দেখা লেখা ছিল।

    কানু ঘোষ আর বৃন্দাবনের কথোপকথন থেকেই ব্যাপারটি বেশ স্পষ্ট।

    (২)


    বৃন্দাবনের বৌদিকে নিয়ে তার এমনতরো চিন্তার গভীর কারণ ছিল। বাঘের মতোই হিংস্র তার একমাত্র বৌদি মিনু কয়াল। যেমন নিষ্ঠুর, তেমনি ফন্দিবাজ। তক্কে তক্কে থাকে কার ওপর নখদাঁত বার করে কখন ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। প্রতিবেশীরাও তাকে খুব ডরায়। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় শিকার তার নিজের শাশুড়ি দীনবালা।

    এসব গ্রামে মেয়েরা প্রায় সকলেই খুব কর্মঠ, সংসারের হাল ধরে থাকে তারা, শক্তপোক্ত না হলে তাদের চলে না। পুরুষটি যদি মাছ ধরতে বা মধু সংগ্রহে গিয়ে “জঙ্গলে পড়ে যায়,” বাঘের শিকার হওয়াকে এই অঞ্চলে ওই ভাবেই প্রকাশ করা হয়, তাহলে শাঁখা সিঁদুর খুইয়ে তারা কিছুকাল কান্নাকাটি করে বটে, কিন্তু তার পরেই ছানাপোনাদের মুখ চেয়ে খালের জলে বাগদার মিন ধরতে শুরু করে বা কাঠ কুড়োতে অন্যদের সঙ্গে গভীর জঙ্গলে চলে যায়। ক্ষিদের থেকে বড় তাড়িয়ে-বেড়ানো শত্রু এই দুনিয়ায় আর আছে কে !

    এই কঠোর জীবন কাটাতে কাটাতে খুব নম্র স্বভাবের অনেক মেয়েও কিছুদিন বাদে কঠিন হয়ে পড়ে, কিছুটা মারকুটে আর তিতিবিরক্ত, তাদের খরখরে জিভের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে, এমন বান্দা যেন কোনও দ্বীপে কেউ জন্মায়নি। কিন্তু তাদের বেশির ভাগের কাঠিন্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সেই আগেকার নরম মন, মৃত স্বামীর কথা মনে পড়লে চোখ কেন যে হরদম জলে ভাসে! ঘরসংসারের যে স্বাদ মেয়েগুলো পেয়েছে, তা চট করে ভুলে যাওয়া তাদের কম্ম নয়।

    এই বাইরে কঠিন, ভেতরে নরম ধারার একেবারেই ব্যতিক্রম বৃন্দাবনের বৌদি মিনু। তার ভিতর বাহির সবই যেন পাথর হয়ে গেছে! সেরা ঝগড়ুটে বলে এ তল্লাটে তাকে সবাই জানে। ভয়ও পায়। চিৎকারে কাক চিল বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁসে না, মানুষ তো কোন ছার! তবে মিনু শুধু দজ্জাল ঝগড়ুটে নয়, সে স্বভাবেও ভারী নিষ্ঠুর।

    মিনুর স্বামী তামিলনাড়ুর গেঞ্জিকলে পরিযায়ী শ্রমিক। এতদিন হল বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু তার কোনও ছেলেপুলে হয়নি। দেওর বৃন্দাবন আর খুনখুনে বুড়ি শাশুড়িকে নিয়ে তার সংসার। ছোট সংসার শান্তির আগার হতে পারত। কিন্তু বৌদির মুখের জ্বালায় বৃন্দাবনের প্রায় বিবাগী হবার দশা, আশপাশের গ্রাম থেকে কেউ জঙ্গলে মাছ ধরতে বা মধুসংগ্রহে যাচ্ছে জানতে পারলেই সে তাদের নৌকায় চেপে বসে, যেন যতক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকা যায় ততই ভালো। আট/ দশ দিন বাদে সে যখন ফিরবে তখন তার গেঁজে যদি মধু বা মাছ বিক্রির টাকায় বেশ ফুলে ফেঁপে থাকে, তাহলে মিনু একবেলা শান্ত থাকার খুব চেষ্টা করবে, কাঁসার থালায় চুড়ো করে ভাত বেড়ে একটু হাসি হাসি মুখ করবে, কিন্তু ওবেলা থেকেই তার দেওয়া ভাতের এবং হাসির পরিমাণ কমতে থাকবে এবং ক্রমে তার খ্যানখ্যানে গলা এমন চড়ায় উঠে যাবে যে বাড়ির ত্রিসীমানায় কাকচিল বসতে পারবে না। প্রথমে বৃন্দাবন সংসারে টাকা কম দিচ্ছে এই অনুযোগ দিয়ে শুরু হবে, তারপর তার স্বামী তামিলনাড়ুতে আর একটি সংসার পেতেছে এই কল্পিত সন্দেহে সে একেবারে ফেটে পড়বে। অকাট্য যুক্তি তার, না হলে সে মিনসে দেশে ফিরতে চায় না কেন ! বর্ষাকালে সবাই জমিতে চাষ দেবে বলে কাঁহা কাঁহা মুলুক থেকে গ্রামে ফিরে আসে, আর বেন্দাবনের দাদা সব দায়িত্ব ভাইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়ে কেমন সম্বৎসর গেঞ্জি কারখানায় খেটে যায়!

    সারাদিন এইসব নিয়ে বকবক করতে করতে যেই না সন্ধেটি হবে, সুজ্জি ঠাকুর পাটে বসবেন, অমনি মিনুর ছোঁড়া সমস্ত তিরের মুখ ঘুরে গিয়ে যাকে বিদ্ধ করবে সে হল তার সত্তর বছরের প্রায় চলচ্ছক্তিহীন শাশুড়ি দীনবালা। এত লোক মরে বেন্দাবনের মা কেন মরে না, এই দিয়ে শুরু করে এমন শাপশাপান্ত সে করতে থাকবে যে কানে আঙুল দিতে হবে। পাড়া পড়শির এখন অভ্যাস হয়ে গেছে তাই, নাহলে তাদের উল্টোপাল্টা মন্তব্য কানে এলে মিনু রাগের ঠেলায় দীনবালাকে আরও আকথা কুকথা বলতে থাকত। তার স্বামী এবং দেওর অনেক বুঝিয়েছে তাকে, শাশুড়ি চোখের জলে সাঁতরেছে, কিন্তু অভ্যাস পাল্টায়নি। ছেলেরা বাড়িতে না থাকলে সে দীনবালাকে পেট পুরে খেতেও দেয় না। এত অসভ্যতা করে যে জঙ্গলে গেলে বৃন্দাবনের প্রায়ই মনে হয় ফিরে গিয়ে সে দেখবে মিনু গলা টিপে তার মা-কে মেরে রেখেছে নইলে মা নিজেই গলায় কলসি বেঁধে নদীজলে ঝাঁপ দিয়েছে।

    (৩)


    এখন মন্ত্রতন্ত্র সব ভুলে প্রায় একটি জড়ভরতে পরিণত হলেও, দীনবালা বুড়ি এককালে এ অঞ্চলের একমাত্র মেয়ে-গুনিন বা সামান বলে বিখ্যাত ছিল। সে ছিল মা বনবিবির অন্দরমহলের মানুষ, মায়ের সাক্ষাৎ কন্যা! দীনবালার সাহায্যে মানসিক সফল হলে লোকেরা মা বনবিবির পুজোয় জ্যান্ত মোরগ উৎসর্গ করত, কিন্তু দাপুটে সামান দীনবালা তেমন তেমন ক্ষেত্রে সাফল্য এলে মায়ের চরণে উচ্ছুগ করত এঁড়ে গরু। কালে কালে স্বাধীন সেই প্রাণী বিরাট ষাঁড় হয়ে জঙ্গলের ধারের সমস্ত গ্রামে ঘুরে বেড়াত। যেমন তেল চুকচুকে তার চেহারা, তেমনি বাঘের মতো গর্জন ! চাষার ক্ষেতে শস্য মুড়িয়ে খেলেও দীনবালার ষাঁড়কে কেউ তাড়া করত না, তাতে নাকি স্বয়ং মা বনবিবি রুষ্ট হবেন। খাক, কত খাবে, স্বয়ং ঈশ্বরের জীব হলেও পুরো ক্ষেত তো খেয়ে উজাড় করে দিতে পারবে না, এই ভেবে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকত।

    মা বনবিবির আশির্বাদে দীনবালা নাকি বাঘও বাঁধতে পারত। গুরুর কাছ থেকে এমন জোরালো মন্ত্র শিখেছিল সে যে সেই মন্ত্র কানে গেলে বিরাট বপু নিয়ে ঠায় বসে থাকতে বাধ্য হত বনের বাঘ, নড়তে অবধি পারত না। তারপর একসময় নিজের অজান্তেই হাঁ মুখের শ্বদন্ত বার করে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ত। সেই সুযোগে মাছ কাঁকড়ায় নৌকা বোঝাই করে নিরাপদে গ্রামে ফিরে আসত জেলেরা। ক্যানিং ছাড়িয়ে সোনারপুর পর্যন্ত দীনবালার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে এই কারণে যে সে ছিল গোটা সুন্দরবনে একমাত্র মেয়ে সামান। এখন বুড়ো বয়সে তারই এই দুরবস্থা দেখে লোকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ভাবে কোথায় গেল সেই ঐশ্বরিক ক্ষমতা, কোথায় গেল মানুষের ভয় ভক্তি! এই দুনিয়ায় সবই যেন পদ্মপাতায় জল। একটু বাতাস বইলেই টুপ! নিচে বইছে অনন্ত কালসাগর! নুনের পুতুল সকলে এক এক করে সেখানেই নুন হয়ে মিশে যাবে।

    দীনবালার সেরা কীর্তি অবশ্য বাঘকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা নয়, সে তো সব গুনিনই মন্ত্র-বশ করে রাখতে জানে। তাই না মাছ আর মধু সংগ্রহে যাবার সময় প্রত্যেক নৌকায় একজন করে গুনিন থাকতেই হবে। সে তার হাতের মন্ত্রপূত লাঠি “আশাবাড়ি” নদীর চরের বালিতে গুঁজে রেখে, ধূপধুনো জ্বালে, খুব চেঁচিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে, যেন হেতাল আর ক্যাওড়ার ঘন পাতায় ধাক্কা খেতে খেতে শব্দগুলো গভীর বনের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে পারে! সেখানে হয়ত কোনও পশুর গাছের নিচে কান খাড়া করে বসে আছে বিশাল ফকির-বন্ধু, বনবিবির নাম কানে যেতেই পেছনের দুপায়ের মধ্যে লেজ ঢুকিয়ে সে সরে যাবে আরও গভীর বনে, যেখানে এই দোপেয়েগুলোর বিষাক্ত মন্ত্র তার কানে ছ্যাঁকা দেবে না। এমনই ছিল সে যুগের জানগুরুদের দাপট! দীনবালা এসব মন্ত্র-তন্ত্র তো জানতই, সেই ভরসাতেই স্বামীর সঙ্গে নৌকা করে সে মাতলা, ইছামতী, রায়মঙ্গল নদীতে সে ঝড়-তুফানের মতোই ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়িয়েছে। বনের কোনও পশুপাখিকে তার ভয় ছিল না। লোকে বলে চরে রোদ পোহানো দশ হাত লম্বা কুমির অবধি কালো কাঠে সাদা রঙ দিয়ে আঁকা বিরাট চোখওয়ালা দীনবালার নৌকা দেখলে ভয়ে ঝপ করে গভীর জলে লাফ দিয়ে তলিয়ে যেত কোন গভীরে।

    কিন্তু এসব ছাড়াও দীনবালার খ্যাতি ছিল বাঁজা মেয়েদের মুশকিল-আসান বলে। নাকি মন্ত্র পড়ে আর পুজো দিয়ে নষ্ট গর্ভে সন্তান এনে দেওয়ার বিরল শক্তি ছিল তার। শোনা যায় সেরকম বাচ্চাকাচ্চা এখনও এ গ্রামে সে গ্রামে ঢের আছে। এককালে সা-জোয়ান ছিল তারা, এখন বুড়ো হতে চলল, তবু লোকের মুখে মুখে এসব কথা এখনও ভেসে বেড়ায়।

    কেউ কেউ সাক্ষ্য দেয়, যেহেতু উর্বরতা আনবার জন্য মন্ত্রোচ্চারণের সেরা সময় সন্ধ্যাকাল, কোমর-ছাপানো কালো চুল, হাতে ধুনোর মালসা, যুবতী দীনবালা আবছা অন্ধকারেই নির্ভয়ে ঢুকে যেত গভীর জঙ্গলের ভেতরে মা বনবিবির থানে পুজো দিতে। সঙ্গে তার লোকলস্কর কিচ্ছুটি নেই, পাশে শুধু ল্যাতপেতে কান নাড়াতে নাড়াতে চলেছে সেই মানতের বিশাল ষাঁড়। থেকে থেকে গর্জন করছে জন্তুটা, আবছা অন্ধকারে হঠাত দেখলে মনে হবে পূর্ণবয়স্ক হাতির মতো মহাকায়! যেন স্বয়ং দেবী পার্বতী ভৃঙ্গীকে নিয়ে চলেছেন শিবের আরাধনায়।

    সন্ধে গড়িয়ে গেলেও সেই বনের দিকে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত, বিশেষ করে সন্তানহীন সেই বৌটি যার গর্ভসঞ্চারের জন্য পুজো দিতে বনের ভেতর ঢুকেছে দীনবালা। কিন্তু একা যাচ্ছে বলে গুনিনের পেছন পেছন কেউ মরে গেলেও যাবে না। কারণ গুনিনকে, সে ছেলেই হোক বা মেয়ে, এইরকম ক্ষেত্রে মা বনবিবির পুজো চড়াতে হয় একেবারে একা ও পুরোপুরি নগ্ন হয়ে। কেউ যদি পিছু পিছু গিয়ে ভুল করেও সে দৃশ্য দেখে ফেলে, তাহলে তৎক্ষনাৎ সে অন্ধ হয়ে যাবে।

    সত্যি হোক, মিথ্যে হোক, ডাহা মিথ্যেই যদি হয়, তবুও এই গল্পকথা একবার চাউর হয়ে গেলে আর কেউ দেখতে যায়! ফলে সূর্য অস্তে গেলে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাক জ্বলে ওঠে নিকষ কালো আঁধারে, ম্যানগ্রোভের জঙ্গল যেন আলোর মালা পরে বসে থাকে। বাতাস আর খালবিলে ঢেউয়ের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। সেই অলৌকিক নিস্তব্ধতাকে ভেঙে মাঝে মাঝে অনেক দূর থেকে কিসের হেঁড়ে গলার ডাক ভেসে আসছে, তা কি খোদ রাজাবাবুর নাকি দীনবালার মানতের ষাঁড়ের, কে জানে ! কিছু পরে ঠিক বার হয়ে আসবে দীনবালা, যাবার সময় তার চোখমুখ যেমন দবদবে আর ঘোর-লাগা ছিল, তেমনটি আর নেই তো ! তার বদলে মুখে মিষ্টি হাসি, চোখে বরাভয়। হাতের মালসায় জঙ্গল থেকে তুলে আনা জড়িবুটি, যা খেলে অধীর অপেক্ষায় থাকা বৌটি গর্ভধারণ করবে।

    (৪)


    দীনবালা সম্বন্ধে এইসব গল্প সত্যি না মিথ্যে, তা তার ছেলের বৌ তো দূরের কথা, নিজের ছেলেরাও জানে না। কারণ বড় ছেলের বয়স যখন পাঁচ বছর, দীনবালার স্বামীকে বাঘে খায়। এমন খাওয়া খেয়েছিল জন্তুটা, যে মানুষটার এক হাতের পাঞ্জা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। শুধু রক্তমাখা লুঙি তুলে এনেছিল তার নৌকার সঙ্গীসাথিরা, সুন্দরবনের রীতি রেওয়াজ অনুযায়ী সেই কাপড়ের টুকরোটাকে সাক্ষী রেখেই তার বৌয়ের সিঁদুর মোছা, শাঁখা ভাঙা, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি কাজকর্মগুলো সারা হয়েছিল। গর্ভে ছোট ছেলের চারমাসের ভ্রূণ নিয়ে বাঘবিধবা দীনবালা সেই যে স্বামীর রক্তমাখা কাপড়টিকে বুকে জড়িয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়, তারপর যখন তার জ্ঞান ফেরে তখন সে নাকি একেবারে অন্য মানুষ। হয়ত মগজের ভেতর স্বামী- হারানোর শোক এমন ঘেঁটে দিয়েছিল সবটা, যে সামানের শেখা মন্ত্রতন্ত্র সব ভুলে সে হয়ে গেল এক সাধারণ মেয়ে যাকে ছেলে মানুষ করবার জন্য খালেবিলে বাগদার মিন ধরে আড়তদারের কাছে বিক্রি করতে যেতে হয়। নাহলে এত বড় একজন গুনিন জলে নামলেই তো খালের সমস্ত মাছ দৌড়ে তার আঁচলে চলে আসবার কথা। কিন্তু সেসব তো হলই না, উপরন্তু কাদা মাখা, জলে ভেজা দীনবালাকে ঘরে ফিরতে দেখে কেউ তাকে আগের কথা জিজ্ঞাসা করলে ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আর শুধু মাথা নাড়ায়। সেই মাথা নাড়ানোর মানে যে কী, স্বামীর নৌকায় সে ছিল না বলে আপশোস, নাকি এসব অদ্ভুত কথা শোনার বিস্ময়, তা কেউ বোঝেনি।

    সে যাই হোক, গুনিন দীনবালা একেবারে সাধারণ মেয়েছেলে হয়ে গিয়ে গতর খাটিয়ে দুই ছেলেকে বড় করে তুলল, বড় ছেলের বিয়েও দিল। আর যত বুড়ি হতে লাগল, তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল শ্বাসকষ্টের ব্যারাম, কথা বলতে গেলে মুখে উঠে আসে দলা দলা শ্লেষ্মা আর বুকখানা ওঠে নামে যেন একখান হাপর। লোকে বলে এতকাল ধরে জঙ্গলের আঁধারে দুর্বৃত্ত অপদেবতাদের টক্কর নেবার ফল হাতেনাতে এখন পাচ্ছে দীনবালা।

    জন্ম থেকে বৃন্দাবন মা-কে এমনই দেখেছে, কোলকুঁজো আর বুড়িমতো, সাতেপাঁচে নেই, সাত চড়ে রা কাড়ে না। তবে নিজে যা দেখছে লোকের মুখে শুনেছে ঠিক তার উলটো। এই উল্টোপাল্টা গোলকধাঁধায় সারা জীবন ঘোরা তবুও সইত, কিন্তু বৌদি ঘরে আসবার দু তিন বছরের মধ্যে ব্যাপার যা দাঁড়াল, তাতে শান্তি নামে শব্দটাই তার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল। মিনু নিজের বাঁজা নাম ঘোচাবার জন্য দীনবালাকে প্রথম প্রথম খুব যত্নআত্তি করত। হাঁপের টান বেশি হলে বুকে আর পায়ের তলায় রসুন, কালোজিরে ফোটানো গরম গরম সর্ষের তেল মালিশ করে দিত, বাসকপাতার রস খাওয়াত আদা আর মধু দিয়ে, যাতে বুক থেকে শ্লেষ্মা বেরিয়ে যায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। দীনবালা আগের কথা, মন্ত্র, আচার, কিছুই মনে করতে পারল না, মিনুরও চোপা বাড়তে লাগল দিন দিন। তারপর অবস্থা এমন দাঁড়াল, সে দীনবালার মুখ দেখে না, ভাবে এই বুড়িই যত নষ্টের গোড়া, মন্ত্রতন্ত্র ওর মনে আছে সবই, ইচ্ছে করে কাজে লাগাচ্ছে না। তাই তার পেটে বাচ্চাও আসছে না। অথচ একটা বাচ্চা নেই বলে স্বামী আসে না, সংসারটাই ভেঙে যাচ্ছে তার। দীনবালা বৌ-কে যত বোঝাতে যায়, এসব ঠিক কথা নয়, লোকের রটনা মাত্র, তিলকে তাল করা, মিনু তত ভাবে, তার শয়তান শাশুড়ি ইচ্ছে করে বোকা সেজে আছে। ছেলের বৌকে মা হবার স্বাদ জানতে দেবে না, এই তার ষড়যন্ত্র। তার চণ্ডাল-রাগ বুড়িকে ছাড়িয়ে বুড়ির প্রিয় পোষ্যদের ওপর, বিশেষ করে হাড়জিরজিরে বুড়ি গরু শ্যামলীর ওপর আগ্নেয়গিরির লাভার মতো নেমে এল।

    (৫)


    দীনবালার আগের জীবন সম্বন্ধে যা জানা যায়, তার সঙ্গে বর্তমান জীবনের একটা মিল থেকে গিয়েছিল। সেটা তার পশুপ্রীতি। মানতের ষাঁড়গুলো সব মরেহেঁজে কোথায় চলে গেল, জঙ্গলে একা ঘোরার সময় বাঘের পেটেও গিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তাতে না দমে গিয়ে দীনবালা এবার শুরু করলে গাইগরু পোষা। অশক্ত শরীরেও শীতের মোটা কুয়াশা ঠেলে সে গরুর গলার দড়ি ধরে গ্রামের সীমানা অবধি নিয়ে যেত, সেখানে খুঁটো পুঁতে দিয়ে আবার দুপুর বেলায় ঘর থেকে মাড় জল বালতিতে নিয়ে গিয়ে খাওয়াত। এখন তো তার শরীরের যা অবস্থা, নিজেকে নিয়ে চলাই মুশকিল, তবুও হাতের লাঠিতে নিজের টলে পড়ে যাওয়া সামলে তার গরুকে মাঠে নিয়ে যাওয়া চাই। দুটো গাই গরু তার, বাহারি নাম তাদের ধবলী আর শ্যামলী। ধবলীর একটা বাছুরও আছে। এঁড়ে বাছুর। আর একটু বড় হলে বৃন্দাবন সেটাকে ক্যানিং-এ নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেবে। মুশকিল হয়েছে শ্যামলীকে নিয়ে। হাড় জিরজিরে দেহ আর দুটো বিশাল চোখ নিয়ে সে যখন দীনবালার গলা মুখ চেটে দেয় পরম স্নেহে, তখন বুড়ির চোখ দিয়ে দরদর ধারা বয়। বৃন্দাবন যদি জিজ্ঞাসা করে, “কাঁদো কেন মা?” বুড়ি শুধু বলবে, “অনেক কথা মনে পড়ে যে!” কিন্তু কথাগুলো কী সে তার ঠিকমতো মনেও পড়ে না, গুছিয়ে বলতেও সে ভুলে গেছে। গরুগুলোর ওপর তার একটা গভীর স্নেহ শুধু অনর্গল বেরিয়ে আসে তার ওই চোখের জলের সঙ্গে। এই শ্যামলীকে নিয়েই বাঁধল তুমুল গোলমাল। গরুটা বুড়ো হয়েছে, দুধ দেয় না, বাছুর বিয়োতে পারে না, ওটাকে এখনই বিদেয় করে দেওয়া উচিত, এই হচ্ছে মিনতির সরব মতামত। তাতে করে মাড়জল বাঁচবে, কষ্টে তুলে আনা ঘাসে আধপেটা খেয়ে থাকতে হবে না ওদের, ছোট্ট গোয়ালে ধবলীর ভবিষ্যত অজাত সন্তানের জন্য খানিক জায়গা হবে, দুটো গরুকে মাঠে বেঁধে দেবার সময় এবং পরিশ্রম বাঁচবে। কিন্তু একথা শুনে কানে আঙুল দেয় দীনবালা, বৌয়ের সঙ্গে কিছুতেই এঁটে উঠতে না পেরে কাঁদতে কাঁদতে মাটির দেওয়ালে মাথা ঠুকতে থাকে।

    সেদিন বিকেলে গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে বেজায় উত্তেজিত হয়ে সামনের বিধানসভা ভোট নিয়ে আলোচনা করছিল সবাই, হঠাৎ দেখা গেল বৃন্দাবন তার মা-কে ধরে নিয়ে আসছে এদিক পানে। বুড়ি হাপুস নয়নে কাঁদছে, কে যেন ভোরবেলা তার গোয়াল থেকে ধবলীর গলার দড়ি খুলে জঙ্গলের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে!

    এ কী কথা, কাছাকাছি বাঘ আছে জেনেও গোয়ালে বাঁধা গরুকে খুলে নিয়ে গিয়ে কেউ সেদিকে খেদাতে পারে ! প্রথমে সবাই যেন খুব অবাক হয়, তারপর সম্মিলিত কোলাহল ক্রমে খাদে নেমে আসে। কারও কারও মনে পড়ে যায়, বাড়ির অসুস্থ বুড়ো গরুকে কসাইয়ের হাতে তুলে দিলে পাপ হবে এই বিবেচনায় তারা জোয়ার আসবার ঠিক আগে তাকে খালের ওপারে বাঘের জঙ্গলের কাছাকাছি ছেড়ে দিয়ে এসেছে। জোয়ারের সময় ফুলে ফেঁপে সে খালের যে চেহারা হয়, তাতে গরু কেন, হাতিও পার হবার চেষ্টা করলে ভেসে যাবে। সেই অসহায় পশুটির তারপর কী হল, সে জলে ভেসে গেল নাকি বাঘের পেটে ঢুকল, সে খোঁজ আর কে রাখে !

    বন দপ্তর থেকে অনেক বলা কওয়া হচ্ছে গ্রামবাসীদের এই প্রবণতা নিয়ে। অসুস্থ গরু খেলে বাঘও নাকি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, তার খাদ্যাভ্যাস পালটে সে নাকি তখন কেবলই গ্রামের কাছে ঘুরঘুর করা শুরু করবে ! এতে মানুষের বিপদ বেড়ে যাবে বহুগুণ। কিন্তু সে যতই বলা হোক না কেন, বেশির ভাগ গ্রামবাসী কসাইয়ের হাতে বুড়ো গরু তুলে দিতে রাজি নয়। অভাবের সংসারে তাকে বসিয়ে খাওয়ানোও সম্ভব নয়। তাহলে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসা ছাড়া হাতে আর কি থাকে?

    পঞ্চায়েত প্রধান দীনবালাকে বলে, “ও ঠাম্মা, তোমার গরু তো বুড়ি থুত্থুরি হয়ি গিইছিল। হয় নাই বল ?”

    ডুকরে ওঠে দীনবালা, “কিন্তু তার তো কুনও অসুকবিসুক করেনি বাবাসকল! চার বচর আগেও তো তারে দুইয়েছি।”

    মহা হট্টগোলে কেউ কেউ চাপা স্বরে বলে, মাত্র চার বছর, এ বড় অন্যায় কথা। আবার বিজ্ঞরা মাথা দোলায়, চার বছর কি করে কম হয়? লোকে বসিয়ে বাপ মা-কেই খাওয়াতে চায় না,এ তো একটা গরু ! গ্রামে যাত্রাপালা করে মদন পাল, সে ডায়ালগ দেবার মতো করেই বলে, “বয়স হলি মানুষকেই বানপ্রস্থে যেতি হয়, আর এ তো একখান বুড়ি গাই! আর কাঁদে না, এবার ঘরকে যাও দিনি।”

    গরু হারিয়ে যাবার সমস্যার কোনও সমাধান চণ্ডীমণ্ডপে হওয়া সম্ভব ছিল না, হয়ও না! মাঝখান থেকে আজ মধু সংগ্রহে যাবার কথা থাকলেও কেবলই দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে বৃন্দাবন মা-কে তাড়া দিতে থাকে,”অ মা, অত ল্যারব্যার করি হাঁটতিছ ক্যান? মউলরা নাও ছাড়ি দিলি কি ভাল হবে ?”

    বৃন্দাবন লাঠি, হাঁড়ি আর বাঘকে ধোঁকা দেবার জন্য মাথার পেছনে পরার মানুষ-মুখোশ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরোবার পর পরই যেন চারিদিক আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মিনু আজ কেন যেন খুব গম্ভীর। ঝগড়াঝাটি কিছু নেই, তুলসি তলায় পিদিম জ্বেলে সেই যে রান্নাঘরে ঢুকেছে, আর তার কোনও সাড়াশব্দ নেই। অন্যদিন গোহাল থেকে ধবলীর ঘন ঘন নাক ঝাড়ার শব্দ শোনা যায় আজ কেউ নেই, কিছু নেই ! দীনবালা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে, চোখের জলে নাকের জলে ভিজে যাওয়া তার ছেঁড়া থানের আঁচল রুগ্ন মানুষটির মতোই মাটির ওপর নেতিয়ে পড়ে থাকে।
    অনেক রাতে, কত রাতে কে জানে, শেয়ালের চিৎকারে তার ঘুম সহসাই ভেঙে যায়। উঃ, কী খিদে পেয়েছে বাপ, তার ভেতরে ঢুকে যাওয়া পেটের কোঁচকানো চামড়ায় হাত বোলায় বুড়ি, বৌটা তাকে এক বাটি মুড়িও তো দিতে পারত !

    ঠিক তখনই কেন দরজায় শব্দ হয়, ক্যাঁচ কোঁচ! এখনই বোধহয় একবাটি মুড়ি নিয়ে মিনু ঢুকবে, এই আশায় ভূমিশয্যা থেকে মাথা তোলে বুড়ি, কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে, কিন্তু না, কেউ দরজা খুলে ঢোকে না। অথচ পরিষ্কার শুনেছে সে পায়ের শব্দ, কেউ যেন দাওয়ায় উঠে আসছে ! আরও কয়েক মুহূর্ত ঘাড় উঁচু করে থাকে দীনবালা, দাওয়ায় উঠছে, দরজা খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু ভেতরে আসছে না কেন ! হঠাৎ বুড়ির খুব ভয় করে, বাঘ আসেনি তো ! সে ভুলে যায় ছোট ছেলে বাড়ি নেই, ছোট্ট মেয়ের মতো তার নাম ধরে কেঁদে ওঠে, “বেন্দাবন,অ বেন্দাবন, মোর যে ভয় ধরে বাপ!”

    এইবার দরজা খুলে যায়, কুপির আলো এসে দীনবালার চোখে পড়ে, কাঁপা কাঁপা আলোর ঢেউয়ে তার নজর পড়ে মিনুর মুখের ওপর, সে মুখ ভাবলেশহীন, অন্য দিনের মতো মুখরা নয় আজ সে, বরং খুব বেশি চুপচাপ, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে শাশুড়ির দিকে। এক হাতে তার কুপি, আর একহাতে বৃন্দাবনের লাল গামছাটি। গামছার আড়ালে উঁচু মতো ও কি? মুড়ির বাটি? ক্ষিধের ঠ্যালায় বুড়ি কি ভুলভাল ভাবতে থাকে, না দেখতে থাকে? তার মনের কুয়াশা কি চোখেও উঠে এল! হঠাৎ দীনবালার মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়, সে স্বচক্ষে দেখতে পায় তার শ্যামলীকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জঙ্গলের দিকে, গরুটার মুখ শক্ত করে দড়ি দিয়ে কয়েক প্যাঁচে বাঁধা। বুড়ি হলে কী হবে, কী লড়াইটাই না দিচ্ছে বাছা তার! পেছনের দু পা টান করে যেন মাটিতে গেঁথে দিচ্ছে, শিং দুটো নাড়াচ্ছে ঘন ঘন। যাবে না, সে যাবে না সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে, বাঁচার হক তারও আছে।

    চোখ বড় করে, ঘাড় তুলে, অনেক কষ্ট করেও গামছার আড়ালে বৌ-এর হাতে মুড়ির বাটি নাকি কষে বাঁধবার মোটা দড়ি তা বুঝে উঠতে পারে না দীনবালা। তবুও তার দিকে মিনু এক পা এগিয়ে আসতেই প্রবল আতঙ্কে বুড়ি চিৎকার করে ওঠে, “যাব না, আমি যাব না বানপ্রস্থে, তুই আমারে বাঘের পেটে পাঠাতি চাস, রাক্ষুসি !”


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    ইদবোশেখির লেখাপত্তর | ইদ নিয়ে অন্য রকম ভাবনা | রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ ও আমাদের ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট | বরাতের রাত | চৈতন্য-আন্দোলনের সামাজিক দিকনির্দেশ | কবিতাগুচ্ছ | ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর | ফ্রেশ | ঘটনা : গল্পের মতো | অতল ও কয়েকজন | একশো না, চার বছরের নিঃসঙ্গতা | সাহিত্যে শিল্প, নীতি ও শরৎচন্দ্র | আধচেনা জলের গভীরে | রায়সাহেব | দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া | জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিবিধ ভাবনা | অন্ধকারে নিমগ্ন মানুষদের প্রতি | ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম | নয়ন সান্যালের উপাখ্যান | অবৈধ ভোটারের সন্ধানে | ডোম | ওহ, ডায়মন্ড! ডায়মন্ড! | শেষ পারানির কৌটো | কবিতা ভেবে | কালবৈশাখী | একটি প্রাচীন কাহিনি | বানপ্রস্থ | বার্বিডল
  • ইদবোশেখি | ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১২৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন