এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিদ্রোহী শাসক: মমতা মডেলের রাজনৈতিক রসায়ন

    অখিল রঞ্জন দে লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ৫৮ বার পঠিত
  •  
    বিদ্রোহী শাসক: মমতা মডেলের রাজনৈতিক রসায়ন
     
    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০২৬ সালের নির্বাচনী কৌশলটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত কোনো তত্ত্বে ধরা পড়ে না, কারণ তিনি এখানে 'সেলফ-ক্যানিবালাইজেশন' বা নিজের তৈরি করা ব্যবস্থাকে নিজেই গ্রাস করার এক অকল্পনীয় সাহস দেখিয়েছেন। সাধারণত কোনো শাসক তাঁর প্রশাসনকে নিজের শক্তির উৎস মনে করেন, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেছেন। নির্বাচন কমিশন যখন একের পর এক প্রশাসনিক রদবদল ঘটালো—ডিজিপি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যন্ত সরিয়ে দিল—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই মুহূর্তটিকে নিজের প্রশাসনিক দায়মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেন। তিনি অত্যন্ত কৌশলে নিজের সেই ‘অদলবদল হওয়া’ প্রশাসনের বিরোধিতা শুরু করলেন, যেন এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তাঁর নয়, বরং নির্বাচন কমিশন তথা দিল্লির চাপিয়ে দেওয়া একটি ব্যবস্থা। এই প্রশাসনিক হারাকিরির মাধ্যমে তিনি ভোটারদের অবচেতনে এই বার্তাটি গেঁথে দিলেন যে— "আমার হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, এখন সিস্টেমে যা ভুল হচ্ছে তার দায় আমার নয়।"
    ‌‌ এই কৌশলের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ দিক হলো তাঁর তৈরি করা সেই শক্তিশালী ন্যারেটিভ, যেখানে তাঁর প্রতিপক্ষ কেবল বঙ্গ বিজেপি নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র। তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে এই চিত্রটি অঙ্কন করেছেন যে— নির্বাচন কমিশন, ED, CBI, এমনকি উত্তরপ্রদেশ বা অসমের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা জোট বেঁধে কেবল তাঁর বিরুদ্ধে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বাংলা দখলের এক প্রবল ‘বাঙালি প্রতিশোধ স্পৃহা’ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধের আবহে বঙ্গ বিজেপির নেতারা কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। দিল্লি থেকে যখনই প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে হুঙ্কার দিয়েছেন, লড়াইটি ‘মমতা বনাম মোদী’ বা ‘বাংলা বনাম দিল্লি’র একটি হাই-প্রোফাইল দ্বন্দ্বে পর্যবসিত হয়েছে। এর ফলে বঙ্গ বিজেপির স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা কেবল ‘দিল্লির নির্দেশের অনুসারী’ হিসেবে সংকুচিত হয়ে গেছে। তাঁরা যখনই কোনো দুর্নীতির অভিযোগে সোচ্চার হয়েছেন, মমতা তাকে ‘দিল্লির ষড়যন্ত্র’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক গুরুত্বকে ম্লান করে দিয়েছেন।
    ‌ এই ‘সংকটের বয়ান’ মমতা অত্যন্ত কৌশলে ‘প্রাপ্তির হিসেব’-এর সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। একদিকে প্রশাসনিক রদবদলে তৈরি হওয়া ‘অস্তিত্বের সংকট’, আর অন্যদিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী বা দুয়ারে সরকার-এর মতো সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের হাতে পৌঁছানো নগদ ও পরিষেবা—এই দুইয়ের মিশেলে তিনি ভোটারের সামনে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ তুলে ধরেছেন। সাধারণ মানুষ যখন দেখছেন কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো সক্রিয় হচ্ছে বা কমিশন তাঁর অফিসারদের সরিয়ে দিচ্ছে, তখনই তাঁরা নিজেদের প্রাপ্তির হিসেবটি মিলিয়ে নিতে পারছেন। ফলে, শাসকের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক ক্ষোভটি নিমিষেই ‘নিজের রক্ষাকর্তাকে বাঁচানোর’ তাগিদে রূপান্তরিত হচ্ছে। মানুষ ভাবতে বাধ্য হচ্ছে— ‘মমতা না থাকলে এই প্রাপ্তিগুলোও কি থাকবে?’ এই একটি প্রশ্নই বিরোধীদের যাবতীয় অভিযোগকে ভোঁতা করে দিয়েছে।
    দার্শনিক স্তরে এটি এক ধরণের 'অস্তিত্ববাদী রাজনীতি'। তিনি প্রমাণ করেছেন যে তাঁর কাছে ক্ষমতার গদি কেবল শাসনের জন্য নয়, বরং ‘অনন্তকাল লড়াইয়ের মধ্যে থেকে’ মানুষের অস্তিত্বের সাথে একাত্ম হওয়ার মাধ্যম। নিজের সাজানো প্রশাসন ভেঙে দেওয়ার পরেও সেই পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে দিল্লির বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির একক সেনাপতি হয়ে তিনি যেভাবে নিজেকে ২০২৬-এ তুলে ধরেছেন, তা সম্ভবত আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এক অনন্য গবেষণা হয়ে থাকবে। জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, এই ‘আত্ম-ধ্বংসাত্মক পুনর্নির্মাণ’ তাঁকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে যেখানে তিনি প্রশাসনের ঊর্ধ্বে এবং বাঙালির আবেগীয় ও দৈনন্দিন প্রাপ্তির ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2402:e280:2141:1e8:94f2:13fa:5f7:***:*** | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩২740365
  • "তাঁকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে যেখানে তিনি প্রশাসনের ঊর্ধ্বে এবং বাঙালির আবেগীয় ও দৈনন্দিন প্রাপ্তির ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছেন" - এটা পড়ে অনেকক্ষন হাসলাম।
     
    মমতার মতো করাপ্ট পলিটিশিয়ান মনে হয়না পবতে আর কেউ আছে বলে। ওনার আগে সিপিএমও করাপ্ট ছিল, কিন্তু উনি সারদা, রোজ ভ্যালি ইত্যাদি দিয়ে যা শুরু করেছিলেন সেটাই আরও ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনোরা পবর শিক্ষা আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে, যার একটা ফল হলো আর জি কর কান্ড, যেখানে প্রিন্সিপালকে কি কারনে যেন প্রোটেক্ট করতে পুলিশের হাই র‌্যাংকিং অফিসাররা অবধি সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। আর তিনো দলে চিটিংবাজ, গুন্ডা, দুর্নীতিগ্রস্ততে ভর্তি, যারা কোটি কোটি টাকা চুরি করছে। তারপর নাকি বাঙালির আবেগ! মাইরি laugh
  • অখিল রঞ্জন দে | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:২২740367
  • প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত নিপুণভাবে নিজেকে সেই কলুষিত ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে এক জন ‘একাকী যোদ্ধা’ হিসেবে পুনঃস্থাপন করেছেন। তিনি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের অভিমুখটি সরকারের থেকে সরিয়ে সুকৌশলে ‘দিল্লির বঞ্চনা’ ও ‘অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্কটে’র দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। নিজের প্রশাসনের বিরুদ্ধেই সরব হওয়ার এই স্পর্ধা ও ‘বিদ্রোহী’ সত্তার আড়ালে তিনি বিরোধীদের প্রতিবাদের জমিটিকেই কেড়ে নিয়েছেন। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, বরং শাসনের গদিতে বসেও বাঙালির অবচেতনে এই অপরাজেয় ‘লড়াকু’ ইমেজটি বজায় রাখাটাই তাঁর রাজনীতির শ্রেষ্ঠ জাদুকরী। এটুকুই বলতে চেয়েছি। ধন্যবাদ
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন