

অলংকরণ: রমিত
(১)
এই দুনিয়ায় কিছু লোক একটা বিশেষ ধরণের ধাতুর তৈরী, একটা বিশেষ ধরণের বাসন নিয়ে জন্মায়। লোকে বলে তারা নাকি সত্যিকারের 'বড়লোক'। তো আমার কাছেও আছে বটে একটা ওরকম বিশেষ ধরণের বাসন; বিশেষ ধাতু দিয়ে তৈরী। আরে না, বাসন বলতে এখানে চামচের কথা হচ্ছেনা। আর ধাতুটাও এমন কিছু না যা দিয়ে ওয়্যারউল্ফ মারা চলবে। ঐ বড়লোকের কথাটা অবশ্য সত্যি! যে রকম সম্পত্তি থাকলে পৃথিবীর সব রাজা-বাদশাকে হার মানানো যায় ততখানিই বড়লোক! আসলে টাকা, পয়সা, বিঘা-একর দিয়ে তো আর সব সম্পত্তির অঙ্ক ঠিক কষা যায়না? এই দুনিয়ায় এমনও কিছু জিনিষ আছে যার দাম লেখার মত কোনো সংখ্যা আজ অব্দি তৈরীই হয়নি। তো, অমনিই এক জিনিষের আমি মালিক! আর জিনিষটা হলো একটা লোহার তাওয়া। আরো ঠিক করে বলতে গেলে, আমার দিদি-আম্মার লোহার তাওয়া।
"তাওয়া" বলা ঠিক হচ্ছে কিনা ঠিক বুঝতে পারছিনা অবশ্য। এর কানাগুলো আরো উঁচু, ঢালাই লোহার তৈরী। চলতি কথায় ওকে আমরা বলি 'স্কিলেট'। স্কিলেটটা আমাকে গল্প বলতো। ওঃ, "বলতো" বললাম নাকি? ঐখানে একটু ভুল হলো! অতীত নয়, বর্তমান। স্কিলেটটা আমাকে গল্প "বলে"। অনেক, অ-নে-ক সব গল্প। তাদের কোনো কোনোটা এখন আর এই সময়ের পাতায় নেই। কোনোটা জীবনের মঞ্চের ওপরে এখনো খুব মন দিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছে। কোনো গল্পটা হয়তো কারুর খুব আদরের ধন ছিলো একদিন। কোনোটা আবার কারুর এমন স্বপ্ন যে কুঁড়ি হয়ে ঘুমিয়ে আছে, কালকের ডালে ফুটবে বলে।
কিন্তু, স্কিলেট আবার গল্প বলবে কী করে? একটা বাসন কি কথা বলতে পারে নাকি? হুঁ পারে বটে; যদি সেটা জাদু বাসন হয়! দিদি-আম্মার এই লোহার তাওয়াটা জাদু করা ছিলো।একটা ব্যাপার অবশ্য আছে। যে কেউ কিন্তু সে গল্প শুনতে পাবেনা! শোনার জন্য তোমাকে বাসনদের ভাষা জানতে হবে। সে ভাষায় কোনো শব্দ নেই। শুধু গন্ধের ভাষা, আর স্পর্শের। ওর হাতলের ঠান্ডা ছোঁয়া, মাঝখানটা বহু বছরের ব্যবহারে মসৃণ... এক ঝলক বেকন ভাজার গন্ধ, কখনো দারচিনি আর পীচফলের... কী কোমল ভাষা! এত সুক্ষ্ম, এত কবিতা কবিতা, পৃথিবীর কোনো বইয়ে তার খোঁজ পাওয়া যায়না! গল্পগুলো আমার চোখের সামনে ছবির মতো ফুটে ওঠে। স্পষ্ট, ঝকঝকে। কখনো মনে হয় ১৯৪০ সালের কোনো সিনেমা। কখনো যেন অদ্ভুত সুন্দর সেই সব পেইন্টিং, ভার্মিয়ের যাদের কোনোদিন আঁকেননি।
ওর কাছ থেকে আমি প্রথম গল্পটা শুনেছিলাম যখন আমার বছর পাঁচেক বয়স। আমি ওর গায়ে হাত বোলাচ্ছিলাম... মোটা দানার নুন দিয়ে সদ্য ঘষে মেজে আনা... আচ্ছা এই খানে একটা কথা বরং স্পষ্ট করে নেওয়া ভালো। আমি বলেছি "ওর", "ওটার" নয় কিন্তু, কেমন তো? যে তোমার বাড়িতে কয়েক প্রজন্ম ধরে রয়েছে, তোমাদের জীবনের এত ওঠা, পড়া, হাসি, কান্না, স-অ-ব কিছুর শরীক হয়েছে, তাকে কি আর একটা বোবা জড় জিনিষের মত মনে করা যায় নাকি? লোহার তৈরী হোক আর যাই হোক, এই স্কিলেটটা আমাদের পরিবারেরই একজন। আমার আপনার লোক। ওর নাম 'স্কিলেত্তা'। ছোট করে আমি ডাকি 'স্কিলি'।
হ্যাঁ, কী যেন বলছিলাম? ও, সেই প্রথম গল্প! গল্পটা ছিলো কর্নব্রেডের গন্ধ দিয়ে বলা। তাজা হলুদ ভুট্টার গুঁড়ো, অল্প টকানো দুধ, এক মুঠো চেডার চীজ, কুচি কুচি হ্যালাপিনিও ... স্বর্গীয়! স্কিলির মধ্যে কর্নব্রেডটা নিজের মনে ঢিমে তালে তৈরী হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের বিকেল; মস্ত খামারবাড়িটার এখানে ওখানে কঁককঁক করে মুরগিগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর সেই ছবিটার মধ্যিখানে ছটফটে সেই মেয়েটি। গোলাপি গালে ছিটছিট দাগ, হাল্কা বাদামী চুল, সহজেই হেসে গড়িয়ে পড়তে পারে। তেইশ বছরের এমিলি মিলার, তার আজ উৎকন্ঠার শেষ নেই!
— "তুই ঠিক জানিস তো স্কিলি? এই কর্নব্রেড ওর ভালো লাগবে তো?"
— "জানি মানে? একশো বার জানি! শুধু ভালো লাগবেনা। এই কর্নব্রেড খেলে পর এদেশ ছেড়ে আর নিজের দেশে ফেরতই যেতে চাইবেনা। 'তোমার ও'।
— "ধ্যাৎ! তোর যেমন কথা! মোটেই সে "আমার" নয়!
— "উঁউঁহ! ঢং দেখো মেয়ের! মরে যাই! স্কিলি যেন কিছু বোঝেনা! বেশ, দেখবো, দেখবো!"
মুঠোমুঠো খিলখিল ফিনফিন করে ছড়িয়ে যাচ্ছিলো। সব্জিবাগানের ঢালু সবুজে, বুনো গোলাপের ঝোপে। ফ্রাঙ্কো ওচেয়ানো সেসব শুনতে পায়নি। মাইকেল এঞ্জেলো আর মারে মেদিতেরানেওর দেশ থেকে মাত্র ক'মাস আগে এখানে কাজ করতে এসেছে; জলপাইয়ের মত গায়ের রং, থোলো থোলো কালো আঙুরের মত চুল ... নাঃ, সে এমিলির নয়! তখনও।
অনেক রাত হয়ে গেলো তারপর। আকাশের রঙ গোলাপি থেকে কখন গাঢ় বেগুনী পেরিয়ে মখমলের মত গভীর নীল হয়ে গেছে। গির্জার মস্ত উঁচু মিনারের ঘড়িতে রাত বারোটার ঘন্টা বেজে বেজে চুপ করে গেছে। রান্নাঘরে তখনো আলো জ্বলছে দেখে মিসেস মিলার অবাক হন!
— "এমিলি! কী রে? রাত দুপুর হয়ে গেলো, তুই এখনো জেগে! কী এত সেলাই করছিস?"
— "এই কিচেন টাওয়েল গুলো! আজকের দিনে সব্বাইকে সাজিয়ে গুজিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে মা! আমার এত খুশির দিন!"
— "ওমা, সত্যি তো রে! কী সুন্দর! জলপাই আর আঙুরের নক্সা!"
পাকা জলপাই আর থোলো থোলো কালো আঙুর ... স্বপ্ন যে কত রকমের দেখতে হতে পারে! কেউ আগে থেকে ধারণাই করতে পারেনা ওরা কখন কীরকম সেজে আসবে! ভারী খামখেয়ালী সব! স্বপ্নরা!
স্কিলির প্রথম গল্পের শেষটা হয়েছিলো এইভাবে। ধ্যাৎ, কী বলছি! শেষ না, শেষ না, শুরু!
(২)
ব্যাপার কী জানো? স্কিলি কিন্তু সবসময় গোটাগুটি একটা গল্প এনে হাজির করবে এমন কথা নেই। অনেক সময়েই ও শুধু ঝলক দেখায়... কতক গুলো টুকরো টুকরো ছবি, দৃশ্য। কিন্তু তার থেকেই পুরো একটা কাহিনী বুঝে নিতে তোমার কোনো অসুবিধে হবেনা। গ্রীম ভাইদের কথা মনে পড়ে আমার। কিম্বা হ্যান্স অ্যান্ডারসনের। চোখের সামনে পাতার পর পাতা উল্টে যায় — সেই যে এক রেড ভেলভেট কেকের গল্প — কোকো, বাটারমিল্ক, ক্রীমচীজ, পিক্যান বাদাম ... বিয়েবাড়ি একটা। হাসিখুশি বর-কনে। সাদা আর ফিকে গোলাপী ফুলের তোড়াটা মস্ত সিল্কের ফিতে দিয়ে বাঁধা। সরু লম্বা ডাঁটিওয়ালা কাঁচের গেলাসে সোনালী পানীয় বুড়বুড়ি তুলে হাসছে।
তারপরে, স্প্যাগেত্তি বোলোনিয়েজের গল্প — সারাদিন ধরে ঢিমে আঁচে তৈরী টমেটোর স্যস, গাঢ় লাল রঙের ওয়াইন, নোন্তা পারমাজান চীজ ... তিনটে ক্ষুদে ছেলেমেয়ে মস্ত সাইকামোর গাছের নীচে পিকনিক টেবিলে বসে হেসে কুটোপাটি হচ্ছে। জগতের সবচেয়ে সরল, সবচেয়ে শুদ্ধ আনন্দের শব্দ ঐ রকম হয়।
তিনটে ছেলেমেয়ে, সবার বড় 'পিয়েতা', লতানো হাত, বিষন্ন চোখ, গাঢ় রঙের চুলে এলোমেলো ঝুঁটি। বড় দিদি, সবকিছু দেখেশুনে রাখে সে। তারপরে ক্রিস্টোফার। লম্বা, চুপচাপ। গায়ের রং জলপাইয়ের মত, চুলগুলো কালো আঙুরের থোকা যেন। তারপরে অ্যালান, মায়ের সাথেই তার বেশি মিল। গোলাপি গালে ছিটছিট দাগ, হাল্কা বাদামী চুল, সহজেই হেসে গড়িয়ে পড়তে পারে। ক্রিস্টোফারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে অ্যালান আসলে দেবশিশু। ওর পিঠের ঐ ডানিহাড় দুটোর তলায় নিশ্চয়ই কুঁড়ি লুকোনো রয়েছে। সময় হলেই ঝকঝকে সোনালী ডানা বেরোবে ওর থেকে। খুব ভুল ভাবেনি ও। বেরিয়েছিলো ডানা ঠিকই। সে গল্প পরে বলছি।
এর পরে ছিলো ব্লুবেরী স্কোনের গল্প -- ঝোপ থেকে সদ্য তুলে আনা বুনো ব্লুবেরী, এক ঝলক ভ্যানিলা বীন, কমলালেবুর খোসার গোলালো হাসিখুশি গন্ধ ... গ্রীষ্মকালের সুগন্ধী ঘাসের মাঠে কুকুর দুটোর সাথে দিকবিদিক দৌড়োদৌড়ি করে খেলছে ছেলে দুটো । কলেজ থেকে বাড়ি এসেছে গরমের ছুটিতে। ঝলমলে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলে ওরা, নিজেদের আসছে জীবনের প্ল্যান নিয়ে -- "তুই অ্যাকাডেমিকসে যেতে চাইলে যা ক্রিস, কিন্তু আমি মন ঠিক করে ফেলেছি; আর্মিতেই জয়েন করবো।" আসছে জীবন... ঐ আকাশটার মত মুক্ত, ঝলমলে।
আর এর পরে আসতেই হবে অ্যাপল পাইয়ের গল্প, অবধারিত ভাবে। আমি পাইয়ের জন্য আপেল কাটছিলাম। ক্রাস্টটা ততক্ষণে বেলা হয়ে গেছে। ফ্রিজের ভেতরে রেখে ওকে ঠান্ডা করে নিতে হয়। বেক করার পর তাহলে মুচমুচে সুন্দর হয়ে দাঁড়াবে। বরাবরই হয়। ও নিয়ে চিন্তা নেই আমার।
জানলার বাইরে হেমন্তের বিকেল। গাছ থেকে নিঃশব্দে খসে পড়ছে কমলা পাতা, লাল পাতা। একটা, দুটো। ভারী সুন্দর দেখতে পাতারা সব। কিন্তু থাকেনা ওরা। দুনিয়াতে কারুরই জন্য।
টেলিফোনের আওয়াজে আমার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেলো। কে করেছিলো ফোনটা? বাবা কি? নাঃ, বাবা ততদিনে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে আমার সঙ্গে। কার গলা...মনে নেই। আমার শুধু এটুকুই মনে আছে যে গলাটা আমাকে অ্যালানের খবর দিয়েছিলো। অ্যালানের খবর; ওর পিঠের ডানিহাড়ের তলার সেই কুঁড়ি দুটোর থেকে ডানা বেরিয়েছিলো সত্যিই। ঝকমকে সোনালী ডানা, যা মেলে এই নোংরা ধুলোটে পৃথিবী ছেড়ে মানুষ উড়ে চলে যেতে পারে। অনেক উঁচুতে, অনেক অনেক দূরে।
"হা! আমি ঠিক জানতাম ওর ডানা আছে!"
কিন্তু কি কাঠখোট্টা ভাষা এই নোংরা ধুলোটে পৃথিবীর! ওরা শুধু বললো — "অ্যালান ওশান ও তার তিন সঙ্গী আজ সকালে বোমা বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছেন।" ছিন্নভিন্ন...
আমার হাতে ছুরিটা এলোমেলো পা ফেলছিলো। সবটায় রক্ত রক্ত হয়ে গেলো। সবুজ গ্র্যানীস্মিথ আর লাল ফুজি আপেলদের গা-মাথা জুড়ে। ঐ আপেলরা সব...কোনোদিন যারা আর পাই হয়ে উঠবেনা। সবটা রক্ত রক্ত হয়েছিলো। আফগানিস্তানের এক ধুলোমাখা শহরের এক ধুলোমাখা রাস্তায়। আমার ছোট্ট ভাইয়ের বাকিটুকু ... ছিন্নভিন্ন।
তাজা আপেল, দারচিনি আর রক্তের গন্ধ আমার সব অনুভূতিকে অবশ করে দিচ্ছিলো আস্তে আস্তে। গাঢ় একটা ঠান্ডা অতল গর্ত, এরা সবকিছুকে নিঃশেষে গিলে নেয়। তবু আমি শুনতে পাচ্ছিলাম ... টেবিলের ওপরে রাখা ছবির ফ্রেমে দুটো হাসিখুশি ছেলের মুখ। একটা হাসিখুশি গলা — "বললে বিশ্বাস করবিনা ক্রিস, আমি ছুটি পেয়ে গেছি। থ্যাংকসগিভিংয়ে বাড়ি আসছি। প্রমিস! কিন্তু তোর সেই আপেল পাইটা বানাবি বলে দিলাম। ঠিক তো?"
— "একদম বানাবো। তুই এসেই খেতে পাবি। প্রমিস!"
কথা রাখেনি ও। মিথ্যেবাদী কোথাকার! তাহলে আমাকে বা রাখতে হবে কেন? নাঃ, আমি বানাইনি আপেল পাই। তারপর আর কোনোদিনই। চারটে বছর কেটে গেছে। থ্যাংকসগিভিং আসে; চলে যায়। আপেল পাই আর হয়না। প্রতি বছর এই সময়ে আমি শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকি। হেমন্তের বিকেল। গাছ থেকে নিঃশব্দে খসে পড়ছে কমলা পাতা, লাল পাতা। একটা, দুটো। ভারী সুন্দর দেখতে পাতারা সব। কিন্তু থাকেনা ওরা। দুনিয়াতে কারুরই জন্য।
(৩)
কি জানো? জীবন জায়গাটা এমনই যে এখানে অনেক সময়ে লোকের যেমন ভাবে চলার কথা, তারা তা আদৌ চলেনা! আমি বরাবর জানতাম যে স্কিলির কাজ হলো গল্প বলা, কিন্তু ক'মাস আগে ও যে কাণ্ডটা করলো তার মাথামুণ্ডু তুমি বুঝে উঠতে পারবেনা! অবশ্য পুরো দোষটা যে ওরই তাও বলা চলেনা। আমিও কিছুটা নিয়ম ভেঙেছিলাম এখানে। গল্প শুনতে চাওয়ার বদলে আমি ওকে বলেছিলাম আমার মাথায় যেন একটা বাড়ি মারে... ওর গায়ে যত শক্তি আছে তার সবটা দিয়ে।
ক'মাস মানে ঠিক কত মাস সেটা অবশ্য বলতে পারছিনা। আমার আদৌ মনে নেই। অনেক কিছুই মনে নেই আমার। সেই সময়টায়, আমার মাথার ভেতরকার কিছু ছবি দেখে সাদা কোট পরা কিছু লোকের মুখ গম্ভীর হয়ে গেছিলো। 'রিপোর্ট' নামের এক তাড়া কাগজ নাড়াচাড়া করতেন ওঁরা, আর সে কী অখুশি! কী যে অখুশি! অখুশি অন্যরাও হয়েছিলো। আমার আশেপাশের লোক,জন। ভাবলে অবাক লাগে যে একটা মাথার ভেতরে, একটা পাকিয়ে ওঠা ঘটনা কত অশান্তিই যে বুনতে পারে! অবাক জিনিষই বটে! এই অসুখরা।
সব শেষ হয়ে আসছিলো। গাঢ় অন্ধকার রাত্তিরের মত বিষনীল মরণ আস্তে আস্তে আমার পুরোটা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিলো। আমার মস্তিষ্কের আনাচে, কানাচে, সব কটা কোণে, খাঁজেভাঁজে। অনুভূতিদের জানলার কাঁচগুলো সব ঝাপসা। মাঝ শীতের ভোরে কুয়াশার মত। আমার ভেতরে অনেক গুলো বাঁধ ভেঙে খসে চুরমার হয়ে যাচ্ছিলো রোজ। অনেক গুলো আবেগ; ভয়াল, নিষ্ঠুর, হিংস্র... ঝাঁকেঝাঁকে কালো দাঁড়কাকের মত ঝাঁপিয়ে পড়তো। কালো, কর্কশ, ঠুকরে ঠুকরে কঙ্কাল বার করে আনে ওরা চেনা সবকিছুর শরীর থেকে। ভালো করে সব মনে পড়েনা, কিন্তু... ওরা ঠুকরে খেয়েছিলো। কঙ্কাল হয়ে দাঁত ছরকুটে পড়ে থাকতো আমার আশা, স্বপ্ন, ভালোলাগা; আমার বেঁচে থাকা।
আর তখনই ওরা এলো। সেই নীল পোষাক পরা লোকগুলো। তাদের মাথায় অদ্ভুত সব টুপি। মুখোসে মুখের অর্ধেক ঢাকা। গ্লাভস পরা হাতে চকচকে ছুরি ধরে, ফিসফিস করতে করতে, সেই লোকগুলো এলো।
তার পরে কী হয়েছিলো? কী জানি, ঠিক বলতে পারবোনা। আমার শুধু মনে আছে যে আমি ডুবে যাচ্ছিলাম। ডুবে যাচ্ছিলাম, ডুবে যাচ্ছিলাম। একটা অতল অন্ধকার সমুদ্র। কেউ জড়িয়ে ধরে রেখেছিলো আমাকে। সারা পৃথিবী জুড়ে একমাত্র ঐ একজনেরই অস্তিত্ব ছিলো। ওর নাম 'যন্ত্রনা'। যন্ত্রনা আমার মাথার খুলির ভেতরের দেওয়ালে অসংখ্য গ্রাফিতি এঁকেছিলো... খুলিটার যেখানটায় একটা ধারালো করাত গভীর চুমুর দাগ রেখে গেছিলো তারও ভেতরে। যন্ত্রনা আমার বুকের মধ্যিখানে অশ্রুতপূর্ব সুরে বেহালা বাজাতো। একটা শেষহীণ রিক্যুয়েম, বুকের ঠিক মাঝখানটায়... ঐখানে আজকাল শুধু শূণ্যতারা থাকে। যন্ত্রনা আমার সারা শরীর জুড়ে অপূর্ব সব কবিতা লিখে রেখেছিলো... শরীরটা অবশ্য ততক্ষণে ভুলে গেছে ওর বাঁ দিকটা আদৌ কেমন ছিলো। আর এই রকম সময়ে আমি অস্থির হয়ে শুধু একজনকেই খুঁজছিলাম। সে হলো স্কিলি। আমার মাথায় প্রচণ্ড জোরে একটা বাড়ি মারার জন্য।
এসেছিলো স্কিলি আমার কাছে। কিন্তু ওকে সেদিন একদম অন্যরকম মনে হলো! সেই আমুদে, মিশুকে, দয়ালু স্কিলি যে আমাকে রূপকথার গল্প বলতো, তাকে আজ আর কোথাও দেখতে পেলাম না। যে এসেছিলো সে কঠিন, ধূসর, খুব খুউব ঠাণ্ডা... লোহার মত।
"তুমি কি ভেবেছিলে? সব অন্য রকম হবে? সেসব হয়না এই দুনিয়ায় বোকা ছেলে! বুঝেছো? খুব ভালো করে জেনে নাও আজকে। তুমি যেরকমটা চেয়েছো তা হবেনা, কোনোদিন হবেনা।"
আমার বুকের মধ্যে একটা শক্ত ধাতব হাত দিয়ে স্কিলি ধাক্কা দিলো। উঁচু একটা পাহাড়ের ধারালো কিনারা থেকে আমি খাদের মধ্যে পড়ে গেলাম। আমার চারপাশ গিরে শুধু সীমাহীণ কুয়াশা। ঠাণ্ডা, তেতো। মৃত্যুর মত। ও হাসছিলো... নিষ্ঠুর, ধাতব হাসি। লোহার মত।
পড়তে পড়তে পড়তে পড়তে আমি মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করি। যাহোক কিছুকে। কিন্তু নেই, কিচ্ছু নেই। শুধু কয়েকটা কথা আমার চারপাশে অহেতুক মথের মত ঘুরপাক খেয়ে বেড়ায়। কয়েকটা অর্থহীণ কথা... এড শিরানের ফিসফিস হয়ে... "ওয়াইট লিপস, পেল ফেস, ব্রিদিং ইন স্নো-ফ্লেকস। বার্ন্ট লাংস, সাওয়ার টেস্ট ... স্লো-লি সিংকিং, ওয়েস্টিং। ক্রাম্বলিং লাইক পেস্ট্রিস... ইট'স টূ কোল্ড আউটসাইড, ফর এঞ্জেলস টু ফ্লাই...অ্যান এঞ্জেল উইল ডাই। কাভার্ড ইন ওয়াইট।"
কী বাজে বকছো এড? এঞ্জেলরা কখনো মরেনা। ওদের ডানা থাকে জানোনা? ওরা শুধু ডানা মেলে উড়ে চলে যায়, আর কোনোদিন ফিরে আসেনা। অ্যালানের মত।
অর্থহীণ না অযৌক্তিক? নাকি পুরোটাই বিভ্রম? মানেটা যাই হয়ে থাক না কেন, এইসময় আরো একটা কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম আমি। সব প্রতিধ্বনির ওপর আস্তে আস্তে প্রলেপের মত ছড়িয়ে যাচ্ছিলো। খুব আস্তে, তারপর কিছুটা জোরে, তারপর আরো জোরে। এ'ও বেহালার সুর। কিন্তু আগে যে রিক্যুয়েম শুনেছিলাম তার থেকে এর সুর পুরোপুরি আলাদা। এই সুরের ভাষায় কোনো কথা নেই। অনেকদিন ধরে চেপে রাখা কোনো কান্না যখন দীর্ঘশ্বাস হয়ে সামনে আসে সেই রকম। কিম্বা কোনো ভালোবাসা, যে বহুকাল ধরে বুকের অনেক গভীরে সযত্নে লুকিয়ে রাখা আছে। একটা গভীর ঘুম এবার আমার সবটুকু ছড়িয়ে পড়তো লাগলো। নীলচে সবুজ রঙের ঘুম, সব অবশ করে দিয়ে আমায় ঢেকে দিচ্ছে। সব খেলা যখন সাঙ্গ হয়ে যায়, সেই তখনকার মত। এ ঘুমের থেকে আমি আর কোনোদিন জেগে উঠতে চাইনা।
(৪)
কোনো কিছুই এক রকম থাকেনা এই দুনিয়াতে। গাছের রং বদলে বদলে যায়। দিনের রং, আকাশের রং। 'বদল' ছাড়া আর সবকিছুই তো অস্থায়ী এখানে। আমার দিনগুলোও বদলে গেছিলো। আমার আকাশ, আমার জীবন। আমি অনেকদিন ধরে একটু একটু করে বুঝতে পারছিলাম। শিখছিলাম। বুঝেছিলাম যে থানাটোস এসেছিলেন আমার কাছে। বেশ কয়েকবার। আমার মাথায়, বুকে চুমু খেয়েছিলেন। শেষে একদিন "পরে আবার আসবো" বলে চলে গেলেন। ঐ রকম কয়েকটা চুমু তোমার পুরো জীবনটাই বদলে দিতে পারে।
আমি এও বুঝেছিলাম যে স্কিলি আসলে কোনোদিনই আমার সাথে ওরকম ব্যবহার করেনি। পুরো ঘটনাটা শুধু আমার মাথার মধ্যে ঘটেছিলো। স্কিলি ঠিক আগের মতো আবার আসতো আমার কাছে। ঠিক আগের মতই আবার গল্প বলতো। অবশ্য একটা ব্যাপার ঘটেছে! আজকাল গল্পের দৃশ্যগুলো খানিকটা ঝাপসা লাগে আমার চোখে। গন্ধ আর স্পর্শের ভাষা, বেঁকেচুরে টোল খেয়ে তুবড়ে গেছে আমার মস্তিষ্কের সঙ্গে সঙ্গেই তো? তাতে অবশ্য ক্ষতি কিছু নেই। ঝাপসা চোখে দেখা অনেক ছবিই তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়!
এইদিনের গল্পটা যখন স্কিলি বলতে শুরু করলো, আমার ভাঙাচোরা অলফ্যাক্টরি আন্দাজ করলো ..."বীয়ার ব্যাটারে ডুবিয়ে ভাজা কডমাছ আর আলুভাজা?"
— "ওরকম করে বলেনা বাবু, এটা একটা ক্লাসিক ডিশ জানো না? এর নাম 'ফিশ অ্যান্ড চিপস'"।
— "ওঃ, ঠিক ঠিক। তা হঠাৎ এই 'ক্লাসিক ডিশ' কেন বানানো হচ্ছে? জানতে পারি কি ম্যাডাম?"
— "ওমা! কেন আবার? তোমার 'তাকে' ইম্প্রেস করার জন্য! আমার ওপর সব ছেড়ে দাও। দেখবে এই খেলে সে আর নিজের দেশে ফেরত যেতেই চাইবেনা।"
— "আমার 'সে'? কী যা তা বকছো স্কিলি? সেটা আবার কে?"
— "আহা! জানো না যেন! ঐ যে ছোকরা মত ডাক্তারবাবুটি। লালচে চুল, বেহালা বাজায়, আদা দিয়ে চা বানায়!"
— "ভ্যাট, কী বাজে কথা! ও মোটেই 'আমার' ডাক্তারবাবু নয়! তুমি খুব ভালো করেই জানো ও কোনদিন আমার চিকিৎসা করেনি।"
— "আরে,সে তো খুব ভালো কথা! নাহলে তো মুশকিল ছিলো। রোগীর সাথে ডাক্তারের সম্পর্ক হলে মেডিক্যাল এথিক্সে আটকায় রে বাবা!"
— "আঃ, কী হচ্ছে স্কিলি! মোটেই আমাদের মধ্যে অমনি কোনো সম্পর্ক নেই!"
— "উঁউঁহ! ঢং দেখো ছেলের! মরে যাই! স্কিলি যেন কিছু বোঝেনা! বেশ, দেখবো, দেখবো!"
আমার দিকে তাকিয়ে একরাশ স্নেহ নিয়ে চোখ মটকালো স্কিলি। ওর ঐ গল্পটা সেদিন ঐভাবে শেষ হয়েছিলো। ধ্যাৎ, কী বলছি! শেষ না, শেষ না, শুরু!
বেহালা আর আদা-চা... সত্যি,স্বপ্ন যে কত রকমের দেখতে হতে পারে! কেউ আগে থেকে ধারণাই করতে পারেনা ওরা কখন কীরকম সেজে আসবে! ভারী খামখেয়ালী ওরা সব! স্বপ্নরা!
dc | 2402:e280:2141:1e8:dc0a:8d64:cbac:***:*** | ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৫739695
Ranjan Roy | 103.59.***.*** | ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৫739701