

অলংকরণ: রমিত
তর্ক চলছিল দলটার মধ্যে, টাকার হিসেব নিয়ে। গেজেট নোটিফিকেশন হয়ে গেছে। এখন তাই ডিএ কে কত পাবে, কিভাবে হিসেব হবে, তুমুল আলোচনা চলছে শিক্ষক আর সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে। ওরা সাত-আটজন রোজই এপথ দিয়ে যান নিজের নিজের কাজের জায়গায়। দলটা হোঁচট খেলো শফিকুল মাস্টারের বাড়ির সামনের জটলাটায় এসে। বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে গুমরে গুমরে কান্না আর বুক চাপড়ে হাহাকার। ব্যাপারটা জানতে পেরে চাকুরের দল কিছুক্ষণ গুম হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে “কী যে শুরু হয়েছে এবারে, কোনো মানে হয়না” বলে ক্ষোভ আর বেদনা প্রকাশ করে তারপর আবার পা চালান। হেডমাস্টার কেরাণি মণিরুলকে ডেকে বললেন, “তুই এসে পাওনাগণ্ডা হিসেব করে দিস। সব যেন ঠিকঠাক হাতে পায়, দেখিস”। “আচ্ছা”। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আবার ওরা সেই ডিএ-র হিসেবের গল্পে মশগুল হলো।
কিছুদিন ধরে শফিকুলের আব্বার শরীরটা আবার খারাপ যাচ্ছিল। শফিকুল কাজের চাপে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারছিলো না। প্রাণপণে কাজ করছিলো শফিক। আগের রাতে বেচারি বৌ-টা দু-বার খেতে ডাকতে এসে ধমক খেয়ে ফিরে গেছে। রাত এগারোটা নাগাদ মা এসে আবার বিরক্ত করা শুরু করেঃ “চাট্টা খেয়ে লে ব্যাটা, আমার খুব খিদা পেয়েছে। বৌটাও খেতে বসছেনা। আয়,” বলে কাঁধটা একটু ঝাঁকাতেই ও চটে উঠলো। “তোমরা খেয়ে লাও না। আমি পরে যাচ্ছি।“ কিছুতেই উঠতে পারেনা শফিক। প্রচণ্ড চাপ। তখনো অর্ধেকও আপলোড হয়নি। হাতে আর সময় নেই। এর মধ্যে শেষ করতে না পারলে চাকরিটা বোধহয় থাকবেনা। মুষড়ে পড়ে শফিক। এমন সময় হাঁটুতে নাড়া খেয়ে দেখে, বাবুল। “চলো না আব্বা, খেতে চলো। কেউ খাচ্ছেনা”। “তুই এখনো ঘুমাসনি? মাথা নাড়ে বাবুল। “কেন”? বাবুল চুপ। আবার, “চলোনা আব্বু” বলে টানাটানি শুরু করে। এবার আর পারলোনা শফিক। উঠতেই হলো। ঢাকনা তুলে ঠাণ্ডা খাবার কোনোরকমে মুখে গুঁজলো। আদ্দেক খেয়েই উঠে পড়লো। রাত তখন প্রায় বারোটা। নিঝুম পাড়ায় একটা কুকুর হঠাৎ হঠাৎ বেখাপ্পা ডেকে উঠছে। গত সপ্তাহে একবার আব্বার এমন হাঁপের টান উঠলো যে ওরা ভেবেছিলো এই বুঝি শেষ। শফিক দৌড়ে গিয়ে জোর করে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে আসে। তার ওষুধ পড়ায় আস্তে আস্তে ধরে প্রাণ ফিরে আসে। এর মধ্যে আবার ডাক্তার দেখানোর কথা ছিলো, নিয়ে যেতে পারেনি শফিক। ওষুধ আনারও সময় পাচ্ছেনা। আব্বা যদি না বাঁচে, শফিক নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেনা। দুশ্চিন্তা নিয়ে শফিক কাজে ফিরে গেল। ওর নিজের শরীরটাও ভালো যাচ্ছিলো না।
নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ। ভুলচুক হবার উপায় নেই, হলেই ভোটারের সর্বনাশ। তালিকায় নাম উঠবেনা, আর ভোটার ভোট দিতে পারবেনা। “আগেও তো কত্তবার আমরা ভোট দিয়েছি। এরকম তো হয়নি! এবার কী লাগলো রে ভ্যালা”? দুশ্চিন্তায় সব মানুষেরই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেনা কেউ। “আমাদের নামটা আছেতো মাস্টার? বাদ পড়েনি তো কেউ”? রাস্তায় বেরোলেই লোকে ছুটে আসে। “না চাচা, এখনো লিস্ট বেরোয়নি। চিন্তা কোরোনা, আমি সব একদম ঠিকমতো ফিলাপ করে পাঠাচ্ছি”।
ঘোষিত হল খসড়া তালিকা। তাতে বুথের প্রায় অর্ধেক লোকের নাম নেই। কী হল ব্যাপারটা? “তুমি বলে আমাদের নাম ধাম সব ঠিক করে লিখ্যা পাঠিয়েছো, তো লিস্টে আমাদের নাম নাই ক্যানে? বাড়িতে দুঝনার নাম আছে তো তিনঝনারই নাই ! ই ক্যমোন হলি”? শফিক মুখ চূণ করে বলে, “এটা ফাইনাল লিস্ট নয় কাকা। ফাইনাল লিস্ট বেরাক। এই খসড়াতে অনেক ভুল আছে। সেগুলো সংশোধন করার সুযোগ আছে। আমি সব ঠিক করে দেবো। তোমাদের চিন্তা নাই”। অনেকে মানতে চায়না। ভাবে শফিক নিশ্চয় তাদের সম্পর্কে ভুলভাল তথ্য দিয়েছে। কেউ কেউ বাড়ি এসেও চোটপাট করে যায়। “তুমি তো আগেও বল্যাছিলা সব ঠিক করে পাঠিয়েছো্ তো ফের নাম উঠলো না ক্যানে”? শফিক বলে, “আমার বাড়িরও কারুর নাম উঠেনি গো”!
সেই সংশোধনের কাজ চলছিলো। শরীর চলতে চায়না শফিকের। বুকে একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে কয়েকদিন হল। আগের রাতে ভাত খেয়ে জল খাবার পর কাজে বসেই শফিকের দুচোখে ঝাঁপিয়ে এলো ঘুম। টেবিলে মাথা রেখে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লো। বৌ সকালবেলা চা দিতে এসে ফিরে গেলো। আহা, ঘুমাক একটু। শাশুড়িও তাই শুনে খুশি হলো। বেলা আরেকটু বাড়লে শফিকের মা আবার গেলেন চা নিয়ে। “উঠ ব্যাটা” বলে একটু নাড়া দিতেই ঘাড়টা কাৎ হয়ে ঝুলে পড়লো। “আল্লা” বললে চিৎকার করে উঠলো মা। ছুটে এলো বৌমা। “কী হলো মা”? ”তুমি ও বাড়িতে খবর দাও, যাও শীগগির”। ছুটে এলো সম্পর্কে ফুফাতো ভাই তথা বন্ধু সাবির। সবাই মিলে ধরাধরি করে শফিককে মেঝেতে শুইয়ে দিলো। সাবির এরপর একছুটে বেরিয়ে গিয়ে ডাক্তারকে ধরে আনলো। নাড়ি দেখে, চোখ টেনে, স্টেথো লাগিয়ে গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উনি মাথা নাড়লেন, “ম্যাসিভ অ্যাটাক, ঘুমের মধ্যেই”। সাবির শুধালো,”ম্যাসেজ করবেননা ডাক্তারবাবু”? “লাভ নেই, অনেক দেরি হয়ে গেছে”। বেরিয়ে যাবার সময় সাবিরকে ডেকে আস্তে করে বললেন, “আমার ভিজিটটা দিয়ে আসিস”। শফিকের আব্বাজান টের পেয়ে বুক চেপে ধরে বেদম কাশতে কাশতে টলতে টলতে কোনোরকমে বেরিয়ে এসে ধপ করে শফিকের দেহের পাশে বসে পড়েন, তারপর শুয়ে পড়লেন। হাড় জিরজিরে বুকে হাত দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে, “আল্লা, এ তোর কেমন বিচার হলি আল্লা, আমাকে না নিয়ে…” গলা তার বুজে এলো।
এরপর শফিককে যথারীতি মাটি দেওয়া হল।
খবর পেয়ে ছুটে এলেন স্থানীয় বড় দলের নেতা। উনি খুব দুঃখ করলেন, সান্ত্বনা দিলেন, ছেলেটাকে আদর করলেন, সেলফি তুললেন আর পকেট হাতড়ে একটা একশো টাকার নোট বের করে শফিকের মায়ের হাতে জোর করে গুঁজে দিয়ে বলে গেলেন কোনো অসুবিধা হলে জানাতে। তার চলে যাবার সময় কে যেন ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো—আর দেখা পাওয়া যাবেনা। ওদিকে সাবিরের বাড়িতে অদ্ভুত অবস্থা। তালিকায় বাড়ির সকলের নাম উঠেছে। বাড়িতে খুশির হাওয়া বইছিল। তার ওপর আবার ওর ‘পেনসনজীবী’ শিক্ষক আব্বা আর পঞ্চায়েতের চাকুরে দাদার অ্যাকাউন্টে বেশ ভালো পরিমাণ ডিএ-র পাওনা টাকা ঢুকবে হিসেব করে আগের দিন বাজার থেকে পোলাও এর ভালো চাল আর মশলাপাতি আর খাসির মাংস আনা হয়েছে। শফিকের বাড়িরও সকলের নেমন্তন্ন ছিল। ওগুলোর কী হবে এখন? কাঁদতে কাঁদতে কি উৎসব করা যায়?
আব্বা হুকুম দিলেন মাংসটা পাশের গ্রামে চাচার বাড়ি দিয়ে আসতে।
পরদিন সব কাগজে খবর হলোঃ বিএলও শফিকুল ইসলামের হার্ট অ্যাটাকে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।
তালিকায় বুথের ভোটারদের নাম আর বেশি ওঠেনি। বাদ পড়া ভোটারদের কাছে হিয়ারিং-এর নোটিশ আসে। সব ডকুমেন্ট দিয়েও তাদের নাম ফাইনাল লিস্টে ওঠেনি। তারপর এলো ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি”। বিডিও অফিসে গিয়ে আবার কাগজ জমা দেওয়া হল। তাতেও লাভ হলনা। এরা হলো “বিচারাধীন”। বিচারে অল্প কয়েকজনের নাম উঠলো। বাকিদের নাকি এখন ট্রাইবুনালে যেতে হবে। তারপরেও নাম না উঠলে হবে ডি ভোটার। ওদিকে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে। পুশ ব্যাক করার কথাও শোনা যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা যে দোকান থেকে সার, বীজ কেনে সেখানে কীটনাশকের বিক্রি হঠাৎ বেড়ে গেছে, যদিও এখন চাষের সময় নয়।
তবে নতুন ফসল বুনবার সময়ের আর খুব দেরি নেই। কাল বৈশাখি আসছে।