

অলংকরণ: রমিত
এই ক্লাশ নাইন-টেন এ আমাদের ইতিহাস পড়াতেন জগবন্ধু বাবু। উনার মত করে ইতিহাস-কে প্রায় জীবন্ত করে পড়াতে আমি আর কারোকে দেখিনি – না, এখনকার অনেক তথাকথিত বিখ্যাত টেড-টক দেওয়া সেলিব্রিটি-দেরও নয়। অনেক দিন আগের কথা বলে এখন আর সবকিছু মনে নেই, কিন্তু হালকা মনে আছে উনি যখন হিটলারের উত্থান নিয়ে ক্লাসে কিছু বলতেন। হিটলার ভালো লোক ছিল বা সে যা করেছিল ঠিক করেছিল – এমন কিছু দাবী অবশ্যই ছিল না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কিছু চুক্তি বা জিনিস কিভাবে হিটলারের উত্থানের প্রক্ষাপট তৈরী করেছিল – অত সব খুব গভীরে তেমন বুঝতাম না তখন, কিন্তু নবীন মন কেবলই ভাবত – সত্যিই কি বঞ্চনার শিকার হয় নি কি তারা!
যাই হোক, এই নিয়ে দিস্তে দিস্তে লেখা হয়েছে, এমনকি বাঙলাতেও। সেই ইতিহাসের ফিরে মূল্যায়ন করার মতন আমার এলেম আর ইচ্ছে কোনটাই নেই। সেদিন একটা বই পড়তে গিয়ে, ১৯৪৩ সালে লেখা একটা রিভিউ চোখে পড়ল। আর সেই রিভিউ পড়তে পড়তেই অনেক কিছু পুরানো ঘটনার পরম্পরা স্মৃতিকে ধরে নাড়া দিল যেন -
১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন মাঝপথ পেরিয়ে গেছে। ইউরোপের মাটিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মরছে। হিটলারের বাহিনী পোল্যান্ড থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত প্রায় তছনছ করে দিচ্ছে সব কিছু। আর ঠিক সেই সময়, আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস সিদ্ধান্ত নিল যে তারা জার্মান একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের আত্মজীবনী তথা রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো ‘মাইন ক্যাম্ফ’ (যার বাঙলা করলে দাঁড়ায় “আমার সংগ্রাম”) বইটির রিভিউ ছাপবে। যুদ্ধ চলাকালীন খোদ শত্রুপক্ষের নেতার বইয়ের এমন গম্ভীর পর্যালোচনা আজ আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনার পেছনে ছিল এক দীর্ঘ ইতিহাস এবং সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব। আসলে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকদের উদ্দেশ্য ছিল মোটামুটি স্পষ্ট। তারা চেয়েছিলেন আমেরিকান বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষকে বোঝাতে যে, নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা কেবল সীমান্তের যুদ্ধ নয়, এটা মগজের যুদ্ধও বটে। রিভিউটি প্রকাশের মাধ্যমে তাঁরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে হিটলারের রণকৌশল এবং তার ইহুদিবিদ্বেষ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এগুলো বহু বছর আগেই এই বইতে ছক কষে রাখা হয়েছিল!
রিভিউটা যেদিন ছাপা হলো, তার মাত্র তিন দিন আগে ঘটে গেছে এক ভয়াবহ ঘটনা। পোল্যান্ডের সোবিবোর মৃত্যু শিবিরে বন্দিরা বিদ্রোহ করেছে, সেই শিবিরে ততদিনে গ্যাস চেম্বারে মেরে ফেলা হয়েছে কমপক্ষে এক লক্ষ সত্তর হাজার ইহুদিকে। আর রিভিউ বেরোনোর ঠিক পরের দিন, রোমে এক হাজার ইহুদিকে ধরে ট্রেনে তুলে দেওয়া হলো আউশভিৎসের উদ্দেশ্যে। এই পটভূমিতে বসে উইলিয়াম শ্লাম নামে এক অস্ট্রীয়-আমেরিকান সাংবাদিক যখন রালফ ম্যানহেইমের অনুবাদ করা ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটির রিভিউ করছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই এই ঘটনাগুলো তখনো তিনি জানতে পারেন নি। কিন্তু তিনি এটুকু জানতেন যে এই গ্রন্থ সমালোচনা নাৎসিদের বিরুদ্ধে তাঁর অস্ত্রাগারে থাকা সেই একমাত্র অস্ত্রটি ব্যবহার করতে পারে যা হল ভাষার তীক্ষ্মতা দিয়ে ঘটনাপ্রবাহ এবং হিটলারের কাজকর্মকে জেরা করার ক্ষমতা।
‘মাইন ক্যাম্ফ’ লেখা হয়েছিল ১৯২৪ সালে, লান্ডসবার্গ জেলখানায় বসে। হিটলার তখন বন্দি, মিউনিখে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরে। জেলে বসে বই লিখলেন আর তার মধ্যে ঢেলে দিলেন তাঁর সব স্বপ্ন, সব ক্রোধ, আর আজকের দেখায় সব বিষ। ১৯২৫ সালে প্রথম খণ্ড বেরোল, ১৯২৬-এ দ্বিতীয়। এটা মনে রাখা দরকার যে এই বইটা যখন লেখা হয় তখন হিটলার নিজে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ছিলেন এবং জার্মানির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর ভাবনা অধিকাংশ মানুষের কাছে অপ্রাসঙ্গিক বা চরমপন্থী বলে মনে হতো। এই বইটি পড়লে সহজেই বোঝা যায় যে এটি কোনো সুসংগঠিত দার্শনিক গ্রন্থ নয়; বরং এটি একধরনের আবেগপ্রবণ, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং অনেকাংশে বিশৃঙ্খল বক্তব্যের সমষ্টি, যেখানে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, জাতিগত বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
এই কারণেই সম্ভবত বইটি প্রথমদিকে তেমন বিক্রী হয় নি বা আন্তর্জাতিক পরিসরে তেমন গুরুত্ব পায়নি। অনেকেই এটিকে একটি অগোছালো আত্মকথা হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে লেখকের আবেগ যুক্তির চেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে। কিন্তু ১৯৩০ সালে যখন নাৎসি পার্টি জার্মান পার্লামেন্টে হঠাৎ ১০৭টা আসন পেয়ে গেল, তখন থেকে বইয়ের বিক্রি বাড়তে শুরু করল। ১৯৩৩ সালে হিটলার যখন চ্যান্সেলর হলেন, সেই একবছরেই বিক্রি হলো আট লক্ষেরও বেশি কপি। জার্মানিতে বিয়ের অনুষ্ঠানে সরকার নিজে উপহার দিত এই বই।
ইংরেজিভাষী দুনিয়ায় বইটা আসে আস্তে আস্তে। ১৯৪৩ সালের দিকে মিত্রশক্তি বুঝতে পেরেছিল যে হিটলার কেবল একজন সামরিক প্রতিপক্ষ নন, তিনি একটি বিপজ্জনক আদর্শের ধারক। ১৯২৫ সালে যখন মাইন কাম্ফ প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন ইংরেজিভাষী দুনিয়ায় একে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে যখন জার্মানি ইউরোপ গ্রাস করতে শুরু করে, তখন আমেরিকান পাঠকদের মধ্যে কৌতূহল জাগে, এই মানুষটির মনের ভেতরে আসলে কী চলছে?
কিন্তু সমস্যা ছিল অনুবাদের। হিটলারের মূল জার্মান লেখাটি ছিল অত্যন্ত জটিল, ব্যাকরণগত ভুলে ঠাসা এবং শব্দবহুল। আমেরিকায় বোস্টনের প্রকাশক হাউটন মিফলিন ১৯৩৩ সালে প্রথম একটা ছাঁটাই সংস্করণ বের করল। কিন্তু সেই সংস্করণে হিটলারের লেখার সবচেয়ে বিষাক্ত অংশগুলো কেটে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর পরেও বেশ কিছু ইংরেজি সংস্করণ বের হলেও সেগুলোও ছিল হয় সংক্ষিপ্ত অথবা পরিমার্জিত।
অ্যালান ক্র্যানস্টন নামে এক তরুণ সাংবাদিক (পরে যিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সেনেটর হয়েছিলেন) ইউরোপ থেকে ফিরে এই ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। তিনি ১৯৩৯ সালে নিজেই একটা মাত্র দশ সেন্টের ট্যাবলয়েড সংস্করণ বের করলেন, যেখানে বাদ দেওয়া অংশগুলো রাখা হলো। মাত্র দশ দিনে পাঁচ লক্ষ কপি বিক্রি হলো! কিন্তু হাউটন মিফলিন কপিরাইটের মামলা করে তার সব কপি নষ্ট করিয়ে দিল।
তারপর ১৯৪৩ সালে হাউটন মিফলিন সিদ্ধান্ত নিল একটা পূর্ণাঙ্গ, সম্পাদনাহীন অনুবাদ বের করবে। কাজটা দেওয়া হলো র্যাল্ফ ম্যানহাইমকে, তাঁর প্রথম বড় অনুবাদের কাজ। ৬৯৪ পৃষ্ঠার সেই বই বেরোল। ম্যানহাইম তাঁর ভূমিকায় লিখলেন, হিটলারের ভাষা এতটাই অসংলগ্ন যে তিনি মূল জার্মান উদ্ধৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন কোনো কোনো জায়গায়, না হলে পাঠক হয়ত বিশ্বাসই করবেন না যে এ ভাষায় কেউ লিখতে পারে!
বই তো বেরুলো ইংরাজি ভাষায়, এবার দরকার রিভিউ – আর সেই ভারটা নিল নিউ ইয়র্ক টাইমস। নিউ ইয়র্ক টাইমস রিভিউ লেখার জন্য বেছে নিল উইলিয়াম এস. শ্লামকে। শ্লামের জন্ম ১৯০৪ সালে, অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের গ্যালিসিয়ায়, একটি ইহুদি মধ্যবিত্ত পরিবারে। কিশোর বয়সে কমিউনিস্ট হয়েছিলেন, এমনকি মস্কোতে গিয়ে লেনিনের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেছিলেন। কিন্তু স্তালিনের বাস্তবতা দেখে মোহভঙ্গ হলো। ১৯৩৮ সালে হিটলারের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন, এসে পৌঁছলেন নিউ ইয়র্কে। এখানে লিখতে শুরু করলেন নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে হেনরি লুসের ফর্চুন ম্যাগাজিন পর্যন্ত। যে হিটলারের কারণে দেশ ছেড়েছিলেন, তাঁরই বই ‘মাইন ক্যাম্ফ’ রিভিউ করতে বসলেন শ্লাম নিউ ইয়র্ক টাইমস এর ডাকে। রিভিউয়ের শিরোনাম রাখলেন, “জার্মান বেস্টসেলার”।
শ্লাম রিভিউ শুরুই করলেন একটা বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য দিয়ে। লিখলেন, “সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ আমাদের সতর্ক করেছেন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্যাপারে নরম থাকতে। কিন্তু পেশাদার সততা আমাকে বাধ্য করছে জানাতে যে অ্যাডলফ হিটলার একজন নিম্নমানের লেখক।” এরপর লিখলেন, এই সাহিত্যিক সমালোচনা ওয়ারশর শিশুদের কাছে খুব একটা সান্ত্বনার কথা নয়। তবুও যা কাগজে ছাপা হয়েছে, মলাটের ভেতরে আছে, ওয়াশিংটনে কপিরাইট পেয়েছে, সেটা একটা বই-ই বলতে হবে, বইয়ের নাম ‘মাইন ক্যাম্ফ’ হলেও!
এই কয়েকটা বাক্যে কতটা ব্যথা আর বিদ্রূপ একসাথে মিশে আছে, সেটা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে রিভিউটা লেখার সময় ওয়ারশ গেটোর ইহুদিরা মাত্র কয়েক মাস আগে বিদ্রোহ করে নিহত হয়েছেন। শ্লামের রিভিউ পড়লে বোঝা যায় তিনি এই বইটাকে কতটা ঘৃণা করেছিলেন এবং একইসঙ্গে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বইটিকে নিছক একটি রাজনৈতিক ইশতেহার হিসেবে দেখেননি। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল একটি "জমাটবদ্ধ দুর্গন্ধ" (coagulated stench), যা জার্মানির জাতীয় ইতিহাসের গায়ে চিরস্থায়ী কলঙ্ক হয়ে লেপ্টে থাকবে। শ্ল্যাম লিখেছিলেন যে, হিটলারের এই লেখাটি কোনো সাহিত্য নয়, বরং এটি একটি অপরাধীর স্বীকারোক্তি। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, যারা এই বইটিকে পাগল বা অশিক্ষিত মানুষের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তারা আসলে হিটলারের অশুভ পরিকল্পনাকে হালকাভাবে দেখার ভুল করছেন।
রিভিউয়ের বেশ উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ম্যানহাইমের অনুবাদকে নিয়ে শ্লামের বিশ্লেষণ। তিনি লিখলেন যে এর আগের সব অনুবাদকরা একটা ফাঁদে পড়েছিলেন, তাঁরা হিটলারের ভাষাকে এমনভাবে সাজাতেন যাতে সেটা কিছুটা হলেও বোধগম্য শোনায়। এটা হতো অনুবাদকের নিজের ভাষার প্রতি সম্মানবোধ থেকে, হিটলারের প্রতি সম্মান থেকে নয়। ফলে কী হতো? ইংরেজিতে হিটলারকে পড়ে মানুষ ভাবত এটা অন্তত কিছুটা সংগঠিত চিন্তার লেখা। শ্লামের মতে এটা অপরাধের সামিল। অথচ আসল জার্মান পড়লে বোঝা যায় এই বই আদপে একটা অসংলগ্ন বক্তব্যের জগাখিচুড়ি মাত্র!
শ্লাম জানালেন যে এই সমস্যাটা তাঁর নিজের জীবনেও হয়েছে। তিনি জার্মান জানেন বলে আগের ইংরেজি অনুবাদ পড়তে গিয়ে কখনো বুঝতেই পারতেন না এটা হিটলারের লেখা, যতক্ষণ না মূল জার্মান টেনে আনতেন! শ্ল্যাম মজা করে লিখলেন যে, এ যেন সেই কোনো সৌন্দর্যপ্রেমী ফটোগ্রাফারকে FBI বলেছে কুখ্যাত গ্যাংষ্টার ডিলিঞ্জারের ছবি তুলতে, কিন্তু সে ছবি তোলার আগে ডিলিঞ্জারের মুখ প্লাস্টিক সার্জারি করে সুন্দর করে নিয়েছেন!
ম্যানহাইমের অনুবাদকে শ্ল্যাম প্রশংসা করলেন এই কারণে যে তিনি হিটলারের গদ্যকে ইংরেজিতেও ঠিক ততটাই দুর্বোধ্য রেখেছেন যতটা মূল জার্মানে। শ্লাম বললেন এই কাজ করতে গিয়ে ম্যানহাইম নিশ্চয়ই শব্দার্থের (‘সিম্যান্টিক্স’) নর্দমায় মাসের পর মাস নাক ডুবিয়ে রেখেছিলেন। এবং শেষে হয়তো গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ এর ছন্দ-তাল বোঝার ক্ষমতা অনেকটা হারিয়ে ফেলেছেন। শ্লামের মতে ম্যানহাইমকে যুদ্ধে হতাহতদের সম্মানসূচক তালিকায় স্থান দেওয়া উচিত। কারণ তিনি তার দেশের সেবা খুব ভালোভাবেই করেছেন, প্রথম এমন একটি ইংরেজি হিটলার-অনুবাদ তৈরি করে যা লেখকের প্রতি সুবিচার করে। এখানে প্রথমবারের মতো আপনি হিটলারের গদ্যকে ইংরেজিতে প্রায় ততটাই অপাঠ্য পাচ্ছেন যতটা তা জার্মান ভাষায়।
আর তারপর শ্লাম সেই বিখ্যাত বাক্যটা লিখলেন তাঁর রিভিউতে যেটা এখনো অনেকেই মাঝে মাঝে উদ্ধৃত করেন। হিটলারের একটি বক্তৃতার দুটো অনুচ্ছেদের আক্ষরিক অনুবাদ দিয়ে শ্লাম লিখলেন, “This is the Moronic Evil, so shapeless and pre-spiritual that it defies articulation”।
শ্লাম একটা উদাহরণও দিলেন, ১৯৩৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নুরেমবার্গে হিটলার হাজার হাজার অধ্যাপক, লেখক ও শিল্পীর সামনে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। শ্লাম সেই বক্তৃতার দুটো অনুচ্ছেদ হুবহু তুলে দিলেন। সম্পূর্ণ অর্থহীন, যুক্তিহীন বাক্যের পর বাক্য। জার্মান ভাষাতেও এতে কোনো চিন্তার সামান্যতম সাদৃশ্য যদিও কয়েক হাজার জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক এবং শিল্পীরা হিটলারের মূল কথাগুলো সেভাবেই গিলেছিলেন যেভাবে 'হিট প্যারেড'-এর মেয়েরা সিনাত্রার গান গিলে থাকে। শ্লাম বললেন যে যদি তাঁরা সত্যিই বুঝতে সক্ষম হয়ে থাকেন হিটলার কী বলতে চেয়েছিলেন, তবে নিশ্চয়ই তাঁরা উপলব্ধির কোনো অনন্য ইন্দ্রিয় তৈরি করে নিয়েছে! কারণ এটি কেবল মন দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।
সেই সময় একটা তর্ক চলছিল জার্মানরা কি পাগল হয়ে গেছে কিনা সেই মর্মে। শ্লাম এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বললেন, যদি কেউ বলে সে চিনের সম্রাট, তাহলে তাকে পাগল বলার অধিকার আছে। কিন্তু যদি সে সত্যিই চিনের সম্রাট হয়ে যায়? তখনও গোঁয়ার মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা হয়তো বলবেন সে পাগল, তখন কিন্তু তখন তাদেরই পাঠানো হবে পাগলা গারদে। ‘মাইন ক্যাম্ফ’ নিয়ে সাহিত্যিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে কোনো বিতর্ক থাকার অবকাশ থাকতে পারে না। বইটা যে বাজে লেখা তা নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকা উচিত নয়, এমনকি সমালোচকদের মধ্যেও নয়, যাদের কাজই হল দ্বিমত পোষণ করা! কিন্তু এই বিশেষ ক্ষেত্রে যে লেখাটি একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো জেনারেল আইজেনহাওয়ারের সামরিক ইশতেহার।
রিভিউটি প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠকদের মধ্যে মিশ্র এবং জোরালো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কদিন বেশ হইচই হলো। যুদ্ধের মাঝখানে এই ধরনের একটা বইয়ের রিভিউ নিয়ে মানুষের মতামত বিভক্ত হয়ে গেল। একদিকে অনেকে বললেন, ঠিক আছে, ভালোই হয়েছে। শত্রুকে জানতে হবে। হিটলার কী চায়, সেটা তার নিজের মুখ থেকেই পড়া উচিত প্রতিটি আমেরিকানের। সৈনিকরা যখন পড়তে চাইছেন, পাঠানো উচিত। শত্রুকে ধ্বংস করতে হলে তার মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি, আর মাইন কাম্ফ হলো সেই মনস্তত্ত্বের নীল নকশা। অন্যদিকে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেন, যুদ্ধের এই সংকটকালে শত্রু নেতার চিন্তাধারাকে এত বড় প্ল্যাটফর্মে জায়গা দেওয়া কি নৈতিকভাবে সঠিক? এতে কি হিটলারের প্রচারণাই আরো ছড়িয়ে পড়বে না?
তবে তর্ক-বিতর্কের ফলে যা হয় আর কি! বইটির কাটতি রাতারাতি বেড়ে যায়। রালফ ম্যানহাইমের অনুবাদটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কারণ এটি ছিল প্রথম কোনো অনুবাদ যা হিটলারের ভাষার কদর্যতা বা অসংলগ্নতাকে পালিশ না করে হুবহু তুলে ধরেছিল। আমেরিকানরা লাইন ধরে বইটি কিনতে শুরু করে, কেবল হিটলারকে সমর্থন করতে নয়, বরং তাঁর 'পাগলামি'র গভীরতা বুঝতে। এই রিভিউর পর থেকেই আমেরিকায় ‘মাইন কাম্ফ’ পাঠের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। একে আর দশটা রাজনৈতিক বই হিসেবে না দেখে একটি 'বিপজ্জনক দলিল' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শ্ল্যামের সেই রিভিউ পরবর্তীকালে হিটলার-চর্চার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়।
যুদ্ধ শেষ হলো ১৯৪৫ সালে। হিটলার মরল। কিন্তু ‘মাইন কাম্ফ’ –এর গল্প শেষ হল না। বইটা পড়া কঠিন। ম্যানহাইম নিজে বলেছিলেন, এর ভাষার কোনো মাথামুণ্ডু নেই। ২০২১ সালে ফরাসি অনুবাদক মানোনি বলেছেন, এটা এক “অসংলগ্ন স্যুপ”, যার অনুবাদ করতে গিয়ে পাগল হওয়ার জোগাড়। তবুও বইটাকে অস্বীকার করা যায়নি। কারণ এই অসংলগ্ন, বাজে ভাষার বইটাই কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল। ছয় কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল যে যুদ্ধে, সেই যুদ্ধের নীলনকশা এই বইয়েই লেখা ছিল। জার্মানিতে বাভারিয়া রাজ্য সরকার দশকের পর দশক ধরে এই বইয়ের পুনঃপ্রকাশ আটকে রাখেছিল। ২০১৬ সালে কপিরাইটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জার্মান পণ্ডিতরা একটি সমালোচনামূলক সংস্করণ বের করলেন, যেখানে হিটলারের প্রতিটা মিথ্যার পাশে টীকা লেখা। সেই সংস্করণ বেস্টসেলার হলো জার্মানিতেই।
আমেরিকায় হাউটন মিফলিন ম্যানহাইমের অনুবাদ ছাপতে থাকল যুদ্ধের পরেও। ২০০০ সাল পর্যন্ত তারা বই বিক্রী থেকে প্রাপ্ত লাভ নিজেদের পকেটেই ঢোকাচ্ছিল, যতক্ষণ না ‘US News & World Report’ এই ব্যাপারটা ফাঁস করে দিল। তারপর থেকে লাভের ভাগটা দেওয়া শুরু হলো হলোকাস্ট শিক্ষা ও ইহুদি পরিবার সহায়তার কাজে। প্রতি বছর আসত আনুমানিক ৬০ হাজার ডলার, মনে হয় যেন সেই টাকায় রক্ত লেগে আছে! কিন্তু এখন সে টাকায় বেঁচে থাকা মানুষদের সাহায্য হচ্ছে।
উইলিয়াম শ্লামের কি হল? ১৯৪৩ সালে সেই রিভিউ লেখার পর তাঁর জীবনটা আরো কয়েক দশক চলল। ধীরে ধীরে তিনি বাম থেকে ডানে সরে গেলেন। উইলিয়াম এফ. বাকলির সঙ্গে মিলে “National Review” পত্রিকা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখলেন। পরে ইউরোপে ফিরে গিয়ে আরো দুই দশক লিখে ১৯৭৮ সালে সালৎসবুর্গে মারা গেলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি ছিল, “সমাজতন্ত্রের সমস্যা হলো সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদের সমস্যা হলো পুঁজিবাদীরা।”
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ১৯৪৩ সালের সেই নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিভিউটি পড়লে অবাক হতে হয়। তখন যুদ্ধ শেষ হতে আরও দুই বছর বাকি। হলোকাস্টের ভয়াবহতা তখনও বিশ্ববাসীর সামনে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবুও উইলিয়াম শ্ল্যাম সেই বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে চিনেছিলেন। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে সেই রিভিউয়ের জন্য যেখানে তিনি সবচেয়ে বিপজ্জনক বইটাকে সবচেয়ে সরল ভাষায় চিহ্নিত করেছিলেন। ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে শ্লাম যখন এই রিভিউ লিখলেন, ইউরোপের ইহুদিরা তখন গ্যাস চেম্বারে যাচ্ছিল। তিনি জানতেন না তাঁর পরিচিতজনরা বেঁচে আছেন কিনা। তিনি জানতেন শুধু একটাই কথা, এই বইয়ের কথা মানুষকে বলতেই হবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বুক রিভিউ সেদিন নাৎসিদের সাথে লড়েছিল তার একমাত্র অস্ত্র দিয়ে, ভাষা মাধ্যমে জিজ্ঞাসা। তাই হয়তো রিভিউয়ের নামটা এত তীক্ষ্ণ ছিল - “German Best Seller”
হ্যাঁ। এটা বেস্টসেলার ছিল। আর সেটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি!
নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই একই সংখ্যায়, রিভিউর পাশে একটি ছোট সাইডবার ছিল, যার শিরোনামে লেখা ছিল “Wartime Reading”। সেখানে জানানো হলো, ১৯৪২ সালে আর্মি রেড ক্রস হাসপাতাল লাইব্রেরিতে ’মাইন ক্যাম্ফ’ ছিল সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন বইগুলোর একটা। ওখানে স্বেচ্ছাসেবক মার্গারেট ফারান্ড থর্প লিখেছিলেন, সৈনিকরা সেই বইগুলোই সবচেয়ে বেশি চাইছে যেগুলো তারা যে যুদ্ধে লড়ছে সেটা বুঝতে সাহায্য করবে। এই তথ্যটা নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিভিউ করার সিদ্ধান্তটিকে আরো গভীর একটা মাত্রা দিয়ে দেয়। রণাঙ্গনের আমেরিকান সৈনিকরা, যারা হিটলারের বিরুদ্ধে লড়ছে, তারা নিজেরাই চাইছে জানতে — এই মানুষটা কে? সে কী চায়? তার মাথায় আসলে কী আছে? সাথের ছবিটি গভর্নর আইল্যান্ডের ফোর্ট জে তে তোলা।

The New York Times Book Review: 125 Years of Literary History, By The New York Times; Edited by Tina Jordan and Noor Qasim, 2021.
dc | 2402:e280:2141:1e8:2d0b:f28b:9b3a:***:*** | ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩২740168