বিদ্রোহী শাসক: মমতা মডেলের রাজনৈতিক রসায়ন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২৬ সালের নির্বাচনী কৌশলটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত কোনো তত্ত্বে ধরা পড়ে না, কারণ তিনি এখানে 'সেলফ-ক্যানিবালাইজেশন' বা নিজের তৈরি করা ব্যবস্থাকে নিজেই গ্রাস করার এক অকল্পনীয় সাহস দেখিয়েছেন। সাধারণত কোনো শাসক তাঁর প্রশাসনকে নিজের শক্তির উৎস মনে করেন, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেছেন। নির্বাচন কমিশন যখন একের পর এক প্রশাসনিক রদবদল ঘটালো—ডিজিপি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যন্ত সরিয়ে দিল—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই মুহূর্তটিকে নিজের প্রশাসনিক দায়মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেন। তিনি অত্যন্ত কৌশলে নিজের সেই ‘অদলবদল হওয়া’ প্রশাসনের বিরোধিতা শুরু করলেন, যেন এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তাঁর নয়, বরং নির্বাচন কমিশন তথা দিল্লির চাপিয়ে দেওয়া একটি ব্যবস্থা। এই প্রশাসনিক হারাকিরির মাধ্যমে তিনি ভোটারদের অবচেতনে এই বার্তাটি গেঁথে দিলেন যে— "আমার হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, এখন সিস্টেমে যা ভুল হচ্ছে তার দায় আমার নয়।"
এই কৌশলের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ দিক হলো তাঁর তৈরি করা সেই শক্তিশালী ন্যারেটিভ, যেখানে তাঁর প্রতিপক্ষ কেবল বঙ্গ বিজেপি নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র। তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে এই চিত্রটি অঙ্কন করেছেন যে— নির্বাচন কমিশন, ED, CBI, এমনকি উত্তরপ্রদেশ বা অসমের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা জোট বেঁধে কেবল তাঁর বিরুদ্ধে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বাংলা দখলের এক প্রবল ‘বাঙালি প্রতিশোধ স্পৃহা’ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধের আবহে বঙ্গ বিজেপির নেতারা কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। দিল্লি থেকে যখনই প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে হুঙ্কার দিয়েছেন, লড়াইটি ‘মমতা বনাম মোদী’ বা ‘বাংলা বনাম দিল্লি’র একটি হাই-প্রোফাইল দ্বন্দ্বে পর্যবসিত হয়েছে। এর ফলে বঙ্গ বিজেপির স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা কেবল ‘দিল্লির নির্দেশের অনুসারী’ হিসেবে সংকুচিত হয়ে গেছে। তাঁরা যখনই কোনো দুর্নীতির অভিযোগে সোচ্চার হয়েছেন, মমতা তাকে ‘দিল্লির ষড়যন্ত্র’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক গুরুত্বকে ম্লান করে দিয়েছেন।
এই ‘সংকটের বয়ান’ মমতা অত্যন্ত কৌশলে ‘প্রাপ্তির হিসেব’-এর সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। একদিকে প্রশাসনিক রদবদলে তৈরি হওয়া ‘অস্তিত্বের সংকট’, আর অন্যদিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী বা দুয়ারে সরকার-এর মতো সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের হাতে পৌঁছানো নগদ ও পরিষেবা—এই দুইয়ের মিশেলে তিনি ভোটারের সামনে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ তুলে ধরেছেন। সাধারণ মানুষ যখন দেখছেন কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো সক্রিয় হচ্ছে বা কমিশন তাঁর অফিসারদের সরিয়ে দিচ্ছে, তখনই তাঁরা নিজেদের প্রাপ্তির হিসেবটি মিলিয়ে নিতে পারছেন। ফলে, শাসকের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক ক্ষোভটি নিমিষেই ‘নিজের রক্ষাকর্তাকে বাঁচানোর’ তাগিদে রূপান্তরিত হচ্ছে। মানুষ ভাবতে বাধ্য হচ্ছে— ‘মমতা না থাকলে এই প্রাপ্তিগুলোও কি থাকবে?’ এই একটি প্রশ্নই বিরোধীদের যাবতীয় অভিযোগকে ভোঁতা করে দিয়েছে।
দার্শনিক স্তরে এটি এক ধরণের 'অস্তিত্ববাদী রাজনীতি'। তিনি প্রমাণ করেছেন যে তাঁর কাছে ক্ষমতার গদি কেবল শাসনের জন্য নয়, বরং ‘অনন্তকাল লড়াইয়ের মধ্যে থেকে’ মানুষের অস্তিত্বের সাথে একাত্ম হওয়ার মাধ্যম। নিজের সাজানো প্রশাসন ভেঙে দেওয়ার পরেও সেই পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে দিল্লির বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির একক সেনাপতি হয়ে তিনি যেভাবে নিজেকে ২০২৬-এ তুলে ধরেছেন, তা সম্ভবত আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এক অনন্য গবেষণা হয়ে থাকবে। জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, এই ‘আত্ম-ধ্বংসাত্মক পুনর্নির্মাণ’ তাঁকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে যেখানে তিনি প্রশাসনের ঊর্ধ্বে এবং বাঙালির আবেগীয় ও দৈনন্দিন প্রাপ্তির ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।