

অলংকরণ: রমিত
মহামন্ত্রী শাহুজি পড়েছেন গভীর ভাবনায়। চিন্তার চোটে তাঁর নাওয়া খাওয়া সব শিকেয় উঠেছে। মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে রয়েছে, এই একটু আগে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জয়দ্রথ দণ্ডগেন্ডুক খেলার কী একটা দুর্ঘটনা নিয়ে বলতে এসেছিল, তিনি চেঁচিয়ে উঠে বলেছেন, এই সব ছোটখাট বিষয়ে যেন সে কোনো নালিশ জানাতে না আসে ভবিষ্যতে। ভাগ্যিস মহামন্ত্রীপত্নী সেসময় সখীদের সাথে কোনো এক উদ্যান পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, তাই সেকথা সাথে সাথে জয়দ্রথ, মাকে নালিশ করতে পারেনি।
শাহুজি এখন ভাবছেন ওইদিন মহারাজকে স্তোকবাক্য না দিয়ে সোজাসুজি বুঝিয়ে বললেই সঠিক হত, মহারাজের মাথাতেই বা এত ভুলভাল ভাবনা যে কোত্থেকে আসে কে জানে? কিন্তু ওইদিন কীই বা করার ছিল, তিনি গিয়ে দেখেন মহারাজ ঘাড় গুঁজে রাজপ্রাসাদের দোতলার বারান্দা জুড়ে আধঘণ্টা ধরে ক্রমাগত পদচারণা করে চলেছেন। প্রথমে তিনি কিছুক্ষণ মহারাজের পিছু পিছু হাঁটার চেষ্টা করছিলেন, তারপর গলদঘর্ম হয়ে বুঝলেন, মহারাজের সাথে পাল্লা দিয়ে হাঁটা তাঁর কম্ম নয়, পরিস্থিতি শিগগিরই সামাল দিতে হবে। তার থেকেও আগে বুঝতে হবে মহারাজের মনে কী চলছে, নইলে মহারাজ নিজে নিজে সাতপাঁচ ভেবে রাজদরবারে গিয়ে যাহোক তাহোক একটা ঘোষণা করে দিলে সবার মুখ পুড়বে। এরকম কান্ড কারখানা আগেও বেশ কয়েকবার ঘটিয়েছেন তিনি, একবার রাজ্যে খুব গুটিবসন্ত আর হামের মাঝামাঝি কী যেন এক রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল, গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে, রাজবৈদ্য অনেক কিছু ঘেঁটেও কোনো প্রতিষেধক বার করতে পারছিলেন না, তিনি মহারাজের কাছে আরও এক সপ্তাহ সময় চাইতে মহারাজ ওরকম বারান্দা জুড়ে পায়চারি শুরু করে দিলেন। কাউকে কিচ্ছুটি না বলে পরের দিন দরবারে গিয়েই সটান ঘোষণা করলেন, রবিবার সকল রাজ্যবাসীকে দ্বিপ্রহরে চার দণ্ডকাল সময় ধরে ঘণ্টা ধ্বনি করিতে হইবে, সেই ঘণ্টা ধ্বনিতেই রোগ নিরাময় হইবে! গ্রামে গ্রামে কাড়া নাকারা বাজিয়ে সেকথা ঘোষণা করার হুকুম দিলেন। আর সাথে রাজবৈদ্য বসুসেনকে বরখাস্ত করে রাজজ্যোতিষী জ্ঞানশর্মাকেই নতুন রাজবৈদ্য পদে অভিষিক্ত করে দিলেন। সে ঘটনা নিয়ে বহুদিন সঙ আর চারণকবিরা ছড়া কেটেছে।
তাই এবার নীরবতা ভেঙে শাহুজি বলেই ফেললেন,
মনের কথা ব্যক্ত করুন জাহাঁপনা, আপনার ইচ্ছেই আমাদের কাছে আদেশ!
মহারাজ পায়চারি থামিয়ে বললেন, তেমন কিছু না, শুধু রাজ্যবিজয়!
মহামন্ত্রী একগাল হেসে বললেন, এ আর এমনকি, কোন রাজ্য জয় করবেন বলুন, এক্ষুণি আমি সেনাধ্যক্ষ, গণৎকার, যুদ্ধপ্রকৌশলী, অস্ত্রাগারিক সবাইকে ডেকে পাঠাচ্ছি, আলোচনা করে কৌশল নির্ধারণ করে, যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেই হল।
মহারাজ মিত্রবর্মণ মাথা নেড়ে বললেন, আহা তুমিও যেমন, আমি রাজ্যবিজয় বলেছি, একবারও যুদ্ধযাত্রার কথা বলেছি কী?
- যুদ্ধ ছাড়া রাজ্যবিজয় কীরূপে হইবে মহারাজ?
- এটা ভেবে বের করাটাই তো তোমার কাজ।
- আচ্ছা মুঘলদের মতো বিবাহ করে মিত্রতা করে ফেললে কেমন হয়?
- ছি, ওসব অলক্ষুণে কথা মুখে আনবে না, সকাল সকাল যতসব ম্লেচ্ছ জাতির কথা। আর তাছাড়া এই রাজ্যের নারীরা শুনেছি ডাকিনীবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী, তাই আমি বিবাহের ঝুঁকি নিতে পারছি না।
- বলেন কী, আপনি বুঝি বিভঙ্গদেশ জয় করতে চান? কিন্তু শুনেছি সেখানকার লোকেরা সব পাখির ভাষায় কথা বলে, অদ্ভুত সব খাবার তাদের, আফিমের গুটি, জলের পোকা, মৎসের মস্তক, আরও কত কী। তার ওপর পথঘাট সব কর্দমাক্ত, দেবীর গলায় নরমুণ্ড, এই দেশ জয় করে হবেটা কী?
- যাও যাও তুমিও মন্ত্রিত্ব ছেড়ে জয়দ্রথের মতো দণ্ডগেন্দুক খেলায় মাতব্বরি শুরু করো, কিছুই তো খবর রাখো না, তাদের জমিতে সারা বছর এত ধান হয়, তারা খেয়ে কুলিয়ে উঠতে পারেনা, লোকজন নাকি ঠেলে ঠেলে গিয়ে খাজনা জমা করে আসে, আর আসল কথা হল বিভঙ্গদেশে জলের মতো স্বচ্ছ, হাওয়ার মতো সূক্ষ্ম, মেঘের মতো নরম এক বস্ত্র পাওয়া যায়, তার বিশ্বজোড়া নাম, সেটার উৎপাদনের দখল করে নিতে পারলে রোমক, পারস্য, বর্তনিয়া, হুন, উত্তরকুরু নানান রাজ্য থেকে এত স্বর্ণমুদ্রা আসবে, কোষাগারে অর্থ রাখার স্থান অকুলান হবে।
- এসব খবর আপনাকে দিল কে?
- মনে আছে, দুদিন আগে এক পরিব্রাজক এসেছিল? সে একান্ত সাক্ষাতে এসব বিশেষ খবর আমায় দিয়ে গেছে। এই যে আমি যুদ্ধ ছাড়াই রাজ্য জয়ের জন্য উতলা এর কারণ জানো? সেই পরিব্রাজক কথায় কথায় বলছিল এখন আর রাজরাজরাদের কোনো বদ কাজ করে পালানোর জো নেই, সব কর্মকান্ড নাকি লিপিবদ্ধ করা থাকছে। সেই সুদূর গ্রীষ্মদেশে কোনো এক পণ্ডিত নাকি সবকিছু লিখে রাখা শুরু করেছে, এসব ইতিহাস হয়ে থাকবে। দূরদূরান্তের খবরাখবরও জোগাড় করে করে লিখে রাখছে। তারই মুখে শুনলাম এমনকি এই যে আমাদের রাজ্যের দন্ডগেন্দুক খেলা, সুদূর বর্তনিয়াতেও নাকি শুরু হয়ে গেছে, সেই খেলার জেতা হারা অব্দি নাকি লিখে লিখে রাখা হয়, সব ইতিহাসের অংশ।
এসব শুনে মহামন্ত্রী বেশ চমকে উঠলেও মহারাজকে বুঝতে না দিয়ে মিহি গলায় বললেন কিন্তু তার সাথে যুদ্ধ না করার কী সম্পর্ক মহারাজ?
- আরে সব যদি সত্যিকথা লেখা থাকে, তাহলে সেসব কথা পরের লোকজন জেনে যাবে না? লোকে রাজাধিরাজ মিত্রবর্মণকে শেষমেশ কি ঘর্ঘরদেশের রক্তলোলুপ বর্বর দস্যু বলে মনে রাখবে? তাই ঠিক করেছি এবার থেকে যুদ্ধ টুদ্ধ বন্ধ। যাও যাও আগে একশোটা তাম্রপত্র লেখার হুকুম দাও, তাতে লেখো একশো জন ব্রাহ্মণকে হাজার বিঘা নিষ্কর জমি দান করা হল। তারপর বিনাযুদ্ধে রাজ্যজয়ের প্রস্তুতি কর।
- আপনি হাজার বিঘা জমি দান করবেন, এ তো বিশাল ব্যাপার!
- কে বলেছে দান করব, এটা খালি লেখা থাকবে। পরে যারা এসব দেখে ইতিহাস লিখবে, তারা যাতে চাট্টি ভালো ভালো কথা বলে যায়। আরে ভাবমূর্তি ভালো করতে হবে না। যাও যাও মেলা কথা বাড়িও না, ভেবে বের করো উপায়। এই শনিবারের মধ্যে উত্তর চাই।
আজই সেই শনিবার। শাহুজী এখনো কোনো অহিংস উপায় ভেবে বের করে উঠতে পারেননি, তাই দরজায় খিল দিয়ে চিন্তনে বসেছেন, পোশাক ঘামে ভিজে গেছে, টুপ টুপ করে টাক থেকে ঘাম পিঠ বেয়ে নামছে, কাঁচা পাকা দাড়ি গুলো কুটকুট করছে। এর আগে তিনি মহারাজকে কিছু না জানিয়েই একটা ছোট সেনাদলের প্রহরায় দূতের হাতে বিভঙ্গদেশের মহারাজকে একখানি পত্র লিখেছিলেন, অবশ্যই রাজ্যের সরকারি সিল সমেত; দেশের সব দপ্তরের সিলমোহর সর্বদাই তাঁর হাতের কাছে মজুত থাকে, কখন কোনটা লাগে তার ঠিক আছে! পত্রে বলা হল, বিভঙ্গদেশের আচার ব্যবহারে মহারাজ মিত্রবর্মণ খুবই ক্ষিপ্ত, বিভঙ্গদেশকে এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হল, তার মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে। শাহুজি ভেবেছিলেন এত বড় রাজ্যের হুমকিতেই কাজ হাসিল হয়ে যাবে, কিন্তু ওঁর টাইমিং একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল। সৈন্যরা রথ নিয়ে বিভঙ্গদেশে কিছুদূর যেতে না যেতেই রথের চাকা বসে গেল কাদায়, সৈন্যরা দূতকে একটা ঘোড়ায় চড়িয়ে রাজার কাছে পাঠাল, প্যাচপ্যাচে কাদার মধ্যে সে ঘোড়াও কিছুদূর গিয়ে রণে ক্ষান্ত দিল। শেষমেশ বিভঙ্গদেশের ডাক বিভাগের লোক মুচকি হেসে পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিল। দুদিন পর রাজার উত্তরও এল পায়রাতেই, ছোট্ট চিঠি, 'বর্ষাকাল সমাগতপ্রায়, এখন বিভঙ্গদেশ আক্রমণ করবেন? শুভেচ্ছা রইল, ইতি বিভঙ্গরাজ'। সেই চিঠিটা হাতে পাওয়া ইস্তক শাহুজির ঘুম উড়ে গেছে।
শেষমেশ শ্যালক অশ্বতোষ এসে বুদ্ধি দিয়ে উদ্ধার করল শাহুজিকে। দেখুন জাম্বু, শকুনির পাশা খেলা শুনেছেন তো? পাণ্ডবদের জমি কী করে হরপে নিয়েছিল
- হ্যাঁ, কিন্তু, মহারাজ ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে চান ইতিহাসের কাছে, আর এখনো শকুনির ভাবমূর্তি যে আমাদের কাছে কত ভালো তা তো দেখাই যাচ্ছে, সুতরাং পাশাখেলাটেলা বাদ।
- আহা, আমি খেলার কথা বলেছি, পাশাই বা কেন খেলতে হবে। এই যে আমার জ্যেষ্ঠ ভাগিনেয় যে খেলা নিয়ে মত্ত, যে খেলায় আমাদের রাজ্যের লোক এত দক্ষ, সেই দণ্ডগেন্ডুক খেলা দিয়েই ফয়সালা হবে রাজ্যবিজয়ের। কোনো হিংসা মারামারির ব্যাপার নেই।
মহারাজ মিত্রবর্মণের ভারি পছন্দ হলো প্রস্তাবখানা, গোটা ঘর্ঘর সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্ববৃহৎ দণ্ডগেন্ডুকের ময়দান তাঁরই নামে নামাঙ্কিত। আবার দূত পাঠিয়ে বিভঙ্গরাজকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হল।
বিভঙ্গরাজ বৈঠকে এসে সব শুনে টুনে পত্রপাঠ নাকচ করে দিলেন প্রস্তাব, আমাদের এদিকে এখন দণ্ডগেন্ডুক খেলার মরশুমই না, আমরা দণ্ডগেন্ডুক খেলি শীতে, এখন হলো পদগেন্ডুক খেলার মরশুম। আর জানেনই তো পদগেন্ডুকে আমরা বিশ্ববন্দিত, চলে আসুন পদগেন্ডুক খেলা দিয়েই তবে ভাগ্য নির্ধারিত হোক।
শুনেই তো মহারাজ মিত্রবর্মণ গেছেন ব্যোমকে, পদগেন্ডুকে তাঁর রাজ্য নেহাতই শিশুসুলভ। ঢের ছোটো রাজ্যের কাছে আকছার হেরে যায়, সুতরাং এই ঝুঁকি কিছুতেই নেওয়া যায়না। মহামন্ত্রী শাহুজি পাশ থেকে মিনমিন করে বললেন, আচ্ছা লুডো খেলে ঠিক করে নিলে হয়না? মিত্রবর্মণের কটমট করে তাকানোয় শিগগির মুখ বুঁজলেন।
বিভঙ্গরাজ বললেন, দেখুন আমরা আপনাদের তুলনায় অনেক ছোট্ট, আর দুর্বল একটা রাজ্য বটে, কিন্তু তা বলে এত বড় রাজ্যের ভাগ্য তো আর একটা ছক্কার দানের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়না, এটার সাথে গোটা রাজ্যের জনগণের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে।
এই কথা শুনে হঠাৎ মহারাজ মিত্রবর্মণ কেদারা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, ঠিকই তো! রাজ্যবাসীকেই রাজ্যের ভাগ্য ঠিক করতে দিতে হবে!
মহামন্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, মানে?
মহারাজ মিত্রবর্মণ বললেন, ওই যে সেই পরিব্রাজক, সে এরকমই একটা কথা বলছিল বটে। পারস্য থেকে অনেক উত্তরে, হাড় হিম ঠান্ডার এক দেশে নাকি এরকমই আলোচনা চলছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার স্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হলে ওখানকার গণ্যমান্য লোকজন চিঠি লিখে একটা বাক্সে জমা করে, তারপর নাকি সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে বিপক্ষে আসা চিঠি পড়ে ঠিক করা হয় কী হবে।
বিভঙ্গরাজ অবাক হয়ে বললেন, চমৎকার ভাবনা বটে, সত্যিই তো কত কড়া কড়া সিদ্ধান্ত নিতে হয়, মাঝে মাঝে আমারই তো মাথা ঝিম ঝিম করে। চিঠি চাপাটির বুদ্ধিটা নেহাত ফেলনা নয়।
মিত্রবর্মণ কান এঁটো করা একটা হাসি হেসে বললেন, তাহলে আর কি? মিটেই গেল, আপনার রাজ্যের গণ্যমান্য লোকদের চিঠি লিখে জানাতে বলুন তারা কী চায়? বিভঙ্গদেশ আমাদের রাজ্যের মধ্যে চলে এলে তারা খুশি কিনা? সেই চিঠি পড়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
শাহুজি শিগগির মিত্রবর্মণের কানে ফিসফিস করে বললেন, তাহলে আজ রাতেই সেই সব লোকেদের বাড়ি রাশি রাশি স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়ে দিচ্ছি, কলমের দামের জন্য! আর চিন্তা কী!
সেটা শুনেই মিত্রবর্মণের ঠোঁটে যে মুচকি হাসিটা খেলে গেল, তাতে দিব্যি বোঝা গেল ওঁর মনের কথাটাই বলে দিয়েছেন মহামন্ত্রী।
কিন্তু, একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন বিভঙ্গরাজ, দেখুন চাট্টি গণ্যমান্য লোক নিয়ে তো আর রাজ্য নয়, আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ রয়েছে, তারা খেটে খায়, তাদের মতামতেরও একটা দাম আছে? হাজার হোক তারাও তো রাজ্যেরই প্রজা। তাহলে চারজনের চিঠি পড়ে কি আর এতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?
শুনেই মিত্রবর্মণের মুখ ভার। তিনি সাদা দাড়ি চুলকে বললেন, আচ্ছা তবে সবাইকেই চিঠি লিখতে বলুন।
মহামন্ত্রী শুনেই হাঁ হাঁ করে ওঠেন, বলেন কী, সেই সব লক্ষ লক্ষ চিঠি পড়ে উঠতেই তো ছ-সাত মাস লেগে যাবে!
বিভঙ্গরাজ হেসে বললেন, তার থেকেও বড় কথা সবাই তো আর পত্র লিখন পদ্ধতি সম্বন্ধে অবগত নয়, সবাই কি আর লেখাপড়া জানে? ছোটবেলায় কেউ কেউ পাঠশালায় যায় বটে, কিন্তু সে আর কজন লেখালিখি করতে পারবে?
মিত্রবর্মণ বললেন, চিন্তা নেই, কাগজে হ্যাঁ আর না লেখা থাকবে, তার পাশে টিক দিয়ে পাঠালেই হবে। নইলে আমাদের লোক থাকবে পাশে, বলে দেবে কোনটায় টিক দিতে হবে।
বিভঙ্গরাজ মাথা নেড়ে বললেন, কিন্তু অনেকে তো পড়তেই জানেনা, তবে কোনটা হ্যাঁ, কোনটা না বুঝবে কী করে।
তবে উপায়?
শেষমেশ অনেক মাথা ঘামিয়ে ঠিক হলো একটা নির্দিষ্ট দিনে বিভঙ্গদেশের বিভিন্ন জায়গায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্র বসানো হবে, সেই কেন্দ্রে এসে রাজ্যবাসীরা তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে যাবে। একটা করে কাগজ দেওয়া হবে, তাতে ছবি এঁকে বোঝানো থাকবে দুটো সিদ্ধান্ত, তার মধ্যে যেটা মনে ধরবে তাতে টিক দিতে হবে। তবে এটাও ঠিক হলো যে এই সিদ্ধান্ত গোনাগুনির কাজে দুপক্ষ থেকেই বুঝদার লোকজন থাকবে, তাহলেই কেউ চিটিং টিটিং করলে ফস করে ধরা পড়ে যাবে। আর এখন থেকে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিন অব্দি বিভঙ্গদেশে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক যাবতীয় কার্যে মহারাজ মিত্র বর্মন এর তৈরি করে দেওয়া 'সিদ্ধান্ত পরিষদ' নামে এক 'নিরপেক্ষ' দল সাহায্য করবে, পাছে বিভঙ্গরাজ প্রজাদের জোর করে নিজের দিকে টেনে বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান।
মুখ ভার হলেও বিভঙ্গরাজ আর কী করেন, এতবড় আর শক্তিশালী রাজ্যের প্রস্তাব, বাধ্য হয়ে মেনে নিয়ে নতমস্তকে নিজের রাজ্যে ফিরে এলেন।
পরের দিন সক্কাল সক্কাল বিভঙ্গরাজ মন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বসলেন, সিদ্ধান্তের কাগজে কিসের ছবি দেওয়া যায়? কী করে সহজে বিভঙ্গদেশের মানুষের মনকে ধরা যাবে? বিভঙ্গরাজ্যের রাজপ্রতীক সিংহ ব্যবহার করা হবে কি? কিন্তু সেটা তো রাজবংশের প্রতীক, সেটা কি এখানে ব্যবহার করা ঠিক হবে?
মন্ত্রী অনেক মাথা খাটিয়ে বললেন, মহারাজ খুব সাধারণ কিছু বাছতে হবে, যেটা দেখেই চট করে এই শান্ত সাধারণ বিভঙ্গদেশের কথাই মনে হবে, এখানকার মন জুড়িয়ে দেওয়া সবুজ প্রকৃতির কথা।
- তাহলে? গাছ, পাতা, ফুল, মাটি, প্রজাপতি কী বাছা যায় বলুন তো?
- বৈঠকে যাওয়ার সময় রাস্তার দিকে দেখছিলাম, ঝোপে ঝাড়ে কত সাধারণ সব ফুল ফুটে আছে, অথচ কী সুন্দর তাদের রং, মন শান্ত হয়ে যায় যেন দেখেই। ঘেঁটুফুল মহারাজ, ঘেঁটুফুলের ছবি দিন কাগজে। কত তুচ্ছ, অথচ কী স্নিগ্ধ।
রাজ্যজুড়ে কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে বিভঙ্গরাজ এই সিদ্ধান্ত দিবসের কথা প্রচার করা শুরু করে দিলেন। গ্রামে গ্রামে সব বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে খুব সুন্দর করে ঘেঁটুফুলের ছবি এঁকে দেওয়া হল। মহারাজ বুঝিয়ে বললেন পাশের ঘর্ঘরদেশের বিভঙ্গদেশ দখলের অপচেষ্টার কথা, ওইদিন যারা যারা চায় বিভঙ্গদেশ স্বাধীন থাকুক তাদেরকে ঘেঁটুফুলের ছবিতে টিক দিতে হবে।
ওদিকে মিত্রবর্মণও শাহুজির সাথে বিচারে বসেছেন কিসের ছবি দেওয়া যায় সিদ্ধান্ত দিবসের জন্য। শাহুজি বললেন গরুর ছবি দেওয়া যায়, ঘর্ঘরদেশের গরু খুবই বিখ্যাত। রাজজ্যোতিষ জ্ঞানশর্মা বললেন, ত্রিশূল কেমন হবে? তাতে মিত্রবর্মণ বললেন, ওরা কিসের ছবি দিয়েছে? শাহুজি বললেন, শুনলাম কি এক সামান্য ফুলের ছবি দিয়েছে, কেউ পোঁছে না সে ফুল। মিত্রবর্মণ বললেন আমরাও তবে ফুলের ছবি দেব, এমন ফুল যা দেখে প্রজারা বুঝবে শৌর্য, বীর্যে কেন ঘর্ঘরদেশ সর্ব শ্রেষ্ঠ! সবচেয়ে দুর্লভ, সবচেয়ে পবিত্র ব্রহ্মকমলের ছবি থাকবে আমাদের সিদ্ধান্ত পত্রে।
উনি তো বলেই খালাস, এদিকে ব্রহ্মকমলের ছবি আঁকতে গিয়ে শিল্পীদের কালঘাম ছুটে গেল, তারা তো জীবনে সে জিনিস চোখে দেখেনি, নাম শুনেছে মাত্র। অর্থ এবং আদেশ পেয়ে আঁকতে হবে তবু। ব্রহ্মকমলের ছবি দেওয়ালে দেখে একজন মাথা চুলকে বলল, এ নিশ্চয় রসগোল্লা, আরেকজন বলল আরে না একটু ওঠা ওঠা দেখছো না, এ হল রাবড়ি, ঘর্ঘরদেশের রাবড়ি খুব বিখ্যাত। আরেকজন মাথা নেড়ে বলল, না না, আমার মনে হচ্ছে এটা পদ্ম লুচি, আরেকজন বিচক্ষণ গোছের লোক, যাকে অন্যরা একটু মান্যিগন্যি করে, তিনি এসে বিচার করে বললেন তোমরা জানো না, এসব কিছুই না, এ হল কাপাস তুলো। সে যাই হোক, বিভঙ্গদেশের নানা বাড়ি ঘর পাঁচিল সেইসব পদ্মলুচি, রাবড়ি, কাপাস তুলোয় সেজে উঠতে লাগল।
এদিকে প্রজারা বুঝেই উঠতে পারছে না এসব হচ্ছেটা কী। তারা খামোখা চাইবেই বা কেন যে বিভঙ্গদেশ অন্য রাজ্যের হাতে যাক, তারা তো দিব্যি আছে। ঠিক এমনটাই ভেবেছিলেন বিভঙ্গরাজ। কিন্তু বাস্তব যে আরও ঘোরালো। বিভঙ্গদেশের কিছু তালেবর লোক এই তালে হঠাৎ বলতে শুরু করে দিল বিভঙ্গদেশ যদি একটা এতবড় সাম্রাজ্যের সাথে যুক্ত হয় তবেই না শক্তিশালী হবে, নইলে আশেপাশের রাজ্য আমাদের রেয়াত করবে কেন, ইয়াব্বড় সেনাবাহিনী থাকবে, পান থেকে চুন খসলেই, অপরাধের কথা ভাবলেই ক্যাঁক করে ধরে জেলে পুরে দেওয়া হবে, কেউ কেউ আবার এও বলা শুরু করল বিভঙ্গদেশের থেকে ঘর্ঘরদেশের শিল্প, সংস্কৃতি, আইনকানুন সবই নাকি শত শত গুণে ভালো। বিভঙ্গদেশের রাস্তা খারাপ, আইনকানুন সর্বনেশে, মানুষের উন্নতি নেই, সব বিচ্ছিরি।
বিভঙ্গরাজ তো এরকম কাণ্ডকারবার দেখে চমকে উঠলেন, গুপ্তচরদের ডেকে বললেন, শিগগিরই খবর নাও তো কী হচ্ছে। চরেরা খোঁজ খবর নিয়ে এসে জানাল, মহারাজ ঘর্ঘরদেশের ছাপ মারা প্রচুর স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা বাজারে ঘুরছে। মহারাজ সব বুঝতে পারলেন, তাড়াতাড়ি ঘোষণা করলেন এক বছরের খাজনা মকুব! সারা বিভঙ্গ দেশে জয়ধ্বনি পড়ে গেল তাঁর নামে।
সে খবর মিত্রবর্মণের কানেও পৌঁছতে দেরি হল না, এখন বিভঙ্গদেশেই তাঁর তৈরি সিদ্ধান্ত পরিষদ ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। তারা চুপিচুপি এসে বলল খাজনা মকুব হয়ে সবাই তো খুব খুশি, এমন হলে কি আর কেউ ঘর্ঘর সাম্রাজ্যে আসতে চাইবে? সারা রাত শাহুজির সাথে শলা পরামর্শ করে, ঠিক সক্কালবেলা মিত্রবর্মণ বললেন, এখন থেকে বিভঙ্গরাজ আর কোনো নতুন ঘোষণা করতে পারবেন না, সিদ্ধান্ত পরিষদও তিরিং করে লাফিয়ে উঠল, ঠিক ঠিক, এটা বেআইনি, এভাবে উনি প্রজাদের প্রভাবিত করতে পারেন না। বিভঙ্গদেশের মান্যিগন্যি লোকেরাও লাফিয়ে উঠল, ঠিক ঠিক এটা বেআইনি। বিভঙ্গরাজ অবাক, তিনি এখন থেকে নিজের রাজ্যে নিজের ইচ্ছেমতো কোনো ঘোষণাও করতে পারবেন না, এরা বলছেটা কী?
সিদ্ধান্ত পরিষদ আরও বলল, এবার থেকে মহারাজ মিত্রবর্মণ-এর লোকজন এসে ঘর্ঘর সাম্রাজ্যের কথাও বিভঙ্গদেশ জুড়ে প্রচার করবে। বিভঙ্গরাজ নিমরাজি হয়ে বললেন, বেশ। দেখা গেল ঘর্ঘরদেশের লোকজন দলবল নিয়ে সিদ্ধান্ত দিবসের কথা প্রচার করতে এসে উল্টে বিভঙ্গদেশের দারুণ দারুণ সব খাবার খেয়েদেয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুম লাগাল আর বিভঙ্গদেশের ছেলে ছোকরাদের রৌপ্য মুদ্রা আর শাহুজির লিখে দেওয়া প্রচারের কথাবার্তা সঙ্গে দিয়ে বলল যাও ঢেঁড়া পিটিয়ে গ্রামে গ্রামে এগুলো সব প্রচার করে আসতে হবে।
ছেলেরা তো ঘর্ঘরদেশের ভাষা জানেই না, শাহুজির লিখে দেওয়া কথা পড়তে গিয়ে তাদের নাজেহাল অবস্থা। শেষমেশ এক পণ্ডিতের কাছে নিয়ে গেলে তিনি বানান করে পড়ে বললেন, এতে লেখা আছে, বিভঙ্গদেশ ঘর্ঘর সাম্রাজ্যের অধীনে এলে সারা রাজ্যের কোণায় কোণায় প্রহরী ছড়িয়ে দেওয়া হইবে, সব রাস্তা, পুকুর, মাঠ পাথর দিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া হইবে, কাউকে আর কষ্ট করিয়া পাখির ভাষায় কথা কহিতে হইবে না, সবাইকে ঘর্ঘরদেশের ভাষা শিখাইয়া দেওয়া হইবে। বিভঙ্গদেশের সকল প্রকার তামসিক আহার বন্ধ করিয়া সবার জন্য স্বাত্তিক আহার প্রকল্প শুরু করা হইবে।
এসব শুনে একটা ছেলে মাথা চুলকে বলল, কই এসব তামা টামা তো আমরা মোটে খাই না। আরেকজন বলল পাখির মতো ভাষা মানে, আমরা গরু চরাতে চরাতে আনমনে শিশ-টিশ দিই বটে, সেই শিশের কথা বলছে? শিশ দিতে কষ্ট কী, আমি তো দিব্যি পাখির মতো শিশ দিতে পারি, এরা কী লিখেছে এসব?
তা শেষমেশ পণ্ডিত মশাই বলে দিলেন ঘর্ঘরদেশের ভাষায় লেখা কথা গুলো কীভাবে উচ্চারণ করতে হবে। ওরা ঢেড়া পিটিয়ে ওভাবেই সুর করে করে সেসব কথা বলতে লাগল ঘুরে ঘুরে, ভাগ্য ভালো রাজ্যবাসীরা শুনে কিছুই বুঝতে পারল না।
ওদিকে বিভঙ্গরাজ নানা লোকজনকে জোগাড় করেছেন, কেউ নাচ দেখাচ্ছে, কেউ রণপা পরে হাঁটছে, কেউ ডিগবাজি খাচ্ছে, কেউ ছড়া কাটছে, কেউ গান শোনাচ্ছে। তিনি বজরা চেপে লোকজন নিয়ে রাজ্যের আনাচে কানাচে পৌঁছে যাচ্ছেন নদী বেয়ে। যেখানেই যাচ্ছেন লোকের ভিড় জমে যাচ্ছে সেইসব দেখতে। চরের মুখে সেসব খবর পেয়ে শাহুজির গোঁসা আরও বেড়ে যাচ্ছে। উনি বুঝলেন, না না এভাবে চলবে না, নতুন কিছু ভাবতে হবে, নইলে মহারাজ মিত্রবর্মণ তাঁকে শূলে চড়াবেন। তিনি চর মারফত সংবাদ পাঠালেন। সেই শুনে সিদ্ধান্ত পরিষদ জোরসে ঘোষণা করল, সব প্রজা প্রজা নয়, কিছু কিছু প্রজা। তাই বিভঙ্গদেশে এক্ষুণি প্রজা বাছাই পর্ব শুরু করতে হবে।
বিভঙ্গদেশে সবার মাথায় বাজ পড়ল। সবাই চমকে উঠে বলল, এ কথার মানে কী? সিদ্ধান্ত পরিষদের লোকজন কান চুলকাতে চুলকাতে জানাল তারা নাকি সরেজমিনে তদন্ত করে দেখেছে বিভঙ্গদেশের অনেক প্রজা সারা বছর এই রাজ্যে থাকে না, নানা আসেপাশের রাজ্যে কাজে যায়, কেউ কেউ বাণিজ্যে যায় দূর দেশে, আবার আশেপাশের রাজ্য থেকে অনেক প্রজা নাকি বিভঙ্গদেশে নানা কারণে চলে আসে, সুতরাং যারা এখানে থাকেই না আর যারা এ রাজ্যের লোকই না, তারাও যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে থাকে, তবে তো আসল সিদ্ধান্তই ভুলভাল হয়ে যাবে। তাই তাদের বাদ দিয়ে এবং সব প্রজার ঠিকুজি কুলুজী বংশলতিকা খতিয়ে দেখে একটিমাত্র প্রজাতালিকা বানাতে হবে, সেই প্রজাতালিকায় নাম থাকা প্রজারাই একমাত্র সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বাকিরা আসল প্রজা নয়। তাদেরকে ঘর্ঘরদেশের পেয়াদা এসে রাজ্যের বাইরে রেখে আসবে।
সেই শুনে অনেক মানুষের হিক্কা শুরু হল, কাউকে কাউকে মাথায় জলপট্টি দিতে হল, কেউ কেউ শিগগির গ্রামের কবিরাজের কাছে ছুটল। কেউ কেউ রাজার দেওয়া খেতাব, তাম্রপত্র, পুরোনো পুঁথি খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল। পুরোহিতরা ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়া তালপাতার পুঁথির পাতা খুঁজে পেতে দেখতে লাগল কাদের কাদের বংশলতিকা পাওয়া যাচ্ছে, লিপিকাররা বটতলায় আসন নিল, রৌপ্যমুদ্রার বদলে বংশতালিকা নকল করে দেওয়ার জন্য। রাজ্য জুড়ে সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড!
বিভঙ্গরাজ প্রমাদ গুনলেন। রাজ্য জুড়ে এই হুলুস্থূল এক্ষুনি থামানো দরকার। তিনি তাড়াতাড়ি দরবারে ঘোষণা করলেন যারা যারা খাজনা দেয়, সবাই তাঁর প্রজা, এদেরকে সরানো যাবে না কিছুতেই। বিভঙ্গমন্ত্রী কানে কানে বললেন, মহারাজ, খাজনা দেয়না এমন তো অনেক লোক আছে, যাযাবর, শিকারী, চোর, ছোটখাটো নানা পেশার লোকজন, আরও কত লোকজন জলে জঙ্গলে মাঠে ঘাটে আউলে বাউলে থাকে। মহারাজ বললেন খাজনা হিসেবে এক মুঠো চাল কী দুটো সব্জি, মোষের শিং, পুঁটি মাছ, এক পোয়া দুধ, যার যা সাধ্যে কুলোবে, কিছু একটা দিলেই হবে, আর কোনো চিন্তা নেই প্রজা হওয়া নিয়ে। সিদ্ধান্ত পরিষদও নাছোড়বান্দা, তারা বলল এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গেছে, আর মহারাজ তো আগেই এবছরের খাজনা মকুব করেছেন এখন তাই তাঁর আর খাজনা জমা নেওয়ার এক্তিয়ার নেই। বিভঙ্গরাজ পাল্টা ঘোষণা করলেন, এ হল আগের বছরের খাজনা। দুই দিকে দুই শিবিরে প্রজারা ভিড় জমাল, একদিকে খাজনা জমা হচ্ছে, খাজনাদার হিসেবে নাম উঠছে, অন্যদিকে ঘর্ঘরদেশের পেয়াদাদের সামনে সাত জন্মের ঠিকুজি কুলুজি নিয়ে হাজির হতে হচ্ছে, তারপরে আবার প্রশ্ন আসছে, কোথায় থাকা হয়, কবে থেকে থাকা হয়, অন্য কোনো দেশে যাতায়াত আছে কিনা, ঘর্ঘরদেশে যেতে মন চায় কিনা হেন নানান প্রশ্ন। শেষের প্রশ্নে না বললেই নাকি প্রজার লিস্টি থেকে নাম কাটা। বিভঙ্গরাজ এই নিয়ে আপত্তি তুলতেই সিদ্ধান্ত পরিষদ বলল, রোসো, আমরা এমন একটা ব্যবস্থা করছি কেউ আর আপত্তি করতেই পারবে না। এই বলে শিবিরে একটা কালো কাপড় চাপা খাঁচা বসিয়ে দেওয়া হল, লোকজন যেতে সব প্রশ্নের শেষে খাঁচা থেকে একটা চিরকুট বেরোচ্ছে, সেটা দেখে পেয়াদারা খসখস করে কী যেন লিখে নিচ্ছে, উঁকি দিয়ে দেখতে গেলে পাতা লুকিয়ে ফেলছে। তারপর একদিন খাঁচার কাপড় তুলে দেখা গেল, ভেতরে এক মস্ত বড় কাকাতুয়া বসে কচমচ করে লঙ্কা খাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে একটা খাঁচার ভেতর রাখা দুটো চিরকুট থেকে যখন যেটা ইচ্ছে বাড়িয়ে দিচ্ছে, একটায় লেখা আছে প্রজা, আরেকটা লেখা ভিনদেশী। লোকজন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতে পেয়াদারা হাত উল্টে বলল, দেখুন আমাদের কিচ্ছুটি করার নেই, পুরো নিরপেক্ষতা বজায় আছে, বজ্রদেশের ত্রিকালদর্শী কাকাতুয়া এসে বিচার করে সব জানাচ্ছে। এ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
এদিকে মিত্রবর্মণ আর শাহুজি তবু স্বস্তিতে নেই, সবসময় বুকের ভেতরটা কেমন আনচান আনচান করছে। চরেরা এসে কানে কানে বলছে এখনও নাকি বিভঙ্গদেশ জুড়ে বিভঙ্গরাজেরই নাম সবার মুখে মুখে। মিত্রবর্মণ পাদুকা খুলে চরের পশ্চাদ্দেশ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলেন, সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে একটি উত্তরকুরু দেশ থেকে আনা ফুলদানি চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। আবার দুটো পেয়াদা দিয়ে চরকে পাকড়ে দাঁড় করিয়ে আরেক পাদুকা ছুঁড়ে লক্ষ্যভেদ করে নিয়ে নাক ঝেড়ে শাহুজিকে বললেন, অঙ্গ, কলিঙ্গ, প্রাগজ্যোতিষপুর সব কী সুন্দর বশ্যতা মেনে নিয়েছিল, এই বিভঙ্গদেশটাই যত নষ্টের গোড়া!সবচেয়ে বিচ্ছিরি, ঘাড়ট্যাঁড়া আর হিংসুকুটে। শাহুজি বললেন, মহারাজ এসব না করে সোজা যুদ্ধযাত্রা করলেই তো মিটে যেত, কটা দিন সবুর করুন, সেনাবাহিনী নামিয়ে গোটারাজ্য দখল করে নিলেই হবে। মিত্রবর্মণ জলদগম্ভীর স্বরে হেঁকে বললেন, না, বিনাযুদ্ধেই নিতে হবে সমগ্র বিভঙ্গ।
ভোর হতে দেখা গেল মহামন্ত্রী শাহুজির নতুন ফন্দিতে দলে দলে ঘর্ঘরদেশের সেনা লাঠি, বল্লম, শরকি হাতে কাদাপথ ঠেলে হেঁটে হেঁটে বিহঙ্গদেশে ঢুকছে। সাথে সাথে বিভঙ্গদেশের প্রহরী তাদের পথ আটকে দাঁড়াল।বিভঙ্গরাজ খবর পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, এ তো যুদ্ধ ঘোষণার সামিল! আপনারা যুদ্ধ করবেন না কথা দিয়েছিলেন যে! সেনাবাহিনী বলল, আমরা তো যুদ্ধ করতে আসিনি, সিদ্ধান্ত পরিষদের কাজে এসেছি। বিভঙ্গ দেশের প্রজাদের অভয় দিতে। যদি বিভঙ্গ রাজ তাদের ভয় দেখিয়ে জোরাজুরি করে তাই তারা নির্ভয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করতে অভয় দেবে। বিভঙ্গরাজ কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না, কিন্তু দেখা গেল রাজ্যের কিছু মান্যিগন্যি লোকজন সেই সেনা বাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল হঠাৎ, তারা বলল, এমন শক্তিশালী বাহিনী রাজ্যে প্রথমবার এসেছে, এ দেখেও সুখ, রাজার উচিত পথ দেখিয়ে তাদের গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়া। রাজার যদি কোনো অভিসন্ধি না থাকে তবে তাদেরকে বাধা দেওয়া হচ্ছে কেন? মহারাজ সমাজের ওপর মহলের এই প্রবল চাপে নিমরাজি হয়ে বললেন, আচ্ছা বেশ, ওরা আসুক।
দেখা গেল সেনাবাহিনী দেখে প্রজারা অভয়ের চেয়ে ভয় পেতে লাগল বেশি। একে তো তারা সারাক্ষণ গোঁফ চুমরে, বল্লম উঁচিয়ে, কড়া চোখে তাকিয়ে থাকে। অন্যদিকে তারা যে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে কী ভাষায় কথা বলে তাও বোঝা যায়না। উল্টে নানান জায়গায় ক্ষেতের কলাটা মুলোটা, খামারের মুরগি, গাছের ফলমূল ইচ্ছেমতো তুলে নিয়ে চলে যায়। কখনো ধানের গোলা ভেঙে দেখে ভেতরে কিছু লুকানো আছে কিনা, নৌকা ফুটো করে দেখে খোলের নিচে কী আছে। একজায়গায় কতকগুলো ছেলে মিলে দল পাকিয়েছিল, তারা সিদ্ধান্ত দিবস এর বদলে অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবনার কথা বলছিল। তারা বলছিল সব রাজাই নাকি খারাপ, রাজা ছাড়া অন্য রকম রাজ্যের কথা সবাইকে শোনাচ্ছিল, কোন এক পরিব্রাজক নাকি তাদের এসব কথা বলে গেছে। তারা বলছিল সেনাবাহিনীর পেছনে খরচ কমিয়ে আরো বেশি পাঠশালার খোলার কথা, গ্রামের ক্ষেত মজুরদের দুঃখকষ্টের কথা, হাতে হাতে পলাশ ফুল রাজা সরানোর মিছিলের কথা। দিনে দিনে তাদের দলে লোক বাড়ছিল, বেশির ভাগই রাজ্যের গরিব গুরবো লোকজন। ঘর্ঘরদেশের সেনাবাহিনী তাদের এমন বেচাল কথাবার্তা শুনে বল্লমের খোঁচায় তাদের সবাইকে পাড়াছাড়া করল। দিকে দিকে খুঁজতে লাগল কারা এই পলাশ ফুলের দলে নাম লিখিয়েছে। ধরতে পারলেই সপাং সপাং করে চাবকাতে লাগল। একি অলক্ষুণে কথাবার্তা, বলে রাজাকেই চাইনা। নানা জায়গায় ক্রমেই তাদের দাপট বাড়তে লাগল, পাঠশালা তুলে দিয়ে সেখানে তাদের চৌকি বসাল। রাজ্যের একেক জায়গায়, একেক বাড়িতে ঢুকে তারা হঠাৎ হঠাৎ হুকুম করতে লাগল, তল্লাশি নেব। পুরো বিভঙ্গ দেশের লোক এই নতুন বাহিনীর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠল।
রাজ্যজুড়ে ঘর্ঘরদেশের সেনাবাহিনীর এমনধারা বেয়াদবির কথা বিভঙ্গরাজের কানেও পৌঁছেছিল। তিনি তাদের ধরে আনার হুকুম দিতে যাবেন ভাবছেন এমন সময় খবর এলো খোদ মহারাজ মিত্রবর্মণ নাকি বিভঙ্গদেশে পদার্পণ করবেন।
শাহুজি মহারাজ মিত্র বর্মনকে বুঝিয়েছেন প্রস্তুতি সবই সাঙ্গ, কিন্তু শেষমেশ ওদেশে গিয়ে বিভঙ্গদেশের প্রজাদেরকে ঘর্ঘর সাম্রাজ্য সমন্ধে ভালো ভালো কথা বলে আপন করে নিতে পারলে তবেই ষোলোকলা পূর্ণ হয়। সেইমত খুব সুন্দর করে ভাষণও লিখে দিলেন মহারাজের জন্য। মিত্র বর্মন পড়ে টরে বললেন, খাসা হয়েছে, তা ওদের ভাষায় না বললে ওরা বুঝবে কী করে, এক্ষুনি এটা অনুবাদের ব্যবস্থা করো।
এবার এদিকে তো বিভঙ্গদেশের লোকজন ভালোই ক্ষেপে গেছে ঘর্ঘরদেশের ওপর, কোনো বড় পণ্ডিত সেই ভাষণ বিভঙ্গভাষায় লিখে দিতে রাজি নন, পায়ে ধরে সাধা হচ্ছে, স্বর্ণমুদ্রার লোভ দেখানো হচ্ছে তবু তারা গা করছে না। শেষে একজন ময়লা ধুতি পরা টিকিওলা পণ্ডিত হঠাৎ এসে বলল ও দেশের ভাষা আমি জানি, একটা ফুটো পয়সা দিলেই লিখে দিতে পারি। তাকে দিয়ে গোটা ভাষণ আগাগোড়া অনুবাদ করিয়ে ঘর্ঘর ভাষার বর্ণে লিখিয়ে নেওয়া হল, সিদ্ধান্ত পরিষদের লোকেদের এত আনন্দ হল, সেই হুল্লোড়ে টিকি পণ্ডিতকে ফুটো পয়সাটুকু দেওয়ার কথাও তারা বেমালুম ভুলে গেল।
নির্দিষ্ট দিনে মহারাজ মিত্রবর্মণ শোভাযাত্রা করে বিভঙ্গদেশ এর দুয়ারে এসে উপস্থিত। যথাবিহিত সম্মানে বিভঙ্গ রাজ অভ্যর্থনা করে দেশের ভিতর নিয়ে এলেন। রাজকীয় বজরায় চাপিয়ে বিভঙ্গ দেশ ঘোরাতে ঘোরাতে তাঁকে রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উনি রুখা শুখা দেশের লোক, এত সুজলা সুফলা দেশ জন্মে দেখেননি, তিনি অবাক হয়ে চারিদিক দেখছিলেন। নদী নালা গাছপালা, মৃদুমন্দ হাওয়া এসবে মহারাজের বুকটা যেন হু হু করে উঠল। এক জায়গার মাঠের মধ্যে ছেলেদের কাদা মেখে পদগেন্ডুক খেলতে দেখে তাঁর হঠাৎ মনে হল যেন এসব রাজপোশক, মুকুট ফেলে রেখে এক ছুট্টে সেই মাঠে গিয়ে ওদের সাথে খেলায় জুটে যান। পাশ থেকে শাহুজীর কনুই এর খোঁচা খেয়ে আবার তিনি সম্বিৎ ফিরে পেলেন। শাহুজি ভাষণের প্রতিলিপিটা মহারাজকে দিয়ে বললেন, আরেকবার ভালো করে ঝালিয়ে নিন। মহারাজ বললেন ঝালিয়ে নেওয়ার কিচ্ছু নেই, দেখে দেখে তো পড়ব, একেবারে মঞ্চে উঠে পড়লেই চলবেখন। মহারাজ মিত্র বর্মনের জন্য বিশাল শামিয়ানা টাঙিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল, সেখান থেকে তিনি বিভঙ্গদেশের প্রজাদের জন্য কিছু বলতে চান। অনেকে এতদিন এই রাজার নাম শুধু শুনেছিল, আজ চোখের দেখা দেখতে এসেছে, তার ওপর খবর চাউর হয়েছে ঘর্ঘরদেশের রাজা নাকি আজ বিভঙ্গদেশের ভাষায় কথা বলবেন। বিভঙ্গ রাজবাড়ীতে দারুণ দারুণ নিরামিষ পদে মধ্যাহ্নভোজ সেরে ঢেঁকুর টেঁকুর তুলে মহারাজ মিত্রবর্মণ মঞ্চে উঠলেন।
- মিত্রগণ, আজ আপনাদিগকে সামনে দেখিতে পেয়ে খুবই ভালো লাগিতেছে। আমি ঘর্ঘরদেশের রাজা, অনেক পথ পার হইয়া আপনাদিগের সহিত দেখা করিতে আসিয়াছি।
আপনারা অবগত আছেন ঘর্ঘরদেশ আশেপাশের মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী রাজ্য, দিকে দিকে ইহার নাম। সমগ্র দেশ বীর পালোয়ানে ভর্তি, আমাদিগের সর্বাধিক নামি যে পালোয়ান তাহার নাম তিশমার ঘর্ঘরওয়ালা। সে এক আঘাতে ত্রিশটিকে আহত করিতে সক্ষম, বাড়াইয়া বলিতেছি না, সত্যই ত্রিশটি মক্ষিকা মারিতে পারে সে একদানে।
সভায় গুঞ্জন শুরু হল, সবাই বিভ্রান্ত, কেউ কেউ ফিক করে হেসে ফেলল, মহারাজ ভাবলেন যাক ভালোই শুরু হচ্ছে ভাষণ।
- যুদ্ধে আমরা যখন যাই অতিবৃহৎ সপ্তাশত কামান আমাদিগের সঙ্গে থাকে, সেই সমস্ত কামানে অগ্নি সংযোগ করিলেই, কামান হইতে একতাল গোময় নির্গত হইয়া শত্রু সৈন্যের মস্তকে পতিত হয়। আমাদিগের সৈন্যরা সেই সুযোগে ঘুঁটের মালা পরিধান করিয়া কঞ্চি হস্তে মুক্ত কচ্ছ হইয়া উল্টো প্রান্তে দৌড় মারে।
সভায় বেশ হাসির রোল শুরু হয়ে গেল, মহারাজ তাতে আরও খুশি।
- আমাদিগের রাজ্যে শিক্ষারও খুব কদর, যে সমস্ত শিক্ষার্থী পাঠশালায় পড়াশোনায় সবিশেষ দক্ষ, সমস্ত শ্লোক মুখস্থ বলিতে পারে, সর্বাগ্রে সমস্ত আঁক কষিতে পারে, তাদের আমরা মস্তক মুণ্ডন পূর্বক, গর্দভের পৃষ্ঠে বিপরীতমুখে স্থাপন করিয়া মস্তকে দধির অবশেষ ঢালিয়া রাজ্য হইতে বিতাড়ন করি।
জনতার হাসি আর থামছে না। মহারাজের উৎসাহ তুঙ্গে। ওদিকে যেসব মান্যগণ্য লোকরা ঘর্ঘর রাজ্যের দিকে ঝুঁকে ছিল তাদের মুখ চুন।
- ততোধিক অপূর্ব আমাদিগের খাদ্যরুচি, সাত্ত্বিক খাদ্য বিনা অন্য কিছুই আমরা গ্রহণ করি না। আমরা দিন শুরু করি উষ্ণ ভূষির সহিত শিবাম্বু পান করিয়া। বিল্ব পত্র, কন্টল পত্র, বল্মীক স্তূপ ও সদ্য ভূপতিত সুমিষ্ট ছাগমল গ্রহণ করিয়া আমাদের উদর তৃপ্ত হয়।
এবার জনতা পাগলের মতো হাসাহাসি শুরু করায় শাহুজির কিঞ্চিৎ সন্দেহ হল। মহারাজকে কানে কানে বললেন দ্রুত ভাষণ শেষ করুন।
মিত্রবর্মণ ঘাড় নেড়ে বললেন এই তো হয়ে এসেছে,
- আমাদিগের রাজ্যের সব চাইতে ভালো ব্যাপার, কোনো দারিদ্র্যর চিহ্নমাত্র এরাজ্যে নাহি, দরিদ্র কৃষক, মজুর, ভিক্ষুক এদেরকে দেখামাত্র আমরা চাবকে রাজ্য থেকে ভিনদেশী দাগাইয়া বিতাড়ন করি, রাজা মাত্রেরই যা অবশ্যকর্তব্য।
যাহা হউক বুঝিতে পারিতেছেন নিশ্চয়ই বিভঙ্গদেশ ঘর্ঘর সাম্রাজ্যের তুলনায় ফকিরের নাসিকার নস্যের সমান মাত্র। তাই আপনাদিগের কাছে অনুরোধ সিদ্ধান্ত যাই নেবেন, সুগভীর ভাবনা পূর্বক নেবেন। ধন্যবাদ।
বিভঙ্গরাজ হাসি চেপে উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে জোরে মহারাজ মিত্রবর্মণের জন্য হাততালি দিতে বললেন। মিত্রবর্মণ যখন ভাষণ শেষে আনমনে নেমে আসছেন, একজন ভিড় থেকে মিত্রবর্মণের মুকুট তাক করে পাদুকা ছুঁড়ে মারলে একটুর জন্য তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। মিত্রবর্মণ দেখতেও পেলেন না। বিভঙ্গদেশের পেয়াদা বাধ্য হয়ে ভিড় থেকে সেই লোকটাকে ধরে নিয়ে গেল টেনে হিঁচড়ে।
শেষমেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিন এসে পড়ল, দিকে দিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ শিবিরে বিশাল ভিড় জমল মানুষের। কেউ কেউ শিবিরে এসে জানতে পারল তার নাম নাকি তালিকা ভুক্ত হয়নি, তাই তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবে না। সেই নিয়ে বিস্তর গোলযোগও হল নানা জায়গায়। দ্রুত ঘর্ঘর বাহিনী সেসব দমনও করল বল্লম উঁচিয়ে। তাও বহু বহু কাগজে প্রজারা টিক মেরে জমা দিল দলে দলে।
মহারাজ মিত্রবর্মণকে সেই ভাষণের কেচ্ছার কথা আর কেউ খুলে বলেনি ভয়ে। সেই দিন থেকে ঘর্ঘররাজ ও বিভঙ্গরাজ দুজনেই বেশ খোশ মেজাজে আছেন। তবে সিদ্ধান্তে ঘেঁটু ফুল না ব্রহ্মকমল কার পাল্লা ভারী হল সব কাগজ গোনা হলে তবেই বোঝা যাবে, এখন দু দেশের পেয়াদারা মিলে সেইসব লক্ষ লক্ষ, অর্বুদ অর্বুদ, কাগজ গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, গুনছে তো গুনছেই, ....
পুনশ্চ:
উঁহু, শেষটা কিছুতেই ক্লিফহ্যাঙ্গারে শেষ করব না। যে কেউ শেষটা নিজের মতো করে ভেবে নিতে পারেন। কেউ ভাবতে পারেন এত কিছু করে শেষমেশ শাহুজির বুদ্ধিতে ব্রহ্মকমলই গুণতিতে বুঝি বেশি পড়ল, কেউ ভাবতে পারেন, যাহ, তা কখনো হয়, বিভঙ্গ দেশের প্রজারা মিত্রবর্মণের ওপর যেরকম খাপ্পা, ঘেঁটুফুলের পাল্লাই ভারী। আমি ভাবলাম একটু অন্যরকম, প্রায় মাস তিনেক ধরে রাত দিন এক করে সমস্ত কাগজ গোনাগুনি চলল। শেষে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করে যা বেরোল, তা দেখে তো সিদ্ধান্ত কমিশনের চক্ষুস্থির। ঘর্ঘর দেশের সৈন্যরা তো গর্দান যাওয়ার ভয়ে সিঁটিয়ে উঠল, ওদিকে বিভঙ্গদেশের পেয়াদারা এর ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। গুণে দেখা গেছে ঘেঁটুফুল আর ব্রহ্মকমলে প্রায় সমান সমান টিক পড়েছে। কিন্তু সেসব কাগজ যোগ করে যত হয় তার তিনগুণেরও বেশি প্রজা কাগজের দুটো ছবিই কেটেকুটে মস্ত বড় করে পলাশ ফুলের ছবি এঁকে জমা দিয়েছে।