এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আবেগ বনাম বিচার। 

    লতিফুর রহমান প্রামানিক লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ মে ২০২৬ | ৪৫ বার পঠিত
  • আবেগ বনাম বিচার।

    রামিসার রক্তমাখা ছিন্ন মস্তকের ছবি টা আমিও খুব বেশীক্ষণ দেখার শক্তি ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। বুকের ভিতর কাল থেকে একটা অস্পষ্ট ব্যাথা আমিও অনুভব করেছি। ফেচবুকে বারবার তার নিস্পাপ মুখের ছবি টা দেখে দেখে ক্লান্ত হয়েছি। সারা বাংলাদেশ কাল খিপ্প আর বেদনায় ভুগেছে। আসলেই তো এতো নির্মমতা মানুষের পক্ষে সহ্য করা যায় না। দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ, অভিমানে মানুষ খিপ্ত হয়ে উঠে যায় এভাবে প্রতিটি ঘটনায়। এই তো হাদীর ঘটনা। সময়ের পরিক্রমায় অনুভূতি ভোতা হয়ে আসছে। এখনো তার বিচার শুরু করা যায় নি। আবার আসল কথায় আসি। অন্তত আইনের ছাত্র হিসেবে আমাদের আবেগের চেয়ে বাস্তবতা আর আইনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে চলতে হয়। কেউ কেউ সাত দিন, দশ দিন বা দরকার হলে আজই যেন ফাসীতে ঝুলে দেওয়া হয় সেই দাবী ও চলছে। সরকারের বিরুদ্ধে অন্তত যারা সবকিছুতে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে তারা প্রধানমন্ত্রী আর সালাউদ্দিন আহমেদ কে তুনোধুনো করছে। খুন, ধর্ষণের দায় সরকারের বিরুদ্ধে না গেলেও অন্তত বিচারের আওতায় আনার কাজ টা করতে হয়। পুলিশ খুব দ্রুত আসামীকে ধরতে পারার সফলতা নিয়ে কিন্তু কেউ একটা ধন্যবাদ দিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। তবে পুলিশ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কেউ কেউ পোস্ট দিচ্ছে আরবের দেশগুলো মতো শরীয়া আইনের ব্যবহার ঘটাতে। কিন্তু চাইলেই কি সম্ভব? এর সাথে বৃহৎ পরিসরের ভাবনার বিষয় নিহিত আছে। কালই বাংলাদেশ কে মোল্লার দেশ, জঙ্গীর দেশ, আফগান আর পাকিস্তান বলে বর্বর রাস্ট্রের তকমা লাগিয়ে শাহবাগ দখল করে প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে অনেকেই। জানি সবকিছুই মানুষের ক্ষোভ আর আবেগ। কিন্তু চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ ছাড়া কি কাউকে দড়িতে ঝুলে দেওয়া যায়? না। যায়না। আধুনিক গনতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষের আইনের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আদালত বদ্ধপরিকর। দরকার হলে দশ জন অপরাধী ছাড়া পাবে কিন্তু কোন নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়। আইনের এই সুত্র বা মূলমন্ত্র আইনের ক্লাসে প্রথম শ্রেণির পাঠ। সরকার সাত দিনের মধ্যে তদন্তের প্রতিবেদন দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। কতটা সম্ভব হবে জানিনা, আমার সন্দেহ ও অমুলক নয়। সাগর রুনীর তদন্তের প্রতিবেদন দেওয়ার তারিখ সেঞ্চুরি পার হয়েছে। সেটা নিয়ে কি কত তোলপাড় হয়নি? চার পাচ বছরের সেদিনের সাগরের সন্তান এখন যুবক প্রায়। অথচ এখনো অভিযোগ পত্র জমা হয়নি। ধরা যাক রাইসার খুনের তদন্তের প্রতিবেদন এক মাসের বা পনের দিনে জমা হলো। আরেকটি বিষয় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, আরেক জন খুনী নাকি পালিয়ে গেছে। তাকে ধরে ফেলাও আপাতত আইনী প্রশ্ন। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি নিয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রাইসার খুনীর আইনী অধিকার। তারপর হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট। বলতে গেলে কয়েক মাসের বিষয়। প্রশ্ন করবেন এত সময় লাগবে কেন? হ্যাঁ লাগবেই। বিশ বছর বা দশ বছর আগের প্রিয়জনকে হারানো যে মানুষ গুলো এখনো আদালতের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদেরকে অগ্রাধিকার না দেওয়া ও বিচারহীনতা বা অবিচার করা। অতএব রাইসার মামলা স্লো হতে বাধ্য। অভিযোগ গঠন হলো। আইনের অজস্র প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। তাড়াহুড়ো করে বিচার করতে নেই, সেটাও আরেকটা অবিচার। আবার দেরী করে বিচার বিচার করাও অন্যায়। যাইহোক অভিযোগ গঠন নিয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকছেই। সেটাও তো কয়েক মাসের বিষয়। তার মানে মোটামুটি কয়েক মাস বা বছরের তো কম নয়। আর চাইলে ও আপনি এসব এড়াতে পারবেন না। কারণ আসামীকে তার অধিকার দিতে না পারলে বিচারের নামে বিচারক খুনী হয়। ধরুন নিম্ন আদালতে ফাসীর আদেশ হলো। অন্তত মানুষের স্বান্তনা। যাইহোক বিচার হলো। তার পরের পর্ব গুলো দারুণ হতাশার। বিশ্বজিৎ। নাম মনে আছে তো। আরবার? মিন্নি, ঐশী এদের কথা মানুষ ভুলতে বসেছে। সাত খুনের ঘটনা নিয়ে কি কম আলোচনা হয়েছে? বা টেকনাফ এ সেনাবাহিনীর সেই কর্মকর্তা, ওসি প্রদীপ। আমার স্মৃতি থেকে অনেক কিছু মুছে গেছে। আপনার ও তাই। নিম্ন আদালতের রায়ের মামলার হাইকোর্টে পেপার বুক রেডি হতে দুই তিন বছর লেগে যায়। এটা নাকি স্বাভাবিক ব্যাপার। টাকা না দিলে আপিল শুনানীর তালিকায় আসেনা সেটা মাঝে মাঝে নিউজ হয়। ঘটনা মিথ্যা নয়। তারপর শুনানি হতে হতে আরও ছয় সাত বা কাছাকাছি বছরের বিষয়। অনেক সময় আপীল রিমান্ডে আসে। তাহলে তো আরও অনেক দুরের পথ। যাইহোক হাইকোর্টে ও নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকছে। তারপর আপীল বিভাগ। পেপার বুক রেডি হতে আরও কত সময়। এর মধ্যে আইনের অনেক ডালপালা বের হবে। আইনের অনেক ব্যাখা আসবে। ততদিনে মানুষের স্মৃতি থেকে রাইসারা মুছে যায়। মানুষের মনে গেথে যায় বিচারহীনতার ভয়। রাস্ট্রপতির ক্ষমা, রিভিউ তো থাকছেই। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় অপেক্ষা করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে আসে। আদালত দীর্ঘ কারাবাসের মানুষ টাকে ফাসী থেকে কয়েক বছরের কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করে। সেটাও ন্যায় বিচার। আদালতের বিচারক ও মানুষ। তার ও মায়া আছে, দয়া আছে। শপথে যাই থাকুক না কেন। অপরাধীর নিস্পাপ শিশুর কান্না ও বিচারককে আন্দোলিত করে। মাইসার মুখের ছবি টাও কি কম ব্যথিত করে না?
    আবার নতুন ঘটনা ঘটে। সাংবাদিকেরা ছুটে যায় সেদিকে। ক্যামেরা, ফ্ল্যাশ, লাইন। আমরাও হুমড়ি খাই টাটকা নিউজের দিকে। আমাদের স্মৃতি ক্লান্ত হয়ে আসে, বিস্ময়কর ভাবে অতীতের কষ্ট মুছে যায় আমাদের। রাইসাদের কবরে ঘাস ফুল ফোটে, আবরারের খুনীর ফাসী চাই লেখা বুয়েটের লাল দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে কালক্রমে। আবারও খুন হয়, ধর্ষণ হয়। আমরা ব্যথিত হই। আর যাদের হারায় তারা এক হতাশার ব্যথায় কুকড়ে কুকড়ে বেচে থাকে কোন ভাবে। সাহায্য, সহযোগিতা, সরকার, আশ্বাস ধিরে ধিরে সরে আসে। আর একা একা একা রাইসারা কবরে ঘুমায় বাবার কোল ছাড়া চিরকালের জন্য।
    @লতিফুর রহমান।
    লেখক ও আইনজীবী।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন