

আমি বিদুষী নই, লিখিয়ে নই। সংসারপ্রবাহে বহমান এক সাধারণ গৃহবধূ মাত্র। তবু ঘটনাচক্রে আকস্মিকভাবে লেখার জগতে চলে গিয়েছিলাম। তখন বয়স প্রায় চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই। ঘরে-বাইরে তুমুল ঝড়কে সাথী করেই শুরু করেছিলাম নতুন পথচলা। এবং আশ্চর্য, আমার লেখার তারিফ করতে লাগলেন গুটিকয় প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধ লেখকরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ‘মোহনা’ পত্রিকার সম্পাদক, ফাদার দ্যতিয়েন, ফাদার ম্যাথিউ শিলিংস, আর ডঃ গৌতম পাল। বলা বাহুল্য, ফরাসিভাষী, প্রচারবিমুখ, জেসুইট এই ফাদার শিলিংস বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নিরলস সেবক ছিলেন। এই ‘মোহনা’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাবার আগের শেষ ৮ বছর (২০০৫-২০১২), আমি এর নিয়মিত লেখিকা ছিলাম। আবার উপদেষ্টামণ্ডলীরও সদস্যা ছিলাম। পত্রিকাটির প্রুফ রিডিং করতাম আমি। কোন তথ্যভিত্তিক বিষয় থাকলে, ফাদারও প্রচুর সাহায্য করতেন। ফাদার শিলিংস বাবার বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। ক্রমে আমারও বন্ধু হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন এক অপার শান্তির আশ্রয়। সে এক অন্য কাহিনী।
এই প্রসঙ্গে আজ যার কথা লিখতে চাইছি, সেই ফাদার দ্যতিয়েন, আমি বলি রসরাজ ফাদার দ্যতিয়েন, ধীরে ধীরে আমার বন্ধুসম হয়ে উঠেছিলেন। এ যেন অসমবয়সী বন্ধুত্বের এক নক্সী কাঁথা। কতো স্মৃতি উকি মেরে যায়, মনের আনাচ কানাচ জুড়ে। যথার্থই তিনি ছিলেন রসরাজ। সাহিত্য আর জীবন থেকে রস গ্রহণ কীভাবে করতে হয়, তাঁর কাছে, তাঁকে দেখে শিখেছি। জানি না, কেবল কালির আখরে তাঁকে কতটা যথাযথ বর্ণনা করা সম্ভব। আমি শুধু আমার গুরু ও বন্ধু রসরাজকে যেমন চিনেছি, সেই সম্পর্কটুকুর বিবরণ এখানে দেবো, তাঁর সাহিত্যকৃতির বাইরে যে ফাদার দ্যতিয়েনকে বাঙালী পাঠক চেনে না, তাঁর একটা অন্য পরিচয় তুলে ধরবার উদ্দেশ্যে। তাঁর সেই গরিমার ছটায় আমি নিজেও আলোকিত হয়ে যাবো, এই লোভটাও কি আর নেই আমার? ফাদারের সেই পরিচয় যে একান্তভাবে আমারই জানা!
সম্ভবত ১৯৭০ সাল। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর। বাবার (লুইস প্রভাত সরকার) চাকরিসূত্রে আমাদের ওখানেই বসবাস তখন। আমি ঐ ছয়ের কাছাকাছি। নিতান্ত বালিকা। বাবা বিষ্ণুপুর গুরু ট্রেনিং (টিচার্স ট্রেনিং) স্কুলের হেডমাস্টার তখন। স্পষ্ট- অস্পষ্ট মিলিয়ে মনে পড়ে, ফাদার আমাদের বাড়িতেই উঠেছিলেন, বিষ্ণুপুরে এসে। কেননা ঐ শহরে তখন আমরাই ছিলাম একমাত্র খ্রিস্টান ক্যাথলিক পরিবার। ওই বয়সে ফাদার দ্যতিয়েনের মত মানুষকে তো আর পরিমাপ করা সম্ভব ছিল না, তাই তাঁর অত গুরুত্বের ভারাভার না বুঝে, কখনো তাঁর কোলে বা কখনো তাঁর কাঁধেও চেপে বসেছি। আর পাঁচজন মানুষ বাড়িতে এলে, যেমন খুশি খুশি লাগত, তাই-ই লেগেছিল। তবে ফাদার দ্যতিয়েনের বেলায় বোধহয় একটু অন্যরকম কিছু দেখেছিলাম। সেসময় যেন অনেক বেশি বেশি মানুষ বাড়িতে আসছেন। ফাদারের সঙ্গে কথা বলছেন, এই আর কী! আবার সময় অসময় তুচ্ছ করে সারা শহর তিনিও চরকিপাকে ঘুরছেন। মজা তো আমারো! কেননা নিতান্ত বালিকার আবদারে, কখনো বা ফাদারেরই ছেলেমানুষি উৎসাহে সঙ্গী হয়েছি আমিও, শহর পরিক্রমণে। দেখেছি পথে ঘাটে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলছেন। হাসছেন। পরে বুঝেছিলাম, ফাদার তো এভাবেই বহু লেখার উপাদান সংগ্রহ করতেন। উপরন্তু এটা তাঁর মিশুকে স্বভাবের এবং মানুষকে জানার ও বোঝারও একটা অন্যতম প্রক্রিয়া ছিল। সেইকটা দিন কী যে আনন্দে কেটে ছিল, বলার নয়। সে এক হৈহৈ রৈরৈ ব্যাপার শহর জুড়ে। ভীষণ উচ্ছ্বসিত শহরের মানুষজন। বিশেষত শিক্ষক, লেখক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মানুষরা। বাবার স্কুলের তরফ থেকে ফাদারকে সংবর্ধনা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের নিমিত্ত রীতিমত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল। ঠিক কতদিন ছিলেন, তা মনে নেই এখন। তবে বেশ কয়েকটা দিন ছিলেন। বিষ্ণুপুরের পুরানো মানুষেরা কিন্তু আজো ফাদারের সেই স্মৃতি বহন করেন। কারণ ২০১০-র ২৯ ডিসেম্বর আমি বিষ্ণুপুরে গিয়ে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে, ভালোভাবেই অনুভব করেছিলাম এই কথা। আর ততদিনে তো অনেকে জেনেই গেছেন, ফাদারের রবীন্দ্র স্মৃতি পুরষ্কার অর্জনের কথা।
এরপর ১৯৭২-র ডিসেম্বরে আমরা নদীয়ার কৃষ্ণনগরে চলে আসি। বাবা তখন থেকে, অবসর নেওয়ার আগে অবধি কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলেই শিক্ষকতা করেছেন। ওই ৭০-র দশকেও কয়েকবার কৃষ্ণনগরের বাড়িতেও ফাদার এসেছিলেন। তারপর তো ফাদার ১৯৭৮-এ বেলজিয়াম ফিরে যান। কেন যান, তাও আমরা আজ অনেকেই জানি। বাঙালি খ্রিস্টান, সমাজের একাংশ, ফাদারের কিছু লেখা নিয়ে বিতর্ক তোলেন। এবং সে অভিমানেই তিনি বেলজিয়াম ফিরে যান। কিন্তু ফাদারের দ্বিতীয় মাতৃভাষা তো ছিল বাংলা, ছিল বাংলার সঙ্গে তাঁর অমোঘ আত্মিক টান। সে টান তো, উপেক্ষা করা চাট্টিখানি কথা নয়। তাই আবার তাঁকে ফিরে আসতে হয় বেশ কয়েকবারই, এই বাংলায়। হয়তো এই বাংলার মাঠ-ঘাট, শালিখ, শঙ্খচিলকে ভালোবেসেই। আর আমিও ততদিনে, বহু মাঠ-ঘাট, নদী-নালা পেরিয়ে, আবার তাঁর দেখা পেলেম, ২০১০-র, ১০ ই ডিসেম্বর, যেদিন ফাদার পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাদেমী মঞ্চ থেকে, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার গ্রহণ করলেন।
এই পুরষ্কার পাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই, কলকাতার সাহিত্যমহল আবার নড়েচড়ে বসেছিল। কারণ ২০০৭ সাল থেকেই পাঠকের বহু আকাঙ্খিত, তাঁদের প্রিয় ফাদার দ্যতিয়েনের সেই অননুকরণীয়, বিশিষ্ট শৈলিতে নির্মিত লেখা, আবার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। এবং যথারীতি সাড়া পড়ে যায় পাঠকমহলে। সম্ভবত, এই পর্যায়ে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম লেখাটি ছিল- কাল রাতের বেলা গান এল মোর মনে- এই শিরোনামে।
আমি তো সেই স্কুলে পড়ার সময়েই তাঁর অনবদ্য রম্যরচনা ‘ডায়েরির ছেঁড়া পাতা’ পড়েই মুগ্ধ হয়েছিলাম। যেটির জন্য তিনি ১৯৭৩ সালে, নরসিংহ দাস পুরষ্কার পান। তারপর পড়েছি, ‘রোজনামচা’। তবে এসব লেখার সমালোচনা করবেন সাহিত্যবোদ্ধারা। আমি কেবল বলতে পারি, এসব লেখার বাইরে, ফাদার দ্যতিয়েনের যে মানুষী আবেগ, তাঁর কিছু চাওয়া বা না-পাওয়ার আক্ষেপ। যেমন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, শেষ যেবার আমার বাড়িতে এসেছিলেন ১৫ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৫ সালে, বাংলাদেশ ভ্রমণ সাঙ্গ করে। কথায় কথায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, অজন্তা, সবাই আমার কেবল এই ‘ডায়েরির ছেঁড়া পাতা’ বা এই ধরণের লেখাগুলি নিয়েই কথা বলেন। কিন্তু ‘আমাদের জীবন’ এ ( যে পত্রিকা ফাদার নিজে সম্পাদনা করতেন ) আমার অনেক ভাল ভাল লেখা আছে। যেগুলির কথা কেউ একবারো বলেন না। ফাদারের সেই আক্ষেপের স্বর, চোখের চাহনি আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল, যে, কোনো শিল্পী বা লেখকই চান না, তাঁর একমাত্রিক পরিচয়ে আবদ্ধ থাকতে। আর আমিও বিশ্বাস করি, একমাত্রিক পরিচয় একজন মানুষের যথার্থ পরিচয় হতে পারে না। কারণ, বহুকৌণিকতা নিয়েই মানুষের জীবন। একজন মানুষের মাঝে এই যে বহুত্ব, তার মধ্যেই নিহিত থাকে একজন মানুষের যথার্থ স্বরূপ। যেকারণে, এই বহুত্ব, যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের কাম্য। এই বহুত্বের স্বীকৃতি বিনা একজন মানুষের পূর্ণ প্রস্ফুটন সম্ভব নয়।
যাইহোক, কলকাতাতে ফাদার আসতেই, আমি ফোনে কথা বলেছিলাম। পরিচয় দিতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, কবে তোমার সঙ্গে দেখা হবে, অজন্তা? বাবা, এর আড়াই বছর আগেই চলে গেছেন জগত ছেড়ে। অর্থাৎ ২০০৮-র ফেব্রুয়ারীতে। তাই আমি একটু বেশিই স্মৃতি-কাতর হয়ে পড়েছিলাম। ফাদারের সঙ্গে দেখা করার জন্য মনটা ভারি আকুলি বিকুলি করছিল। তো ওই পুরষ্কারের দিন, অনুষ্ঠানের শেষে, ফাদারের সামনে গিয়ে শুধু বলেছিলাম, ফাদার আমি অজন্তা। প্রণাম করার অবসরটুকুও দিলেন না। সজোরে বুকে টেনে নিয়ে, কেঁদে ফেললেন। আমি তথৈবচ। কতক্ষণ? জানি না, হুঁস ফিরল, যখন হঠাৎ পাশ থেকে, স্নেহাশীষ (স্নেহাশীষ শূর) বললেন, আরে অজন্তাদি! হ্যাঁ, ওই মোহনা-তে লেখার সুবাদেই পরিচয়, স্নেহাশীষের সঙ্গে।
আসলে ফাদার ছিলেন, অত্যন্ত আবেগী মানুষ। যে মুহূর্তে যেমনটা অনুভব করতেন, ঠিক হুবহু সেটারই প্রকাশ ঘটাতেন। তাতে কে কী মনে করল, সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনতেন না। এ ব্যাপারে ফাদার ছিলেন অত্যন্ত একরোখা বা একগুঁয়ে মানুষ। যাইহোক, সেদিন আর বেশিকিছু কথা হয়নি। কারণ বহু বিশিষ্ট মানুষ তো বটেই, সঙ্গে অনেক মিডিয়াও ছিল। তাই সুযোগমত আবার দেখা করব, কথা দিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন একরাশ স্মৃতি মেদুরতা নিয়ে।
এর কয়েকদিন পর, ১৪ অরিখে (ডিসেম্বর-২০১০) আমাদের অবাক করে দিয়ে ফাদারই সকালে ফোন করলেন আমায়। এবং অত্যন্ত আন্তরিক ভাবে জানালেন, আমার সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে চান। আমি যেন দুপুর দুটোয়, প্রভু যীশুর গির্জায় চলে যাই। বেলজিয়াম থেকে এলে, এটাই ছিল ফাদারের আস্তানা। যাই হোক কোনো দ্বিরুক্তি না করে, আমি দুপুর দুটোয় সটান হাজির হলাম, প্রভু যীশুর গির্জায়। গেটম্যানের জিজ্ঞাসাবাদ সারা হলে, ভিতরের এক দিকে প্রবেশ করতেই দেখি, ফাদার হাস্যমুখে, দুবাহু বাড়ায়ে এগিয়ে আসছেন, আমার দিকে। আবার সেই স্নেহালিঙ্গন। আহা! কী একটা দিন কেটেছিল সেদিন। ওই দুপুর দুটো দুটো থেকে, সাড়ে ছটা অবধি ছিলাম ফাদারের সঙ্গে। শুধু বলতে পারি, সেদিন একটি অনন্য দিনের সংযোজন ঘটেছিল, আমার জীবনে। গির্জার পার্লারে বসে কিছুক্ষপ কথা বলার পর এলেন, দয়াময়ীদি (ভুতোর দিদি। ফাদারের গল্পের এক জীবন্ত চরিত্র)। তারপর আর কী! তিনজনে খানিক আড্ডা মেরে, দয়াময়ীদির গাড়ি করে গেলাম, কলেজ স্ট্রিট। গ্রন্থালয় থেকে আমি আর দয়াময়ীদি, ‘ডায়েরির ছেঁড়া পাতা’এবং ‘রোজনামচা’ কিনলাম, ফাদার দোকানেই বইগুলোতে সই করে দিলেন। তারপর কিছু বইয়ের দোকান ঘোরাঘুরি করে, সোজা গাঙ্গুরাম। গরম গরম সিঙ্গাড়া কেনা হল। ফের প্রভু যীশুর গির্জায় ফিরলাম, বিকেলের মধ্যেই। গরম চা সহযোগে সেই সিঙ্গাড়ার সদ্ব্যহার হল। আর তারই সঙ্গে তুমুল আড্ডা চলতে লাগল। থেকে থেকে ফাদারের সেই দরাজ হোহো হাসির হররা। প্রতিটি কথায়, বচনে চোখে মুখে উপছে পড়ছে কৌতুকের ঝিলিক, এ দৃশ্য বা এ আড্ডার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুলিখন সম্ভব নয়। অন্তত আমার পক্ষে তো নয়-ই। একজন ৮৬ বছরের বৃদ্ধের (?) প্রতিটি রোমকূপ মেলে যেন ছিটকে পড়ছে প্রাণের স্ফুলিঙ্গ। যেন অফুরান প্রাণের উৎসধারা। কোথাও কোনো ক্লান্তির ছাপ নেই। এই প্রাণ বর্ণনা করে কার সাধ্য! কেবল প্রাণ দিয়েই অনুভব করতে হয়। বলে বা লিখে তা বোঝানো সম্ভব নয়।
কত যে কথা হল সেদিন, কী বলি! এরই মাঝে, ফাদারের আগামী লেখা, যেটা দেশ পত্রিকা ছাপতে চলেছে - আটপৌরে দিনপঞ্জি - তার দুটো খসড়া পড়ে শোনালেন। জানতে চাইলেন, কেমন লাগল। এর চেয়ে দুর্লভ অভিজ্ঞতা আর কী হতে পারে!
সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ সি.জি. (চিন্ময় গুহ) এসে ফাদারকে ওঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন। আর আমিও বাড়ি ফিরলাম, এক হীরকখণ্ড সম সমৃদ্ধি নিয়ে। এক টুকরো ফেলে আসা সেই ছোট্টবেলা আর আমার হারিয়ে যাওয়া বাবার গায়ের গন্ধ মেখে।
এরপর ঐ ২০১১-র জানুয়ারীতে আরও দুবার প্রভু যীশুর গির্জার পার্লারে, ফাদারের সঙ্গে দেখা করি, আবার কয়েক ঘন্টা সেই তুমুল আড্ডা, আলোচনায় কোন বিষয় নিয়ে কথা না হত! কখনো বিভিন্ন বই ও লেখা, কখনো বর্তমান বাঙালি সমাজের বহমান অবস্থা, সিনেমা, গান, রাজনীতি, ধর্মীয় গোঁড়ামির কুফল, মায় নারী স্বাধীনতা, এমন কতকী! কখনো মতে মিলত। কখনো বা মিলত না। সেই নিয়ে আবার প্রচুর তর্কাতর্কি, প্রচুর কথা কাটাকাটি। কিন্তু শেষমেষ ঐ হোহো হাসিতেই সব কিছুর সমাপ্তি ঘটত। এক আশ্চর্য কথকতার সৃষ্টি হত।
আড্ডার মাঝে মাঝে কখনো কখনো, মান্না দে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বা শ্যামল মিত্র-র গানের দু-চার কলি গেয়ে উঠতেন দরাজ গলায়। বিশেষ করে শ্যামল মিত্র-র অনেক গল্প করতেন, কারণ শ্যামল মিত্র-র সঙ্গে ফাদারের ব্যাক্তিগত পরিচয় ছিল একসময়। অনেক মজার মজার স্মৃতি জড়িয়ে ছিল এই গায়কের সঙ্গে। আর সেগুলোই আরও মজা করে গল্পের ছলে বলতেন, খুব ভালবাসতেন, মজা করেই ভালবাসতেন শ্যামল মিত্র-র- ‘নাম রেখেছি বনলতা যখন দেখেছি’- গানটি। যখনই আমরা আড্ডা দিয়েছি, কোনো না কোনো সময়, চোখে মুখে কৌতুকের ছটা ছড়িয়ে, এই গানটি গাইতেন ফাদার। আর আমিও পাল্টা কৌতুকে, ছদ্ম গাম্ভীর্যে বলতাম, আজন্ম সন্ন্যাসীর মুখে এ কী কথা, ফাদার, অমনি সেই হোহো হাসির হাসির অট্টরোল। অনবদ্য সে মুর্চ্ছনা। আসলে তাঁর সেন্স অফ হিউমার বা রসবোধ কোন পর্যায়ে উঠতে পারে, তা, তাঁর সঙ্গে প্রাণখুলে আড্ডা না দিলে বোঝানো বড়ই মুশকিল। এমনিতেই আমরা জানি ফরাসিরা রসিক জাতি। কিন্তু ফাদার যেন, সবাইকে ছাড়িয়ে, হিমালয়ের চূড়া ছুঁয়েছিলেন!
আবার যখন রবিঠাকুরের গানের প্রসঙ্গ আসত, ফাদার যেন অন্য মানুষ হয়ে উঠতেন। খুব প্রিয় গান ছিল, “তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই-” আর ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। এই গান দুটি তাঁকে মুহূর্তে ভক্তিরসে আচ্ছন্ন করে ফেলত।
বাংলা সিনেমাও দেখতে বেশ ভালবাসতেন। ওঁর কথা অনুযায়ী আমি কিছু বাংলা সিনেমার তালিকা করে দিই। তার মধ্যে বেশ কিছু সিনেমার সিডি কিনে নিয়ে যান। মজা করে বলেছিলেন, যাক, পুরস্কারের টাকাটার কিছুটা সদগতি হল। আরও বলেছিলেন, বেলজিয়ামে তো আর বাংলা বলার লোক পাব না। তখন এগুলো দেখলে ভাল লাগবে।
২৮ শে জানুয়ারী, ২০১১। ঐদিন সন্ধ্যায় প্রভু যীশুর গির্জার হলঘরে, ফাদারকে বিদায় সম্বর্ধনা জানানোর জন্য, আয়োজন করা হয়, ‘দ্যতিয়েনি মজলিস’ নামে এক সভার। যেহেতু, এর পরদিন অর্থাৎ ২৯শে জানুয়ারী, ফাদার আবার বেলজিয়াম ফিরে যাচ্ছেন। বহু বিশিষ্ট মানুষ উপস্থিত ছিলেন ঐ মজলিসে। সবাই যে যাঁর মত করে, ফাদারের সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন ঐ মজলিসে, আর বেশ রাত পর্যন্ত চলেছিল ঐ মজলিস। তবে আমার বাড়ি একটু দূরে থাকায়, আমি ৮ টার আগেই বেরিয়ে এসেছিলাম। তার আগে আবার সেই, স্নেহালিঙ্গন। আবারও অশ্রুবর্ষণ, উভয়তই। হ্যাঁ, সন্ন্যাসীও কাঁদতে পারেন। কেননা, তিনি একজন মরমী মনের, লেখক-মানুষ। মানুষের ব্যথা-বেদনা, হর্ষ-উচ্ছ্বাস, সবই যে তাঁকে ছুঁয়ে যাবে, তা আমার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না।
ঐদিনই আমার এবং আরও অনেক গুণমুগ্ধের ছবি, ই-মেল আইডি, ফাদার সঙ্গে নিয়ে যান। আমাদের সবার ছবি সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কারণ ছিল। ফাদার ঐ সময় বয়সোজনিত কারণে মাঝে মাঝে স্মৃতিভ্রংশের সমস্যায় ভুগতেন, সাময়িক ভাবে। কিন্তু ছবিগুলি দেখলে সহজেই সবার কথা মনে পড়বে, এটাই ফাদারের কাম্য ছিল। আর সেই থেকেই, ফাদারের সঙ্গে আমার, ই-মেলে চিঠিপত্রের আদান প্রদান শুরু হয়। তা চলতে থাকে, একদম ফাদারের শেষ শয্যা নেওয়ার আগে পর্যন্ত।
এরপর, আবার ২৭/১০/২০১৩ তে খবর পাই ফাদার আবার কলকাতায় আসছেন। যথারীতি আবার প্রভু যীশুর গির্জার পার্লারে সেই অনবদ্য আড্ডা। এতদিনে ফাদার মোহনা পত্রিকার সূত্রে জেনে গেছেন, আমার কিছু লেখালেখির কথা। তাই এবার গিয়ে, একটু ভয়ে ভয়েই আমার একটা লেখা দিয়ে আসি ফাদারকে, ভয় এই কারণেই, জানি ফাদার খুব একটা কারো লেখা পড়েন না। অন্যদিকে কঠোর সমালোচক, তায় ওই সময় ওঁর অনুরাগীদের আনাগোনায়, আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণে সদা ব্যস্ত। কিন্তু এরই মাঝে, আমাকে অবাক করে দিয়ে, একদিন ফোনে জানালেন যে, আমার লেখাটা উনি পড়েছেন। এবং ভালও লেগেছে। আরো জানালেন, আমার শব্দভান্ডার বেশ সমৃদ্ধ ও মনকাড়া এবং লেখার বুনোটও খুব স্বচ্ছন্দ। তবে কিছু কিছু জায়গা ফাদারের বুঝতে অসুবিধা হয়েছে, যেহেতু উনি ‘রস’ (নরেন্দ্রনাথ মিত্র) গল্পটা পড়েননি। কেননা, এই লেখাটার সঙ্গে ‘রস’ গল্পটার একটা ব্লেন্ডিং ছিল, একটা জায়গায়।
যাইহোক, এরপর আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে একদিন ফোনে জানান, আমি তোমার সঙ্গে আবার দেখা করতে চাই। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। চারপাশে এত 'ভিড়' আর ভালো লাগছে না। আমি হাঁপিয়ে উঠছি। আমি মজা করে বললাম, ফাদার একেই বলে খ্যাতির বিড়ম্বনা। আপনি খ্যাতিমান মানুষ যখন, তখন এটুকু তো সহ্য করতেই হবে। কিন্তু মনে মনে তো জানি, এই মানুষটা একদিকে যেমন বাঘের মত, অন্যদিকে ততটাই পেলব। যতটাই রসিক, ততটাই রূঢ়। যতটাই ভিড়ে মিশে যেতে পারেন, ততটাই একলা, নিঃসঙ্গ। ঐ বছরই বেহালা বই-মেলায়, ওঁর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে (সেদিন বিশ্বজ্যোতি দাসগুপ্তও ছিলেন সাথে) এমনই কিছু কথা উপলব্ধি করেছিলাম। বলেছিলাম, ফাদার এবার আপনি কলকাতাতেই থেকে যান। আর বেলজিয়াম, ফিরতে হবে না, উনি সোজাসুজি জানালেন, অনেকের ঈর্ষা হবে, অজন্তা, আর সেই আঘাতটা আসবে ওঁর স্বগোত্র থেকেই। জিনিসটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই আর কথা বাড়াইনি। ওঁর চলে যাওয়ার মূলে বাঙালি খ্রিস্টান সমাজ তো ছিলই। তবে হয়তো আরও কাছের কেউ অপ্রিয় আচরণ করছিলেন। বুকে কতটা গভীর ক্ষত নিয়ে হেসে হেসে বেড়াচ্ছেন, তা সেদিন বুঝেছিলাম। প্রতিভা অনেকসময় দুঃসহ হয়ে ওঠে। নিয়তির কী পরিহাস!
তবে একটা ব্যাপার ক্রমশ পরিস্কার হয়ে উঠছিল যে, লেখার ব্যাপারে ফাদার মারাত্বক খুঁতখুঁতে ছিলেন, তাঁর সম্বন্ধে যে বা যাঁরা লিখেছেন, সে ব্যাপারেও তিনি সবসময় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। একদিন কথার ফাঁকে বলেছিলেন, চিন্ময় (চিন্ময় গুহ) যতটা ভাল বোঝে, ততটা ভাল লেখে না। আমি একটু অবাক হয়ে বলেছিলাম, ওঁর লেখা তো আমার বেশ ভাল লাগে। ওঁর বই আমি পড়েছি। আপনার সাথে নেওয়া সাক্ষাৎকারও পড়েছি। কই খারাপ তো লাগেনি কিছু! বরং ভালই লেগেছে। কিন্তু ফাদারের অভিব্যক্তি আমার সেকথায় সায় দেয়নি। আবার অপরপক্ষে ফাদার শিলিংস সি. জি. র সম্পর্কে বলতেন, ওর মত ফরাসিটা এদেশে খুব কম মানুষই জানেন। এগুলো আমার জীবনে খুব ছোটো ছোটো, কিন্তু অত্যন্ত দামী সঞ্চয়। যাইহোক বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে, আমিও আর বেশি কিছু বলিনি। এরই সাথে দেখেছি ফাদার, তুলনামূলক ভাবে বিশ্বজ্যোতিদার (বিশ্বজ্যোতি দাসগুপ্ত) লেখা বেশি পছন্দ করতেন। ব্যক্তিগত ভাবে ভালওবাসতেন খুব। এটা জেনেছিলাম, ফাদার যখন বুঝতে পারেন, মানসিক গঠনগত কারণে আমিও খুব একলা, বন্ধুবান্ধব নেই বললেই চলে। তখন ফাদার আমাকে, বন্ধু হিসেবে বিশ্বজ্যোতিদাকে সাজেস্ট করেছিলেন। যদিও আমাদের পূর্ব পরিচিতি ছিল, মোহনাতে লেখার সুবাদে।
যাইহোক এরপর একটু অতি সাহসেই আমার আরো দুটো লেখা দিয়ে এসেছিলাম ফাদারকে। এবং উনি পড়বেন, এও কথা দিয়েছিলেন। যিনি কিনা বলেছিলেন, সেবার কলকাতাতে থাকাকালীন তিন মাসে, কারও লেখা পড়বেন না।
এরপর ১৩/১২/২০১৩ তে, আমি আবার ফাদারের সঙ্গে দেখা করতে যাই। এবং গিয়ে যখন শুনলাম, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফাদারের কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই, তখন সোজা ফাদারকে নিয়ে আমার বাড়ি চলে এলাম। অটো এবং মেট্রো করে আমরা এসেছিলাম। তাতে ফাদার ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। সেদিনই সন্ধায় অলক ভাইয়ের (আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড, অলক পুষ্পপুত্র) সঙ্গে ফাদারের আলাপ করিয়ে দিই, অলকেরই অনুরোধে, সে সন্ধ্যেটাও ভারি আনন্দে কেটেছিল।
রাতে খুব তৃপ্তি করে, ডিমের ভুজিয়া আর রুটি খেয়ে ঘুমাতে গেলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, ফাদার রীতিমত হাতমুখ ধুয়ে, সোফায় বসে আছেন। আমাকে দেখেই ছেলেমানুষের মত বায়না ধরলেন, এখুনি ফাদার, ‘নাম রেখেছি বনলতা’ গানটি শুনবেন, অগত্যা বাসি-মুখেই কম্পিউটারে বসে, গানটি ডাউনলোড করে শোনালাম ফাদারকে। ফাদারের সেই ছেলেমানুষের মত উচ্ছ্বাস দেখার মত ছিল। চোখে মুখে সেই আদি অকৃত্রিম কৌতুকের ঝলকানি, তারপর আমি হাতমুখ ধুয়ে, একসাথে সকালের খাবার খেয়ে, দুপুরের রান্নার আয়োজন শুরু করলাম, আর এদিকে আমার স্বামী ফাদারের বায়না অনুযায়ী, স্থানীয় গির্জা, বিশেষ কয়েকজনের বাড়ি ঘোরাতে নিয়ে গেলেন। ফিরতেই জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন লাগল? ফাদার তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই জানান দিলেন, কিছু ভাল কিছু মন্দ। যাইহোক দুপুরের খাবার খেয়ে আবার সেই আড্ডা, সেই অনবদ্য কথকতার পদাবলী, আরও কটি ফুল গ্রথিত হল আমার জীবনমাল্যে। বিকেল ৫টা নাগাদ, একটি সংস্থার (নামটা ঠিক মনে নেই) একজন এসে ফাদারকে নিয়ে গেলেন, আমার বাড়ি থেকেই, আর আমি এদিকে, ‘মাঝে মাঝে বটে ছিঁড়ে ছিল তার, তাই নিয়ে কেবা করে হাহাকার’- ছেড়ে দিয়ে ভাবতে শুরু করলেম, কী পেলেম! অন্ত নাহি তার।
তার কদিন পর, ১৮/১১/২০১৩ তারিখে, বিকেল বেলায়, অলকের গাড়ি করে, আমি, অলক, ফাদার, আর অলকের ছেলে আপন- এই চারজন মিলে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পৈর্তৃক ভিটে, কোদালিয়াতে যাই। তারপর সেখানকার স্থানীয় লাইব্রেরি ও তার তত্বাবধানে সংরক্ষিত ছোট্ট একটি মিউজিয়াম দেখে, সোনারপুর বইমেলাতে উপস্থিত হই। ফাদারকে ঘিরে মেলা উদ্যোক্তাদের সেকী উচ্ছ্বাস! ওরাই আমাদের সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখালেন। শেষে আমাদের সবাইকে পিঠেপুলি খাওয়ালেন। যেগুলি ওই বইমেলাতে অবস্থিত দোকানেই তৈরি হচ্ছিল। সুস্বাদু সেই পিঠে খেয়ে খুব সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন ফাদার।
সেবার ফাদার ফেব্রুয়ারীতে (২০১৪) আবার বেলজিয়াম ফিরে যান। যথারীতি, ই-মেল যোগে পুনরায় আমাদের পত্রালাপ চলতে থাকে। কেননা এর আগে মাঝে বেশ কিছুদিন নানান সমস্যার (আইডি, নেট ও মেশিন সংক্রান্ত সমস্যা) কারণে আমাদের পত্রালাপ বন্ধ ছিল।
এরপর ৭/২/২০১৫ তারিখে, বাংলাদেশ সফর সাঙ্গ করে, ফাদার আবার কলকাতায় আসেন। অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে, তখন থেকেই ফাদার অসুস্থ হতে শুরু করেন। এবং ক্রমশ ধরা পড়ে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। আমাদের মনের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু আমাদের কারও সাধ্য ছিল না, এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার, বোধহয় একেই বলে ভবিতব্য। যা মেনে নিতেই হয়। তাই মেনে নিয়েই আবার দেখা হল তাঁর সঙ্গে। না, এবারে আর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, আমাকে যেতে হয়নি তাঁর কাছে। শিশুসুলভ অস্থিরতায় তিনিই ছুটে এসেছিলেন আমার কাছে। এযেন সাগর উজিয়ে এল নদীকে পথ দেখাবে বলে।
১৫/২/২০১৫ তারিখে সকালেই দেখি, অলকভাইয়ের ফোন। জানাল, গতকাল অলক, ফাদারকে ওর বাড়িতে নিয়ে এসেছে। কিন্তু রাত পোহাতেই সকালবেলা উঠেই বায়না ধরেছেন, আমাকে এখুনি অজন্তার বাড়ি নিয়ে চল (অলকের মুখেই শুনেছি একথা)। অগত্যা অলোক আমায় আরও জানাল, আমি যদি বাড়িতে থাকি, তবে কি ফাদারকে নিয়ে আসবে আমার বাড়ি? আমি দ্বিরুক্তি না করে বললাম, তুই এক্ষুনি নিয়ে আয়, ফাদারকে। সেই সকালেই অলক ওর গাড়ি করে, ফাদারকে নিয়ে আসে আমার বাড়িতে। তখন একটু বেলা গড়িয়েছে। ফাদারকে দেখে খুশি হলেও, মনের ভিতর একটা কাঁটা খচখচ করতেই থাকে। ভাবি, আর কতদিন! তবুও মনের ভাব গোপন করে সাদর অভ্যর্থনা জামাই ফাদারকে। হাসিমুখেই। তখন ছেলে-বৌমা বাড়িতে, একটু কথা বলে, রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু রান্না করব কী! একটু পর পরই, হাঁকডাক। ফাদারের কথা, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, অজন্তা, কাজেই কোনোরকমে রান্না সংক্ষেপ করা। আর মাঝে মাঝে ফাদারের সঙ্গে কথা বলা, খানিক পরে দেখি, আমার জন্যে তাঁর লেখা শেষ বইখানি - ‘লালপেড়ে গল্পবলি’ - নিয়ে এসেছেন। এর আগেও - ‘গদ্য পরম্পরা’ - উপহার দিয়েছিলেন তাঁর স্বাক্ষরসহ। নিতান্ত এ অভাজনের প্রতি, তাঁর এই অপরিসীম স্নেহ, কীভাবেই বা ব্যক্ত করি?
বাড়ির সবাই মিলে একসাথে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সারলাম। ইতিমধ্যে আমার বন্ধুসম পৃথাদি এল, ফাদারের সঙ্গে দেখা করার উদ্দ্যেশ্যে। পৃথাদি ও তার মা ফাদারের লেখার গুণমুগ্ধ ভক্ত। সেই দুপুরটাও আমরা সবাই একসাথে জমিয়ে আড্ডা দিলাম। ফাদার তখন অসুস্থ হলেও, সেই কথকতা বা হাসির রেশে খুব একটা কিছু উনিশ-বিশ লক্ষ্য করিনি। আসলে তাঁর অফুরান প্রাণের কাছে, অসুস্থতাকেও থমকাতে হয়েছিল বৈকি। একপর বিদেশে পৃথাদির গাড়ি করে ফাদারকে, প্রভু যীশুর গির্জায় পৌঁছে দিয়ে আমরা বাড়ি ফিরি।
অনেকবারই আমাদের কথা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে। এবং মাঝে মধ্যেই বলতেন, তোমাকে আমার বাঙালি খ্রিস্টান সমাজে ব্যতিক্রম মনে হয়। তোমার চিন্তার উদারতা ও ব্যাপ্তি আমার খুব ভাল লাগে। তাই তোমার সঙ্গে কথা বলে এত আনন্দ পাই। আমি জানিনা, কেন তিনি এসব বলতেন। তবে আমার সঙ্গে ফাদারের, ইমেলে যে চিঠিপত্রের আদান প্রদান ঘটত, সেসব চিঠিতে, দু-চারটি শব্দেই তাঁর এই অপার স্নেহের পরশ পেয়েছি বারবার। শুধু তাই নয়, আরো অনেককিছু বিস্তারিত জানাতেন, ফাদার। তাঁর লেখার বিষয় তো বটেই। তার বাইরেও থাকত, কোন সিনেমা দেখলেন, কেমন লাগল ইত্যাদি নানান বিষয়। আমার প্রতি ফাদারের এই আস্থা, এইস্নেহ আমাকে যেমন বিচলিত করেছে, আবার তেমনই আপ্লুত হয়েছি। কারণ যে বাঙালি খ্রিস্টান সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে, এদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, বুকে গভীর ক্ষত নিয়ে। জীবনের এই গোধূলিবেলায়, কিছুটা হলেও আমি যে তাঁর প্রাণের আরামের কারণ হলাম, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি, আমার এ জীবনে আর কিছুই নয়।
এরপর, ২১ শে ফেব্রুয়ারী (২০১৫) ঠাকুরপুকুর ব্রতচারী বিদ্যাশ্রম-এ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে, আয়োজন করা হয় এক সভার, সেখানে ফাদার প্রধান অতিথীর আসন অলংকৃত করেন। সেদিন ঐ সভায় কয়েকটি বই উদ্বোধন অন্তে, ফাদার একটি সুন্দর বক্তব্য রাখেন। ফাদারের বাংলা ভাষার প্রতি প্রীতি এবং সম্মান ছিল অতুলনীয়। যেমন কেউ জেনেশুনে যদি ফাদারের সঙ্গে ইংরেজীতে কথা বলতেন, উনি মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে নিতেন। বলতেন, তুমি বাঙালি, আর আমিও বাংলা জানি, তবে, তুমি কেন আমার সঙ্গে ইংরেজীতে কথা বলছ? এ আমার নিজের চোখে দেখা ঘটনা।
যাইহোক, অনুষ্ঠান শেষে ফাদারের সঙ্গে দেখা করে, তাঁর পূর্ব নির্ধারিত বায়না অনুযায়ী, আগে একটা বাংলা ক্যালেন্ডার দিলাম। কী যে খুশি হলেন, ফাদার! তারপর আবার সেই চিরাচরিত কথকতা, সেই হাসি-ঠাট্টা। কিন্তু সেদিন কী কোথাও কোথাও তার কেটে যাচ্ছিল না! কারণ ততদিনে আমরা জেনে গেছি ফাদার, ক্যানসারে আক্রান্ত। ভিতরে ভিতরে আমরা সবাই একটু উৎকণ্ঠিত। তবুও যিনি নিত্য প্রাণময়, তাঁর প্রাণধারা রোধ করে, এমন সাধ্য কার! তিনি যে রম্যরচনার নায়ক। রাজাধিরাজ রসরাজ।
আমাকে বাহুপাশে আবদ্ধ করে, হাসতে হাসতেই এগিয়ে গেলেন গাড়ির দিকে। চড়ে বসলেন গাড়িতে। কৌতুকময় চোখের কোণে যেন টলটল করে উঠল কয়েক বিন্দু জল। আমিও তথৈবচ। গাড়ির কাঁচ উঠে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে আমি হাত নাড়াতে লাগলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল। ফাদার, আর একটি বারও পিছন ফিরে তাকালেন না। আমি হাত নাড়াতেই লাগলাম...
কী জানি! ফাদার কী বুঝতে পেরেছিলেন - এ দেখাই শেষ দেখা!