

অলংকরণ: রমিত
অরণ্য
ঠিক এই মুহূর্তে তুমি কী করছ, জানি না। হয়তো সুদৃশ্য আলোর নীচে তোমাদের আহারাদি শেষ। তোমার সন্তানের ঘরে যে আমুদে ভালুকটি, তার অবয়ব আধখোলা দরজা দিয়ে চোখে পড়ছে। আমুদে ভালুকটি যেন এখন চাইছে জীবন্ত হতে, তোমার কাছে আসতে। তোমার দুধের শরীর ঘিরে একটি রাতের পোশাক। তাতে অতিকায় সব ফুল ফুটে আছে। ফাঁকে ফাঁকে লতাপাতার বিস্তার। হয়তো কখনো তোমার পোশাকে নক্ষত্র থাকে, থাকে সমুদ্র আর ঝাউবন। তোমার জানালা দিয়ে যে চতুষ্কোণ রোদ আসে, কখনো হয়তো থাকে সেই রোদের ছাপ। তুমি বেসিনের কাছে গিয়ে হয়তো এইমাত্র মুখের এঁটো ধুলে। আয়নায় দেখলে একবার তোমার দুইচোখের দৃষ্টি আর একঝাঁক পাখির মতো উড়ে যাওয়া ভুরু। দেখলে কণ্ঠার কাছে একটি চঞ্চল প্রজাপতি উড়ছে। এমনটি রোজ এমন সময় হয়। কোথা থেকে যেন ওই প্রজাপতি উড়ে আসে। হয়তো ও তোমার সুগন্ধ পায়। তোমাকে ফুলের মধুর মতো ভাবে। ডাল- ভাতমাখা সব মুড়ি- মিছরির মতো বাসনের স্তুপগুলি হাওয়ায় ভাসিয়ে তুমি একটি ঝোরার পাশে রাখলে। কাল এলোমেলো চুলের এক কিশোরের মতো ভোর তোমার জানালার বাইরে দাঁড়ালে নয়নার মা এসে সেসব ধুয়ে দেবে। ধুয়ে দেবে আজ রাতে যে পোশাকগুলি তোমার রক্তাক্ত হবে- সেইসবও। আয়নায় তোমার মুখের পেছনেই দেখা যাচ্ছে ডোরাকাটা দেহ নিয়ে একটি বাঘের মুখ খবরের কাগজ পড়ছে। আহা, এইমাত্র হাই তুলল সে। তুমি হয়তো জানতে পারলে না, সেই উদগারে কী প্রচণ্ড বালি ও কাদার গন্ধ, বিষের গন্ধ
বাথরুম থেকে ফিরে এলে কি? তোমার পায়ের গোছে জলকণা। তোমার সন্তান এখন সেই আমুদে ভালুকের কাছে পৌঁছে গেছে। সেই ভালুক হয়তো আঁক কাটছে তোমার সন্তানের পিঠে। তোমার সন্তান চাঁদের মতো ডুবে যাচ্ছে ঘুমে। তুমি ফুলের পোশাকে ঘুরে ঘুরে সব সুদৃশ্য আলো এখন হয়তো নিভিয়ে দিচ্ছ। এইমাত্র তুমি বুঝি ধাপে ধাপে তোমার দিকে এগিয়ে এসেছে যে সিঁড়ি, তার আলো নেভালে। দুটি বীভৎস মুখোসের সামনে দাঁড়িয়ে দরজা বন্ধ করলে। বীভৎস মুখোসুগুলি তোমাকে দেখছে যদিও, তাতে তুমি বিন্দুমাত্র ভয় পেলে না। হয়তো একবার হাত ব্যবহার করে কণ্ঠার কাছে উড়তে থাকা প্রজাপতিটিকে ছুঁয়ে দেখলে। তোমার বসবার ঘর পেরিয়ে শোবার ঘর।তার দেওয়ালে কয়েকটি অবলোকিতেশ্বরের মতো জানালা। হয়তো মেঘ ও বিদ্যুতের কাছাকাছি থাক বলে এসব জানালা বন্ধ করার কখনো কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তাছাড়া রক্তাক্ত হয়ে তুমি যখন বিছানায় পড়ে থাক অনন্তের মতো একা হয়ে, তখন বিদ্যুতের রেখার খসে পড়া দেখতে তোমার ভাল লাগে। ভাল লাগে আকাশের ওপারের সেইসব আওয়াজ, যার কোনো অর্থ হয় না। শুধু অতীতের কথা মনে হয়, মনে হয় বায়ুভূত মানুষের কথা। হয়তো বিদ্যুতের রেখা ঝলসালে তুমি স্পষ্ট দেখতে পাও, হাতে লাঠি নিয়ে থান পরা এক বৃদ্ধা কোথাও চলেছেন। নোনাজল উপছে আসে তোমার পাথরে। তুমি অস্ফুট হাতে বিছানা হাতড়ে দ্যাখো, সেই বাঘের মুখটি কখন তোমাকে খেয়ে যেন এই অরণ্যে কোথায় মিশে গিয়েছে। শুধু রোম কিছু পড়ে আছে তার
এই যে আমার সমুখ দিয়ে
এই যে আমার সমুখ দিয়ে কয়েক পা হেঁটে আরেকটি ঘরে গেলে, তোমার পা ফেলার শৈলী দেখে মনে হল ভেতরে ভেতরে কোথাও তুমি ছোট ফ্রক ও ইজের পরা কিশোরীই রয়ে গেছ। বুকে ফুলের কুঁড়ির মতো অস্ফুট স্তন। ইজেরে নুন, ঘামের দাগ। ধারাল নখর না হয়ে ওঠা আঙুলের শীর্ষগুলি সাদা। যে ঘরে গেলে, সে ঘরে তোমার নানা সময়ের উৎক্ষিপ্ত রক্তমাংস বা কখনো কঙ্কাল। হয়তো শরীরেরও টুকরো, হয়তো মনের। অনেক লুকোনো কাপড়ের ফালি, যেগুলো ব্যবহৃত হয়েছে উপছে আসা রক্ত মোছার কাজে। তখন আমি কিছু মাটির মূর্তি, কিছু মাঙ্গলিক ব্যাঙ, যে একটি নরম দেহের কচ্ছপ, যে কোনোদিন হাঁটে না, সমুদ্র বা ভেজা বালির তীর কখনো দেখেনি, সেসবের জগতে বসে আছি। দেখছি ছোট একটু চতুষ্কোণ দিয়ে আকাশ দেখা যায়। তার রঙ কিছুটা হতাশার মতো, কিছুটা দুঃখের মতো। বহুদিন আগে মৃত জোনাকি লেগে আছে তার গায়ে। তোমার কোনো শব্দ পাই না। শুধু মনে হয়, সেই যে আরেকটি ঘর, তার ভেতরে হয়তো তোমারই নানা সময়ের উৎক্ষিপ্ত হাড়- কঙ্কাল সরিয়ে সরিয়ে কিছু খুঁজছ তুমি। নিজের পিণ্ড পিণ্ড রক্তমাংস বা তার পূতিগন্ধে নিজেরই গহ্বর থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছ। বাইরে মূক এক আলোর মধ্যে বসে থাকতে থাকতে, ওইসব মাটির মূর্তি, মাঙ্গলিক ব্যাঙ বা স্থির হয়ে থাকা সেই নরম দেহের কচ্ছপের জগতে বসে থাকতে থাকতে মনে হয়, আমি যেন এক অনাহূতের মতো ঈশ্বরের অনেকগুলি বন্ধ দরজার একটির সামনে ঠাণ্ডা সিঁড়িতে বসে আছি। কোথাও বন্দরে মণিমানিক্যে একটি বোঝাই জাহাজ ভিড়েছে, তার ফলে অভূক্ত, অশক্ত অসংখ্য মানুষের উল্লসিত চিৎকার সেখানে আর কিছু ঘোড়ার আর্তনাদ
তুমি ফেরো, ফিরে আস চোখের কালো নদীচর নিয়ে। হাস, সে হাসিতে বহু নক্ষত্রযুগের যেন ক্লান্তি, মরে পাতা হয়ে যাওয়া ঝরে ঝরে পড়ে। এখন আর তোমাকে ছোট ফ্রক ও ইজের পরা কিশোরীর মতো লাগে না। মনে হয় যেন, অস্ত্রপচারের পর জরায়ু বদল করে পৃথিবীতে, কোলাহলে ফিরে এসেছ। এইরকম ফেরার নির্দিষ্ট কিছু পোশাক থাকে, যেন খানিকটা ছাই বা শ্যাওলা রঙের। তোমার গায়ে সেরকম একটি পোশাক। ফুলের কুঁড়ির মতো অস্ফুট স্তনের জায়গায় দুটি অত্যন্ত ভারী, কালো পাথরের মতো স্তন। যেন বহু বন্দি তোমার সেই স্তন পান করে মলমূত্রে ভরা নরকের মতো গারদে ভোরের অপেক্ষায়, একটু চঞ্চল পাখির ডাকের অপেক্ষায় দিন কাটিয়েছে। কখনো তোমার চোখে চোখ পড়ে আমার। কিছু অণু, শুক্রাণু একে অপরের দিকে ছুটে যায় তখন। আমি চোখ ফিরিয়ে দেখি তোমার জ্যামিতিক ঘর। ওঠবার সিঁড়ির মুখে কী সুদৃশ্য কাঠের একটি দরজা। এই দরজা ঈশ্বরের দরজা নয়, তোমার। তাতে একটি ছিদ্র, যা দিয়ে বাইরের আগন্তুককে দেখা যায়। জরিপ করা যায় তার মুখের রেখা, পেশীর বিন্যাস বা ঠোঁটের নকশা বা চিবুকের অস্পষ্ট ক্ষত। এই ঘরের কোথাও তোমার নীলাভ জলের মতো বিছানা আছে, কোথাও ডলফিন লাফিয়ে ওঠা দরজায় ঘেরা বাথরুম আছে। অসময়ের বীর্য বা পেচ্ছাপ বেরিয়ে যাবার নীরব ছিদ্র আছে সেখানে । হয়তো- বা একটি আয়নাও আছে অবিভাবকের মতো। আমার মুখোমুখি বসে তুমি হাস। আমার সেই হাসিকে ক্লান্ত একটি ঘোড়ার মুখের মতো মনে হয় অথবা আলোর নীচে দাঁড়ান কোনো নৈশপরির মতো অথবা অনেক ধুলিঝড়ের পর জানালায় কোনোক্রমে আটকে থাকা একখণ্ড স্নিগ্ধ মসলিনের মতো
আমি সেই কচ্ছপটিকে দেখি।সমুদ্র বা ভেজা বালির তীরের কোনো ধারণা ছাড়াই একটি বসবার আসনের হাতলে কেমন শিশুর মতো আহ্লাদে হাত- পা ছড়িয়ে কী গাঢ় শান্তিতে বুঁদ হয়ে আছে
হরিণশিশু
কী সমুজ্জ্বল রোদ চারপাশে, কী সমুজ্জ্বল রোদ। গত রাতে আমরা আবার সেই অভ্যস্ত শরীরে ফিরে এসেছি। সেই পরিচিত নুনে- ঘামে, চুলের গুমোটে। আজ এই সমুজ্জ্বল রোদ আমাদের হাড়গোড়- ভাঙা ঘরে কেমন একটি ফিকে আভা ছড়িয়ে রেখেছে। আমি নিজেকে পোশাকে মুড়িয়ে যেন- বা রোদ দেখার ভঙ্গিতে বাইরের সামান্য বারান্দাটিতে এসে দাঁড়িয়েছি। তুমি একটি যেন হরিণশিশুর খোঁজে এ ঘরে- ও ঘরে হেঁটে যাচ্ছ। কখনো যেমন তোমার আমার মনে হয়, এই পৃথিবীতে পৃথিবী কী ভয়াবহভাবে একা, আজ সেরকম মনে হচ্ছে না। দেখলাম পড়শী বাড়ির জানালার আলিসায় কী একটি পাখি যেন খানিকটা নিষ্প্রয়োজনে বসে আছে। শরীরে আঁকাবাঁকা ডোরা। এরকম সমুজ্জ্বল রোদ পাখিদের জীবনে, মানুষের জীবনে একই উৎস থেকে শুরু হয়, ভাবলে এ-ও অদ্ভুত লাগে। এইসব নিয়ম হয়তো পৃথিবীতে যেসব প্রেরিতপুরুষেরা এসেছেন, তাঁদের ইচ্ছেনুযায়ী তৈরি বা হয়তো নয়। তুমি হরিণশিশুর সন্ধানে এ ঘরে- ও ঘরে কখনো হেঁটে, কখনো ছুটে যাচ্ছ। এই সমুজ্জ্বল রোদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটি দেখতে আজ আমার ভাল লাগছে। কল্পনায় বেশ দেখতে পাই প্রকাণ্ড একটি ক্রুদ্ধ আকাশের দিকে গোছা গোছা বেলুনের সমষ্টি হর্ষে, আহ্লাদে উড়ে যাচ্ছে
হরিণশিশুটি কেমন তোমায় জব্দ করছে এইভেবে আমি মনে মনে একটু হেসে ফেলি যেন- বা। দেখি চোখের সম্মুখে গাছের পাতা ধরে রোদ দোল খাচ্ছে। যেসব ঝোপঝাড় কখনো মানুষের ভাষা বোঝে না, তাদের গায়েও কেমন রোদের নোলক। কখনো হরিণশিশুর পিছু পিছু ছুটে হয়রান হয়ে যাওয়া, পরিশ্রান্ত হয়ে যাওয়া- জীবনে কখনো হয়তো দরকার। এইমাত্র দেখলাম তোমার মুখে আলপনার মতো ঘাম, চুলের গুছি শেকড় থেকে খুলে এসে দৃষ্টির সামনে ঝুলছে। এ চেহারায় কতদিন পর, না দিন নয়, নক্ষত্রযুগ পরে তোমাকে দেখলাম। দেখলাম তোমার শরীর থেকে ভারী কলসের দেবী এখনো বিদায় নেননি। যদিও তুমি এরইমধ্যে বহু মরুপ্রান্তর অতিক্রম করেছ, উটসহ ধুলিঝড়ে নিখোঁজ হয়েছ, তবু সেই ভারী কলসের দেবী তোমার শরীরে যেন তাঁর একটি পা রেখে দিয়েছেন। সমুজ্জ্বল রোদের প্রান্তে বারান্দায় একটি শুকনো ধবধবে মানুষের মতো দাঁড়িয়ে মনে হয়, এরচেয়ে খুব বেশি আর কী প্রয়োজন? পড়শি বাড়ির জানালার আলিসায় বসা সেই ডোরা- দেওয়া ক্ষুদ্র পাখিটি এখন ডাকছে। ঠোঁটের গহ্বরে তার লাল তীব্র জিভ। এইসবও হয়তো পৃথিবীতে যেসব প্রেরিতপুরুষেরা এসেছেন, তাঁদের ইচ্ছেনুযায়ী তৈরি বা হয়তো নয়। কখনো মনে হয় এই সমুজ্জ্বল
রোদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে তোমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করি, এ ঘর- ও ঘরে খুঁজে তুমি হরিণশিশুটিকে খুঁজে পেলে কি না অবশেষে। নাকি পরিশ্রান্ত হয়ে কোনো একটি ঘরে বিদীর্ণ একটি গাছের মতো অসংখ্য ঝরা পাতার মধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে রইলে খুব হতবাক হয়ে
একদিন আমাদের দেখা হবে
একদিন আমাদের দেখা হবে। একটি মৌন কাচের এপারে- ওপারে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াব দুজন। কাচের গায়ে আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে আমরা ছুঁয়ে দেখব এ অন্যের মুখ, চোখ ও ঠোঁটের ঝুল। ছুঁয়ে দেখব গ্রীবার একটি নীল লতিয়ে ওঠা শিরা। বহুযুগ পর, বহু নোনা ঢেউ আর জাহাজডুবির পর। ছুঁয়ে দেখব এ অন্যের খটখটে নক্ষত্র, কোমরে হাতিয়ার নিয়ে দাঁড়ান কালপুরুষ। মৌন কাচের এপারে- ওপারে আমাদের দুটি অবুঝ হাতের আঙুল মাকড়সার মতো যেন হামা দিয়ে উঠবে, নামবে। কোথাও কোনো ছিদ্র পাবে না, কোথাও কোনো ফাটল পাবে না। বয়স্ক এক অবিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে সেই মৌন কাচ। যেন তার সুখ- দুঃখের উত্তাপ শান্ত হয়েছে। গা থেকে খসে গেছে কামের বাকল। এইভাবে সেই মৌন কাচ আমাদের রক্ষা করবে, আমাদের মুহূর্তে মুহূর্তে রক্ষা করবে। মোমের মতো গলে, খসে পড়তে দেবে না। আমরা দুজন শুধু কাচের ওপার থেকে ছুঁয়ে দেখব এ অন্যের শীতল রক্তমাংস, আকৃতি হারান স্তন। একসময় জলচর নাবিকের মতো শ্রান্ত হয়ে মৌন কাচের গায়ে ঠেকিয়ে রাখব উস্কোখুস্কো মাথা, ভেজা চুলের দাঁড়। এইভাবে একদিন আমাদের দেখা হবে। দিনটির বিশেষত্ব থাকবে না কোনো। শুধু সূর্য উঠবে অত্যন্ত সাদা হয়ে, একটি মথ উড়ে এসে বসবে তার গায়ে। থেকে থেকে তীক্ষ্ণ মিছরির মতো হাওয়া হবে। গাছগুলি অন্যমনস্ক হয়ে দুলবে
কিছুক্ষন আকাশ থেকে বালি খসে পড়ার পর আমরা নিজেরা নিজেদের সম্বিৎ ফিরে পাব। পিছনে তাকিয়ে দেখব যে পাহাড়- পরিখা আমরা পেরিয়ে এসেছি, দিগন্তে তারা কী প্রিয় অলংকারের মতো দাঁড়িয়ে আছে! যে ঘাসবন আমরা পেরিয়ে এসেছি, সেই ঘাসবন তখনো শিশুর মতো দুলছে। আমরা নিজেদের চুনে, হাড়ে ফিরে যাব। ফিরে যাব নিজেদের কঠিন কঙ্কালে। গাঢ় নৈঃশব্দ্য রেখে ফিরে যাব। আমাদের চুন, হাড়, কঠিন কঙ্কাল অতিকায় দরজার মতো হাঁ করে থাকবে, যেন লালা গড়িয়ে পড়া তৃষ্ণা নিয়ে বেঁচে আছে কোনো পশু। সেই মৌন কাচের গায়ে এরপর আমাদের অপসৃয়মান ছায়া পড়বে। তীরবিদ্ধ পিঠ ও ঊরুর ছায়া পড়বে। একপাল হাঁসের মতো আমাদের ধবধবে পোশাকের ছায়া পড়বে। ‘কী নিয়ে ফিরে যাচ্ছি আমরা, কী নিতে এসেছিলাম?’ আমরা ভাবব হয়তো একবার। তার উত্তর দেবে মানুষের লোহা ও পাঁজরের আড়ালে যে নিষ্পলক চোখের এক পাখি থাকে, সেই পাখি। আমরা বুঝব সেই ভাষা, সেই অনুক্ত উত্তর। সেই মৌন কাচ প্রাজ্ঞ এক ঈশ্বরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে তখনো। দিন তখনো ভীষণভাবে বিশেষত্বহীন। সাদা সূর্যের গায়ে মথ তখনো ডানা গুটিয়ে বসে আছে। তীক্ষ্ণ মিছরির মতো হাওয়া হচ্ছে থেকে থেকে। তাতে অন্যমনস্ক হয়ে দুলছে সব গাছ। একদিন এইভাবে আমাদের দেখা হবে। সেই দিন হয়তো আমাদের খুব নিকটেই আছে
উত্তুঙ্গ একটি মোমের মতো
তুমি জান, আমিও জানি, একদিন সকালে পাটভাঙা থানের মতো রৌদ্র উঠবে। গাছের শীর্ষে, পাতার জাফরির ভেতর তখনো কিছু কালো সর লেগে থাকবে পূর্বতন রাতটির। আমাদের নতুন ফুলের মতো পোশাকের ভেতর, ঝুল ও নকশার ভেতর থেকে যাবে আমাদের একই শরীর, হাড়- পঞ্জর মুড়ে রাখা সেই কবেকার উদবর্তন থেমে যাওয়া পুরোনো মাংস। আমার নরম পাথরের মতো হাত, তোমার ফর্সা, উদ্ভাসিত পায়ের গোছ। সেই সকাল হবে একটি পরিপূর্ণ সকাল। সিঁড়ির ধাপে পড়ে থাকবে সেই পাটভাঙা থানের মতো রৌদ্র, আঙিনার এদিকে- ওদিকে মুঠো করে বাঁধা চুলের মতো ঘাসে, জংলায় লেগে থাকবে সেই পাটভাঙা থানের মতো রৌদ্র। চতুর্পাশে হাওয়া বইবে। সেই হাওয়ায় ডুবে থাকবে ঘন শান্তিতে ভরা ছোট ছোট বাটি। আমাদের পেছনে তখন শৈলচূড়ার মতো ঝকঝক করবে আমাদের খাঁচা, নিষ্কলঙ্ক খাঁচা। তুমি জান, আমিও জানি এইসব ছোটবড়ো খাঁচাগুলি আমাদের প্রিয় গৃহকোণ। যেখানে আমরা কখনো মুখোমুখি বসি, মৃদু শব্দে চামচ নাড়িয়ে গুলি দ্রবনীয় যা কিছু। কখনো অস্ফুট হাতে কাছে টেনে আনি নুনের কৌটো। প্রহরীর মতো আমাদের ঘিরে খাঁচাগুলি দাঁড়িয়ে থাকে, অবিশ্বাস্যভাবে ঝকঝক করে। সেইদিন, সেই পরিপূর্ণ সকালের পাটভাঙা থানের মতো রৌদ্রে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হবে, নিকষ লোমের আড়াল থেকে বেরোলে পৃথিবী এখনো স্বপ্নের। তোমার কিছুটা চটচটে মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হবে, সংসারে তেমন সময় পাও না তুমি। সারাক্ষণ একটি কালো পোকা তোমার কশেরুকা বেয়ে বেয়ে নামে
সেই যে একদিন সকালে পাটভাঙা থানের মতো রৌদ্র উঠবে, সেইদিন অমন রৌদ্রের মধ্যে, শান্তির ছোট ছোট বাটি ডোবা সেই পরিপূর্ণ সকালের হাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে অতর্কিতে আমরা শুনতে পাব, কোথাও একটি ধ্বস পাহাড় ভেঙে ভেঙে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে যেন। কোথাও একটি তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে যেন আমাদের উদ্দ্যেশ্যেই কিছু বলছে। তুমি জান, আমিও জানি তেমন শষ্যের খেত পেরিয়ে আমরা কখনো হেঁটে আসিনি। স্বচ্ছ আলোর মতো নয় আমাদের আত্মা। পাপ ও পুণ্যের টানে আমরা কখনো জিরাফের পিঠে বসেছি, কখনো- বা এঁদো চেহারার বাঘের। তুমি জান, আমি জানি আমাদের দু’জনেরই চাঁদে অন্য শরীরের কাম, রক্ত লেগে আছে। ফলে সেই পরিপূর্ণ সকালে, পাটভাঙা থানের মতো রৌদ্রে নিজেদেরই তৈরি এবড়ো-খেবড়ো ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমরা মেনে নেব, আমাদের মুখোসের আড়ালে বেঁচে থাকা শেষ হল। পোশাকের আড়ালে, সলমা- জড়ির আড়ালে দেহগত বেঁচে থাকা আমাদের শেষ হল। মুখোমুখি নৈঃশব্দ্য নিয়ে বসে থাকার দিন শেষ হল। যে তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর কোথাও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আমাদের উদ্দ্যেশ্যে কিছু বলছে, তা অগ্রাহ্য করে খুব ধীর পায়ে একবার হিরণ্ময় জল আর বালতির জগৎ থেকে ঘুরে আসব আমরা। দরজায় পাশেই একটি চিরকালের মূক আয়নায় শেষবার নিজেদের দেখে নেব। তুমি লাবণ্যময়ী ছিলে, আমি চোখ, পেশীর আড়ালে একটি কঙ্কালের মতো। তখনই যেন কোথাও একটি ভোঁ বেজে উঠবে, কোনো অতিকায় টইটম্বুর জাহাজ বন্দর ছাড়ার আগে যেমন ভোঁ বেজে ওঠে
তুমি আমি অত্যন্ত বিষণ্ণ চোখের দুটি পেঁচা হয়ে একটি অদৃশ্য গাছের কোটরে বসে থাকব এরপর। শৈলচূড়ার মতো আমাদের খাঁচা, নিষ্কলঙ্ক খাঁচাগুলি কী এক আনন্দে, বিষে তখনো ঝকঝক করবে, উত্তুঙ্গ একটি মোমের মতো হর্ষে গলে গলে পড়বে