

অলংকরণ: রমিত
"অবশেষে হিন্দুর ঘরের মেয়ে রূপমতী মোছোলমানের ঘরে বউ হয়ে সিরাজুলের সহগামী হলো।" অনন্ত বাবুর কথা শেষ হবার আগেই শান্তিরাম বাবু কথার খেই ধরবার জন্য মুখিয়েই ছিলেন।
- এ আর নতুন কথা কি? এতো চিরকালের গপ্পো। হিঁদুর ঘরের মেয়ে-বৌয়ের আব্রু ইজ্জত লুট করার ট্রাডিশন তো ওই নেড়ে শালাদের আবহমান কালের।
একটা "হুঁহ্" শব্দ করে অনন্ত থেমে গেলেন। কথাটা শেষ করতে পারেনি, তার আগেই শান্তিরাম ফুট কাটার জন্য অনন্ত বিরক্তি চেপে রাখতে পারে নি। "হুহ্" শব্দটা পিছলে বেরিয়ে আসে। আর সেটা শান্তিরাম খেয়াল করেই কথা থামিয়ে দেয়। একটু মলম লাগিয়ে, "হ্যাঁ, বলুন অনন্তদা, তারপর?"
শান্তিরাম কোনো আড্ডাতে দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়না। কোনো কথা শোনার ধৈর্য্য নেই। আগে থেকেই একটা ধারনা তৈরি করে, মাঝপথে অপরকে থামিয়ে নিজে খেই ধরে। অপরজন তখন বিরক্ত হয়ে গুম মেরে চুপ করে যায়। আড্ডার খোলামেলা মুক্ত পরিবেশ হারিয়ে, গুমোট নিম্নচাপ তৈরি হয়। যারা অনন্তর মত সংযত নয়, সেখানে তো মুখোমুখি ঝগড়া লেগে যায়। কতো আড্ডা, কতো বন্ধু হারালো শান্তিরাম, তবুও শিক্ষা নিলো না। তুলনায় অনন্তবাবুর সঙ্গে আড্ডাটা দীর্ঘদিন চলছে। কারন এটা নয় যে শান্তিরাম স্বভাব বদলেছে। অনুরূপ পরিস্থিতি তে অনন্ত বাবু চুপ করে যান, থেমে যান। বড়জোর একটা বিরক্তি সূচক শব্দ করে শান্তিরামকে ওয়াকওভার দিয়ে দেন। আর ওয়াকওভার ম্যাচ জেতার আনন্দ নেই, খেলাটাই তো হলো না। আর সেই কারণেই আজকাল শান্তিরাম বলতে শিখেছে -- "হ্যাঁ, বলুন অনন্তদা, তারপর?"
এবার অনন্ত বাবু ঢোঁক গিলে, হাতের তালুতে ঠোঁট ও কষ দুটো মুছে আবার শুরু করলো, সিরাজুল ঘরে বৌ আনলো বটে, কিন্তু বেশিরভাগ দিন সিরাজুল কাজ থেকে বাড়ি ফেরে না। ঠিক কথা, মেমারি থেকে আদ্রা নিত্যদিনের যাতায়াত অসম্ভব। কিন্তু বিয়ের আগে শনি রবিবার মেমারির বাড়িতে ফিরতো। বিয়ের পাঁচ ছমাস কাটতে না কাটতে সেটাও বন্ধ। শোনা গেল আদ্রাতেই এক বিধবা চোলাই মদ ব্যবসায়ীর নেশায় আসক্ত সে। রেলের ঠিকা মজুর সিরাজুল, তার বেতনের সবটাই বিধবা মদ ব্যবসায়ী সুফিয়ার ঠেকে গুণে দেয়।
ঠিক এই সময়ে শান্তিরাম বলতে গেছে "ও শালাদের তো একটা বৌ নিয়ে.... " ; কিন্তু অনন্ত বাবুর চোখে চোখ পরতেই কথা থেমে গেলো। অনন্ত আবার বলতে শুরু করে, সিরাজুলের বাপ মা ছেলেকে বাড়িতে ঢুকতেই দেন না। ছেলের বউ রূপমতীর নামে জমি লিখে দিয়েছে। পাকা ঘর বানিয়ে দিয়েছে। সব সময়ে, এমন বাচ্চা একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার জন্য ছেলেকে শাপান্ত করে। সিরাজুল অন্য কোনো দায়িত্ব পালন না করলেও, রূপমতীকে গর্ভদান করে গেছে। শ্বশুর শাশুড়ি বলে, "মা রে, কি আর তোর বয়স, কচি মেইয়ে। তুই ফির থন জেবন শুরু কর। তুই তো আমাদের মেইয়ে। আমরা গোড়ে যাবার আগে তুয়ার বিয়া দিয়া যাই।" রূপমতী তার সদ্যোজাত মেয়েকে আগলে, শ্বশুর শাশুড়ি কে নিয়েই থাকতে চায়। মেয়ে বড়ো হবে, লেখাপড়া শিখবে, তার অনেক স্বপ্ন।
(২)
রূপমতীর মেয়ে তহমিনা, লোকের মুখে মুখে তুহিনা , যখন ক্লাশ নাইন, বেশ বড়ো হয়েছে, রূপমতীর বর সিরাজুলের দ্বিতীয় পক্ষ, মানে সুফিয়ার গর্ভে সিরাজুলের সন্তান এলো। তখন তাকে আদ্রায় দেখভাল করবে কে? সুফিয়ার তখন সবে তিন মাস হবে। সিরাজুল তিন মাসের গর্ভবতী সুফিয়াকে নিয়ে এলো নিজের মেমারীর বাড়িতে। মা বাপ তো তাকে বাড়ির উঠোনেই পা রাখতে দেবে না। একেবারে রণচন্ডী সংহার মূর্তি। কিন্তু রূপমতী শ্বশুর শাশুড়িকে বলল, তোমরা তো আমাকেই জমি লিখে দিয়েছো। তাহলে আমার মতামত টা তো নিতে হবে। তাই আমি বলছি, এই বিপদের সময়ে মেয়েটা যাবে কোথায়? তোমার ছেলের অন্যায়ের শাস্তি ওকে কেন দেবে? আর ওর পেটের বাচ্চা, তার কি দোষ। ওকে বরং এখানেই থাকতে দাও। বাচ্চাটা হয়ে গেলে, তারপর ওকে আদ্রায় নিয়ে যাবে, বা যা করার করবে। এখন ওকে তাড়িয়ে দিও না। শ্বশুর শাশুড়ি বলল, ঠিক আছে, তোয়ার কথাই মানলাম। তবে হ্যাঁ, বাচ্চার নামে ছল করে উয়ার এঘরে আসা যাওয়া চইলবে না। সিরাজুলের এ বাড়িতে ঠাঁই হবে নাই, বইলে দিলাম। ওকে আদ্রায় ফিরে যেতে হবে। আর সুফিয়ার জন্য নিয়ম করে ট্যাঁকা পাঠাইতে হবে। পয়সা দিতে উয়াকে আসতে হবে না, ও ফোনে পয়সা পাঠায়ে দিবে। ও ছেলেকে ঘরে তুলবো না। বাচ্চা বিয়ানো হইয়ে গেইলে, গাই বাছুর নিয়ে বিদায় নিতে হবে।
সিরাজুল সুফিয়ার সাথে একটু আলাদাভাবে কয়েকটা কথা বলে বিদায় নিল। রূপমতী এখন কলে ধরা পড়া ইঁদুরের দশা। আপনি শোয়ার জায়গা নেই, শংকরাকে ডাকে। বুড়ো শ্বশুর শাশুড়িকে দেখভাল করে। আছে মেয়ের পড়াশোনা। মেয়েকে নিয়ে তার ভবিষ্যতের চিন্তা। আবার উপরি পাওনা সতীনের আগমন। সংসার সামলাতে রূপমতী দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে, বেরিয়ে পরে মাঠে-ঘাটে, পুকুরের পাড়ে, খালের পাড়ে, জলা জমিতে, নানাবিধ শাক পাতা সংগ্রহ করে। হিংচে, কুলেখাড়া, কলমি, থানকুনি পাতা, কচুর শাক, কচুর লতি, কেশুত পাতা, কত না রকমারি লতাপাতা শাক। ঢেঁকির শাক, গিমা শাক, কি নেই তার কাছে। এসব সংগ্রহ করে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়। তারপর রাত্রে চলে সেগুলোর ছোট ছোট আঁটি বাঁধা। সকাল হলেই সেগুলো নিয়ে ছোটে বাজারে। বাজারে তার কিছু নির্দিষ্ট খদ্দের আছে। যারা তার ওপরে নির্ভর করে। লোকে বলে বিনা পুঁজির ব্যবসা। তারা রূপমতির মেহনত পুঁজিকে দেখতে পায় না। কোন কোন উটকো খদ্দের বলেই বসে, বন বাদার থেকে কুড়িয়ে আনা এক আঁটি কলমীর দাম দশ টাকা? তোমার তো বিনা পুঁজির ব্যবসা, এত পয়সা রাখবে কোথায়? রূপমতী হাসতে হাসতে উত্তর দেয়, ঠিকই বলেছো, তুমিও একটু এই ব্যবসাটা করো না। তাহলে আমার পয়সা রাখার সমস্যা হবে না।
রূপমতী সতীনকে গুগলির ঝোল, ল্যাঠা মাছ, বাইন মাছের ঝাল, এসব করে খাওয়ায়। পুষ্টিকর খাবার চাই এ সময়। মুরগির গলা মেটে দিয়ে চচ্চড়ি করে দেয়। কুলেখাড়ার রস খাওয়ায়। রূপমতীর সেবা যত্ন চোখে দেখার মত। ঘড়ির কাঁটার মত চব্বিশ ঘন্টা সে কাজ করে চলে। মেমারী গ্রামিন হাসপাতালে সুফিয়ার ডাক্তার দেখানো, সেবা যত্ন, ওষুধপত্র, সবকিছু চলে। আবার উপার্জনের পথটাও সামলাতে হয়। কখন কোন জমিতে, কোন খালে বিলে, জলাজমিতে, কোন শাক পাতা, সব হিসেব রাখতে হয়। এসব ছাড়াও কোন তাল গাছের নিচে একটা পাকা তাল পড়ে আছে দেখেছে, কোথায় হাত বাড়ালেই একটা পাকা পেঁপে নাগালে আসে, সে দেখে রেখেছে। রাতে ঝড়ের পর, ভোর থাকতে বাগানে বেরিয়ে পড়া, আম কুড়োবার তাগিদ, আবার কোথায় চাষের জমিতে একটু বেথুয়া শাক পাওয়া যায়, সবদিকে খেয়াল রাখতে হয়। দুই একবার লক্ষণ রেখা অতিক্রম করে ফেলেছে। হাঁস মুরগির ডিমে হাত দিয়ে ফেলেছে। তখন কপালে জুটেছে গালাগালি, আর চোর অপবাদ। আর সেই গালাগালির মধ্যে অবশ্যই জাত ধর্মের কথা উঠে এসেছে। -- এইখানে এসে অনন্ত বাবু আড় চোখে শান্তিরামের দিকে দেখে নিলেন, কারণ অতি অবশ্যই এখানে শান্তিরামের একটা মন্তব্য অনিবার্য ছিল। কিন্তু শান্তি রাম আজ যথেষ্ট সংযত। সেই সুযোগে একটু দম নিয়ে একটা বিড়ি ধরালেন। একটা লম্বা টান দিয়ে দীর্ঘ ধোঁয়া ছেড়ে, আবার বলতে শুরু করলেন।
(৩)
আজকাল মেয়ে তহমিনা ওরফে তুহিনা ঘরের কাজে মাকে অনেকটা সাহায্য করে। চোখের উপর দেখতে পায় তো, মায়ের দম ফেলার সময় নেই। অনেকেই বলে তুহিনার বিয়ের কথা। দেখতেও ভারী সুন্দর হয়েছে মেয়েটা। আর উঠতি বয়সের একটা আলাদা সৌন্দর্য, মাধুর্য, ছটফটে ভাব আছে। সবারই চোখে পড়ে। কিন্তু রূপমতী বলে, ওকে পড়াশোনা করাবো। ও চাকরি করবে, তারপর বিয়ে করবে। আর তুহিনা বলে, পড়ার পেছনে তো ঘরের কোন খরচ নেই। বরং কন্যাশ্রী বাবদ কিছু আয় হয়। সাত তাড়াতাড়ি বিয়ে করলে সেটা বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবেই চারজনের সংসার হয়ে ওঠে পাঁচ, সাড়ে পাঁচ জনের সংসার।
বিধাতার কি নির্মম পরিহাস, সুফিয়ার যেদিন সম্ভাব্য ডেলিভারির ডেট দিয়েছিল ডাক্তার, তার ৭-৮ দিন আগেই জল খসতে শুরু করে। ডাক্তার তাড়াতাড়ি সিজার করার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ বাচ্চা যে তরলের মধ্যে ভাসমান থাকে, যে তরল হল তার জীবনী শক্তি, সেটা যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে বাচ্চা বাঁচবে না। ডাক্তার হাই রিস্ক বন্ডে সই করিয়ে নেবে। সুফিয়ার বাড়ির লোক হিসেবে নিকটাত্মীয় রূপমতীকেই টিপছাপ দিতে হলো। ডাক্তার স্পষ্ট বুঝিয়ে বলে, "চেষ্টা করব মা ও বাচ্চা দু'জনকেই বাঁচাতে। কিন্তু কতটা সফল হবো, জানা নেই। সবটাই উপরওয়ালার হাত।" বিবর্ণ সুফিয়া রূপমতীর হাতটা পরম ভরসায় শক্ত করে ধরেছিল, আর করুণ চোখে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টি যতটা অসহায়, ততটাই আত্ম গ্লানিতে পূর্ণ। খবর গিয়েছিল সিরাজুল এর কাছে। সে হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছিল যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব। সমস্ত খরচাপাতি ব্যয়ভার সে ই বহন করে। কিন্তু শেষ অব্দি বাচ্চা বাঁচলেও, মাকে বাঁচানো যায়নি। সিরাজুল অথৈ জলে পড়ে, বিবর্ণ হতাশ দৃষ্টি নিয়ে রূপমতীর দিকে তাকায়। সিরাজুলের কোলে সদ্যোজাত জীবন, আর উঠোনে পড়ে সদ্য মৃত সুফিয়া। আদ্রায় গিয়ে এই বাচ্চাকে নিয়ে সে কি করবে। রূপমতী সিরাজুলের কোল থেকে বাচ্চাটাকে টেনে নেয় নিজের কোলে। তারপর বলে এখন এই বাচ্চা আমার। তুমি তোমার কাজের জায়গায় ফিরে যাও। ভুল করেও কখনো আর এখানে ফিরে আসবেনা। চারজনের পেট যেভাবে চলছে, পাঁচজনেরও চলবে। বাচ্চার জন্য খরচ পাঠাবে কি পাঠাবে না, সেটা তোমার ইচ্ছা।
সিরাজুল তো অন্ধকারের মধ্যে একটু আশার আলো দেখতে পেলো। রূপমতীর উদারতা সিরাজুল এর কাছে সুযোগ হয়ে দেখা দিল। কিছু টাকা পয়সা রূপমতীর হাতে দিয়ে, সুফিয়ার পারলৌকিক কাজ সম্পূর্ণ করা পর্যন্ত এখানেই থাকলো। তারপর ফিরে গেল কর্মস্থল আদ্রায়। সুফিয়া সিরাজুল কে ছেড়ে গেলেও, নেশা তাকে আরো চেপে ধরে। নেশা তো সিরাজুল আগেও করতো। কিন্তু এখন সারাক্ষণই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। চাকরিতেও নিয়মিত যায়না, হাজিরা বাবুর সাথে আপোষ রফা করে কিছু কমিশন দেওয়ার শর্তে হপ্তায় একদিন হাজিরা দেয়। এখন আর সন্ধ্যা বা রাত্রি নয়, সকাল সন্ধ্যা রাত্রি সব একাকার। মদের নেশায় ঘুমিয়ে পড়ে, মদের নেশায় জাগে। এরপর হাজিরা বাবুর চাহিদাও বাড়তে থাকে। অন্যদিকে সিরাজুলের অনুপস্থিতিও বেড়ে চলে। মাসে একদিন যায়, দু মাসে একদিন হয়ে যায়। হাতে যে বেতনটা পায় সেটার পরিমাণ ক্রমাগতই কমতে থাকে। প্রথমদিকে সিরাজুল দু-এক বার মেমারিতে ফোন পে তে টাকা পাঠিয়েছিল। ওই দুই একবার মাত্র। সেই টাকাও পাঠানো বন্ধ হয়ে গেল। লোকমুখে শোনা, চোখমুখ অস্বাভাবিক ফুলে গেছে। পেটটা ক্রমাগত ফুলে বড় হতে থাকে। হাত-পা গুলো রোগা হতে থাকে। উঠে দাঁড়াবার শক্তিটুকু চলে যায়।
এদিকে রূপমতীর মেয়ে তহমিনা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, এখন ক্লাস টেন। মায়ের স্বপ্ন মেয়ে কলেজে পড়বে কিন্তু সব স্বপ্নই তো আসলে স্বপ্ন, সত্যি নয়। মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে যে কদিন ঘরে বসে থাকা সেই কদিনে রূপমতীর কর্মব্যস্ততার সুযোগে ঘরে আনাগোনা হলো এলাকার উঠতি নওজোয়ান যুবক শৌণক প্রসাদের। রূপমতী ভেবেছিল মেয়ে ঘরে থাকলে, নবজাত পুত্র সন্তানের দেখভাল করবে। কিন্তু শৌণকের আগমন সব ওলট-পালট করে দেয়। শৌণক পেশায় রঙ মিস্ত্রি, নিজে কাজ ধরে না। কন্ট্রাক্টারের আন্ডারে কাজ করে। বাপ ঠাকুরদার দেশ ছিল বৈশালী। বাড়ির পরিবেশে বিহারী ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু শৌনক বাংলায় জন্মে, বড় হয়ে, অনেকটাই বাঙালি হয়ে উঠেছে। উঠতি বয়সের মেয়ে ঘরে একা, তার সাথে ফাঁকা বাড়িতে ঘনঘন সাক্ষাৎ। বিধাতা এর পরিণতি নির্দিষ্ট করেই রেখেছিল। রূপমতী নবজাত মাতৃহারা শিশু সন্তানকে আপন সন্তান জ্ঞানে পালন করলেও, কন্যা তুহিনাকে নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ ছিল না। দুপুরে মায়ের অনুপস্থিতি ও কচি সৎভাই কে দেখভাল করার অজুহাতে, পড়াশুনা লাটে উঠলো। শৌনক ওরফে শানু সেই সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে। তাছাড়া এ সময় কোভিড আর লক ডাউন এর কারণে স্কুল কলেজ সব বন্ধ হওয়ার ফলে, বাইরে যাওয়ার চাপ ছিল না তুহিনার। বাইরে শৌণকের কাজ থাকলেও যানবাহন ও যাতায়াতের সমস্যা থাকার ফলে খুব নিয়মিত কাজ ছিল না। মাঝেমধ্যে লোকালে কিছু কাজ করতো। মনে হয় শৌণকের কাজের আগ্রহও ছিল কম।
-- "না থাকারই কথা অনন্ত দা" শান্তিরাম ফোড়ন কাটলো। "কারণ ভর দুপুরে এমন জরুরী কাজ ফেলে কে আর অন্য কাজে যায় বলুন।" অনন্ত বাবু শুনেও মুচকি হাসলেন, কিন্তু কোন মন্তব্য করলেন না। আবার মূল গল্পে ফিরে গেলেন -- ফলে শৌণকের কাজ একটু অনিয়মিত। সবে মিলে হিন্দিতে যাকে বলে "সোনে পে সোহাগা"। শান্তিরাম মন্তব্য করল এখনকার ছেলে ছোকরার কথায় "জমে ক্ষীর"। এতটা লুজ ও হালকা হওয়ার কারণে অনন্ত বাবু শাসনের দৃষ্টিতে একবার শান্তিরামকে দেখলেন।
অনন্ত বাবু আবার বলতে শুরু করলেন -- মায়ের খুব ইচ্ছে ছিল মেয়ে অনেক পড়াশোনা করবে, কলেজে পড়বে। আর কন্যাশ্রীর টাকা পেয়ে সেই স্বপ্নটা আরেকটু বর্ণময় হয়েছিল। হাতে আসছে দুটো বাড়তি পয়সা লক্ষীর ভান্ডার। নিজের সমস্ত শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে মেয়েটাকে নিয়েই তার স্বপ্ন। সঙ্গে এখন শুধু স্বপ্ন নয়, কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে, ওই নবজাতক। সতীনের ছেলে হলেও, সে তো মা বলেই ডাকে। আর ওর তো দ্বিতীয় কোনো মা নেই। তাই অবহেলা করতে পারে না। কিন্তু ওই শিশুকে যে যত্ন, দেখভাল করা প্রয়োজন, সেটা করবার সময় কোথায়? সারাদিন রূপমতী এক ঘোরের মধ্যে থাকে, কাজের ঘোর। তাই মেয়ের উপর ওই নবজাতক শিশুর কিছুটা দায়িত্ব দিয়ে খানিক নিশ্চিন্ত হয়েছিল।
(৪)
এর ফল হয়েছিল, ওই ছোট শিশু যার তার কোলে, যখন খুশি, যেখানে খুশি, বেড়ে উঠতে লাগলো। রূপমতীর মেয়ের পক্ষে সেটা সুবিধাই হলো। ভাবা যায় না, যখন তিন সাড়ে তিন বছর বয়স হয়েছে ওই বাচ্চার, স্থানীয় চালের পাইকার নুনিয়া, তার আড়তে ওই শিশুকে নিয়ে যায়। জানেনা হেন গালাগালি নেই। ওই শিশু না জেনেই অকপটে, অবাধে কথায় কথায় খিস্তি দেয়। ও তো এসবের মানেই জানে না। আড়তে বসে সবার সাথে চা খায়, একটু একটু মদ খাওয়াও ধরেছে। ওকে নিয়ে সবাই মজা করে। রূপমতী এই নিয়ে নুনিয়ার আড়তে গিয়ে ঝামেলা করেছে, ঝগড়া করেছে মাতাল মধ্যমণি কৈলাশ রাজভরের সাথে। ঘরে ফিরে মাথা গরম করে মেয়ে তুহিনাকে লাঠিপেটা করেছে। বাচ্চাটার দিকে একটুও নজর রাখেনি বলে। আবার নিজেই সারারাত মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। কিন্তু ততদিনে তো সেই বাচ্চার পাকাপোক্ত নেশা তৈরি হয়েছে। শান্তিরামের মন চাইছিল একবার বলে -- ওই মোল্লাদের ছোট থেকেই এইসব সমাজবিরোধী শিক্ষা দীক্ষার শুরু। কিন্তু বলতে গিয়ে থেমে গেছে। কারণ মনে পড়ে গেছে, সমাজবিরোধী শিক্ষক নুনিয়া, কৈলাস এরা কেউ মোল্লা নয়।
একদিন তখন রাত সাড়ে নটা দশটা হবে। একটা ওষুধের দোকানে ওষুধ কিনতে গিয়ে অনন্ত দেখেন, সেই বাচ্চা দোকানের বারান্দায় একা বসে ঝিমুচ্ছে। দোকানদারকে বললেন, কার বাচ্চা এভাবে ঝিমুচ্ছে? এ তো নর্দমায় পড়ে যাবে। দোকানদার বলল, আপনি জানেন না, ও এক ঝানু বাচ্চা। আপনি যেসব কথাবার্তার মানে জানেন না, ও সেসব জানে। ও সাড়ে দশটা এগারোটার আগে বাড়ি ঢোকে না। ও এখন নেশা করে ঝিমুচ্ছে। ওর কাছেই শোনা গেল, ডান হাতের গলিতে চালের আড়তের নুনিয়ার কথা।
আসলে সংগ্রহ করা সমস্ত শাক পাতা ছোট ছোট আঁটি করে, পরদিন সকালে বাজারে নিয়ে বসতে হবে। আবার রাতের রান্নাবান্নাও আছে। যদিও কিছুটা সাহায্য করে তার মেয়ে। সব কাজগুলো সারা হলে, তবেই ওই ছোট্ট ছেলেকে ঘরে নিয়ে আসা। তার আগে ঘরে আসলে ও সমস্যা বাড়াবে বই কমাবে না। কিন্তু "বোঝার উপর শাকের আঁটি" বলে একটা কথা আছে। সংসারের নানাবিধ বোঝা সামলাতে সামলাতে রূপমতীর ওপরেই জুটেছে শাকের আঁটি সতীনের ছেলে। কিন্তু সেটাও রূপমতী সামলে নিয়েছিল। কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার পর একদিন রূপমতী শাক পাতা তুলে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরে দেখে, ঘরে আলো জ্বলে নি। বাচ্চা রয়েছে রাস্তার ধরে একটি দোকানের বারান্দায় শুয়ে। ভাইকে দুপুরে খেতেও দেয়নি। তারপর খোঁজ চলে মেয়ের। বেশি খুঁজতে হয় নি। অনুমান নির্ভর করে, লোকমুখে শুনে, সেই অনুমান আরো দৃঢ় করে, রূপমতী হাজির হলো প্রসাদের বাড়ি। হ্যাঁ সকালে এসে শাক তুলতে বেরিয়ে যাওয়ার পরেই শৌণক প্রসাদ এসে, মেয়ে তুহিনা কে নিয়ে চলে যায় সিমলাগড়ের কালিবাড়িতে। শৌণকের বাড়িতে সকলেই এই পরিকল্পনার কথা জানে। তাদের এই বিয়েতে সম্মতি আছে। মুহূর্তে খানখান হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো রূপমতীর তিল তিল করে গুছিয়ে তোলা স্বপ্ন।
সতীনের ছেলে লোকের মুখে মুখে কালুয়া নাম প্রাপ্তি হয়েছে। তাকে নিয়ে রূপমতীর কোনও স্বপ্ন নেই, বেশিটাই মায়া, আর কর্তব্যবোধ। শেষের কদিন সুফিয়াকে সে সতীন বলে ভাবতে পারেনি, বরং তারই মত হতভাগ্য এক বোন বলে মনে করেছে। আর তার শেষ হাতের স্পর্শ এবং অসহায় বোবা দৃষ্টি রূপমতীকে বড়ই দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে কালুয়া রূপমতীর উপর একটা আবশ্যিক দায়িত্ব। কিন্তু কি যে করে, সকালে বাজারে বসা, আর দুপুর থেকে শাকপাতা কুড়িয়ে বেড়ানো, আর সন্ধ্যা থেকে রাত্রি সেগুলোর গোছা বাধা, আঁটি বাঁধা, বাছাই করা পরের দিন বাজারের জন্য। এর মধ্যে কখন সে কালুয়াকে দেখবে। ফলে একদিকে যেমন নুনিয়ার সাথে ঝগড়া করে গালাগালি দেয়, অন্যদিকে ওদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনার সরিয়ে আনার কোন উপায় দেখতে পায় না।
(৫)
রূপমতীর শ্বশুর বাড়িতে আর্থিক অনটন ছিল না। শ্বশুর ছিল নিয়োগী বাগানে পাহারাদার। সুবিশাল ১৮-২০ বিঘা জমির উপর আম কাঁঠাল লিচু জামরুল ইত্যাদির বিরাট বাগান। মাঝে ছিল পুকুর। এই বাগানের তত্ত্বাবধান করত রূপমতীর শ্বশুর তাহের আলী। নিয়োগী মশায়ের পরে ছেলে ভাইপোরা মালিক হলো। নিয়োগী মশায়ের একটাই অনুরোধ ছিল ছেলে ভাইপোদের কাছে, এতদিনের বিশ্বস্ত বাগানের তত্ত্বাবধায়ক তাহের আলীকে যেন কখনো বঞ্চনা করা না হয়। তাকে অন্তত একটা মাথা গোজার ঠাঁই ও এককালীন কিছু অর্থ দেওয়া হয়। ভাইপোরা এটা বেঁচে দিলেও, দালালের কাছে জেঠামশাইয়ের সেই অনুরোধ রেখেছিল। ফলে জমির দালালের হাতে তাহেরের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল একটি কচ অবশিষ্টাংশ, এক কাঠা ছয় ছটাক জমি। যেটুকু অর্থ পাওয়া গিয়েছিল তা দিয়ে মাথা বাঁচানোর পক্ষে যথেষ্ট, একটা আশ্রয় তৈরি করা গিয়েছিল। তাহের কিছু টাকা পয়সা বাঁচিয়ে রেখে তাই দিয়ে ফলের ব্যবসা শুরু করে। নিত্যদিন রাত থাকতে ফার্স্ট ট্রেন ধরে কলকাতায় মেছুয়া বাজার পৌঁছানো। সেখান থেকে ফল নিয়ে সকাল আটটার আগে মেমারি আসা। এরপর সেই ফল নিয়ে সিরাজুল আর তার মা, এরাই বাজারে বিক্রি করতো। সন্ধ্যার দিকে তাহেরও গিয়ে দোকানে বসতো। দোকান মানে কোন পাকাপোক্ত নয়, প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে ঝুড়ি নিয়ে বসা। পাশের স্থায়ী দোকান থেকে একটা আলোর লাইন টেনে নেওয়া। তার জন্য মাসে মাসে দোকানকে ইলেকট্রিক বাবদ ভাড়া দিয়ে দেওয়া হতো।
এভাবে সংসার মন্দ চলতো না। ভোগ বিলাস না থাকলেও সচ্ছলতা ছিল। তার ওপর সিরাজুল যখন পাড়ার আরো দুই যুবকের সাথে একত্রে রেলের গ্যাংম্যানের সহকারি লেবার হিসেবে কাজে ঢুকল, এবং দু বছরের মধ্যে স্থায়ী ঠিকা কর্মচারী হল। পরিবারের সুদিন এসে গেল। কিন্তু ওই যে কথায় আছে সুদিন গুলি দুদিন বেশি রয় না। একদিকে সিরাজুল কে ধরল মদের নেশা, সেই সঙ্গে যুক্ত হলো উপপত্নী সমস্যা। এদিকে তাহের আলী মেছুয়া থেকে ফলের ঝুড়ি বয়ে আনতে গিয়ে একবার হাওড়া স্টেশনে বিরাট দুর্ঘটনা ঘটালো। পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গেল। তখন থেকে পরিবারের ভাগ্যের চাকা উল্টো মুখি ঘুরলো। এরপর তাহের আলী আর মেছুয়া বাজার যেতে পারত না। সে সকালে বিকেলে দোকানেই বসতো। মেছুয়ায় মাল আনতে যেত রূপমতীর শাশুড়ি ননহারা। এভাবেও বেশ বছর দেড় দুই চলে ছিল। কিন্তু একদিন রাতে বুকে ব্যথা হলো ননোহরার। ওষুধের দোকান থেকে বলেছিল গ্যাস হয়েছে। গ্যাসের ট্যাবলেট খেলো, তারপরেও ব্যথা বেড়েই চলল। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে ননহারা বিদায় নিল। হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর সময় দেয়নি।
"সময় তো দিয়েছিল, সময়টা কাজে লাগায়নি। ওই ওষুধের দোকানের 'বড়ো ডাক্তার' গ্যাসের ব্যথা বলে সান্ত্বনা দিলো" -- শান্তি রাম মন্তব্য করলো। অনন্ত বাবু সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে নিয়ে আবার শুরু করলেন। এই সময় থেকেই রূপমতীর পরিবারে অভাব দারিদ্র্যের সূচনা। এই সময়েই তার শাক পাতা কুড়িয়ে বাড়িয়ে দিন গুজরান শুরু হলো। তবু শ্বশুরের বার্ধক্য ভাতা, নিজের লক্ষ্মীর ভান্ডার, আর মেয়ের কন্যাশ্রী মিলে যা হোক চলছিল। শুধু দু চোখে ছিল গভীর স্বপ্ন, মেয়ে কলেজে পড়বে, চাকরি করবে। সেই শেষ আশ্রয়, স্বপ্নটুকুও ভেঙে চুরমার।
অনেক বিপদের ঝুঁকি সত্ত্বেও এখন কালুয়াকে সঙ্গে নিয়েই রূপমতী মাঠ কুড়াতে যায়। খালে পুকুরে নামে, কালুয়া এক জায়গায় বসে থাকে। কখনো কখনো কালুয়া মাঠে শাক তোলার কাজে মাকে সাহায্য করে। সে একটু একটু করে শাক চিনতে শুরু করেছে। রূপমতীর ইষ্ট দেবতা লোকনাথ বাবা। রনে বনে জলে জঙ্গলে যে কোন বিপদে সে বাবার স্মরণ নেয়। তাহেরের বাড়িতে রূপমতীর লোকনাথ বাবার ছবি পুজিত হয়। বাজার থেকে কেনা সস্তা ফ্রেমে বাঁধানো কুরআনের বাণী, আর লোকনাথ বাবার ছবি সহাবস্থান করে। রূপমতী নিয়ম ও কানুনের আচার অনুষ্ঠানের পরোয়া করে না। সে তার জানা নিয়মে ধূপকাঠি জ্বেলে, প্রদীপ জ্বেলে সকালে সন্ধ্যায় জল ছিটিয়ে, শঙ্খ বাজিয়ে, আল্লাহকে ডাকে, লোকনাথ বাবাকেও ডাকে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার সময় বা সুযোগ কোনটাই এদের হয় না। কারণ তাহেরকেও সকালের বাজারে বসে বৌমাকে একটু সাহায্য করতে হয়। ওই সময় রূপমতী ঘরের কিছু কাজ সেরে ফেলে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ গরিবের কাছে বিলাস। গরিবের আবার নমাজ আদায়।
এখন তাহের আলী বিছানা থেকে উঠে কোনমতে দাওয়ায় বসে থাকে। তার বেশি পারে না। এদিকে মেয়ে তহমিনা ঘর ছেড়েছে শৌনকের সাথে। ঘরের সমস্ত দায় দায়িত্ব রূপমতীর ঘাড়ে। সিরাজুলও আর টাকা পয়সা পাঠায় না। আগে যদিও অনিয়মিত পাঠাতো, মাস ৮-১০ হলো সম্পূর্ণ বন্ধ। লোকমুখে শুনতে পেয়েছে, চাকরিতে যায় না। ওই মদের দোকানের খাটিয়ায় শুয়ে থাকে। শুয়ে শুয়ে সকাল সন্ধ্যা নেশা চলে। চোখ মুখ অস্বাভাবিক ফুলে গেছে, পেটটা ফুলে টানটান হয়েছে। এখন যাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুজরান। এই সংবাদেও রূপমতীর বিশেষ হেলদোল নেই। কারণ তার নিজের কথা ভাবারই ফুরসত নেই তার। তাছাড়া সিরাজুল তো একটি বা বলা ভালো দুটি সন্তানের দায়িত্ব ধরানো ছাড়া, স্বামী হিসেবে আর কোন দায়িত্ব কোনদিন পালন করেনি। ফলে যেদিন সিরাজুলের মৃত্যুর খবর এলো, সেদিনও রূপমতীর কোন চিত্ত বৈকল্য ঘটেনি। বিছানায় শয্যাশায়ী শ্বশুর, সতীনের ছেলে, এদের ফেলে যাবেই বা কোথায়। ছেলে কালুয়াকে রূপমতী খবরটা দিয়েছিল। কালুয়া আগ্রহ দেখায়নি। দেখাবেই বা কেন, সে তো বাপকে চেনেনি, জানেনি। আর রুপমতী বলে, কাঁদতে গেলেও অবসর লাগে। সেই অবকাশ রূপমতীর নেই।
(৬)
তহমিনার বিয়ের বছর পূর্ণ হওয়ার অনেক আগেই একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। শোনা যায় একেই কোভিডের ভরা দুপুর, তার ওপর ভরা যৌবনের অখণ্ড অবসর। এর সুবাদেই এই সন্তান এসেছিল। তাই তহমিনা মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর অপেক্ষা করেনি। উচ্চ মাধ্যমিকের কথা ভাবেনি। সোজা বাড়ি থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রূপমতীর ঘর থেকে হাঁটা পথে পনের কুড়ি মিনিটের দূরত্বে তহমিনার শ্বশুর বাড়ি। রূপমতী নিয়ম রক্ষার দেখা-সাক্ষাৎ করে। দুর্গাপূজায় বেয়াই বাড়িতে সওগাত পাঠানো, তার সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ছটের পরব। কিন্তু ওই পর্যন্তই, অন্তরের কোনো তাগিদ অনুভব করে না। এদিকে দেখতে দেখতে কালুয়াও যখন বছর আট দশ হবে, তখনো কালুয়া স্কুলের মুখ দেখেনি। মায়ের সাথে পুরো দমে মাঠ খাল বিল কুড়োনোর কাজে লেগে গেল। আরো একটু পরে, বছর ১২-১৪ বয়স হলে কালুয়া বলে, "মা তোকে আর বাইরে ঘুরতে হবে না। তুই ঘর সামলা।" কালুয়াই সব শাক পাতা যোগাড় জন্তর করে। আর মা ঘর সামলায়। পরদিন বাজারের জন্য ছোট ছোট আঁটি বেঁধে, গোছা বেঁধে, প্রস্তুত করে। নানা তাহেরের সাথে বাজারেও বসে। রূপমতীকে এখন অনেক কাজ থেকেই কালুয়া ছুটি দিয়েছে।
গায়ে গতরে বড় এবং রোখা চোকা মেজাজ, কালুয়ার সাথে সহজে কেউ ঝামেলায় জড়ায় না। কালুয়া এখন ভোর থাকতে পাইকার দের কাছ থেকে কিছু কিছু মাল ধরতে শুরু করেছে। ক্ষেতের টাটকা বেগুন, পটল, লাউ, কুমড়ো ইত্যাদি। ফলে এখন আর শুধু শাক পাতা নয়, সঙ্গে বেশ কিছু সবজিও পাওয়া যায়। রূপমতীর সংসারের ছিরি ছাঁদ ফিরেছে। এখন তার ঘরে বসে কখনো কখনো টিভি দেখার অবকাশ মিলেছে। ওদিকে সিরাজুলের মৃত্যুর পর তার অফিসের পাওনা গন্ডা কিছু টাকা পয়সা বৈধ স্ত্রী হিসেবে রূপমতী পেয়েছে। যদিও সেই পরিমাণ খুব বেশি না। লোকে বলে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি, তার পাওনা গন্ডাটা মোটা অংকের হওয়ার কথা। কিন্তু সিরাজুল তো কোনদিন অফিসই করেনি। সেই সুযোগ নিয়ে অফিসে করণিকরা এবং হাজিরা বাবু সব গোলেমালে হরিবোল করে দিয়েছে। বহু টাকায় তারা হাতিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া সিরাজুল তো রেলের পার্মানেন্ট স্টাফ ছিল না। সে ছিল ঠিকাদারের খাতায় পার্মানেন্ট। তবুও কিছু টাকা রূপমতীর ব্যাংক একাউন্টে জমা পরেছিল। লক্ষ্মীর ভান্ডার এর সুবাদে এই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়েছিল। পরে এখানে বিধবা ভাতাটাও যুক্ত হয়েছে।
-- বিধবা ভাতা আর লক্ষ্মীর ভান্ডার কি একসাথে পাওয়া যায়? শান্তিরাম মন্তব্য করে।
-- হ্যাঁ, তবে বার্ধক্য ভাতা ও লক্ষ্মীর ভান্ডার একসাথে পাওয়া যায় না। অনন্ত বাবুর জবাব।
হাসতে হাসতে শান্তিরাম বলেন -- জীবিত সিরাজুল মাসোহারা না দিলেও, মৃত সিরাজুল মাসোহারা চালু করে গেল -- কি বলেন অনন্ত দা? অনন্ত ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলতে শুরু করে, মোটামুটি চলন সই অবস্থা এখন রূপমতীর পরিবারের।
একদিন মাঠ কুড়িয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে কালুয়া শুনলো মায়ের কাছে, তার দাদু, মা, আর দিদি তাহমিনার নামে কি সমস্ত ভোটের কাগজ দিয়ে গেছে। সেই কাগজে অনেক কিছু তথ্য জানতে চেয়েছে। রূপমতী কখনো স্কুলে যায়নি, আর তার বার্থ সার্টিফিকেটের প্রশ্নই নেই। তহমিনার জন্ম সার্টিফিকেট আছে, কালুয়ারও সার্টিফিকেট আছে। কিন্তু সেই সূত্রে তার মা সুফিয়া - বাবা সিরাজুল - দাদু - তাহের আলী কারো সার্টিফিকেট নেই। ফলে তারা কবে এ দেশে এসেছে তেমন কোন সলিড প্রমাণ হাতে নেই। সেই পঞ্চাশ ষাটের দশক থেকে তাহের আলী নিয়োগীর বাগানে মালি ও পাহারাদার হিসেবে কাজ করে, কিন্তু কোন তো সলিড কাগুজে প্রমাণ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নেই। হ্যাঁ, জমির দলিলে, দানপত্রে, তারিখ আছে। কিন্তু সে জমির প্লট ও কাগজ তৈরি হয়েছে ২০০৬ সালে, দালালরা জমি নেওয়ার পর। আর তাহেরের এই অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক ঢের-ঢের আগে। হঠাৎই যেন ধীরে-সুস্থে গুছিয়ে আনা পরিবারটির সবকিছু আবার এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
তাহের আলী সেই ব্রজেন নিয়োগীর আমলে এখানে কাজ করেছে। সেই ব্রজেন নিয়োগী বহুকাল আগে সত্তরের দশকে গত হয়েছেন। তার পুত্ররা বরেন নিয়োগী ও বরুণ নিয়োগী তারাও কেউ আর বেঁচে নেই। এখন আছে ব্রজেন নিয়োগীর তৃতীয় জেনারেশন। তারাও কেউ দেশান্তরে, কেউ ভিন রাজ্যে, কেউবা কলকাতার রাজারহাট - নিউটাউন অঞ্চলের বাসিন্দা। তাহের আলীকে চিনলেও কোন কাগজপত্রের সন্ধান দিতে পারবেনা। আসলে সে সমাজটা তো কাগজে-কলমে নিয়োগ করা, ছাঁটাই করার সমাজ নয়। "বাবু একটা কাজ দেবেন" -- তাহেরের এই কথা শুনে ব্রজেন বাবু বলেছিল, ঠিক আছে, আজ থেকে ওই বাগানের দেখাশোনা করো। আর বাগানের কোনায় যে ঘর আছে সেটা তোমরা থাকো। সবটাই মৌখিক।
ওদিকে সিরাজুল গ্রামেরই আর দুই বন্ধুর সাথে একটা দূর পরিচয় এর সূত্র ধরে পাড়ি দিয়েছিল চাকরির খোঁজে। শোনা যায় কিছু পয়সা কড়িও খরচ করেছিল তারা। তারাই গ্রুপ ডি পদে গ্যাংম্যানের সহকারি ঠিকা লেবার হিসেবে কাজে ঢুকিয়েছিল। বয়স একটা যাহোক কিছু বসিয়ে দিয়েছে, কাগুজে প্রমাণ দরকার হয়নি। কিন্তু আজ যখন কাগজের প্রশ্ন এসেছে তখন বয়সের প্রমাণ কালুয়া আর তহমিনা ছাড়া আর কারোরই কাগজ নেই। কবে থেকে আছে সে প্রমাণও নেই। বহুকাল ধরে দেশভাগের আগে থেকেই তারা আছে। রূপমতীর মা বাবাই বরং দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে ১৯৫২ সাল নাগাদ এসেছিল, তারও কোন নির্দিষ্ট কাগজপত্র নেই। আর তাহের আলীরা এখানকারই মানুষ। ও শুনেছে কেতুগ্রামে ওরা থাকতো। সেখান থেকে কাজ করতে এসেছিল নিয়োগী কর্তার বাগানে। নিয়োগী মশাই তাদের পাকাপোক্ত থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল মেমারিতে। সেই থেকে সেখানেই আছে। কাগজের প্রশ্ন কেউ কখনো তোলেনি। রূপমতীর বিনিদ্র রজনী কাটে। আবার একটা কালো মেঘের উঁকি দেখতে পায়। কালুয়া টের পায় মায়ের চোখে ঘুম নেই। লোকমুখে শুনেছে, কাগজে নাকি লিখেছে, কোন কাগজ না থাকার কারণে ভয়ে আতঙ্কে কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছে। সব ব্যাপারটা সে ঠিক বোঝে নি। শুধু বুঝেছে, ব্যাপারটা খুবই ভয়ের ও আশংকার। তাই চিন্তাটা কালুয়াকে আরো বেশি দুশ্চিন্তায় রাখে। সে জেগে থাকে, মা কোন অঘটন ঘটাবে না তো? তার নিজের বলতে একমাত্র মা।
(৭)
অনন্ত বাবুর কাহিনী এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শান্তি রাম বাকরুদ্ধ। কোনরকম ফোড়ণ কাটতেও সে ভুলে গেছে। এবার সে উৎকণ্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞেস করে --"তারপর? কোন অঘটন ঘটেনি তো?" অনন্ত বাবু একবার শান্তিরামের দিকে তাকালেন, বললেন, "আরে বাবা শোনোই না"। তারপরের দিন খুব ভোর থাকতে কালুয়া বেরিয়ে পড়ে। পাইকারদের কাছ থেকে কিছু মাল ধরতে হবে। সে এখন দক্ষ ব্যবসায়ী। হবে নাইবা কেন? দুই তিন বছর বয়সে যার পেটে মদ পড়েছে, জন্মে থেকে যে মাতৃহারা এবং কার্যত পিতৃহারা, সে সার্ভাইবাল এর তাগিদে নিজেই অভিযোজনে সক্ষম। পাইকারী মাল ধরার পর, ঘরে এসে মাঠ কুড়ানো শাক পাতার চটের বোঝাটা নিতে আসে। সেই সাথে চায়ের দোকান থেকে দাদু তাহের আলী আর মা রূপমতীর জন্য দু গ্লাস চা আর বিস্কুট নিয়ে আসে। মাকে বলে, আজ আর তোকে বাজারে যেতে হবে না। ওদিকটা আমি সামলাবো। তুই ঘরেই থাক, শরীরে যেটুকু পোষায় ঘরের কাজ সেরে রাখ। আজ একটু জিরিয়ে নে তুই।
ঘরের কাজ করতে করতেই রূপমতী লোকমুখে শুনতে পায়, বাজারে কালুয়ার সাথে কারুর জোর গন্ডগোল শুরু হয়েছে। শুনে রূপমতী অসুস্থ শরীর নিয়েই কোনমতে বাজারে পৌঁছায়। গিয়ে দেখে রক্তাক্ত কালুয়া একা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছে। মাকে আসতে দেখেই হঠাৎ তার মন নরম হয়ে যায়। ধরাধরি করে মাকে পাইকারদের কাছ থেকে কেনা সবজির বোঝাটার উপর বসিয়ে দেয়। রূপমতী বুঝতে পারেনা, কি এমন করল, কেন এমন রক্তপাত হলো! জানা গেল প্রতিদিনের মতোই কালুয়া মালপত্র নিয়ে তার নিজের এই জায়গায় মাল সাজাতে এসে দেখে, বাজারের একটা বলদ, ভোলা সেখানে শুয়ে আছে। কালুয়া এসে বলদ এর পিঠে দু চারটে আদরের চাপড় মারতেও সে উঠলো না। তারপর একটু জল ছিঁটাতেই সে চলে যায়। কিন্তু এই সাধারণ বিষয়টাকে অসাধারণ বানাতেই হবে। ভোলার ইস্যু তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। সেই সুযোগেই হঠাৎ একাধিক বিক্রেতা সিউকুমার যাদব, ভোলানাথ সাউ, গোপাল কোলে এসে কালুয়াকে বলে, সে কেন বলদকে মেরেছে। রোখা মেজাজে কালুয়া বলে সে মারেনি, বলদের পিঠে হালকা চাপড় মেরেছে। একটু জল ছিটিয়েছে। কিন্তু তারা মানতে নারাজ। "ডিসেম্বর মাসের এই ঠান্ডায় তুই কেন জল লাগাবি?" মেজাজ হারিয়ে কালুয়া বলে "তাহলে ওকে কিভাবে সরাবো? ও কি আমার বাপ? ওর পায়ে ধরে ওকে বলবো উঠে যেতে?" সুকুমার বলে, " না, ও আমার বাপ। গাই হামারা মাতা হ্যায় "। কালুয়া বলে, "তাহলে এই শীতে বাপকে বাজারে পাঠিয়েছিস কেন? কম্বল চাপা দিয়ে বাড়িতে রাখ।" এই সময় একটু ধাক্কাধাক্কিতে শিবকুমার টাল সামলাতে না পেরে ঝুড়ির উপর পড়ে গিয়ে চোট পায়। যেটা প্রচার হয়ে যায়, কালুয়া সিউকুমারকে মেরেছে। এর পরই ভোলা নাথ সাউ আর শিউকুমার যাদবের লোকেরা এসে কালুয়ার ওপর চড়াও হয়। কালুয়াও আত্ম রক্ষার্থে দু একটা আঘাত করে।
ঘটনা এর বেশি এগোয় নি। কালুয়া আবার নিজের বসার জায়গাটা শাক সবজি গুছিয়ে বসে পড়ে। রূপমতীও অসুস্থ শরীরেই ছেলেকে ছেড়ে যেতে চায় না। মা বেটা দুজনেই বসে থাকে। কিন্তু রূপমতীর যে নির্দিষ্ট কিছু খরিদ্দার আছে, একটু ডামাডোলের ফলে এবং বাজারে চাপা গুঞ্জনে ঘটনাটা রঙ চড়তে থাকে। ফলে ওর শাক পাতা ও সবজির খদ্দেররা বিশেষ আসে না। ছোট ছোট জটলায় আলোচনা চলে -- "এগুলো খুব বেড়েছে," ..... "আর কদিন সবুর করো, দেখবে এস আই আর শেষ হওয়ার পর কতগুলো দেশ ছাড়া হয়" ....... "এসব বাংলাদেশী রোহিঙ্গার দল, একটাও এখানে থাকবে না। সব কাঁটাতারের ওপারে পাঠানো হবে।" কেউ বলল, "দেশটাকে পাকিস্তান বানিয়ে ছাড়বে এগুলো।"
এইসব কথা যখন অনন্ত বাবু বলছেন, তখন হঠাৎই শান্তিরামবাবু বললেন, ওও তাই নাকি ! এসব তো কিছুই জানতাম না। ওই জন্যই দেখি কালুয়ার বসার জায়গাটায় এখন বাবুরামের ছেলে আনাজ পাতি নিয়ে বসে। অনন্ত বাবু বললেন - হ্যাঁ, আরে ওই বাবুরাম হলো সিউ কুমারের শালা। এবার বোঝা গেল, সমস্ত জাতপাত ধর্মের গল্পের পেছনে আসলে কাজ করে একটা অন্য সম্পর্ক। "তাহলে রূপমতী কালুয়া এখন কি করে? আর তো বাজারেও দেখি না ওদের?" -- শান্তিরামের প্রশ্ন।
এখন তো আর রেল স্টেশনের দিকে যাওয়া হয় না, অনন্ত বাবু বললেন। একদিন গিয়েছিলাম, দেখলাম রেলওয়ে স্টেশনে সন্ধ্যায় ছোট ছোট ক্যারিব্যাগে শাকসবজি নিয়ে অফিস ফেরত বাবু বিবিদের মধ্যে ফেরি করে কালুয়া। প্রতি প্যাকেট ১০ টাকা। কোনটায় কেটে রাখা কচুর শাক, কোনটায় থানকুনি পাতা, কখনো চোদ্দো শাক, কখনো বা নিমপাতা, কচুর লতি, বেথুয়া শাক, নানাবিধ প্যাকেজ দশ টাকা। অফিস ফেরত অনেকেই কিনে নেয়। কাল ওকে দেখে প্রশ্ন করেছিলাম, আর বাজারে বসনি? ও বলল, আমাদের কাগজ নাই, আমাদের দেশ নাই, আমাদের ঠিকানা নাই, তাই রেলস্টেশন সবচেয়ে ভালো নিরাপদ জায়গা। হাঘর বেঘরদের নিরাপদ আশ্রয়। আরপিএফ কে নিয়ম মতো টাকা দিলেই হবে। জিজ্ঞেস করলাম, মা এখন কি করে? কালুয়া দেখালো -- ওই তো। দেখলাম রূপমতী প্যাকেটের ভেতরে শাক পাতা কেটে, পরিষ্কার করে, বাছাই করে, প্রস্তুত করছে। ইতিমধ্যে মাইক্রোফোনে ঘোষণা হলো -- তিন নম্বর প্লাটফর্মে ব্যান্ডেল যাবার গাড়ি আপ হাওড়া ব্যান্ডেল লেডিস স্পেশাল ট্রেন আসছে। কালুয়া মুহূর্ত দেরি না করে রেল লাইন টপকে চলে গেল তিন নম্বর প্লাটফর্মে -- "যা নেবেন দশ টাকা, যেটাই নেবেন দশ টাকা, নিমপাতা দশ টাকা, কচুর লতি দশ টাকা, কচুর শাক দশ টাকা।"