এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইদবোশেখি  ইদবোশেখি

  • ধর্মে মিলিত, ভাষায় বিভাজিত দেশ - বেলজিয়াম

    হীরেন সিংহরায়
    ইদবোশেখি | ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ৬২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ছবি: রমিত



     


    দেউড়িতে একটা সরকারি প্রদীপ জ্বালানো চলে কিন্তু একমাত্র তারই তেল জোগাবার খাতিরে ঘরে ঘরে প্রদীপ নেবানো চলে না। 
    -ভাষা ও সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ 

    প্রাক কথন 

    লন্ডন হোবোরন ভায়াডাকটের আটলান্টিক হাউসে হোগান লভেল নামক আইনি সংস্থা আয়োজিত আফ্রিকা সেমিনারে আমার পৌঁছুনোর কথা সন্ধ্যে ছটায়। কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে সেই ঠিকানায় না গিয়ে হাজির হয়েছিলাম লন্ডন ডকল্যান্ডে তাদের আরেক অফিসে। ভুল বুঝে যতক্ষণে লভেলের সভাগৃহে উপনীত হয়েছি, আলোচনা চক্র শুরু হয়ে গেছে, মঞ্চে আমার নেম বোর্ড লেখা আসনটি শূন্য। 

    দেরির জন্যে ক্ষমা চেয়ে বসতেই হোতা অ্যানড্রু টেলর বললেন, না, না; সবে শুরু করেছি, এই তৃতীয় স্লাইড। আফ্রিকায় ব্যবসা করার পথে যে কী কী বাধা সে বিষয়ে এখানে সমবেত ব্যাঙ্কাররা অবগত আছেন, তাদের মধ্যে হয়তো প্রধান শঙ্কা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা - যে কারণে প্রাপ্য টাকা সময়মত ফেরত আসে না। আপনারা সেটা কীভাবে দেখেন? 

    একদা সিটি, পরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কের জার্সি গায়ে আফ্রিকার পথে পথে অনেক ধুলো উড়িয়েছি। বাজারে এক্সপার্ট বলে দুর্নাম আছে, সেই সুবাদে যত্রতত্র দুটো কথা বলার সুযোগ মেলে। দু-দশক যাবত আফ্রিকাকে চিনেছি জেনেছি, তাকে কখনো পর ভাবিনি। যোগ্য সমালোচনা অবশ্যই জরুরি কিন্তু ইউরোপীয়দের মুখে সেটা অনেক সময়ে সেটা একপেশে বক্তিমের মত শোনায়। 

    প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে প্রথা বিরুদ্ধ মন্তব্য করার বদনাম আমার আছেই। তাই বললাম 

    - অবশ্যই! দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের স্থিতিশীলতা দেয় আস্থা, তার ঘন ঘন পরিবর্তন যে কোন ব্যাঙ্কারের পক্ষেই চিন্তার কারণ। সরকার বদলালে মন্ত্রী বদলায়, পলিসি বদলায়। আফ্রিকায় ৫৪টি দেশ, তার তিনটে দেশে হয়তো এখন সামরিক শাসন, কিন্তু কেনিয়া থেকে ঘানা, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে টিউনিসিয়ায় ডজন ডজন দেশে ভোটবাক্স মারফত সরকার পালটাচ্ছে কয়েক দশক যাবত। কাজেই গোটা আফ্রিকার ওপরে এই অনিশ্চয়তার কসুর চাপিয়ে দেওয়া কি উচিত হবে? 

    হলে স্তব্ধতা।

    নীরবতা ভঙ্গ করে বললাম, ব্যাপারটা খানিক প্রাসঙ্গিকভাবে দেখা যাক। ব্যবসার কারণে আমরা দীন দুনিয়ার খবর রাখি, রাখতে বাধ্য হই। গোটা ইউরোপ একই কায়দায় চলে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সত্তর বছরে ইতালিতে পঞ্চাশবার সরকার বদলেছে, পূর্ব ইউরোপের সতেরোটা দেশে নতুন সংবিধান লেখা হয়েছে। সরকারের পটবদল কি শুধু আফ্রিকান সমস্যা? আচ্ছা একটা প্রশ্ন তুলি - এই ইউরোপে এমন কোন গণতান্ত্রিক দেশের কথা কি আমাদের জানা আছে যেখানে ৫৮৪ দিন কোন নির্বাচিত সরকার ছিল না? পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন হয়নি, দেশ চলতো তত্ত্বাবধায়ক আমলাদের দ্বারা, রাষ্ট্রপতির অনুশাসনে? 

    লভেলের অডিটোরিয়াম বুলরিঙের কায়দায় বানানো, ধাপে ধাপে উঠে গেছে; আবছা আলোয় শ্রোতাদের চোখ মুখ দেখা যায় না। কারো সাড়া নেই, উত্তরের অপেক্ষা করছি এমন সময়ে প্রায় শেষের সারি থেকে একটি মেয়ের ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা গেল।

    - জানি, বেলজিয়াম। সেটা আমার দেশ। 

    - ধন্যবাদ। আমাদের ব্যবসায় সবচেয়ে বড়ো বিড়ম্বনা - আমার টাকা কি ফেরত এলো, সেকি এলো না! মনে রাখা দরকার, আফ্রিকা ৫৪টি দেশ নিয়ে এক মহাদেশ, তার পলিটিকাল স্টেবিলিটি দেশ অন্তর আলাদা। ইউরোপে আমরা ইতালি বেলজিয়ামের সমস্যাকে উপেক্ষা করে থাকি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নামের অভিভাবক আছে বলে? আফ্রিকার দেশকে বাঁচায় কে? এর নাম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। সেটা আরেক বিতর্ক। 

    ভাষায় বিভাজিত বেলজিয়াম



    ধর্মরক্ষার্থে 

    রাষ্ট্রসংঘের হিসেব অনুযায়ী আজকের ইউরোপে সার্বভৌম দেশের সংখ্যা চুয়াল্লিশ। মাত্র দুশো বছর আগেও এ মহাদেশ ছিল বহু জমিদারির সমষ্টি, খুব কম দেশেরই ছিল আপন পতাকা, সংবিধান, পার্লামেন্ট। বেলগে নামের এক জাতি যে অঞ্চলে বাস করতো তাকে জুলিয়াস সিজার বেলজিকা বলেছেন (যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মাঝে কখন যে তিনি খাগের কলম হাতে তাঁবুতে বসে ডায়েরি লেখার সময় পেতেন কে জানে)। বেলজিকা পরে নেদারল্যান্ডের জমিদারির অন্তর্গত হলো। রাজারা প্রথমে স্প্যানিশ পরে অস্ট্রিয়ান হাবসবুর্গ রাজাদের তিজৌরিতে খাজনা জমা করতেন। এরপর নেপোলিয়নের আবির্ভাব –তিনি ইউরোপের ভূগোল না হোক স্কুলপাঠ্য ম্যাপের রং বদলাতে থাকলেন। অস্ট্রিয়ান হাবসবুর্গের পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের ভণ্ডামি ঘুচিয়ে তাদের ভিয়েনায় ফেরত পাঠিয়ে নেদারল্যান্ডের রাজপাট দিলেন ভাই লুই বোনাপার্টের হাতে। ওয়াটারলু যুদ্ধের পরে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ ম্যাপের পুরনো রং ফিরিয়ে ভূগোল বইয়ের বিক্রির বাজারে তেজি আনলেন কিন্তু এই চেষ্টা সর্বত্র সফল হলো না। 

    নেপোলিয়নের কিংডম অফ নেদারল্যান্ড দেখা দিল বৃহত্তর রূপে, ইউনাইটেড প্রভিন্সেস অফ নেদারল্যান্ড নামে, বেলজিকা লুকসেমবুর্গ তার অংশ। 

    কয়েকশ বছরের স্প্যানিশ/অস্ট্রিয়ান ক্যাথলিক প্রভুত্ব সত্ত্বেও ডাচ জাতি তার ধর্ম বজায় রেখেছে। আমস্টারডামের রাজা প্রটেস্টান্ট। তাঁর প্রজাদের বিশাল অংশ সেই ধর্মের অনুগামী। হাবসবুর্গ বিদায়ে প্রমাদ গুনল ইউনাইটেড প্রভিন্স অফ নেদারল্যান্ডের দক্ষিণ অংশের দুটি রাজ্য, ফ্ল্যানডারস এবং ওয়ালোনিয়া, তারা এতদিন ছিল ক্যাথলিক রাজা এবং রোমের বড়ো পুরোহিতের অভয় আশ্রয়ে। নেদারল্যান্ডের প্রটেস্টান্ট রাজা ভিলেমকে মানতে তারা রাজি নয়, তিনি ভ্যাটিকানের সামনে মাথা নোয়ান না। 

    ফ্ল্যানডারস এবং ওয়ালোনিয়ায় রব উঠলো, আমাদের ধর্ম বিপন্ন, ক্যাথলিক খতরে মে হ্যায়।

    ফ্ল্যানডারস এবং ওয়ালোনিয়া গায়ে গা লাগানো প্রতিবেশী। ক্যালে থেকে আমাদের জার্মান কুটিরে পৌছুনোর সিধে রাস্তা ই ৪২ দিয়ে ফ্লেমিশ লয়ভেন হতে ফ্রাংকোফোন লিয়েজ যেতে লাগে ঘণ্টা খানেক (জার্মান সীমান্ত অবধি এই মোটরওয়ে একেবারে সোজা, গাড়ির স্টিয়ারিঙ দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা যায়!)। কিন্তু এই দু-পক্ষ গলা জড়াজড়ি করা ভাই বেরাদর নয়। সামাজিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক দিকে দিয়ে তাদের মাঝে বিস্তর ফারাক। কাগজ কলমে বেলজিয়ামের দলিল যখন বানানো হচ্ছে, ফ্ল্যানডারস ছিল ছোট চাষি, সুতোর কারখানার মজুর, বন্দরের কর্মীদের দেশ। শিল্প সাহিত্য দূরের কথা, লেখাপড়ার দৌড় কম, আমস্টারডাম উটরেখটে ডাচ ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ অফুরন্ত কিন্তু ফ্ল্যানডারসের লয়ভেন বা গেনট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যম ফরাসি, ফ্লেমিশ নয়। ভদ্র সমাজে ফরাসির বোলবোলা, ফ্লেমিশ নিতান্ত কৃষকের মুখের বুলি। আয়ের হিসেবে এঁরা নিচের তলার লোক। 

    অন্যদিকে ওয়ালোনিয়ার মানুষ সংখ্যায় কম কিন্তু অর্থনীতির মাপে অনেকটা উঁচুতে। লোহা কয়লা ভারি শিল্পে ইউরোপে তারা এক নম্বরে, আরেক দল জোতদার, জমিদার। তাঁদের কোঁচার পত্তন বা সুটের বাহার অন্য মাপের। তাঁরা ফরাসি বলেন, নামুর, লিয়েজের বৈঠকখানায় রেস্তোরাঁয় মূল্যবান ওয়াইন সহযোগে রুশো ভলতেয়ার নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। ফ্লেমিশরা থাকে ওধারে। ফ্ল্যানডারসের তুলনায় তাঁদের গড় আয় অনেক বেশি। তাঁরা উচ্চঘর, কংস রাজের বংশধর।

    ওয়ালুন নামের একটা কথ্য ভাষা ছিল একদা তবে কালে সেটি ফরাসিতে পরিণত হয়েছে। তবে সে সূত্রে ফ্রান্সের সঙ্গে তাঁদের কোন আত্মিক সম্পর্ক কখনো গড়ে ওঠেনি। ভাষা এক হলেই এক দেশ একতা হয় না। জেনিভার মানুষ নিজেকে ফরাসি ভাবেন না, জালৎসবুর্গের মানুষ নিজেদের জার্মান ভাবেন না, তাঁরা সুইস, অস্ট্রিয়ান। এমনকি ওয়ালোনিয়ানদের উচ্চারণ ফরাসিদের হাসির খোরাক যোগায়, ফ্রান্সের উবি সাঁ লোতে আমাদের প্রতিবেশী মসিউ দুকোপেনি বলতেন, বেলজিয়ানরা মনে করে তারা ফরাসি বলছে! 

    ফ্ল্যানডারসের ফ্লেমিশ ও হল্যান্ডের ডাচ নিকটতম আত্মীয়া, নদে শান্তিপুর আর বর্ধমানের মুখের ভাষার মতন। অ্যান্টওয়ারপের বান্ধবী লিডিয়া উইটস বলতো ডাচ ও ফ্লেমিশের শব্দ সম্ভার একই, পার্থক্য তার ব্যবহার এবং উচ্চারণে। খাওয়া দাওয়া সামাজিক সংস্কৃতিতে ডাচ এবং ফ্ল্যানডারসের মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে গেলে মাইক্রোস্কোপ লাগে। তাঁদের গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকায় ইস্টার ক্রিসমাস একই দিনে। সমস্যা হলো ধর্ম এক প্রভু এক কিন্তু তার বন্দনার রীতি আলাদা। রাজা ভিলেমকে মেনে নিলে নিজেদের ধর্মনাশ। 

    ধর্মরক্ষার্থে ফ্ল্যানডারস এবং ওয়ালোনিয়া একত্র হয়ে ডাচ রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ভিলেম পাঁচ হাজার সেনা পাঠিয়েছিলেন, শোনা যায় মাত্র সতেরশ ফ্ল্যানডার, ওয়ালুন সেনা ব্রাসেলসের দরোজায় তাদের আটকে দেয়। 
     

    ১৮৩০ সালে বেলজিয়ান বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল যেখান থেকে


    ১৮৩০ সালের চৌঠা অক্টোবর একটি নতুন দেশের জন্ম ঘোষিত হল, ফরাসিতে বেলজিক, ফ্লেমিশে বেলজি জার্মানে বেলগিয়েন। রাষ্ট্রসঙ্ঘ অনেক দূরে; ইউরোপের তিন শক্তি, ইংল্যান্ড ফ্রান্স প্রাশিয়া খুশি, ফ্রান্স আর জার্মানির মধ্যে একটা বাফার স্টেট রাখা মন্দ নয় তবে মিলেছে দুটি শর্তে – প্রোগ্রেসিভ ভাবনা চিন্তা সহ লিবারাল প্রজাতন্ত্র নয়, দেশ হবে রাজতান্ত্রিক এবং অঙ্গীকার করতে হবে সকল যুদ্ধে সংঘর্ষে এ দেশ থাকবে নিরপেক্ষ, সুইজারল্যান্ডের মতন। নতুন দেশ, তার রাজা খুঁজতে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো। শেষ অবধি যিনি গদিতে বসলেন সাক্সা কোবুর্গের সেই রাজকুমার লেওপোলড আবার প্রটেস্টান্ট! সেই একই বছরের জুলাই মাসে আমাদের স্কটিশ চার্চ কলেজের পত্তন হয় উত্তর কলকাতায়। সে কলেজের স্থাপনা হয়েছিল ভারতে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে, ফ্ল্যানডারস এবং ওয়ালোনিয়া মিলে বেলজিয়ামের স্থাপনা হল ধর্মরক্ষার উদ্দেশ্যে। 
    মিলকে জুলকে রহো, প্রভুকে গুণ গাও। 

    এমনি চলছিল একশ বছর। একদিন ফরাসি বাবু কালচারকে চমকে দিয়ে দরিদ্র ফ্ল্যানডারস মাথা তুলে দাঁড়াল, লোহা কয়লা ভারি শিল্পের দিন ফুরুল, লিয়েজ নামুরকে পেছনে ফেলে, অ্যান্টওয়ারপ থেকে গেনট ব্রুঘে ব্রাসেলসে নতুন টেকনোলজি লজিস্টিকস এবং দ্রুত বর্ধমান রেল লাইন ফ্ল্যানডারসকে এনে দিলো অর্থনীতিক বল। দুটি ভাই আর পোপের গাজন গেয়ে দিন কাটাতে চায় না। 
    ধর্মের বনাবনি ঘুচে গেলো। 
    তার মূল কারণ ভাষা। 

    বাফার  স্টেট বেলজিয়াম



    একের বুলি পরের গালি 

    দেশে দেশে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে জাতি, ধর্ম, গাত্রবর্ণ, কুল শীল আচার প্রথা। বেলজিয়ামে দেখা দিলো ভাষার আপারথাইড। এ দেশ তিনটি ভাষা ভিত্তিক অঞ্চলে বিভক্ত – ফ্লেমিশ (সংখ্যাগুরু), ফরাসি এবং অতি ক্ষুদ্র জার্মান ভাষী এলাকা অয়পেন-মালমেদি যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানি থেকে কেটে বেলজিয়ামে জুড়ে দেওয়া হয় (গাড়ি চালিয়ে যাবার পথে এই অঞ্চলটি সব সময়ে আমার কৌতূহল উদ্রেক করেছে, তিনশ মিটার উঁচু একটি টিলার ওপরে আছে একটি পিলার, তার নাম দ্রাই লেনডারএক, বেলজিয়াম জার্মানি নেদারল্যান্ডস মেলে একটি বিন্দুতে)।
     

    দ্রাই লেনডারএক



    বেলজিয়ামকে বিভক্ত করেছে ভাষা - পাড়ার লাইব্রেরি থেকে টেলিভিশন, পৌরসভা, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির শিক্ষা ব্যবস্থা, খবরের কাগজ, ফুটবল টিম এবং রাজনৈতিক দল সর্বত্র। তিন ভাষাভাষী অঞ্চলে (কমিউনিটি) তিনটে আলাদা স্বায়ত্ত্ব শাসন। ব্রাসেলস যদিও পড়ে ফ্লেমিশ এলাকায়, এটি দ্বিভাষিক। সেটাও নামেই কারণ স্কুল কলেজের পাঠ প্রক্রিয়া ভাষা অনুযায়ী আলাদা। বেলজিয়ামে কোন ন্যাশনাল পলিটিকাল পার্টি, টাইমস বা ফ্রাঙ্কফুরটার আলগেমাইনের মতো কোন জাতীয় সংবাদপত্র, ন্যাশনাল টেলিভিশন, ন্যাশনাল স্কুল কারিকুলাম নেই, ফ্ল্যানডার ছেলে বা মেয়ে কোন ওয়ালুনের প্রেমে পড়েন না, বিয়ে প্রায় অকল্পনীয় বিপর্যয়। ফ্লেমিশদের পার্টিগুলি যেমন ফ্লামসে বেভেগিং (ফ্লেমিশ আন্দোলন) ডানদিকে হাঁটে, ফরাসি পাড়ার দল যেমন মুভম রেফরমাতুর বা পার্টি সোশিয়ালিস্ত মোটামুটি লিবারাল। ফরাসি পাড়ায় ফ্লেমিশ কোন পার্টির জুলুস বের করার সখত মানা। আমার পরিচিত জনের সূত্রে জানি বেলজিয়ামে বাড়ি ভাড়া করতে গেলে ভাষার পরীক্ষা দিতে হয় –ফ্লেমিশ বললে ফরাসি শারলরোয়া শহরের বাড়িওলা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দূর করে দেবেন।

    সমস্যাটি বিশাল আকার ধারণ করে দ্বিভাষিক ব্রাসেলসে। তার লাগোয়া ছটি উপশহর এবং ৩৫টি ওয়ার্ডের ভৌগোলিক অবস্থান ফ্লেমিশ এলাকায়। আইনত ফ্রাংকোফোন ভোটারদের সেখানে ভোট দেয়ার কোন বাধা নেই ফ্লেমিশ জনতা খাপ্পা কেন না ওয়ালোনিয়াতে যে সামান্য সংখ্যক ফ্লেমিশ বাস করেন তাঁদের সেখানে ভোটাধিকার নেই। 

    ব্রাসেলসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রবাসের সময়ে। কন্টিনেন্টাল ব্যাঙ্কে কাজ করি, আমাদের ইউরোপিয়ান ট্রেনিং সেন্টার ছিল ব্রাসেলসের রু দে লা লোয়াতে (সিংহ পথ), জুবিলি পার্কের উঁচু ফোয়ারা ছাড়িয়ে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদর দফতরের প্রায় মুখোমুখি। আমাদের ফ্লেমিশ সহকর্মী হ্যারমান ফেরময়লেন থাকতেন লিংকেবেকে, ব্রাসেলস সিটি লিমিটের দু হাত দূরে। যেহেতু এটি ব্রাসেলস কমিউনের মধ্যে পড়ে, এখানে ভাষা ভিত্তিক বিভাজন খাটবার কথা নয়। এক সময়ে কোন ফরাসি মেয়র দু ভাষায় ইস্তেহার পাঠানো শুরু করেছিলেন, ফ্লেমিশ আভ্যন্তরীণ মন্ত্রী নিজে এসে বারণ করে গেছেন, ফ্লেমিশ এলাকায় ফরাসি ইস্তেহার কভি নহি। ভাষা পুলিশ পৌরসভা মিটিঙে সরেজমিন তদন্ত করে –সভা পরিচালিত হতে হবে ফ্লেমিশে, ফরাসিতে নেওয়া কোন সিদ্ধান্ত পত্রপাঠ বাতিল। হ্যারমান প্রাইমারি স্কুলের দোতলায় ক্লাস করেছেন, ফরাসি ছাত্র ছাত্রী একতলায়। তারা খেলে আলাদা মাঠে। ফ্লেমিশ কমিউনিটি পুলিশ এসে নিয়মিত লাইব্রেরির বই চেক করে, বিদ্যা অর্জনের জন্য নয়; অন্তত ৬০% বই ডাচ ভাষায় না থাকলে লাইব্রেরির গ্রান্ট বাতিল। 

    ব্রাসেলস শুমান মেট্রো স্টপ থেকে মিনিট পনেরো দূরত্বে ভিলভরদেতে রোদিকাদের পারিবারিক বন্ধু অ্যানি থাকতেন। জার্মানি আসা যাওয়ার পথে সেথায় থেমেছি। এঁরা ফ্লেমিশ কিন্তু ফরাসি তাঁদের প্রথম ভাষা, ওয়ার্ডের নাম ব্রাসেলস-হালে-ভিলভরদে। ফ্লেমিশ পার্টিগুলির দুশ্চিন্তা হলো এধরনের মানুষ জন্মসূত্রে ফ্লেমিশ কিন্তু বেশি ফরাসি ঘেঁষা, তাই দ্বিভাষিক ব্রাসেলসে এঁরা কোন ফ্রাংকোফোন পার্টিকে ভোট দিয়ে জেতাতে পারেন, সেটি হতে দেওয়া যায় না! জোর গলায় বলা হয়, আমি বেলজিয়ান নই, আমার পরিচয় আমি ফ্লেমিশ। যেহেতু ফ্ল্যানডারস আজকে বেলজিয়ামের ইকনমিক এঞ্জিন, ফ্লেমিশ পার্টিগুলি এই সম্পদ ওয়ালোনিয়ার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় না, তারা মনে করে এটি এক অসমঞ্জস ব্যবস্থা, ফরাসি ওয়ালোনিয়া নিতান্ত অন্যায় ভাবে ফ্ল্যানডারসের টাকা সাইফন করে নিচ্ছে।

    ধর্ম থেকে কর্মে আসে মতি – তুষার রায় 

    ধর্মের ডানায় ভর করে বেলজিয়াম দেশটা ইতিহাসে দেখা দিয়েছিল। সংবিধান মাফিক বেলজিয়াম সেকুলার দেশ; ষাট শতাংশ লোক নিজেদের ক্যাথলিক বলে ঘোষণা করেন, মাত্র দশ শতাংশ নিয়মিত চার্চে যান। তিরিশ শতাংশ ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখেন না। 
    কর্মের বলে সোয়া কোটি মানুষের দেশ বেলজিয়ামের মাথা পিছু আয় ৫০ হাজার ডলার, ইউরোপের ছ-নম্বরে। 
    এই বিভেদ এই ঘৃণা নিয়ে দেশটা চলে কি করে? উত্তর হয়তো এই যে দৈনন্দিন জীবনে দু পক্ষের দেখা সাক্ষাৎ হয় না, কেউ কারো সঙ্গে মারামারি হাতাহাতি করেন না। আলাদা থাকেন। 
    একটা জায়গায় দু পক্ষকে মুখোমুখি বসতে হয়; তার নাম পার্লামেন্ট যেটি নির্বাচিত হয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী। কোন জাতীয় দল নেই, কারো পক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা অসম্ভব, একমাত্র উপায় মিলেমিশে সরকার বানানো। মতে প্রায়ই মেলে না, সরকার গঠন হয় না। রেকর্ডের পর রেকর্ড বানায় বেলজিয়াম, ৫৪৮ দিন নয়, নতুন মাইলস্টোন ৬৮৯ দিন। 

    ধর্ম যাদের একদিন একত্র করেছিল, ভাষা তাদের সরিয়ে দিয়েছে দূরে।

    বেলজিয়াম আজ পুরোপুরি ফেডারাল –তিনটি প্রদেশে বিভক্ত: ফ্লেমিশ, ওয়ালোনিয়া এবং দ্বিভাষী ব্রাসেলস, প্রত্যকের আছে নিজস্ব পার্লামেন্ট ও সরকার। তার পাশাপাশি ফ্লেমিশ ফরাসি ও জার্মান ভাষাভাষী, এই তিনটি কমিউনিটির সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্বায়ত্ত শাসনের অধিকার আছে কিছু বিষয়ে, যেমন সংস্কৃতি, স্কুলের কারিকুলাম, স্বাস্থ্য , সমাজ কল্যাণ এবং সর্বশক্তিসম্পন্ন ভাষা পুলিশ।

    ব্রাসেলসের কেন্দ্রীয় সরকার, তিনটে প্রাদেশিক সরকার এবং তিনটে কমিউনিটির স্বাধীন ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে কীভাবে যে রাজ্য চালানো হয় সেটা যে কোন সাধারণ মানুষের বুদ্ধির বাইরে। এ নিয়ে ঠাট্টার শেষ নেই। মনে আছে হ্যারমান বলেছিলেন, আমার গল্প তো শুনলেন। এখন যদি বলেন বেলজিয়ামকে বুঝে ফেলেছেন, তাহলে আমি বলব আপনাকে আমি ঠিক কিছুই বোঝাতে পারিনি।

    ধর্মের নামে প্রভুর বন্দনায় যারা একদিন একই আটচালায় বসেছিলেন, ভাষার নামেই কি তাঁরা আজ একে অপরের থেকে দূরে সরে গেছেন?

    পুনশ্চ

    ওয়ালুন ভাষা বলা হতো বলে সে অঞ্চলের নাম ছিল ওয়ালোনিয়া। আজ ওয়ালুন এক মৃতপ্রায় ভাষা, দু-শতাংশ মানুষ বলেন বা বোঝেন কিনা সন্দেহ। অথচ আজকের ফরাসি প্রধান সেই প্রদেশের নামটা রয়ে গেছে ওয়ালোনিয়া! আম টুরিস্টের লিস্টে সেখানকার শারলরোয়া, দুরবুই, মঁসের নাম থাকে না (এই পথ আমাদের ফ্রান্সের বাড়ি থেকে রাইন যাত্রার শর্টকাট)। বেশি পরিচিত গেনট, ব্রুঘে, অ্যান্টওয়ারপ, ব্রাসেলস সবই ফ্ল্যানডারসে পড়ে।

    আপন দেশে ভাষা নিয়ে বেলজিয়ামে যতোই বখেড়া লেগে থাকুক না কেন, প্রায় পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ইউরোপের কোনো দেশের মানুষ যদি নিজেদের পলিগ্লট, সুনীতি চাটুজ্যের মিনি ভার্শন বলে দাবী করতে পারে সে এই বেলজিয়াম এবং সেই সঙ্গে লুকসেমবুর্গ। শুধু আমাদের ব্যাঙ্কে নয়, এই দুই দেশেই অন্তত চারটে ভাষায় স্বচ্ছন্দ অনেক মানুষ দেখেছি পথে ঘাটে।

    *মৎপ্রণীত ‘এই ইউরোপ এখন’ (কারিগর প্রকাশনা) বইতে হ্যারমানের গল্প আছে।

     


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইদবোশেখি | ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ৬২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:২৪739831
  • ভাল কূট তুলেছেন  মশাই "ধর্ম যাদের একদিন একত্র করেছিল, ভাষা তাদের সরিয়ে দিয়েছে দূরে।"
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন